মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ২৯
কিন্তু, এছাড়া এই মুহূর্তে তার কাছে আর কোন উপায় নেই।
অয়ন কোচ সেনগুপ্তের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগটুকু টের পায়নি। সে কোচের এই সিদ্ধান্তকে এক অমানবিক শাস্তি হিসেবে দেখছে।
ফুটবল মাঠটা ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে মনের বিষ উগরে দিয়ে অয়ন অল্প কিছু সময়ের জন্য হালকা হতে পারত। এর আগেও সে মাঠের খেলায় প্রতিপক্ষকে তছনছ করে তার মায়ের থেকে পাওয়া অপমানের বদলা তুলেছে।
তাকে স্রেফ মাঠের চক্কর কাটাতে বাধ্য করা মানে, তার যন্ত্রণা বের করে দেবার মুখটা জোর করে বন্ধ করে দেওয়া। অয়নের মনে হচ্ছিল সবাই ইচ্ছে করে তাকে কোণঠাসা করে ফেলছে।
সে একবারও বুঝতে পারছিল না যে তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষোভ আর হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মারমুখী আচরণের ঠেলায় তার নিজের সতীর্থরা কতটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
এক সময় যারা তাকে ঘিরে আনন্দ করত, আজ তারা অয়নকে মাঠের মাঝখানে দেখলে আতঙ্কিত হয়।
অয়ন তাদের চোখের সেই বিরক্তি আর ভয় দেখতে পায় না, কারণ তার নিজের ভেতরের দহন এখন এতটাই তীব্র যে বাইরের পৃথিবীর কোনো সংকেত তার মস্তিষ্কে পৌঁছায় না।
অন্যদিকে, দোজোর পরিবেশটা যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো কাজ করছিল। গত এক সপ্তাহ ধরে মিস্টার প্রধান তাকে দিয়ে কেবল ফ্লোরে বসে মেডিটেশন করিয়েছেন আর শ্বাস-প্রশ্বাসের অদ্ভুত সব কসরত শিখিয়েছেন।
এই স্থিরতা অয়নের কাছে অসহ্য। বাইরের এই কৃত্রিম প্রশান্তি আদতে তার মনের ভেতরের অশান্তিটাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলে।
চোখ বন্ধ করলেই সে নিজেকে এক বিভীষিকার মুখোমুখি দেখতে পায়।
যখনই সে দু চোখের পাতা এক করে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করে, অমনি অন্ধকারের বুক চিরে ফেস্টের রাতের সেই অভিশপ্ত স্মৃতিগুলো তীরের মতো ছুটে আসে।
সে স্পষ্ট দেখতে পায় তার মায়ের সেই অগ্নিশর্মা রূপ। সবার সামনে সেই প্রচণ্ড চড়ের শব্দটা এখনো তার কানে প্রতিধ্বনিত হয়। মায়ের চোখে তার প্রতি সেই ঘৃণা আর লম্পট বিক্রমের প্রতি দিনের পর দিন তার সেই অদ্ভুত প্রশ্রয়, এই বৈপরীত্যের স্মৃতিগুলো তাকে পাগল করে তোলে। বিক্রমের সেই জয়ী হাসিটা অন্ধকারের মাঝে ধকধক করে জ্বলতে থাকে। অয়ন যতবার শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে, ততবার...ওর আসলে বিক্রমকে চাই...
কিন্তু যতক্ষণ না বিক্রম মিলছে ততক্ষণ কাউকে না কাউকে তার হাতের সামনে চাই।
চোখ বন্ধ করে সে কার সাথে লড়বে ?
