মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ২৩
ষোড়শ অধ্যায়
কলেজের অ্যানুয়াল কালচারাল ফেস্টের দিন সকাল থেকেই পুরো ক্যাম্পাস হাজারো আলোর মালায় সেজে যেন এক জাদুকরী রূপ ধারণ করেছে। চারদিকে স্টুডেন্টদের ভিড়; হাসি-ঠাট্টা, হইহুল্লোড়, পারফিউমের গন্ধ আর সাজগোজের প্রতিযোগিতায় চারদিক মুখর।
চারপাশের গাছগুলোতে জড়ানো অজস্র ফেয়ারি লাইট, ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে ফুড স্টলগুলোর ভিড় আর বাতাসে ভাসমান পারফিউম, কফি এবং ফাস্টফুডের গন্ধ পুরো পরিবেশটাকে একটা জমজমাট, প্রাণবন্ত কার্নিভালে পরিণত করেছে।
বিশাল মেইন অডিটোরিয়াম আজ আলোর বন্যায় ভাসছে। বাইরে বিশাল প্যান্ডেল, ফুড স্টল আর চারদিকে স্পিকার থেকে ভেসে আসা ভারী বেস-গিটারে তোলা ব্যান্ডের গানের আওয়াজ আর হাজারো স্টুডেন্টের উল্লাস। রঙিন লেজার লাইটগুলো অন্ধকারের বুক চিরে স্টুডেন্টদের উন্মত্ত ভিড়ের ওপর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু অডিটোরিয়ামের ঠিক মাঝখানের ভিআইপি রো-এর আশেপাশে যাদের চোখ যাচ্ছিল, তাদের দৃষ্টি যেন এক জায়গায় গিয়ে আঠার মতো আটকে যাচ্ছিল।
মিস বিদিশা গাঙ্গুলি।
বিক্রমের সেই 'পরামর্শ'টা বিদিশা সচেতনভাবে না মানলেও, অবচেতনে তার নারীমন সেটাই বেছে নিয়েছিল।
আজ তিনি পরেছেন একটা ডিপ মেরুন রঙের কাঞ্জিভরম শাড়ি, যার পাড়ে চওড়া অ্যান্টিক গোল্ডেন কাজ যা অডিটোরিয়ামের আলোয় ঝলমল করছে। ব্লাউজটা ডিপ-নেক, কনুই অবধি হাতা আর পিঠের দিকটা একটা সরু দড়ি দিয়ে বাঁধা। ব্লাউজের নেকলাইনটা গভীর হওয়ায় তার ফর্সা, মসৃণ গলার খাঁজটাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরেছে।
চুলগুলো আজ আর ক্যাজুয়ালি বাঁধা নয়, একটা নিটোল খোঁপা করে তাতে এক গোছা তাজা জুঁইফুলের গজরা জড়ানো। চোখে গাঢ় করে টানা কাজল, কপালে একটা ছোট্ট মেরুন টিপ, কানে ভারী সোনার ঝুমকো আর ঠোঁটে ডার্ক মেরুন লিপস্টিক।
শাড়ির ভারী আঁচলটা তার কাঁধের ওপর দিয়ে নিখুঁতভাবে পিন করা, যা তার টানটান, উদ্ধত স্তনযুগল আর সরু কোমরের ভাঁজকে একটা অবিশ্বাস্য মোহময়ী, রাজকীয় রূপ দিয়েছে।
তাকে দেখে আজ আর কোনো কলেজের শিক্ষিকা মনে হচ্ছে না, অডিটোরিয়ামের মায়াবী আলোয় বিদিশাকে দেখে বরং মনে হচ্ছে কোন প্রাচীন রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল থেকে নেমে আসা এক বিস্মৃতা মোহময়ী সম্রাজ্ঞী। তার প্রতিটি পদক্ষেপে আভিজাত্য ঝরে পড়ছিল।
তাকে দেখে আশেপাশের ছেলেরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সবার মুগ্ধ দৃষ্টি বারবার এক জায়গায় গিয়ে স্থির হচ্ছিল। রাহুল বোস থেকে শুরু করে কলেজের প্রিন্সিপাল, সবার চোখ বারবার ঘুরেফিরে তার দিকেই চলে যাচ্ছে। বিদিশার নিজেরও এই অ্যাটেনশনটা খারাপ লাগছিল না। বহু বছর পর আবার নিজের নারীত্বের এই উদ্যাপনটা তিনি দুহাত ভরে উপভোগ করছিলেন।
অডিটোরিয়ামের একদম পেছনের দিকে, একটা পিলারের অন্ধকারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অয়ন।
তার পরনে একটা কালো টি-শার্ট আর ডার্ক জিন্স। তার দৃষ্টি স্টেজের দিকে নেই, তার চোখ শুধু একটা মানুষের ওপরই স্থির হয়ে আছে।
তার মা।
অয়নের বুকের ভেতরটা একটা বিচিত্র আর তীব্র অনুভূতিতে দুমড়ে মুচড়ে উঠল।
তার মা... তার দেবী... এত সুন্দরী... এত মোহময়ী কেন?
