মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৩১
বিকেল চারটে। লাইব্রেরি বিল্ডিং।
কলেজের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের তিনতলার রেফারেন্স সেকশনটা এমনিতেই সবসময় একটা থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে।
পুরো লাইব্রেরির মধ্যে এই অংশটা সবচেয়ে বেশি চুপচাপ। এখানে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে।
সারি সারি বিশাল মেহগনি কাঠের বুকশেলফ, তার গায়ে থরে থরে সাজানো মোটা মোটা সব বই আর জার্নাল।
জানলার কাঁচ ভেদ করে আসা বিকেলের ম্লান, সোনালি রোদ কাঠের লম্বা টেবিলগুলোর ওপর এসে পড়েছে। বাতাসে পুরোনো কাগজের একটা সোঁদা, ধুলোমাখা গন্ধ। এখানে কেউ জোরে কথা বলে না, জুতোর শব্দটাও সাবধানে করতে হয়।
রেফারেন্স সেকশনের একদম শেষ প্রান্তের একটা নির্জন টেবিলে একা বসে ছিল অয়ন।
তার পরনে একটা ফেডেড কালো টি-শার্ট আর ডার্ক জিন্স। সামনে একটা ফাঁকা খাতা খোলা, কিন্তু তার দৃষ্টি সেদিকে নেই। সে একদৃষ্টে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে, যেন অসীম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার চোখের নিচে কালচে ছোপ, মাথার উসকোখুসকো চুল আর চোয়ালের শক্ত পেশিগুলো প্রমাণ করছে ছেলেটার মনের ভেতরে কী প্রচণ্ড অশান্তি চলছে।
তার মনের ভেতরটা এখন ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া শ্রীহীন বাগানের মতো। গত কয়েকদিনে তার উপর দিয়ে অনেকগুলো ঝড় বয়ে গেছে আর তার উপর কাল দোজো-তে ওই পনেরো বছরের বাচ্চাটার কাছে জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে আছড়ে পড়া, এই সবকিছু মিলে তার আত্মবিশ্বাসকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
সে এখানে নিজে থেকে পড়াশোনা করতে আসেনি। সে এসেছে, কারণ মিস্টার দাস তাকে আসতে বাধ্য করেছেন।
তার পড়াশোনার প্রতি যে সহজাত টান ছিল সেটা আজ মৃত। সিলেবাস শেষ করা, পরীক্ষায় ভাল করার কোন তাগিদ তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। অয়নের মাঝেমাঝে মনে হয় তার ভেতরটা একটা ধূসর মরুভূমি হয়ে গেছে। সেখানে না আছে কোন স্বপ্ন, না আছে কোন আশা-আকাঙ্খা। শুধু বিক্রম মালহোত্রার মুখটা মনে পড়লেই তার কপালের শিরাগুলো দপদপ করে ওঠে।
লাইব্রেরির এই নিস্তব্ধতার মাঝেই জুতোর একটা মৃদু শব্দ তার টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। অয়ন সেদিকে ঘাড় ঘোরাল না। মিস্টার দাসের পাঠানো সেই 'স্পেশাল টিউটর' এসেছে বোধহয়। থার্ড বা ফোর্থ ইয়ারের কোনো সিনিয়র হবে হয়তো, যে তাকে ক্যালকুলাসের বোরিং থিওরি বোঝাতে আসবে। অয়নের এসব ফালতু জিনিসে কোনো ইন্টারেস্ট নেই। সে ঠিক করে রেখেছে, ছেলেটা এলেই তাকে সে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বিদায় করে দেবে।
কিন্তু অয়ন কিছু বলার বা করার আগেই...
ধড়াস!
একটা বিশাল, ভারী অ্যাডভান্সড ক্যালকুলাসের বই সজোরে, তার ঠিক সামনে টেবিলের উপর আছড়ে পড়ল। লাইব্রেরির ওই নিস্তব্ধ পরিবেশে আওয়াজটা প্রায় একটা বিস্ফোরণের মতো শোনালো।
অয়ন চমকে উঠল। তার ঘোরটা এক লহমায় কেটে গেল।
সে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে, ভুরু কুঁচকে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। তার পরনে একটা আকাশি নীল রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ। কাঁধের ওপর দিয়ে ওড়নাটা কড়াভাবে পিন করা। কোন মেকআপ করেছে বলে মনে হচ্ছে না, চুলগুলো শক্ত করে টেনে একটা সাধারণ বিনুনি করা, যা তার পিঠের ওপর ঝুলছে।
চোখে একটা কালো, মোটা ফ্রেমের চশমা, যার কাঁচের ভেতর দিয়ে দুটো অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত এবং কড়া চোখ সরাসরি অয়নের দিকে তাকিয়ে আছে।
মেয়েটার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনো আড়ষ্টতা নেই, আর তার চেয়েও বড় কথা, অয়ন চ্যাটার্জীকে দেখে তার মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো ভয়ের লেশ নেই।
অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। অসভ্য মেয়ে !
অয়ন তার সেই স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটার চোখের দিকে তাকাল। এই দৃষ্টিটা অয়নের একটা মোক্ষম অস্ত্র। ফেস্টের রাতের পর থেকে এই চাউনি দেখে হোস্টেলের সিনিয়র দাদারাও ঘাবড়ে পিছিয়ে যায়। যেকোন মেয়ে এই চোখের দিকে তাকালে ভয়ে সিঁটিয়ে যাবে।
অয়ন মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা শীতল, ওয়ার্নিং দেওয়া দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল, যার সোজা অর্থ - 'আমায় ঘাঁটাস না। যা ভাগ এখান থেকে।'
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! অয়নের ওই দৃষ্টি মেয়েটার ওপর বিন্দুমাত্র কোনো প্রভাবই ফেলতে পারল না। মেয়েটা এক চুলও কাঁপল তো নাই-ই, উল্টে অত্যন্ত ক্যাজুয়ালি সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে সশব্দে অয়নের ঠিক উল্টোদিকে বসে পড়ল।
তারপর সরাসরি অয়নের ওই রক্তবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কড়াভাবে নো-ননসেন্স গলায় বলে উঠল,
"চোখ রাঙিয়ে লাভ নেই।"
অয়ন সামান্য থমকাল। মেয়েটার গলায় কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অস্বস্তি নেই। গলাটা একদম সমতল, কিন্তু তাতে একটা চাবুকের মতো ধার আছে।
অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে উঠল।
মেয়েটা নিজের ব্যাগ থেকে একটা পেন আর খাতা বের করতে করতে অয়নের চোখের দিকে তাকিয়েই আবার বলল, "তোমার ওই অ্যারোগ্যান্স আর হিরোগিরিটা ফুটবল মাঠে দেখাবে। এখানে তুমি একটা স্টুডেন্ট, যে সিলেবাসে যোজন মাইল পিছিয়ে আছে। আমি আমার নিজের পড়াশোনার সময় নষ্ট করে এখানে তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছি। চ্যাপ্টার ফোর খোল।", মেয়েটার গলাটা ছুরির মতো ধারালো।
অয়ন এবার আক্ষরিক অর্থেই হতবাক হয়ে গেল। সে একদৃষ্টে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথার ভেতরটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল।
এই মেয়েটা কে?
অয়নের জীবনে তার মা, বিদিশা ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো নারী তার চোখের দিকে তাকিয়ে ওর সাথে এভাবে কথা বলার সাহস পায়নি। সবাই তাকে দেখে ভয় পায়। এমনকি ওই হাই-সোসাইটির চন্দ্রিমা সেনও তার সাথে কথা বলার সময় তার রূপ আর গ্ল্যামার দিয়ে তাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করেছিল।
সেখানে এই সাধারণ, ছিমছাম সুতির সালোয়ার পরা কোথাকার কে মেয়েটা, সে এসে সোজা অয়ন চ্যাটার্জীর চোখে চোখ রেখে তাকে ধমক দিচ্ছে?
অয়নের ভেতরের সেই রক্ষণাত্মক কাঁটাগুলো, তার রাগের সেই বর্মটা এই অপ্রত্যাশিত সলিড অ্যাটিটিউডের সামনে হঠাৎ করে কেমন যেন ভোঁতা হয়ে গেল। সে এমন একটা রিঅ্যাকশনের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। এই কড়া ধমকটার মধ্যে একটা অদ্ভুত সততা আছে, যা অয়নকে বাধ্য করল মেয়েটাকে সমীহ করতে।
"তুমি কে?" অয়ন তার নিস্পৃহ, শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল, যদিও তার গলার স্বর আগের চেয়ে অনেক নমনীয়।
"ঋতুপর্ণা। থার্ড সেমিস্টার, ম্যাথ অনার্স", মেয়েটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল। কথা বলার সময় সে একবারও অয়নের দিকে তাকাল না।
"মিস্টার দাস আমাকে পাঠিয়েছেন তোমার মিসড ক্লাসগুলো কভার করানোর জন্য। তোমার হাতে সময় খুব কম আর সিলেবাসের অনেকটা বাকি। যদি মনে করো যে এখানে বসে তুমি তোমার ডার্ক ফেজ এনজয় করবে, তাহলে ইউ ক্যান লিভ। আর যদি সত্যিই পরীক্ষায় পাস করতে চাও, তাহলে চুপচাপ বইটা খোলো। পেজ নাম্বার এইটি-ফোর।"
ঋতুপর্ণার চোখে অয়ন কোনো হ্যান্ডসাম স্পোর্টস স্টার নয়, কোনো ব্রুডিং হিরো নয়। সে যখন জানতে পেরেছিল যে তার স্টুডেন্টটির নাম 'অয়ন চ্যাটার্জী', তখন তার ভেতরে একটা তীব্র বিরক্তি কাজ করেছিল।
অয়ন চ্যাটার্জী নামটা এখন পুরো কলেজে গুণ্ডামি আর অসভ্যতার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেস্টের রাতে ব্যাকস্টেজে বিক্রম মালহোত্রাকে ওইভাবে জানোয়ারের মতো মারার ঘটনাটা নিজের চোখে সবাই না দেখলেও ওটার বর্ণনা এখন ক্যাম্পাসে সবার মুখে মুখে ঘোরে।
পুরো ঘটনাটা শুনে ঋতুপর্ণার মনে হয়েছিল, ছেলেটা কোনো সাধারণ ছাত্র নয়, একটা সাইকোপ্যাথ। নেহাৎ, মিস্টার দাস তার সবচেয়ে প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় প্রফেসর। তিনি যখন নিজে থেকে তাকে এই দায়িত্বটা দিয়েছেন, তাই সে না করতে পারেনি।
সে ঠিকই করে এসেছে যদি আজ অয়ন চ্যাটার্জী কোনরকম অসভ্যতা করে সে সোজা মিস্টার দাসকে গিয়ে জানিয়ে দেবে, এই অমানুষকে অঙ্ক গেলাবার দায়ভার অন্তত সে নিতে পারবে না। যে ছেলে নিজের প্রফেসরের সামনে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারারকে মেরেকেটে একসা করে দিতে পারে, তাকে মানুষ করার দায়িত্ব ওর ?
মিস্টার দাসের আর কোনো স্টুডেন্ট জুটল না?