"ব্রিদ ইন... হোল্ড... ব্রিদ আউট", মিস্টার প্রধানের ভরাট গলাতে নিস্তব্ধ হলঘরটা গমগম করছে।
কিন্তু, অয়নের বুকের ভেতরটা রাগে জ্বলছে। এই কৃত্রিমতা তার অসহ্য লাগছে আর নেওয়া যাচ্ছে না।
অয়ন হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে আর উত্তেজনায় কাঁপছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত দ্রুত আর অগোছালো।
"আমি এখানে এগুলো করতে আসিনি!" অয়ন দাঁতে দাঁত চেপে, চাপা গলায় বলে উঠল। দোজোর নিস্তব্ধ পরিবেশে সেটা গর্জনের মতো শোনাল।
মিস্টার প্রধান তার ঠিক সামনেই বসে ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ধীরগতিতে চোখ খুললেন। তার ইস্পাত-শীতল স্থির দৃষ্টি অয়নের চোখের ওপর স্থির হলো। সেই দৃষ্টিতে কোন রাগ নেই বরং করুণা মেশানো গভীরতা আছে।
"তাহলে, তুমি এখানে ঠিক কী করতে এসেছ, অয়ন?" মিস্টার প্রধানের কণ্ঠস্বর শান্ত হলেও তাতে কর্তৃত্বের সুর মেশানো।
"ফাইট! আমি ফাইট করতে চাই!" অয়ন প্রায় চিৎকার করে উঠল।
"আমি কোন সাধু-সন্ন্যাসী নই। আমি এখানে বসে বসে এই দম নেওয়ার নাটক করতে পারব না! আমার হাত-পা নিশপিশ করছে। আমায় লড়তে দিন।"
অন্য স্টুডেন্ট, যারা আশেপাশে প্র্যাকটিস করছিল তারা এক মুহূর্তের জন্য থমকে আড়চোখে ওর দিকে তাকাল। তাদের চোখে বিস্ময়।
কিন্তু, মিস্টার প্রধানের একটা সূক্ষ্ম ইশারায় তারা আবার নিজেদের প্র্যাকটিসে ফিরে গেল।
মিস্টার প্রধান ধীরলয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি অয়নের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা শান্ত হাসি ছুঁড়ে দিলেন। হাসিতে মেশানো তাচ্ছিল্যটা ধরতে অয়নের অসুবিধা হল না। ওর মনে হল যেন ওর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়ল।
"ফাইট করবে? রক্ত ঝরাবে ?" মিস্টার প্রধানের গলায় হঠাৎই গাম্ভীর্যের সুর।
"ঠিক আছে। আজ তুমি একটা ফাইট-ই করবে।"
অয়ন হকচকিয়ে গিয়ে মিস্টার প্রধানের দিকে তাকাল। হঠাৎ করে এই ডিসিশন? সে ভাবেনি মিস্টার প্রধান এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন।
ওর ভেতরে উত্তেজনা আর জেদ দানা বাঁধল। ও ভাবল, এবার নিজের হাতের জোর প্রমাণ করার সময় এসেছে। ও দেখাবে, ও কেবল ফুটবল মাঠের রাজা নয়, মার্শাল আর্টেও ও অপরাজেয়।
মিস্টার প্রধান হাত তুলে দোজো-র এক কোণে অনুশীলনে মগ্ন এক কিশোরকে ডাকলেন।
"আয়ুষ, এদিকে এসো।"
ছেলেটা দ্রুতপদে দৌড়ে এল। বয়স মেরেকেটে পনেরো কী ষোলো হবে। তামাটে গায়ের রঙ, রোগা, ছিপছিপে চেহারা। চোখেমুখে শান্ত, নিষ্পাপ ভাব। কোমরে একটা ব্লু বেল্ট।
"অয়ন, এ হলো আয়ুষ। আজ তুমি ওর সাথে স্পারিং করবে", মিস্টার প্রধান অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন।
অয়ন একবার আয়ুষের দিকে তাকাল, তারপর মিস্টার প্রধানের দিকে ফিরে একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিল। ঠিক যেমনটা একটু আগে উনি ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।
"আপনি আমার সাথে জোক করছেন? আমি এই বাচ্চাটার সাথে লড়ব? আমি ওর গায়ে হাত তুললে ওর হাড়গোড় ভেঙে যাবে।"