শত শত পুরুষের হাজারটা লোলুপ চোখ আজ তার মায়ের উন্মুক্ত ঘাড়, পিঠ আর শাড়ির প্রতিটি ভাঁজ গিলছে। প্রতিটি মুগ্ধ দৃষ্টি যেন বিষাক্ত তীরের মতো এসে ওর শরীরে বিঁধছে।
অয়নের একবার ইচ্ছে হল ছুটে গিয়ে ভিড় সরিয়ে বিদিশাকে একটা চাদরে ঢেকে আগলে বাড়ি নিয়ে যেতে।
কিন্তু পরক্ষণেই সে কঠোরভাবে নিজের এই অনুভূতিটাকে দমন করল। সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার মায়ের প্রফেশনাল স্পেসে বা ব্যক্তিগত জীবনে সে আর কখনো নাক গলাবে না। আজ তিনি অরুণের স্ত্রী নন, অয়নের মা-ও নন, তিনি অ্যাডভান্সড ম্যাথমেটিক্সের লেকচারার 'মিস বিদিশা গাঙ্গুলি'।
তার ভেতরে একটা তীব্র প্রটেকটিভ ইনস্টিংক্ট কাজ করলেও, সে নিজেকে আপ্রাণ চেষ্টায় আটকে রাখল। এই অন্ধ আবেগ আর তীব্র অধিকারবোধের আড়ালের অবদমিত অনুভূতির সত্যিটা জানতে পারলে বিদিশা ভয়ে আর ঘৃণায় শিউরে উঠবেন।
ঠিক তখনই বিদিশার দিকে এগিয়ে এলেন রাহুল বোস। রাহুলের চোখে একটা স্পষ্ট, মুগ্ধ ঘোর যা গোপন করার কোন চেষ্টাই তিনি করলেন না।
"মিস গাঙ্গুলি," রাহুল একটু ঝুঁকে এসে অডিটোরিয়ামের আওয়াজের মধ্যেও এমনভাবে বললেন যাতে বিদিশা শুনতে পান।
"আজ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, ধ্রুপদী উপন্যাসের কোন কালজয়ী নায়িকা যেন সোজা বইয়ের পাতা থেকে বাস্তবের মাটিতে নেমে এসেছে। ইউ লুক অ্যাবসলুটলি স্টানিং।"
বিদিশার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লাজুক অথচ আত্মবিশ্বাসী একটা হাসি ফুটে উঠল। প্রশংসা কার না ভাল লাগে ?
তিনি সামান্য ঘাড় হেলিয়ে উত্তর দিলেন, "থ্যাংক ইউ, মিস্টার বোস"।
এই গোটা দৃশ্যটা অডিটোরিয়ামের আরেক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বিক্রম মালহোত্রার চোখে এসে তীরের মতো বিঁধল। তার শিকারের দিকে অন্য কেউ নজর দিচ্ছে, এটা বিক্রমের কাছে অসহ্য। রাহুল বোসের মুগ্ধ চাহনি আর বিদিশার প্রশ্রয়মাখা হাসি বিক্রমের ইগোতে একটা জোরদার ধাক্কা দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখের মণি দুটো রাগে কুঁচকে ছোট হয়ে এল। সে হাতের মুঠি শক্ত করে রাগটাকে সামাল দেবার চেষ্টা করল।
সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল, আজ রাতেই, এই উৎসবের উন্মাদনার আড়ালে সে তার শিকারের উপর শেষ থাবাটা বসাবে। আজ সে প্রমাণ করে দেবে যে এই মোহময়ী নারীর শরীরের ওপর একচ্ছত্র অধিকার আসলে কার।
রাত আটটা বাজে। ফেস্টের উন্মাদনা তখন তুঙ্গে। অডিটোরিয়ামের মেন স্টেজে তখন স্টুডেন্টদের একটা জমজমাট ডান্স পারফরম্যান্স চলছে। স্পিকারের ভারী বেস-এর আওয়াজে মাটি কাঁপছে। রঙিন লেজার লাইটগুলো অন্ধকারের বুক চিরে তীব্র গতিতে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। চারদিকে উন্মত্ত চিৎকারে কান পাতা দায়। স্টুডেন্টদের উল্লাস আর তালি মিউজিকের সুরের সাথে মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে।
ব্যাকস্টেজটা বেশ অন্ধকার আর ঘিঞ্জি। অডিটোরিয়ামের সেই চাকচিক্য আর আলোর ঝলকানি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক জগত বলা যেতে পারে। দু-একটা নীলচে সার্ভিস লাইট কোনমতে টিমটিম করে জ্বলছে। চারদিকে বড় বড় সাউন্ড বক্স, মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্টের কেস, কুণ্ডলী পাকানো তারের জঙ্গল আর নাটকের ভাঙাচোরা প্রপস ছড়ানো। এই জায়গাটা ভিড়ভাট্টা থেকে বেশ কিছুটা দূরে এবং আপেক্ষিক অর্থে নিভৃত। মিউজিকের ভারী বেস-টা এখানে এসে একটা চাপা, 'ধকধক' আওয়াজে পরিণত হয়েছে।
বিদিশা ব্যাকস্টেজে এসেছিলেন পরবর্তী পারফরম্যান্সের জন্য মাইক আর লাইটের কিউ ঠিক আছে কি না, সেটা চেক করতে। এই ভারী শাড়ি আর ভিড়ের মধ্যে সারাদিন ঘুরে তিনি একটু ক্লান্ত। তার কপালে ঘাম জমেছে।
তিনি একটা বড় কাঠের প্রপস-এর পাশে দাঁড়িয়ে লিস্টটা মেলাচ্ছিলেন। হাতে একটা ক্লিপবোর্ড, সেখানে আগামী পারফরম্যান্সের শিডিউল। আলোর স্বল্পতায় মাঝে মাঝে তার চোখ কুঁচকে আসছিল। তিনি ক্লিপবোর্ডটা চোখের সামনে তুলে ধরে কপালের একটা অবাধ্য চুলের গোছা সরালেন।
"ম্যাম, আপনি এখানে? আমি আপনাকে সারা অডিটোরিয়ামে খুঁজছি।"
বিদিশা মুখ তুলে তাকালেন। বিক্রম মালহোত্রা, পরনে আজ একটা কালো রঙের ডিজাইনার কুর্তা আর সাদা পাঞ্জাবি। তাকে দেখতে অসম্ভব সুদর্শন লাগছে। বিক্রমের ঠোঁটে সেই চিরপরিচিত, নিখুঁত জেন্টলম্যানের হাসি।
"কী ব্যাপার বিক্রম? লাইটিং নিয়ে কোনো প্রবলেম?"
