মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ২৮
সাথে সাথে বিদিশার সারা শরীর দিয়ে এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। তাঁর মনের ভেতরে ফুটে উঠল এক তীব্র তাচ্ছিল্যের ভাব।
ভাগ্যের কী আশ্চর্য পরিহাস! ডক্টর বাগচী তাকে বলেছিলেন যে, ওই অযোগ্য, প্রভাবশালী ছেলেগুলোকে পাস না করালে কলেজের ডিমড ইউনিভার্সিটির স্ট্যাটাস পাওয়া আটকে যাবে। তিনি চেয়েছিলেন ডোনেশনের টাকায় ইউনিভার্সিটির স্ট্যাটাস কিনতে। সেটার জন্য উনি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে পিছপা হননি।
আর আজ?
আজ প্রতিষ্ঠানের সম্মান, ন্যাক-এর এ-প্লাস গ্রেডিং আর ডিমড ইউনিভার্সিটির স্বপ্ন এইসব নির্ভর করছে বিদিশার একটা সিদ্ধান্তর উপরে!
একেই বলে ভাগ্য।
আজ ডোনেশনের টাকা নয় বরং বিদিশার মেধা, বুদ্ধির জোর, তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা আর নেতৃত্বের ওপর এই কলেজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এই সিম্পোজিয়ামটা ডক্টর বাগচী আর তার সিন্ডিকেটের মুখে সপাটে ছুঁড়ে দেওয়া একটা জবাব হতে পারে।
এই ইভেন্টের পরে ডক্টর বাগচী আর তাকে ঘাঁটানোর সাহস পাবেন না।
নিমেষের মধ্যে বিদিশার মনের মেঘটা কেটে গেল। তার জায়গায় জন্ম নিল এক ইস্পাত-কঠিন জেদ আর লড়াকু মানসিকতা। ইতালির সেই অভিশপ্ত রাতে লড়াই করে বেঁচে ফেরা নারীটি আজ আবার তার সামনে একটা নতুন যুদ্ধের ময়দান দেখতে পাচ্ছে।
প্রিন্সিপাল সান্যাল বিদিশার মুখের এই পরিবর্তনটা লক্ষ্য করলেন।
"মিস গাঙ্গুলি, আমি আপনার কনসার্নটা বুঝতে পারছি", প্রিন্সিপাল দৃঢ় গলায় বললেন।
"আমি আপনাকে একা লড়তে বলছি না। পুরো কলেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আপনার পেছনে থাকবে। প্রথমত, আগামী কুড়ি দিন আপনাকে কোন ক্লাস নিতে হবে না। আপনার ক্লাসগুলো আমি গেস্ট ফ্যাকাল্টিদের মধ্যে ডিস্ট্রিবিউট করে দিচ্ছি। আপনার ফোকাস থাকবে শুধুই সিম্পোজিয়াম।"
প্রিন্সিপাল একটু থামলেন, বিদিশার চোখের পলকহীন স্থির দৃষ্টির ওপর নিজের চোখ রেখে আবারও যোগ করলেন,
"দ্বিতীয়ত, আমাদের সেমিনার কমিটি অলরেডি ফর্ম করা আছে। আমি আজই কমিটির হেডকে নির্দেশ দিচ্ছি তারা যেন ইমিডিয়েটলি আপনার সাথে যোগাযোগ করে। এছাড়া অ্যাকোমোডেশন, কেটারিং এবং টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য আলাদা কমিটি আছে। তারা সবাই সরাসরি আপনাকে রিপোর্ট করবে। আপনি জাস্ট জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে হাল ধরুন। আপনার যা যা রিসোর্স লাগবে, আমি প্রিন্সিপাল হিসেবে পার্সোনালি সেটা অ্যাপ্রুভ করব। জাস্ট মেক দিস হ্যাপেন।"
প্রিন্সিপালের কথায় একটা মরিয়া ভাব ছিল বটে, কিন্তু তার সাথেই ছিল বিদিশার প্রতি অটুট বিশ্বাস।
বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর দ্বিধা নেই। তিনি সোজা হয়ে বসলেন।
"ইটস অ্যান অনার, স্যার", মনের ভাবটা প্রকাশ না করে বিদিশা শান্ত ভাবে, আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন।
"আমি এই দায়িত্বটা নিচ্ছি। কিন্তু আমার কাজ করার ধরনটা একটু স্ট্রিক্ট। আমি চাইব আমার সিদ্ধান্তে যেন অন্য কারোর, যেন কোন আন-অফিশিয়াল ইন্টারফেয়ারেন্স না থাকে।"
প্রিন্সিপাল সান্যাল একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তার ক্লান্ত মুখে এতক্ষণে সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠল।
"ইউ হ্যাভ মাই ওয়ার্ড, মিস গাঙ্গুলি। এই ইভেন্টে আপনার কথাই শেষ কথা। কাজটা অনেক বড়, তাই আপনার একটা অত্যন্ত অ্যাকটিভ আর স্মার্ট ভলান্টিয়ার টিম দরকার হবে।"
বিদিশা সতর্ক হয়ে গেলেন। তিনি আন্দাজ করতে পারছিলেন এরপর প্রিন্সিপাল কী বলতে চলেছেন। প্রিন্সিপাল ঠিক সেই কথাটাই বললেন, "ফেস্টে বিক্রমের সাথে আপনার টিউনিংটা খুব ভালো ছিল। সেমিনারের ভলান্টিয়ারিং টিমের দায়িত্বটাও কি ওকে দিয়ে দেব?"
বিদিশার শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু তিনি তার মুখের ভাবে কোন পরিবর্তন আসতে দিলেন না।
ভলান্টিয়ার টিম কথাটা শোনা মাত্রই তার মাথার ভেতর নন্দিতাদির সেই সতর্কবাণীটা বিদ্যুৎবেগে খেলে গিয়েছিল আর তার ঠিক পরক্ষণেই চোখের সামনে ভেসে উঠৈছিল ফেস্টের অন্ধকার অডিটোরিয়ামের সেই দৃশ্যটা - শাড়ির পিন আটকে দেওয়ার অছিলায় তার কোমরে বিক্রমের সেই ইচ্ছাকৃত স্পর্শ।
সেই স্পর্শে যে শুধু সাহায্যের হাত ছিল না, বরং তাতে কাম লুকিয়ে ছিল তা বিদিশার মতো অভিজ্ঞ নারীর বুঝতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু, সে রাতে অয়নের অমন উন্মত্ত আচরণে সে সব চাপা পড়ে গিয়েছিল।
নয়তো বিক্রমের একটা উপযুক্ত শাস্তি তখন সেই মুহুর্তেই পাওনা ছিল। বিদিশার ধারণা, ফেস্টের পরে বিক্রম সম্ভবত সেজন্যই আর ভয়ে তার সামনে আসেনি। কিন্তু, বিদিশা তো এখনও সেই রাতের কিছুই ভোলেননি, ভুলতে পারেননি।
সেদিন রাতের লালসাভরা আচরণই আজ বিক্রমের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল।
বিদিশা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে, ঠান্ডা মাথায় বিক্রমকে সেমিনারের কাজ থেকে ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন।
"না স্যার।"
বিদিশা অত্যন্ত মার্জিত ও পেশাদার ভাবে বললেন।
"বিক্রম হিস্ট্রির স্টুডেন্ট। এটা একটা ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম। এখানে ওর ইনভলভমেন্টের কোনো দরকার নেই। তাছাড়া, বারবার এসব এক্সট্রা-কারিকুলার কাজে ইনভলভমেন্ট বরং ওর পড়াশোনার ক্ষতি করতে পারে।"
প্রিন্সিপাল একটু ভেবে মাথা নাড়লেন, "হুম, তা অবশ্য ঠিক।"
বিদিশা একটুও না ভেবে বললেন, "আমি সেকেন্ড ইয়ারের সাহিল খানকে নেব। ও ম্যাথস অনার্সের ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, এই টপিকগুলো ওর বুঝতে সুবিধা হবে আর স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওর লিডারশিপ আর অর্গানাইজিং স্কিলও নিশ্চয়ই বিক্রমের চেয়ে অনেক বেশি শার্প হবে।"
প্রিন্সিপাল সান্যাল সন্তুষ্ট হয়ে হাসলেন।
"পারফেক্ট চয়েস। সাহিল ইজ আ ভেরি ব্রাইট বয়। তাহলে আপনি ওর সাথেই টিমটা রেডি করে নিন।"
"থ্যাংক ইউ, স্যার।" বিদিশা উঠে দাঁড়ালেন।
প্রিন্সিপাল সান্যাল চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে যোগ করলেন, "আরেকটা কথা মিস গাঙ্গুলি, যেহেতু এটা পিওরলি একটা ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম, তাই আমি চাই আমাদের ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের প্রতিটি মেম্বার যেন এতে সক্রিয়ভাবে ইনভলভড থাকে। অভিজ্ঞ শিক্ষকরা পেপার প্রেজেন্টেশনের দিকটা সামলাবেন আর বাকিরা অর্গানাইজিং কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন। আমি চাইছি পুরো বিভাগটা একটা টিম হিসেবে পারফর্ম করুক, যার লিড দেবেন আপনি।"
বিদিশা সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন। তার চেহারায় এক ধরনের দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
"নিশ্চয়ই স্যার। আমি আজই ডিপার্টমেন্টের সবার সাথে বসে একটা প্রাইমারি ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে ফেলব। প্রত্যেকে যেন তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সঠিক দায়িত্ব পায়, সেটা আমি পার্সোনালি সুপারভাইজ করব।"
"ভেরি গুড! আপনার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে", প্রিন্সিপাল তৃপ্তির হাসি হাসলেন।
"ধন্যবাদ স্যার। আসি তাহলে", বলে বিদিশা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
ভারী কাঠের দরজাটা পেছনে বন্ধ হতেই বিদিশা করিডোরে এসে একবার থামলেন। তার বুকের ভেতরের ভারটা যেন একটু হালকা হয়েছে। তিনি অনুভব করলেন, গত কিছু দিনের অপমানের স্তূপ সরিয়ে এক লড়াকু সত্তা তাঁর ভেতরে জেগে উঠেছে।
করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় তিনি আর নতুন করে কোন দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলেন না। অয়ন কিংবা বিক্রম কারোর চিন্তাই তার মনকে নতুন করে বিক্ষিপ্ত করতে পারল না।
তিনি এক ঝটকায় নিজের মনের অগোছালো ভাবনার ওপর কড়া শাসন জারি করলেন। এখানে আবেগের কোন জায়গা নেই, এখন ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের সময় নয়। সামনে তার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। খটখট শব্দে নিস্তব্ধ করিডোর কাঁপিয়ে তিনি ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।
দুপুরবেলা, কলেজের ক্যাফেটেরিয়া।
ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে, এসির ঠিক নিচে একটা টেবিলে বসে ছিল রনি আর কবীর। সামনে টেবিলে দুটো কোল্ড কফি পড়ে আছে। কিন্তু, ওদের আড্ডার সেই চেনা আমেজ আর নেই। ফেস্টের রাতের পর থেকে ওদের পুরো গ্রুপটাই যেন তছনছ হয়ে গেছে।
অয়নকে ছাড়া ওদের কলেজ লাইফটা খুব ফাঁকা লাগছে ঠিকই কিন্তু অয়নের এখনকার ওই উগ্র রূপটার ধারেকাছে যেতেও ওদের ভয় করে।
"ভাই, অয়নটা পুরো সাইকো হয়ে গেছে মাইরি", রনি একটা স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল।
"কাল ডর্মে দেখলাম, একা একা বসে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওকে ডাকলাম, আমার দিকে জাস্ট এমন একটা লুক দিল না...মনে হলো সুযোগ পেলে আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।"
কবীর মাথা নাড়ল।
"ও এখন একটা টাইমবোমা। কখন কার ওপর ফাটবে কেউ জানে না। ভালোই হয়েছে ও আমাদের সেকশন থেকে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। ওর ধারেকাছে ঘেঁষাও এখন বিপদ।"
ঠিক সেই সময়, ক্যাফেটেরিয়ার কোলাহল ভেদ করে একটা পরিচিত, অত্যন্ত গ্ল্যামারাস অবয়ব সোজা ওদের টেবিলের দিকে হেঁটে এল।
চন্দ্রিমা সেন।
আজ তার পরনে একটা অফ-শোল্ডার ব্ল্যাক টপ আর ফেডেড ডেনিম। চোখে সানগ্লাসটা মাথার ওপরে তোলা। কলেজের 'কুইন বি'-কে সোজা তাদের টেবিলের দিকে আসতে দেখে রনি আর কবীরের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। কবীরের মুখের স্যান্ডউইচটা আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো।
"হেই বয়েজ", চন্দ্রিমার গলায় মিষ্টি সুর, কিন্তু তাতে যে কমান্ডিং টোন, সেটার ধার ছুরির মতো। উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে ওদের সামনের ফাঁকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে পড়ল। পুরো ক্যাফেটেরিয়ার অর্ধেক ছেলের নজর এখন ওদের টেবিলের দিকে।
রনি একটা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল, "কী... কী ব্যাপার চন্দ্রিমা? কোনো হেল্প লাগবে?"
চন্দ্রিমা নিজের পারফেক্ট ম্যানিকিওর করা আঙুল দিয়ে টেবিলের ওপর দুবার টোকা দিল।
"আমি এখানে হেল্প চাইতে আসিনি। ইনফরমেশন নিতে এসেছি", চন্দ্রিমা সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। তার গলায় কোনো ভনিতা নেই।
"ইনফরমেশন? কীসের?" রনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"তোমাদের ওই অ্যারোগ্যান্ট, জংলি বন্ধুটার ব্যাপারে। অয়ন চ্যাটার্জী।"
নামটা শোনা মাত্রই রনি আর কবীর একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
"অয়ন? ওর ব্যাপারে আমরা কী করে জানব? ও তো আজকাল আমাদের সাথে মেশেই না", রনি একটু ভয় পাওয়া গলায় বলল।
চন্দ্রিমা একটু সামনে ঝুঁকে এল। তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।
"ডোন্ট লাই টু মি। তোমরা ওর ক্লাসমেট, ওর ডর্মের বন্ধু। ও কোথায় থাকে, কখন কী করে, আমি সব ডিটেইলস জানতে চাই। স্পিক আপ।"
কবীর একটু আমতা আমতা করে বলল, "বিশ্বাস করো চন্দ্রিমা, আমরা সত্যিই কিছু জানি না। ফেস্টের পর থেকে ও পুরো চেঞ্জ হয়ে গেছে। ও ক্লাসেও আসে না। ওই ফুটবল মাঠে প্র্যাকটিসের পর চক্কর কাটে আর সন্ধেবেলা কোথায় যেন চলে যায়। ডর্মে ফিরলে কারো সাথে একটা কথাও বলে না। ওর চোখগুলো এমন লাল হয়ে থাকে যে আমাদের নিজেদেরই ভয় লাগে। হি ইজ লাইক আ ঘোস্ট নাও।"
"ও কারোর সাথে মেশে না? কোনো মেয়ের সাথেও না?" চন্দ্রিমা কনফার্ম করার জন্য জিজ্ঞেস করল।
"আরে নাহ! মেয়ের কথা তো ছেড়েই দাও, ও আমাদের সাথেও কথা বলে না। পুরো একা হয়ে গেছে ভাই। মনে হয় ফেস্টে ম্যামের কাছে চড় খাওয়ার পর ওর ব্রেনটা ড্যামেজ হয়ে গেছে", রনি ফিসফিস করে বলল।
চন্দ্রিমা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার যা জানার দরকার ছিল, সে জেনে গেছে।
"গুড। থ্যাংকস ফর দ্য ইনফো বয়েজ", চন্দ্রিমা অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে সানগ্লাসটা চোখে নামিয়ে যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে গেল।
ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে এসে চন্দ্রিমা একটা গভীর শ্বাস নিল। বাইরে রোদ থাকলেও মনের ভেতরে হিমশীতল রোমাঞ্চ অনুভব করল সে। অয়ন চ্যাটার্জী এখন সম্পূর্ণ একা। ঠিক যেন আহত একটা সিংহ। যে এখন নিজের ডেরায় বসে ছটফট করছে। তার চারপাশটা ফাঁকা। তার পাশে কোন বন্ধু নেই, কোন সাপোর্ট সিস্টেম নেই, সে এখন পুরোপুরি অসহায়।
চন্দ্রিমার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল, এটা একটা বিশাল সুযোগ। আহত সিংহকে কাবু করা সহজ, যদি আগে থেকে জানা থাকে ঠিক কোন ক্ষতে চাপ দিলে সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাবে। এর আগে সে বড় ভুল করেছিল। সে ভেবেছিল আর পাঁচটা ছেলের মতো ওর একটা ইশারাতেই অয়ন ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়বে।
কিন্তু, ফেস্টের রাতে ও বুঝতে পেরেছে অয়ন কোন সাধারণ ছেলে নয়।
অয়নের এই দুর্বল মুহূর্তে এমন একটা জায়গা দিয়ে এমনভাবে এন্ট্রি নিতে হবে, যাতে ও চাইলেও পালাতে না পারে। বরং এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সে নিজেই চন্দ্রিমার খাঁচায় নিজে থেকে বন্দী হতে বাধ্য হবে। তার জন্য সময় লাগলে লাগুক, এবারে সে আর তাড়াহুড়ো করবে না। হাতে সময় নিয়ে পরিকল্পনার ছক কষবে। তবে তার আগে অয়নের হোয়্যারঅ্যাবাউটস জানা দরকার।
বিকেল তিনটে। লাইব্রেরি বিল্ডিং।
মিস্টার দাস কলেজের ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের একজন সিনিয়র এবং অত্যন্ত সম্মানীয় প্রফেসর। তার বয়স পঞ্চান্ন। কাঁচাপাকা চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মানুষটি অত্যন্ত শান্ত, রাশভারী এবং নিখাদ অ্যাকাডেমিক। ডিপার্টমেন্টের ভেতরকার দলাদলি, কলেজের রাজনীতি, সব রকম গসিপ থেকে তিনি নিজেকে সযত্নে শতহস্তে দূরে সরিয়ে রাখেন।
তিনি এই কলেজের অন্যতম পুরোনো মুখ। যখন তিনি এই কলেজে জয়েন করেছিলেন তখন মেইন বিল্ডিংয়ে ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা কোনো স্টাফরুম ছিল না। সব ম্যাথ টিচারের জন্য কেবিন বরাদ্দ হয়নি।
সেই সময় থেকেই তিনি লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের দোতলার একেবারে শেষ প্রান্তে, নির্জন করিডোরের ধারের এই ছোট্ট ঘরটিতে বসতেন।
পরবর্তীতে ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা উইং, স্টাফরুম এসব তৈরি হলেও, তিনি এই পুরোনো ঘরটি ছেড়ে চলে যাননি।
আজ উনি অফটাইমে একটা বই পড়ছিলেন।
এমন সময় অয়ন দরজায় একটা হালকা টোকা মেরে ভেতরে মুখ বাড়িয়ে বলল।
"মে আই কাম ইন, স্যার?"
অয়নের গলার স্বরটা আবেগহীন, যান্ত্রিক। তার চোখের নিচের কালচে ছোপ মিস্টার দাসের নজর এড়াল না।
"কাম ইন।"
অয়ন ঘরে ঢুকলে উনি চোখের ইশারায় ওকে বসতে বললেন। সে সামনের চেয়ারটায় বসল।
"তোমার কোচ, আমাকে সব বলেছেন", মিস্টার দাস সরাসরি পয়েন্টে এলেন। কোচ সেনগুপ্তর সাথে তার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক।
"আমি শুনেছি গতকাল প্র্যাকটিস ম্যাচে তুমি এমন একটা ফাউল করেছ যার জন্য কোচ তোমাকে এক সপ্তাহের জন্য মাঠ থেকে ব্যান করেছেন। তোমাকে প্র্যাকটিসের সময় শুধু মাঠের বাইরে চক্কর কাটতে বলা হয়েছে।"
অয়ন মাথা নিচু করে সব শুনল। রাগে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। গতকালের সেই ঘটনাটা ওর রাগের আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে। ফুটবল মাঠটাই ছিল ওর শ্বাস নেবার একমাত্র জায়গা, এখন সেটাও ওর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হল।
মিস্টার দাস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "দেখো বাবা, স্পোর্টস নিজের জায়গায় আর পড়াশোনা নিজের জায়গায়।"
অয়ন মাথা নিচু করে কথাগুলো শুনল। সে কোনো উত্তর দিল না।
মিস্টার দাস বললেন, "নিয়মিত ক্লাসে না আসার ফলে তুমি ম্যাথসের সিলেবাসে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছ। কিন্তু তোমার কোচ যখন তোমার জন্য এতবড় গ্যারান্টি দিয়েছেন, তখন আমারও তো একটা দায়িত্ব থাকে। এই ব্যানের সময়টা নষ্ট না করে তুমি অঙ্কের সিলেবাসটা মেকআপ করতে কাজে লাগাও।"
তিনি ড্রয়ার থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করে অয়নের দিকে এগিয়ে দিলেন।
"আমি তোমার জন্য একটা স্পেশাল টিউটোরিয়াল অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছি। আমাদের কলেজেরই একজন অত্যন্ত ব্রাইট স্টুডেন্ট তোমাকে গাইড করবে। তোমার মিসড ক্লাস
গুলোর নোটস আর জটিল কনসেপ্টগুলো ও তোমাকে বুঝিয়ে দেবে।"
অয়ন চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল, "এর কোনো দরকার ছিল না, স্যার। আমি ম্যানেজ করে নেব।"
"ডোন্ট আর্গিউ, অয়ন" মিস্টার দাস এবার একটু কড়া গলায় বললেন।
"তুমি একা সব ম্যানেজ করতে পারবে না। কাল বিকেল চারটের সময় তুমি কলেজ লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনে যাবে। তোমার টিউটর সেখানে তোমার জন্য ওয়েট করবে।"
মিস্টার দাস তার নামটা বললেন না আর অয়নও জিজ্ঞেস করল না। নিজের কেরিয়ার, পড়াশোনা, ভবিষ্যত এসব নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। এমনকী ইন্টারনাল পরীক্ষায় ফিজিক্সে খারাপ রেজাল্ট আসার পরেও সে নির্লিপ্ত থেকেছে।
এই এক সপ্তাহে অয়নের মানসিক অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। বন্ধুদের সঙ্গে তার সম্পর্কের সুতোটা পুরোপুরি ছিঁড়ে গেছে। রোজ ক্লাস কামাই করাটা ওর রুটিন হয়ে গিয়েছে। অয়ন মনে মনে ঠিকই করে ফেলেছে যে ফার্স্ট সেমিস্টারের পরীক্ষার আগে সে আর কোন ক্লাসরুমের চৌকাঠ মাড়াবে না। অয়নের পুরো সময় আজকাল ডর্মের মধ্যেই কাটে। সেখানে বসে বসে ও সবসময় কিভাবে বিক্রমের উপর প্রতিশোধ নেবে সেটা প্ল্যান করে। ওর মায়ের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ আর বিক্রমের ওপর থাকা প্রতিহিংসার আগুনটা এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সেইটা এবার চেনা-অচেনা সবার ওপর ছড়িয়ে পড়ছে, ওর কেবল মনে হচ্ছে সবাই মিলে ওর উপর অবিচার করেছে। ও এখন গোটা পৃথিবীটাকেই নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। অঙ্ক শেখার জন্য ওর মোটেও কোথাও যাবার ইচ্ছে নেই। ওর এখন নিজের ঘরে থাকতেই ভাল লাগে।
কিন্তু, আজ সন্ধ্যাবেলা ওকে আবার সেই দোজোতে যেতেই হবে।
সন্ধ্যা আটটা। প্রধান মার্শাল আর্টস অ্যাকাডেমি।
দোজো-র ভেতরে এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এখানে পা রাখার পর থেকেই দোজোর এই জমাট বাঁধা নৈঃশব্দ্যের সাথে অয়নের মাথার ভেতর টগবগ করে ফুটতে থাকা লাভার এক নিরন্তর যুদ্ধ চলছে।
সে ভেবেছিল এখানে ভর্তি হয়ে কোন স্পারিং পার্টনারকে হাতের মুঠোয় পেয়ে নিজের ভেতরের জমে থাকা সমস্ত বিষ, রাগ আর আক্রোশ তার উপর উগরে দেবে। তার ফুটন্ত স্নায়ুগুলো এখন কেবল হাতাহাতি আর লড়াই চায়। তার এই রক্তের স্বাদের পেছনে এতটা মরিয়া হয়ে ওঠার পেছনে অবশ্য একটা বড় কারণ আছে। তার রাগ উগরে দেওয়ার যে একমাত্র জায়গা, অর্থাৎ ফুটবল মাঠ, সেখান থেকেও তাকে সাময়িকভাবে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।
গতকাল থেকেই কোচ সেনগুপ্ত অয়নকে দিয়ে প্র্যাকটিসের পুরো সময়টা মাঠের চক্কর কাটাচ্ছেন। অয়নের আচরণে তার মতো মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধও শেষমেশ ভেঙে গিয়েছে।
গতকাল প্র্যাকটিস ম্যাচের মাঝপথে অয়ন সম্পূর্ণ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। বল কেড়ে নেওয়ার লড়াইয়ে সে বিপক্ষের ডিফেন্ডার সুমিতের ওপর যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাকে কোনোভাবেই 'ফুটবল' খেলার অঙ্গ বলা চলে না।
সুমিত যখন বলটা ক্লিয়ার করতে যাচ্ছিল, অয়ন কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সরাসরি সুমিতের গোড়ালি লক্ষ্য করে একটা স্লাইডিং ট্যাকল করে।
সঙ্গে সঙ্গেই সে আর্তনাদ করে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা সুমিতকে তাড়াতাড়ি স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ মেডিক্যাল রিপোর্ট এসেছে, প্রাথমিক পরীক্ষার পরে ডাক্তার তাকে একমাসের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে বলেছেন।
কোচ সেনগুপ্তর ধৈর্য্যের বাঁধ সেই মুহুর্তেই ভেঙে যায়। যাকে ঘিরে তিনি কলেজের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের স্বপ্ন বুনেছিলেন সে ক্রমশ টিমের 'অ্যাসেট' থেকে একটা মারাত্মক লায়াবিলিটিতে পরিণত হয়ে উঠছে।
এভাবে চলতে থাকলে তো টুর্নামেন্ট শুরু হবার আগেই অর্ধেক টিম হাসপাতালের পথ ধরবে। তখন প্রিন্সিপালকে কী জবাব দেবেন তিনি ?
অনেক হয়েছে, আর না।
দলের স্বার্থে তিনি একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আগামী এক সপ্তাহ অয়ন শুধু মাঠের চক্কর কাটবে। নো প্র্যাকটিস।
নিজের সেরা অস্ত্রকে এভাবে মাঠের বাইরে পাঠাতে তার খারাপ লাগছিল ঠিকই।
Continued...