"তোমার ইগোটা তোমার স্কিলের চেয়ে অনেক বেশি বড়, অয়ন", মিস্টার প্রধানের শান্ত দৃষ্টি একচুলও নড়ল না।
"লড়াই শুরু করো। তবে একটা শর্ত - তুমি ওকে নকডাউন করার চেষ্টা করবে আর ও শুধু নিজেকে ডিফেন্ড করবে।"
অয়নের মনে হল মিঃ প্রধান বোধহয় পাগল হয়ে গিয়েছেন। সে একটা তাচ্ছিল্যের নিঃশ্বাস ফেলে ম্যাটের ওপর উঠে দাঁড়াল। শরীরটা একটু টানটান করে সে আয়ুষের দিকে তাকিয়ে বলল, "সরি, আমি আজ খুব খারাপ মুডে আছি। ব্যথা পেলে কিন্তু পরে আমায় দোষ দিও না।"
আয়ুষ কোন উত্তর দিল না। সে কোনো কথা না বলে, মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে এক পা পিছিয়ে ফাইট পজিশন নিল। ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একদম রিল্যাক্সড, অবিশ্বাস্য রকমের স্থিতধী, যেন গভীর সরোবরের অচল, নিস্তরঙ্গ জল। ওর চোখদুটো অয়নের বুকে স্থির।
"হাজিমে! (শুরু করো)" মিস্টার প্রধান নির্দেশ দিলেন।
নির্দেশ পাওয়া মাত্রই অয়ন একটা ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো উন্মত্তভাবে আয়ুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর মাথার ভেতর তখন রক্ত ফুটছে। সে তার গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে আয়ুষের মুখ তাক করে একটা ভয়ংকর ঘুঁষি ছুঁড়ল। এই ঘুঁষিটা লাগলে বাচ্চা ছেলেটার চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কথা।
কিন্তু আয়ুষ একটুও ঘাবড়াল না, এমনকী সে একটুও পিছু হটল না। সে ঘুঁষিটা ব্লক করার কোন চেষ্টাই করল না, বরং অত্যন্ত সাবলীলভাবে, একটা জলের স্রোত যেভাবে বড় বোল্ডার পাথরকে এড়িয়ে যায়, সেভাবেই সে নিজের শরীরটাকে একটু ডানদিকে সরিয়ে নিল।
অয়নের ঘুঁষিটা শূন্যে আঘাত করল। তার নিজের প্রচন্ড গতি আর নিয়ন্ত্রণহীন রাগের কারণে তৈরি হওয়া সেই 'মোমেন্টাম'-র জন্য সে টাল সামলাতে পারল না, তার শরীরটা ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
ঠিক সেই সুযোগে, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে আয়ুষ তার বাঁ পা-টা অয়নের ডান পায়ের গোড়ালির পেছনে হুক করল আর নিজের ডান হাত দিয়ে অয়নের শার্টের কলার ধরে তার রাগের মোমেন্টামটাকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে একটা নিখুঁত আইকিডো থ্রো করল।
অয়ন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল তার পা দুটো মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে গেছে।
ধড়াস!
অয়ন সজোরে পিঠের ওপর ম্যাটে আছড়ে পড়ল। সজোরে পড়ার অভিঘাতে তার ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস এক ধাক্কায় বেরিয়ে গেল। লজ্জায় আর অপমানে তার গোটা শরীরটা কুঁকড়ে গেল।
শুরু হবার এক মিনিটের মধ্যেই ফাইট শেষ। অয়ন এখন মাটির ওপর পড়ে হাঁপাচ্ছে আর আয়ুষ আগের মতোই শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
পুরো দোজোতে পিন-ড্রপ সাইলেন্স। একটা পনেরো বছরের রোগা ছেলে, উনিশ বছরের একটা অ্যাথলিটকে জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তুলে মাটিতে ফেলে দিয়েছে! অবিশ্বাস্য!