এই রকম একটা বখে যাওয়া গুন্ডাকে ও কিভাবে ক্যালকুলাস বোঝাবে ? সামনে নিজের সেমিস্টার এক্সাম, তার ওপর এই আপদ! তবে হ্যাঁ, ছেলেটা যদি ভাবে এখানে এসে সে তার ওই রাফ-অ্যান্ড-টাফ হিরোগিরি দেখাবে, তাহলে সে ভুল দরজায় কড়া নেড়েছে।
ওর চোখে অয়ন জাস্ট একটা বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে যাকে সে অঙ্ক গেলাতে এসেছে। নইলে এত বড় অপরাধ করার পরে যার জেলে থাকার কথা, সে দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায় কী করে ? নিশ্চয়ই বাপ-মা কলেজ অথরিটির সাথে কানেকশন কাজে লাগিয়ে ছেলের কুকীর্তি ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে। কোন সাধারণ ঘরের ছেলে হলে এতক্ষণে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হতো। আইনের শাসনের এই বৈষম্য ঋতুপর্ণার কাছে সবচাইতে বেশি অসহ্য লাগে।
ঋতুপর্ণা খাতাটা টেনে নিয়ে একটা জটিল ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন লিখতে শুরু করল।
অয়ন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ঋতুপর্ণার সেই শান্ত, কিন্তু ফোকাসড মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার কাজের প্রতি ডেডিকেশন আর কোনো রকম ভনিতা না থাকার বিষয়টা অয়নের মনের ভেতরকার জমাট বাঁধা অন্ধকারে খুব সামান্য হলেও একটা স্পার্ক তৈরি করল।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে শুধু অবহেলা, বিশ্বাসঘাতকতা আর অপমান সয়েছে। তার মা, যার ভালোবাসাকে সে ছোটবেলা থেকে ধ্রুব সত্য বলে মানত, সেই মা তাকে ভুল বুঝেছে। সবার সামনে অপমান করে তার গায়ে হাত তুলেছে। নিজের জীবন থেকে বার করে দিয়েছে। তার প্রিয় ফুটবল মাঠে আজ তার ফুটবল খেলা বন্ধ। দোজো-তে গিয়ে শান্তির বদলে একগাদা অপমান জুটেছে।
আসলে, অয়ন যে রুক্ষ মেজাজ আর রাগ নিয়ে সবার সামনে ঘুরে বেড়ায়, তা কেবল একটা খোলস। এটা সে নিজেই তৈরি করেছে যাতে ওর ভেতরের ক্ষতবিক্ষত, অসহায় ছেলেটাকে পৃথিবী থেকে নতুন করে আঘাত না পেতে হয়।
কিন্তু আজ, এই নিস্তব্ধ লাইব্রেরিতে, একটা অত্যন্ত সাধারণ মেয়ের এই কড়া, প্রায় মাতৃসুলভ বা একজন স্ট্রিক্ট টিচারের মতো ধমক অয়নের ওই খোলসটায় একটা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি করল। যতই রূঢ় হোক না কেন, এই শাসনের মধ্যে কোনো ম্যানিপুলেশন নেই।
সে আর কোনো তর্ক করল না। কোনো বিরক্তিও দেখাল না। তার পাথরের মতো কঠিন ব্যক্তিত্ব, যা প্রিন্সিপালের ঘরেও ভাঙেনি, যা চন্দ্রিমা সেনের রূপের সামনেও গলেনি, তা আজ এই সাধারণ, আটপৌরে মেয়েটার নো-ননসেন্স আচরণের সামনে নিঃশব্দে নতি স্বীকার করল।
বাধ্য ছাত্রের মতো ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে অয়ন ভারী ক্যালকুলাসের বইটা নিজের দিকে টেনে নিল। সে বইটার পাতা উল্টে ১২ নম্বর পেজটা খুলল।
"গুড", ঋতুপর্ণা অত্যন্ত পেশাদার গলায় বলল।
তারপর সে একটা পেন নিয়ে বইয়ের একটা সমীকরণের ওপর পয়েন্ট করে বোঝাতে শুরু করল, "এই ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশনটার বেসটা তুমি ভুল করেছ। লিমিটটা ইনফিনিটি হলে..."
লাইব্রেরির নিস্তব্ধ কোনায় সবার চোখের আড়ালে শুরু হলো টিউটোরিয়াল ক্লাস। যেখানে অসহায় একটা ছেলে বাধ্য ছাত্রের মতো একটা সাধারণ মেয়ের নির্দেশ মেনে অঙ্ক কষতে শুরু করল।
কিন্তু সেইসময় লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনে আরেকজন উপস্থিত ছিল।
ঠিক তিনটি বুকশেলফ দূরে, সারি সারি এনসাইক্লোপিডিয়া আর মোটা মোটা রেফারেন্স
বইয়ের র্যাকের আড়ালে একজন লুকিয়ে লুকিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল।
চন্দ্রিমা সেন।
তার পরনে দামী অফ-শোল্ডার টপ আর ফেডেড ডেনিম জিন্স, চোখে দামি মেকআপ আর সারা শরীর থেকে ভেসে আসা ডিওর পারফিউমের কড়া, মোহময়ী সুবাস লাইব্রেরির এই ধুলোমাখা, বোরিং পরিবেশের সাথে একদম বেমানান।
অয়ন কার সাথে মেশে না মেশে, সেটা রনি আর কবীররা সত্যিই জানত না। কিন্তু, এই কমাসে কলেজে চন্দ্রিমা নিজস্ব একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে।
ফার্স্ট ইয়ারের রোহন আধঘণ্টা আগে ওকে মেসেজ করে জানিয়েছিল, "অয়ন লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ে ঢুকছে।"
খবরটা পাওয়া মাত্রই চন্দ্রিমা নিজের ক্লাস বাঙ্ক করে সোজা লাইব্রেরিতে চলে এসেছে। সে জানত না অয়ন ওখানে কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। তার মনে একটা সন্দেহ ছিল, হয়তো কোনো মেয়ের সাথে অয়নের সিক্রেট অ্যাফেয়ার চলছে। সেই সন্দেহ মেটাতেই সে নিঃশব্দে, নিজের হাই-হিলের আওয়াজ লুকিয়ে বুকশেলফের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু গত দশ মিনিট ধরে র্যাকের আড়াল থেকে সে যা দেখল, সেটা তাকে একটা বড়সড় ধাক্কা দিল। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
চন্দ্রিমার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। সে শেলফের কাঠের ফ্রেমটা এত শক্ত করে চেপে ধরেছে যে তার পারফেক্ট ফ্রেঞ্চ-ম্যানিকিওর করা নখগুলো সাদা হয়ে গেছে।
যে অয়ন চ্যাটার্জী, তাকে, কলেজের কুইন বি, যার এক ঝলক হাসির জন্য ছেলেরা পাগল হয়ে থাকে সেই চন্দ্রিমা সেনকে স্পোর্টস করিডোরে আক্ষরিক অর্থে একটা ইনভিজিবল ডাস্টবিনের মতো ইগনোর করে চলে গিয়েছিল ! যে ছেলেটা তার মুখের ওপর বলে গিয়েছিল 'আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই'... সেই অয়ন, সেই ডার্ক, অ্যারোগ্যান্ট, আনপ্রেডিক্টেবল অয়ন আজ একটা সাধারণ, বোরিং মেয়ের ধমক চুপচাপ হজম করছে? সে কোনো প্রতিবাদ করল না? একবারের জন্যও চোখ রাঙাল না?
চন্দ্রিমা র্যাকের ফাঁক দিয়ে ঋতুপর্ণাকে খুব ভালো করে স্ক্যান করল।
কী আছে ওই মেয়েটার মধ্যে? একটা সস্তা, সুতির সালোয়ার-কামিজ পরে আছে, চোখে আদ্যিকালের চশমা, চুলে একটা বোরিং বিনুনি আর জিরো মেকআপ! না আছে কোনো ফ্যাশন সেন্স, না আছে কোনো গ্ল্যামার। কোনো পুরুষের রক্তে একবিন্দুও আলোড়ন তোলার ক্ষমতা নেই এই মেয়েটার।
জাস্ট আ প্লেইন জেন!
অথচ... অথচ অয়ন!
সেই অয়ন চ্যাটার্জী, যাকে সে হাজার চেষ্টা করেও নিজের গ্ল্যামারের মায়ায় এক সেকেন্ডের জন্য স্থির করতে পারেনি, সেই অয়ন আজ এই সাধারণ, আটপৌরে মেয়েটার একটা তুচ্ছ ধমকে বাধ্য কুকুরের মতো মাথা নিচু করল?
চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা রাগে, অপমানে আর এক তীব্র ঈর্ষায় জ্বলতে শুরু করল। ওর মনে হতে লাগল, কেউ যেন ওর সুন্দর, নিখুঁত মুখে এক বালতি কাদা ছুঁড়ে মেরেছে।
তার ইগোতে আক্ষরিক অর্থেই দাউদাউ করে আগুন লেগে গেল। সে যখন অয়নকে জল অফার করেছিল, অয়ন তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। সে যখন করিডোরে অয়নের রাস্তা আটকে তাকে ডমিনেট করার চেষ্টা করেছিল, অয়ন তাকে 'পিলার বা অবজেক্ট' বলে অপমান করে চলে গিয়েছিল।
আর আজ?
এই চশমা-পরা আঁতেল মেয়েটা এসে সজোরে একটা বই আছড়ে ফেলে অয়নকে চোখ রাঙাল, আর অয়ন সেটা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিল ?
কেন?
এই 'বেহেনজি' টাইপের মেয়েটার মধ্যে এমন কী আছে, যা চন্দ্রিমা সেনের মধ্যে নেই?
অয়ন কি তাহলে এই ধরনের মেয়ে পছন্দ করে?
না ! এটা হতেই পারে না।
চন্দ্রিমা বইয়ের ফাঁক আবার উঁকি মেরে দেখল, ঋতুপর্ণা অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে একটা ইকুয়েশন বোঝাচ্ছে আর অয়ন মাথা নিচু করে সেটা শুনছে।
অয়ন তাহলে কারোর কথা শোনে !
অয়নকে তাহলে কন্ট্রোল করা যায় !
অয়নের ওই উদ্ধত চোখ দুটোকেও নত করা যায় !
চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা ভয়ংকর ঈর্ষায় জ্বলে উঠল। তার সহজাত ইগো আর ঈর্ষা মিলে তার মস্তিষ্কে একটা মারাত্মক ককটেল তৈরি করল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস আরো দ্রুত হয়ে গেল, বুকের ওঠানামা বেড়ে গেল।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে অত্যন্ত সাবধানে, নিজের স্টিলেটোর কোনো আওয়াজ না করে নিঃশব্দে লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশন থেকে বেরিয়ে এল।
ওর বুকের ভেতরটা রাগে তোলপাড় করছে।
চন্দ্রিমার চোখের সামনে বারবার অয়নের মুখটা ভেসে উঠছে। বেরিয়ে আসার আগে ও র্যাকের ফাঁক দিয়ে অয়নের ওই সুন্দর মুখটা আরেকবার দেখে নিয়েছে। অয়নের মুখটা যেন কোনো গ্রিক ভাস্কর্যের মতো দেখাচ্ছিল। চওড়া কপাল, নিখুঁত ভাবে খোদাই করা টিকালো নাক আর পৌরুষদীপ্ত শার্প ‘জ-লাইন’ যা ওর মুখকে আভিজাত্য এনে দিয়েছে। অবিন্যস্ত একগুচ্ছ চুল এসে অয়নের কপালে পড়েছিল, সেই অবিন্যস্ত ভাবটার মধ্যেও এক অদ্ভুত পৌরুষদীপ্ত আবেদন আছে, সাথে ওই ডার্ক, ব্রুডিং পার্সোনালিটি যা চন্দ্রিমাকে চুম্বকের মতো টানে।
একে পাবার জন্য চন্দ্রিমা সব কিছু করতে পারে।
এর ওপর একমাত্র ওরই অধিকার থাকা উচিত।
সে জন্য যদি তাকে এই 'বেহেনজি'কে রাস্তা থেকে সরানোর দরকার হয় বা অয়নের কোনো ডার্ক সিক্রেট খুঁজে বের করতে হয়, তাহলে সে তাই করবে।