বিদিশা লিস্ট থেকে চোখ না সরিয়েই প্রফেশনাল গলায় জিজ্ঞেস করলেন। তার স্বরে একজন দায়িত্বশীল প্রফেসরের গাম্ভীর্য থাকলেও, সারাদিনের ধকলের একটা ক্লান্তি সেখানে মিশে ছিল।
"নো ম্যাম। সব পারফেক্টলি চলছে। আমি জাস্ট আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম...",
বিক্রম এক পা এগিয়ে এল। ব্যাকস্টেজের আবছা আলোয় তার চোখদুটো ঠিক ক্ষুধার্ত সাপের মতো ডিপ-কাট ব্লাউজে মোড়া বিদিশার গভীর নেকলাইন আর মেরুন শাড়িতে মোড়া শরীরের প্রতিটি ভাঁজের উপর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত অথচ লোলুপভাবে একবার ঘুরে এল। বিদিশার নজর ক্লিপবোর্ডের দিকে থাকায় সেই বিষাক্ত দৃষ্টি তিনি টের পেলেন না।
"...আপনাকে আজ আক্ষরিক অর্থেই গর্জাস লাগছে, ম্যাম। বিলিভ মি, পুরো অডিটোরিয়ামের লাইটিং আজ আপনার সামনে ফিকে হয়ে গেছে।"
বিদিশা একটু থমকালেন। ডেকোরাম অনুযায়ী কথাটা শুধু অনুচিত নয়, আপত্তিকরও বটে। কিন্তু আজ সকাল থেকে তিনি অগণিত মানুষের মুগ্ধদৃষ্টি দৃষ্টি পেয়েছেন, রাহুল বোস একটু আগে এসে তার প্রশংসা করে গেছেন। সেই স্তুতির জোয়ারে তার ইগো এখন তুঙ্গে। তিনি এটাকে বিপদসংকেত হিসেবে না দেখে নিজের সৌন্দর্যের একটা স্বীকৃতি হিসেবে ধরে নিলেন। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল, যা তিনি পরক্ষণেই গাম্ভীর্যের আড়ালে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করলেন।
"থ্যাংক ইউ, বিক্রম। নাউ, গো চেক দা সাউন্ড মিক্সার", বিদিশা হালকা হেসে ঘুরে দাঁড়াতে গেলেন।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ছোট দুর্ঘটনা ঘটল।
বিদিশা যাওয়ার জন্য যেই না এক পা বাড়িয়েছেন, ব্যাকস্টেজের সেই পুরনো কাঠের প্রপস থেকে বেরিয়ে থাকা একটা মরচে ধরা পেরেকের মাথায় তার দামি কাঞ্জিভরমের কুঁচিটা সজোরে আটকে গেল। বিদিশা টাল সামলাতে না পেরে একটু হোঁচট খেলেন।
"আহ্!" বিদিশা বিরক্তি নিয়ে নিচের দিকে তাকালেন। ব্যাকস্টেজের পুরনো কাঠের প্রপস থেকে বেরিয়ে থাকা একটা মরচে ধরা পেরেকের মাথায় তার দামি কাঞ্জিভরমের কুঁচিটা আটকে গেছে। সিল্কের সুতোগুলো পেরেকের মাথায় এমনভাবে আটকেছে যে একটু জোরে টান দিলেই কয়েক হাজার টাকার শাড়িটা মাঝখান থেকে ফেঁসে যাবে। বিদিশা অসহায়ভাবে নিচু হয়ে সেটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলেন।
"ম্যাম, জাস্ট আ সেকেন্ড! টানবেন না, ছিঁড়ে যাবে!"
বিক্রম এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে, অত্যন্ত তৎপর ভঙ্গিতে বিদিশার ঠিক সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার এই আচরণটা দূর থেকে যেকোন মানুষের চোখেই একজন অনুগত, বাধ্য ছাত্রের মতো মনে হবে।
কিন্তু বিক্রমের উদ্দেশ্য সাহায্য করা ছিল না।
সে অত্যন্ত ধীরেসুস্থে পেরেকের মাথা থেকে শাড়ির জট ছাড়াতে শুরু করল। বিদিশা ওপর থেকে বিড়ম্বিত মুখে দাঁড়িয়ে দেখছেন। ব্যাকস্টেজের এই আবছা আলো-আঁধারিতে তাদের দুজনকে বেশ ঘনিষ্ঠ মনে হচ্ছে।
শাড়ির কুঁচিটা ছাড়ানোর অছিলায় বিক্রম তার দুই হাত বিদিশার পায়ের কাছ থেকে ইঞ্চি ইঞ্চি করে ওপরের দিকে তুলতে লাগল। তার আঙুলগুলো শাড়ির ভাঁজ ঠিক করে দেওয়ার নাম করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম, অথচ সুপরিকল্পিতভাবে বিদিশার উন্মুক্ত কোমরের খুব কাছে চলে এল।
বিদিশার শরীরটা রিফ্লেক্স অ্যাকশনে একটু শক্ত হয়ে গেল।
পেরেকের সেই জট ততক্ষণে আলগা হয়ে গেছে, কিন্তু বিক্রম উঠে দাঁড়াল না। সে হাঁটু গেড়ে ওভাবেই বসে রইল।
তার বাঁ হাতের শক্ত, পুরুষালি আঙুলগুলো এবার বিদিশার নাভির ঠিক পাশে, শাড়ির কুঁচি গোঁজার ঠিক ওপরে তার ফর্সা, মসৃণ কোমরের উন্মুক্ত ত্বকের ওপর সজোরে চেপে বসল। এটা ভুলবশত লেগে যাওয়া কোন আলতো ছোঁয়া নয়। সে স্পষ্টতই খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এই স্পর্শটা করেছে।
বিদিশার শ্বাস এক মুহূর্তের জন্য গলার কাছে আটকে গেল। তিনি বিস্ময়ে আর অপমানে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখদুটো অস্বস্তিতে বড় বড় হয়ে গেল।
তার মস্তিষ্ক চিৎকার করে বিপদসঙ্কেত পাঠাতে লাগল - 'ছেলেটা সব সীমা গণ্ডি লঙ্ঘন করছে! ও যা করছে সেটা প্রফেশনাল বা পার্সোনাল কোনো ডেকোরামের মধ্যেই পড়ে না!'
বিক্রম এবার মুখটা সামান্য উঁচিয়ে বিদিশার চোখের দিকে তাকাল। তার সেই 'ভদ্র ছাত্রের' মুখোশটা খসে পড়েছে, গলার স্বরটাও এখন আর সেই বাধ্য ছাত্রের মতো নম্র নেই। সেটা কামার্ত ফিসফিসানিতে ভারী হয়ে উঠেছে,
"খুব সুন্দর লাগছে আপনাকে... জাস্ট পারফেক্ট। এই মেরুন রঙটা আপনার গায়ের রঙের সাথে একদম...", বিক্রমের আঙুলের চাপ বিদিশার কোমরের মাংসে আরও গভীর হলো,
বিক্রমের কামার্ত ফিসফিসানি বিদিশার কানে পৌঁছানোর আগেই, ব্যাকস্টেজের অন্ধকার চিরে একটা পাশবিক গর্জন আছড়ে পড়ল।
"মা-দার-চো-দ!"
বিদিশা আর বিক্রম কিছু বুঝে ওঠার আগেই, পাশের একটা সরু প্যাসেজের অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ছায়ামূর্তি ঝড়ের গতিতে ধেয়ে এল।
অয়ন।
অডিটোরিয়ামের কানফাটানো আওয়াজ আর মানুষের ভিড়ে দমবন্ধ লাগছিল ওর। একটু শান্ত নিরিবিলি পরিবেশের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে ব্যাকস্টেজে চলে আসে।
করিডোরে পা রাখতেই সময় যেন থমকে গেল ওর চোখের সামনে।
তার দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যবশত, অয়ন ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিল, যখন বিক্রমের লোলুপ আঙুলগুলো তার মায়ের কোমরের খাঁজে কামড় দিয়ে বসেছিল। সে ঠিক ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিক্রমের ওই নোংরা স্পর্শ, তার চেপে বসা আঙুল এবং ওই কামার্ত স্বরে ফিসফিসানিগুলো স্পষ্ট দেখতে এবং শুনতে পেয়েছে।
অয়নের মাথার ভেতরকার সব কটা স্নায়ু যেন একসাথে ছিঁড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে অয়নের চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতালির সেই বিভীষিকাময় রাত।
বনগানির সেই বীভৎস মুখ আর বিক্রমের এই ধূর্ত চেহারাটা ওর মগজের ভেতর একাকার হয়ে মিশে গেল। বনগানি... তার মায়ের গায়ে হাত দিচ্ছে... ওই নোংরা, লোলুপ স্পর্শ।
না! আর না!
এতদিনের জমানো বিদিশার অবহেলা, বিক্রমের নোংরা পরিকল্পনা যা সে একদিন নিজের কানে প্র্যাকটিস থেকে ফেরার সময় শুনেছিল আর নিজের ভেতরের অবদমিত যন্ত্রণার লাভা, সবকিছু এক নিমেষে বিস্ফারিত হলো।
এই কদিন ধরে সযত্নে লালন করা 'ডেকোরাম', বিদিশাকে দেওয়া সংযমের প্রতিশ্রুতি, আর নিজের ওপর রাখা কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সবকিছু এক লহমায় ভস্মীভূত হয়ে গেল। অয়ন চ্যাটার্জীর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল এক রক্তপিপাসু দানব। সে ভুলে গেল স্থান-কাল-পাত্র, ভুলে গেল এটা তার কলেজ আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার প্রফেসর।
বিদিশাকে দেওয়া ডেকোরাম মেনটেইন করার প্রতিশ্রুতি, সবার সামনে বিদিশার সম্মান, নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিজের সীমা, সব ভুলে গিয়ে সে একজন মানুষ থেকে নিমেষের মধ্যে একটা হিংস্র, বন্য জানোয়ারে পরিণত হলো।
বিক্রম তখনো হাঁটু গেড়ে বসে বিদিশার কোমরের সেই নিষিদ্ধ স্পর্শসুখটুকু উপভোগ করছিল। অয়ন আর এক সেকেন্ড দেরি করল না। সে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো বিক্রমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অয়নের এই আকস্মিক এবং বিধ্বংসী আক্রমণে বিক্রম হকচকিয়ে গেল।
"অয়ন! কী করছ তুমি! ছাড়ো ওকে!" বিদিশা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু, অয়ন তখন কোনো কথা শোনার মতো অবস্থায় ছিল না। তার চোখের মণি দুটো তখন আক্ষরিক অর্থেই জ্বলছে। সে বিক্রমের দামী ডিজাইনার কুর্তার কলারটা দুই হাতে খামচে ধরে, এক অবিশ্বাস্য পাশবিক শক্তির বলে তাকে মাটি থেকে প্রায় শূন্যে তুলে নিল। তারপর তাকে সজোরে ছুঁড়ে মারল পেছনের একটা বিশাল সাউন্ড বক্সের ওপর।
ধড়াম!
সাউন্ড বক্সের কাঠ আর স্পিকারের মেটাল বডি বিক্রমের পিঠের ঘায়ে আর্তনাদ করে উঠল।
বিক্রম ধূর্ত। চরম ধূর্ত সে। যন্ত্রণায় তার শরীর কুঁকড়ে গেলেও পরমুহূর্তেই সে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ফেলল। সে বুঝতে পারল পরিস্থিতি তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখন যদি সে পাল্টা লড়াই শুরু করে, তবে বিদিশার চোখে তার এতদিনের সযত্নে লালিত 'ভদ্র ও বাধ্য ছাত্রের' মুখোশটা এক লহমায় চুরমার হয়ে যাবে।
সে নিজে পাল্টা মারল না।
সাউন্ড বক্সে আছড়ে পড়ে বিক্রম এক সেকেন্ডের জন্য অয়নের চোখের দিকে তাকাল। সেই এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখে আত্মবিশ্বাস থাকলেও, তার পরের মুহূর্তেই সে নিজের চোখমুখ পুরোপুরি বদলে ফেলল।
নিজের আসল রূপটা লুকিয়ে ফেলে সে একটা নিরীহ, ভয় পাওয়া ছাত্রের মুখোশ পরে নিল। এক নিপুণ কুশীলবের মতো সে নিজের মুখভঙ্গিতে একরাশ আতঙ্ক আর অসহায়তা ফুটিয়ে তুলল।
মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই অত্যন্ত নিরীহ ভাবে, ভয় পাওয়া ছাত্রের মতো কাঁপা কাঁপা দু'হাত তুলে সে গোঙাতে শুরু করল, "কী করছ ভাই? পাগল হয়ে গেলে নাকি? ছাড়ো! ম্যামের শাড়ি আটকে গেছিল, আমি তো জাস্ট ওটা..."
"চুপপপপ!"
অয়নের গর্জনটা ব্যাকস্টেজের মিউজিকের আওয়াজকেও ছাপিয়ে গেল।
বিক্রম নিজেকে বাঁচানোর নাটক করতে করতে আর্তনাদ করে উঠল। "ম্যাম! দেখুন ছেলেটা কী করছে! আমি তো জাস্ট আপনার শাড়িটা..."
অয়ন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ইতালির সেই বীভৎস রাতের বনগানী আর আজকের এই বিক্রম, অয়নের চোখে দুটো মুখ এক হয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তার মা... তার দেবী... তার শরীরে এই লম্পটটার হাত!
সে উন্মত্তের মতো মাটিতে পড়ে থাকা বিক্রমের বুকের ওপর উঠে বসল।
তার ডান হাতের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। তার কপালের রগগুলো শিরা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন কোনো দয়া নেই, সে জায়গায় আছে এক নিখাদ খুনি সত্তার ছায়া যেমন আজ থেকে চার বছর আগে ইতালিতে ছিল।
"অয়ন! স্টপ ইট! লিভ হিম!" বিদিশা রাগে, ভয়ে আর অপমানে চিৎকার করে উঠলেন। তার সাজানো ফেস্ট, তার প্রফেশনাল ইমেজ - সব, সবকিছু তার চোখের সামনে এই একটা ছেলের গুন্ডামিতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু অয়নের চোখদুটো তখন জবাফুলের মতো টকটকে লাল। তার চোখের সামনে শুধু বিক্রমের ওই লোলুপ আঙুলগুলো ভাসছে, যা দিয়ে একটু আগে সে বিদিশার কোমরের ত্বক ছুঁয়েছিল।
তার কানের কাছে তখন আর পৃথিবীর কোনো শব্দ পৌঁছোচ্ছে না। তার মায়ের পবিত্র শরীরে এই শুয়োরের বাচ্চাটা হাত দিয়েছে! তার মা, তার দেবী - তার শরীরে এই লম্পটটার হাত!
অয়ন বিক্রমের কলারটা এক হাতে শক্ত করে টিপে ধরল, যেন তার দমটা ওখানেই বের করে দেবে। তারপর নিজের ডান হাতটা মুঠি পাকিয়ে নিজের সমস্ত জমাট বাঁধা আক্রোশ আর ঘৃণা দিয়ে সজোরে, বিক্রমের চোয়ালে একটা ঘুঁষি মারল।
ক্র্যাক!
হাড়ের সাথে হাড়ের সংঘর্ষের একটা বীভৎস ক্যাঁচক্যাঁচে আওয়াজ হলো। বিক্রমের মাথাটা সজোরে ঘুরে গিয়ে পাশের কাঠের প্রপসের সাথে ধাক্কা খেল।
তার ঠোঁট আর দাঁতের মাড়ি ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে এল। কয়েকটা গাঢ় লাল রক্তের ছিটে গিয়ে লাগল অয়নের কালো শার্টের হাতায়।
"শুয়োরের বাচ্চা! তোকে আমি আজ মেরেই ফেলব!" কোন মানুষের গলায় নয়, বরং অয়ন একটা বুনো জানোয়ারের মতো গর্জন করে উঠল। সে বিক্রমের বুকের ওপর জেঁকে বসে পাগলের মতো, অন্ধের মতো তার মুখে একের পর এক ঘুঁষি চালাতে শুরু করল।
পুরো ব্যাকস্টেজে ততক্ষণে একটা হুলুস্থুল পড়ে গেছে। মেইন অডিটোরিয়াম থেকে স্টুডেন্ট আর ভলান্টিয়াররা বিদিশার চিৎকার আর ধস্তাধস্তির আওয়াজ শুনে দৌড়ে আসতে শুরু করেছে।
"অয়ন! ছাড় ওকে! মেরে ফেলবি নাকি!"
স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট সাহিল ভিড় ঠেলে সবার আগে ছুটে এল। সে দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে অয়নকে জড়িয়ে ধরল। সাহিল দুহাত দিয়ে অয়নের বুক জড়িয়ে ধরে তাকে বিক্রমের ওপর থেকে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। অয়নের গায়ে তখন অসুরের বল।
সে একটা তীব্র শারীরিক মোচড়ে সাহিলকে কনুই দিয়ে একপাশে ছিটকে সরিয়ে দিয়ে আবার বিক্রমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল।
"অয়ন! স্টপ ইট! জাস্ট স্টপ ইট!"
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে এবার পেছন থেকে আরো তিন-চারটে মজবুত হাত অয়নকে লোহার মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরল। সাহিলের সাথে আরও দুটো ছেলে মিলে অয়নকে টেনে বিক্রমের উপর থেকে সরিয়ে আনল।
"অয়ন, মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? তুই ফ্যাকাল্টির সামনে হাতাহাতি করছিস!", সাহিল চিৎকার করে উঠল।
অয়ন তখনো ক্ষিপ্ত বাঘের মতো ছটফট করছে। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার চোখের মণি টকটকে লাল।
মাটিতে পড়ে থাকা বিক্রম মালহোত্রা এবার অত্যন্ত ধীরে ধীরে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে বসল। তার সুন্দর, সুদর্শন মুখটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণটা বীভৎসভাবে ফেটে গেছে, সেখান থেকে গাঢ় লাল রক্ত চিবুক বেয়ে সাদা পাঞ্জাবির বুকের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। সে তার নিজের কাঁপা কাঁপা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ঠোঁটের রক্তটা মুছল। তারপর সেই রক্তের দাগ মাখা হাতটার দিকে তাকিয়ে এমন এক অসহায় দৃষ্টি দিল, যা দেখে যে কেউ ভাববে সে এক চরম অবিচারের শিকার।
ততক্ষণে রকি, সামির সাথে আরো কয়েকজন ছেলে দৌড়ে এসে অয়নকে জাপটে ধরে পেছন দিকে টেনে নিয়ে গেল। ব্যাকস্টেজের সেই সরু করিডোরে তখন প্রবল হুড়োহুড়ি, মানুষের মাথার ভিড়। বাতাসে অস্ফুট গুঞ্জন।
"ম্যাম! ম্যাম, আপনি ঠিক আছেন? কোথাও লাগেনি তো ?"
দুজন ভলান্টিয়ার মেয়ে দৌড়ে এসে বিদিশাকে দুপাশ থেকে ধরল। বিদিশা এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার সারা শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। এই ফেস্টের পিছনে তার এতদিনের খাটুনি, তার অর্জিত প্রফেশনাল ইমেজ, এই কলেজের বুকে তিল তিল করে গড়ে তোলা তার পরিচয় - সবকিছু আজ তার নিজের ছেলের এই বেপরোয়া, রাস্তার গুন্ডাদের মতো আচরণের জন্য ধুলোয় মিশে গেল।
ততক্ষণে ব্যাকস্টেজের এই করিডোরে একটা বিশাল ভিড় জমে গেছে। অডিটোরিয়ামের স্পিকারে তখনো কোনো গানের ড্রাম আর বেস-এর আওয়াজ ধকধক করে বাজছে বটে, কিন্তু এখানকার পরিবেশ একদম নিস্তব্ধ। ভিড়ের একদম সামনের সারিতে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাহুল বোস আর তার ঠিক পাশেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রিমা সেন।
চন্দ্রিমার চোখে আজকে সানগ্লাস নেই। ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে এবং একটা অদ্ভুত উত্তেজনায় বড় বড় হয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অভিজাত পরিবারের মেয়ে চন্দ্রিমার পৃথিবীটা চেনা ছকে বাঁধা। সেই পৃথিবীতে বড় হওয়া চন্দ্রিমার কাছে অয়নের আজকের এই রূপটা তার বড্ড অচেনা।
সেই শান্ত, নির্বিকার ছেলেটার ভেতরে এতটা আগুন? এতটা ধ্বংসাত্মক পুরুষালী শক্তি?
ওর মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল।
মাটিতে পড়ে থাকা বিক্রম তখনও ফ্লোর থেকে আস্তে আস্তে উঠে বসার নাটক চালিয়ে যাচ্ছিল। তার ঠোঁট ফেটে চিবুক বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে রক্তটা মুছে, অত্যন্ত অসহায়, নিরীহ চোখে বিদিশার দিকে তাকাল। সেখানে কিছুক্ষণ আগেকার লোলুপতার লেশমাত্র নেই।
"ম্যাম... আমি তো জাস্ট আপনার শাড়িটা ছাড়িয়ে দিচ্ছিলাম... ও হঠাৎ করে এসে কেন যে..."
বিক্রমের কাঁপা কাঁপা গলায় অসহায়তা আর ভয়ের মিশ্রণ। কিন্তু সে তখন মনে মনে অট্টহাসি হাসছে; সে খুব ভালো করেই জানে, তার এই কয়েক ফোঁটা রক্ত আজ ওই উন্মাদটার কফিনে শেষ পেরেকটা পুঁতে দেবে। নইলে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে আবার কেউটে বেরিয়ে যেতে পারে।
ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা গুঞ্জন শুরু হলো।
"কী অসভ্য ছেলে রে বাবা! জংলি একটা !"
"মিস গাঙ্গুলির মতো একজন রেস্পেক্টেড টিচারের সামনে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারারকে এভাবে মারল?"
"ছি ছি! এ তো জাস্ট বস্তির গুন্ডা!"
"এটা স্রেফ স্ট্রিট-ফাইটিং! একে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া উচিত!"
এই কথাগুলো বিদিশার কানে তপ্ত সিসার মতো ঢুকছিল। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে, রাগে সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। চোখের দৃষ্টি রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। তার মাথা আস্তে আস্তে কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। তার এতদিনের সযত্নে তিল তিল করে গড়া ‘মিস বিদিশা গাঙ্গুলি’ ইমেজটা আজ এই একটা ছেলের জন্য সবার সামনে নর্দমায় গিয়ে পড়েছে।
বিক্রম যে কয়েক সেকেন্ড আগে তার কোমরের স্পর্শকাতর অংশে হাত দিয়েছিল, সেই কামার্ত ছোঁয়াটা বিদিশা ভোলেননি, কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা তাঁর কাছে গৌণ হয়ে গেল। তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে বড় সত্য হল গোটা কলেজের সামনে তাঁর নিজের ছেলে তাঁকে বেইজ্জত করেছে। তাঁর সম্মান, তাঁর অহংকার আজ ধুলোয় লুণ্ঠিত। হাজারটা চোখের সামনে তাকে আজ কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে, স্টুডেন্টরা সবাই ভিড় করে দেখছে। পুরো কলেজ ফিসফিস করছে।
অন্ধ আক্রোশের আগুনে বিদিশার ভেতরের মাতৃসত্ত্বা মুহূর্তের মধ্যে ভস্মীভূত হয়ে গেল। তাঁর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো অয়নের উপর।
তার কাছে এখন একটাই সত্য, অয়ন তার হিংসুটেপনা আর মায়ের প্রতি অধিকারবোধের জন্য একটা ছেলেকে প্রায় খুন করে ফেলতে যাচ্ছিল।
তিনি ঝড়ের বেগে অয়নের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর হাঁটার ছন্দে সারাদিনের সেই রাজকীয় আভিজাত্য অনুপস্থিত। খোঁপার জুঁইফুলের গজরাটা ছিঁড়ে অর্ধেক ঝুলে পড়েছে, কপালে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু।
অয়নকে তখনো সাহিল এবং আরও দুটো ছেলে আটকে রেখেছে। সে রাগে ফুঁসছে, তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার চোখদুটো শিকারী বাঘের মতো বিক্রমের দিকে স্থির হয়ে আছে যেন সুযোগ পেলেই ছিঁড়ে খেয়ে নেবে।
বিদিশা গিয়ে দাঁড়ালেন অয়নের ঠিক সামনে। অয়ন মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাতেই তার চোখের হিংস্রতা ম্লান হয়ে এল। সে আশা করেছিল, মা হয়তো এবার বুঝতে পেরেছে। মা হয়তো এবার ওই লম্পটের হাতের কুৎসিত স্পর্শটার মানে বুঝতে পেরেছে। মা হয়তো তাকে জড়িয়ে ধরে বলবেন, ‘তুই ঠিক করেছিস অয়ন’।
অয়ন তার মায়ের চোখের ভাষা পড়তে ভুল করেছিল। বিদিশার চোখে এর সমর্থন ছিল না। বিদিশা ততক্ষণে রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন। তখন তার চোখে কেবল ক্রোধ আর অবজ্ঞা। তিনি অয়নের চোখের সেই আর্তি দেখতে পাননি, সেইসময় তিনি কেবল এক অবাধ্য গুন্ডা, যে তাঁর সম্মান নষ্ট করেছে, তাকেই দেখতে পাচ্ছিলেন শুধু।
অয়ন বুঝতে পারল না, সে তার মায়ের মর্যাদা বাঁচাতে গিয়ে নিজেই এখন মায়ের চোখে সবচেয়ে বড় অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদিশা কোন কথা না বলে নিজের ডান হাতটা শূন্যে তুললেন। তার হাতের আঙুলগুলো পর্যন্ত রাগে টানটান হয়ে আছে।
ঠাস!
একটা সলিড চড়ের শব্দ ব্যাকস্টেজের সমস্ত কোলাহলকে এক লহমায় স্তব্ধ করে দিল। বিদিশা সজোরে অয়নের বাঁ গালে আঘাত করেছেন। চড়ের তীব্রতায় অয়নের মুখটা ডানদিকে ঘুরে গেল, কয়েকটা অবাধ্য চুলের গোছা তার কপালে এসে পড়ল।
পুরো ব্যাকস্টেজ মুহূর্তের মধ্যে পিন-ড্রপ সাইলেন্ট। অডিটোরিয়ামের উল্লাস, মিউজিকের আওয়াজ যেন হঠাৎ করে অনেক দূরের গ্রহের শব্দ বলে মনে হচ্ছে। সাহিল আর বাকি ছেলেরা অয়নকে ছেড়ে দিয়ে বিস্ময়ে এক পা পিছিয়ে গেল। চন্দ্রিমা সেনের মুখটা বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। রাহুল বোস পর্যন্ত এক পা পিছিয়ে গেলেন। সবাই হতবাক হয়ে এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছে। কলেজের একজন সম্মানীয়া শিক্ষিকা, একটা ছাত্রকে সবার সামনে এমনভাবে চড় মারলেন!
বিদিশার সারা শরীর রাগে রি-রি করছে। তার শাড়ির আঁচলটা খসে পড়েছে, যদিও সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। তার চোখদুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। তার চোখে এখন আর কোনো মাতৃসত্তার ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট নেই। তার জায়গা নিয়েছে এক চূড়ান্ত অপমানিত, রাগে অন্ধ হয়ে যাওয়া একজন শিক্ষিকা, যার কেরিয়ার আর এতদিন তিল তিল করে সযত্নে গড়া সম্মানকে তার নিজের ছেলেই আজ সবার সামনে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
"হাউ ডেয়ার ইউ!" বিদিশার গলাটা ব্যাকস্টেজের নিস্তব্ধতায় সাপের মতো হিসহিস করে উঠল, যেন কোনো আহত নাগিনী ফুঁসছে।
"তুমি একটা জানোয়ার হয়ে গেছ, মিস্টার চ্যাটার্জী! স্রেফ একটা জংলি জানোয়ার! এই ছেলেটা আমাকে সাহায্য করছিল আর তুমি অকারণে ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে?"
অয়ন খুব ধীরে ধীরে মুখটা সোজা করল। তার বাঁ গালটা চড়ের দাগে টকটকে লাল, সেখানে পাঁচটা আঙুলের ছাপ ফুটে উঠেছে।
কিন্তু অয়ন গালটা হাত ছুঁয়ে দেখল না। সে কোনো কথা বলল না। সে কোনো আর্তনাদ করল না, কোনো প্রতিবাদ করল না, এমনকি নিজের সাফাই দেওয়ার জন্য একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।
সে পাথর হয়ে গেল।
তার চোখের আগুন মুহূর্তের মধ্যে নিভে গিয়ে সেখানে এক হিমশীতল, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার নেমে এল। সে একদৃষ্টে শূন্য, নিষ্প্রাণ চোখে বিদিশার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সে ইতালিতে এই নারীটির সতীত্ব রক্ষা করার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল। সে এই নারীটিকে নিজের মনে দেবী রূপে ভক্তি করত। আজকেও তাঁকে ওই লম্পটটার লোলুপ স্পর্শ থেকে বাঁচানোর জন্য সে নিজের সামাজিক সম্মান বলি দিয়েছে।
আর তার প্রতিদান ? তার মা এই শুয়োরটার সাজানো নাটক বিশ্বাস করে নিজের ছেলেকে সবার সামনে গুণ্ডা বানিয়ে দিল !
অয়নের মনে হলো, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহিলা তার মা নয়। তার মা এমনটা করত না। তার মা মরে গেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই নারীটি অহংকার আর দম্ভে অন্ধ একটা মেয়েছেলে, যে নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনছে।
"গেট আউট অফ হিয়ার!" বিদিশা তখনো রাগে কাঁপছেন। "জাস্ট গেট আউট! আমি আর এক সেকেন্ডও তোমার মুখ দেখতে চাই না!"
অয়ন অত্যন্ত ধীরেসুস্থে নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করল। সে আড়চোখে বিক্রমের দিকে একবার তাকাল। বিক্রমের ঠোঁটের কোণে তখনো টাটকা রক্ত লেগে আছে, কিন্তু তার চোখের তারায় একটা বিজয়ীর হাসি। সেই হাসিটা ভিড়ের মধ্যে শুধু অয়নই দেখতে পেল। অয়ন বুঝতে পারল, ম্যানিপুলেশনের কোন চরম সীমায় গিয়ে এই শুয়োরটা খেলাটা খেলেছে।
কিন্তু অয়ন আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তার ভেতরে এখন কাউকে বাঁচানোর আর বিন্দুমাত্র কোনো তাগিদ নেই, কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
তার মা নিজেই নিজের ধ্বংসের রাস্তা বেছে নিয়েছে।
সে সাহিলের হাতটা শান্তভাবে সরিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নিল। তারপর একটা শব্দও না বলে, কারোর দিকে ফিরে না তাকিয়ে, সে ব্যাকস্টেজের অন্ধকার প্যাসেজ দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
বিদিশা সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, তাঁর চড় মারা হাতটা তখনো সামান্য কাঁপছে। চড় মারার ঠিক পরমুহূর্তেই তার মাতৃসত্তায় একটা তীব্র অনুশোচনার মোচড় দিয়েছিল, কিন্তু চারপাশের শতশত চোখের সামনে, নিজের 'প্রফেশনাল ডিগনিটি' বজায় রাখার নেশায় তিনি সেই হাহাকারকে গলা টিপে মেরে ফেললেন।
তিনি হয়তো তাঁর সম্মান বাঁচিয়েছেন, কিন্তু অয়নের ওই শেষ নিস্পৃহ দৃষ্টিটা তাঁর মেরুদণ্ড দিয়ে একটা অজানা অনুভূতির স্রোত নামিয়ে দিয়ে গেছে।
চন্দ্রিমা ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে অয়নের ওই মিলিয়ে যাওয়া পিঠটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর একটা হাতুড়ি পিটছে। একটা ছেলের ভেতরে কতটা আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকলে সে এইরকম ভয়াবহ অপমান হজম করেও পাহাড়ের মতো শান্ত থাকতে পারে? কোন উপাদানে গড়া এই অয়ন চ্যাটার্জী?
অয়ন চ্যাটার্জী নামক রহস্যটা চন্দ্রিমার কাছে আরও গভীর, আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠল।
এদিকে অয়ন চলে যাওয়ার পর ব্যাকস্টেজের করিডোরে একটা শ্মশানের মতো নিস্তব্ধতা নেমে এল।
বিদিশা ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটার দিকে তাকালেন। এই হাত দিয়েই তিনি তাঁর সবটুকু দিয়ে আগলে রাখা একমাত্র ছেলেকে আজ সবার সামনে পর করে দিয়েছেন। অডিটোরিয়ামের বাইরে তখনো উৎসবের বাজি ফাটছে, কিন্তু বিদিশার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে এক অদ্ভুত, হিমশীতল শূন্যতায় ভরে গেল।