অয়ন ম্যাটের ওপর শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, তার হাতে-পায়ে কোন জোর নেই।তার মাথার ভেতরটা এখন ফাঁকা হয়ে গেছে, এক মুহূর্ত আগের সেই রাগটা আর নেই।
মিস্টার প্রধান ধীর পায়ে হেঁটে এসে অয়নের ঠিক মাথার কাছে দাঁড়ালেন। তিনি ওপর থেকে অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন -
"রাগ হলো হাতল ছাড়া তলোয়ারের মতো, অয়ন। শত্রুকে কাটার আগে সেটা নিজের হাতটাই রক্তাক্ত করে দেয়। তুমি তোমার রাগের দাস হয়ে আছ। যতদিন না তুমি তোমার এই রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছ, ততদিন তুমি এই পনেরো বছরের ছেলেটার কাছে বারবার হারবে আর ফুটবল মাঠেও রেড কার্ড খেয়ে বেরিয়ে আসবে।"
অয়ন সেই অবস্থাতেই ফ্লোরে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখদুটো জ্বালা করছে, চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে।
তার জীবনটা আর কত নিচে নামবে?
তার মা তাকে সবার সামনে কুকুরের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে, বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফুটবল মাঠে সে এখন ব্রাত্য, তার বল ছোঁয়া বারণ। আর আজ, এখানে সবার সামনে একটা বাচ্চা ছেলে ওকে জাস্ট এক সেকেন্ডে মাটিতে শুইয়ে দিল !
তার না আছে কোনো আশ্রয় আর না আছে তার হাত ধরার জন্য কোন বিশ্বস্ত মানুষ।
একটা চরম শূন্যতা, একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার তার মনকে গ্রাস করতে শুরু করল। অয়ন খুব একা বোধ করতে লাগল। তার মনে হলো সে যেন মাঝ সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি নিশ্বাসের বদলে ওর ফুসফুসের ভেতর কেবল কালো জল ঢুকে পড়ছে। সে ডুবে যাচ্ছে।
তাকে টেনে তোলার মতো কেউ নেই।
কিন্তু ঠিক সেই গভীর অন্ধকারে, ডুবে যাওয়ার এই মুহূর্তে হঠাৎ করে বিদ্যুত ঝলকের মতো অয়নের চোখের সামনে একটা মুখ ভেসে উঠল।
বিক্রম মালহোত্রা।
ফেস্টের রাতে ওর রক্তে মাখামাখি ফাটা ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা শয়তানি হাসিটা আবার অয়নের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। বিক্রম যেন ওকে বিদ্রুপ করছে, সে যেন ওর এই অসহায়তা উপভোগ করছে।
না !
সে এভাবে হার মানবে না। ওই জানোয়ারের বাচ্চাটা ওর সাজানো জীবন ছারখার করে দিয়েছে। আর ওর থেকে প্রতিশোধ নেবার বদলে আজ ও এখানে মাটিতে পড়ে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে।
ওর নিয়তিতে তবে কী শেষপর্যন্ত এই গ্লানিই লেখা আছে ? অসম্ভব !
অয়ন ম্যাটের ওপর কাঁপা কাঁপা দুই হাত রেখে, দাঁতে দাঁত চেপে এক অবিশ্বাস্য জেদে ভর করে শরীরটাকে টেনে তুলল। ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। তারপর সে সরাসরি মিস্টার প্রধানের চোখের দিকে তাকাল।
সেখানে তখন যন্ত্রণার লেশমাত্র নেই, বরং ধিকধিক করে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। ওর চোখে প্রতিহিংসার সেই লেলিহান শিখা দেখে মিঃ প্রধান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ছেলেটা আজকের অভিজ্ঞতা থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি।