মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৩২
একটি ঘোষণা :- আপনাদের এই আপডেট পড়ে শেষ করতে পাঁচ মিনিট লাগলেও আমার এটা লিখে বার বার rewrite করতে বেশ কয়েকদিন লেগেছে। অন্যান্য বারে আরো বেশি সময় লাগে, এবারে চ্যাপ্টারটা আকারে ছোট হওয়ায় কম সময় লেগেছে।
চুপিচুপি অনেকেই এসে পড়ে চলে যান দেখছি। নয় নয় করে গল্পের সত্তর হাজার ভিউ হয়ে গেল। তা, একটা রেপুটেশন পয়েন্ট দিতে কী আপনাদের হাত কাঁপে ? আমি যেমন লিখে পয়সাকড়ি পাই না তেমন আপনাদের রেপুটেশন পয়েন্ট দিতেও কোন পয়সা খরচা হয় না। প্রতিদিন পাঁচটা করে রেপুটেশন পয়েন্ট তো পাচ্ছেনই।
এবার থেকে প্রতিটা পোস্টে নূন্যতম পঁচিশটা রেপু না পাওয়া অবধি পরবর্তী আপডেট আসবে না। আমি হিসাব রাখব। যদি একমাস লাগে তাহলে পরের আপডেট একমাস পরে আসবে।
যারা নিয়মিত লাইক আর রেপু দিয়ে আমাকে উৎসাহ দেন তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। বাকি যারা চুপচাপ পড়ে পালিয়ে যায় তারা এঁদের থেকে সভ্যতা আর ভদ্রতা শিখতে পারে।
একবিংশ অধ্যায়
দুই সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। কোথা দিয়ে যে সময় গলে যাচ্ছে বিদিশা বুঝতে পারছেন না। তার মনে হচ্ছে এই তো সবে গতকাল প্রিন্সিপাল তাকে সিম্পোজিয়ামের দায়িত্ব নেবার অনুরোধ জানালেন। এত ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে তিনি জীবনে কখনও যাননি। বিদিশা কলেজে আসছেন নির্দিষ্ট সময়ের একঘন্টা আগে আর বাড়ি ফেরার সময়ের কোন ঠিক-ঠিকানা থাকছে না। রাতে বাড়ি ফেরা মানে কোনরকমে শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দেওয়া। অন্য কোন চিন্তার অবকাশ নেই। ফেস্টের বাজেট সামলানো আর সিম্পোজিয়ামের কো-অর্ডিনেটর হওয়ার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ফারাক সেটা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
আগে এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে তিনি সেদিন রাজি হতেন কি না, তা নিয়ে এখন নিজের মনেই সন্দেহ জাগে। প্রথম দিন বিদিশার মনে হচ্ছিল তিনি অথৈ জলে পড়েছেন। সেমিনার কমিটির প্রধান ডঃ পালিত তাকে ছায়ার মতো গাইড না করলে বিদিশা অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতেন। ভদ্রলোকের অশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য।
আপাতত, এই ইভেন্টটার উপর তাঁর কেরিয়ারের বাঁচামরা নির্ভর করছে।
কলেজের মেইন অডিটোরিয়ামের ঠিক পাশেই অবস্থিত কনফারেন্স হলটি এখন বিদিশার দ্বিতীয় ঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার নিজের কেবিনটা একটা অঘোষিত ওয়ার রুমে পরিণত হয়েছে। বিদিশার ডেস্কে ফাইলের পাহাড়। ডেস্কের ওপর সারি সারি ফোল্ডার; সেখানে বাজেট শিট, ডেলিগেটদের ট্রাভেল আইটিনারি, কেটারিংয়ের মেনু ইত্যাদি। আর, ছড়িয়ে আছে রিসার্চ পেপারের অ্যাবস্ট্রাক্ট। শেষ মুহূর্তের ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
এসির ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যেও বিদিশার কপালে সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু জমেছে। তার মনে সবসময় চাপা টেনশন। তিনি তিনমাসের কাজ তোলার জন্য তিন সপ্তাহেরও কম সময় পেয়েছেন। কাজের চাপ আর টেনশনে তার অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠলেও মুখ বুজে লড়ে যাচ্ছেন।
আজ তার পরনে একটা মভ রঙের লিনেন শাড়ি, চুলগুলো একটা টাইট ফ্রেঞ্চ রোলে বাঁধা। তার চোখেমুখে একজন পেশাদারের মতো তীক্ষ্ণ ফোকাস থাকলেও চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির কালচে ছাপটা চাপা দেওয়া যায়নি। ওটা রয়েই গেছে।
তার চোখ ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিমগ্ন থাকলেও চিন্তার কাঁটা সাহিলের দিকে। ছেলেটার অদ্ভুত কর্মদক্ষতা। একদম যন্ত্রের মতো নিঃশব্দে কাজ করে যায়। ভলান্টিয়ার টিমের দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে বিদিশাকে আজ অবধি ওকে একবারও কোনো কাজের জন্য দ্বিতীয়বার বলতে হয়নি। সাহিলের কাজে এখনো অবধি তিনি একটাও ভুল খুঁজে পাননি। অংক যাদের রক্তে থাকে, তাদের কাজের ধরনেও বোধহয় এক ধরনের গাণিতিক শৃঙ্খলা থাকে। সাহিলকে ভলান্টিয়ার টিমের হেড করাটা নেওয়াটা তাঁর সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া সেরা সিদ্ধান্ত।
এমন সময় দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ল।
"কাম ইন" বিদিশা ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই বললেন।
নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল সাহিল। সে অত্যন্ত ধীরস্থির পায়ে বিদিশার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল। বিদিশা ল্যাপটপ বন্ধ করে মুখ তুলে তাকালেন। সাহিলের হাতে একটা নীল রঙের লেদার ফোল্ডার আর একটা স্টিকি নোট।
সাহিল ল্যাপটপের পাশে ফোল্ডারটা নামিয়ে রাখল।
"ম্যাম, আইআইটি কানপুরের ডক্টর ঝা-র কনফার্মেশন মেইল চলে এসেছে। আইআইটি খড়গপুর থেকে যে তিনজন ডেলিগেট আসছেন, তাদের অ্যাকোমোডেশনটা আমি গেস্ট হাউসের ফার্স্ট ফ্লোরে শিফট করে দিয়েছি। আর সেমিনার হলের সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্টের লেআউটটা এই ফাইলে আছে।"
সাহিল যখন ডেস্কের ওপাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিল সেইসময় বিদিশা ফাইলটা হাতে নিয়ে চোখ বোলাচ্ছিলেন। প্রতিটা ডেলিগেটের নাম, সময় আর রুম নম্বর আলাদা করে কালার-কোড করা। একেবারে নিখুঁত কাজ, কোনো ভুল নেই।
"দিস ইজ পারফেক্ট, সাহিল। তুমি প্যানেল ডিসকাশনের ফোল্ডারগুলো ডক্টর পালের ডেস্কে পাঠিয়ে দিয়েছ?"
"ইয়েস ম্যাম। আজ সকালেই পাঠিয়ে দিয়েছি" সাহিল বরাবরের মতো বিনীতভাবে উত্তর দিল। সে প্রথমদিনের মতো বিদিশার ডেস্ক থেকে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে। সেমিনার উপলক্ষে গত দুই সপ্তাহে তাঁদের মধ্যে অনেক কাজের কথা হলেও, সাহিল সচেতনভাবেই এই দূরত্বটুকু কখনও কমতে দেয়নি।
তার দৃষ্টি ফাইলের ওপর, কথা বলার সময় সে সরাসরি বিদিশার চোখে চোখ রাখে ঠিকই, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে বাড়তি কৌতূহল বা কোনোরকম ইঙ্গিত নেই। এক অদ্ভুত পেশাদারিত্বে মোড়া ছেলেটা।
"গুড। থ্যাংক ইউ সাহিল। দ্যাটস অল ফর নাউ। তুমি এবার ক্লাসে যাও, বাকিটা আমি দেখছি। লাঞ্চের পরে ফিরে এসে তুমি কালকের স্পিকারদের লিস্টটা একবার ফাইনাল করে নিও", বিদিশা ল্যাপটপে চোখ রেখে বললেন।
"সিওর, ম্যাম।"
সাহিল সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে, কোন বাড়তি কথা না বলে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
কেবিনের দরজাটা বন্ধ হতেই বিদিশা ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে একটা গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। সাহিলের সাথে কাজ করাটা আক্ষরিক অর্থেই একটা স্মুথ এক্সপেরিয়েন্স।
সাহিলের এই পরিমিতিবোধ আর নিখুঁত পেশাদার আচরণ বিদিশাকে বারবার বিক্রমের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। দুজনের মধ্যে কত তফাত !
বিক্রম থাকলে এতক্ষণে ফাইল দেখানোর অছিলায় অন্তত দুবার ডেস্কের উপর ঝুঁকে পড়ত। কথার ফাঁকে ফাঁকে তার পারফিউমের গন্ধটা কী দারুণ, তার শাড়িটা কত সুন্দর, অতিরিক্ত 'কেয়ারিং' গলায় কথায় কথায় 'আপনাকে খুব টায়ার্ড লাগছে ম্যাম', 'শাড়িতে আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে ম্যাম' গোছের মন্তব্য করত। ফাইলগুলো গুছিয়ে তার দিকে এগিয়ে দেবার সময় ইচ্ছে করে তার আঙুল স্পর্শ করত।
সাহিলের কাজের ধরন দেখে বিদিশা আজ উপলব্ধি করছেন, বিক্রমের এসব আচরণগুলো মোটেও কোনো 'বাধ্য ছাত্রের' স্বাভাবিক আচরণ ছিল না। যতই ভদ্র হোক না কেন, সে ওগুলো হিসেব করেই করত। অয়ন ঠিকই বলেছিল।
বিদিশা আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, এবারেরটায় আক্ষেপ মিশে আছে।
তার শুরু থেকে বিক্রমকে অতটা বেনিফিট অফ ডাউট দেওয়া উচিত হয়নি। তবে তার বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি হলেন না তিনি। প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়।
আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ ফেরাতেই বিদিশার চোখের সামনে আবার হাজারো ডেটা, শিডিউল আর ইমেলের সারি তার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল।
কাজ করতে করতে কতটা সময় পার হয়ে গেছে তিনি জানেন না, তবে হঠাৎই অনুভব করলেন তাঁর মাথার দু-পাশের রগগুলো হাতুড়ির মতো দপদপ করছে। ঘাড়ের পেশিগুলো শক্ত হয়ে গিয়েছে। তিনি দু'হাত দিয়ে কপালটা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রইলেন।
এমন সময় দরজায় আবার নক হলো। বিদিশা ভেবেছিলেন সাহিল হয়তো আবার ফিরে এসেছে। হয়তো কোনো ফাইলে সই নিতে এসেছে।
"ভিতরে এসো সাহিল..." বিদিশা চোখ না খুলেই বললেন।
এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা।
তারপর কেবিনের খোলা দরজা দিয়ে একটা অত্যন্ত মার্জিত, পরিণত পুরুষালি গলা ভেসে এল।
"অঙ্কের এই গোলকধাঁধায় বেশিক্ষণ আটকে থাকলে আইনস্টাইনেরও নিউরাল সার্কিট জ্যাম হয়ে যেত, মিস গাঙ্গুলি। তা, এই অসময়ে এক কাপ কফি আর একটুখানি অহেতুক আড্ডা কি খুব বড় অপরাধ হবে?"
বিদিশা চমকে মুখ তুললেন। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাহুল বোস। তার পরনে একটা চারকোল গ্রে রঙের ফর্মাল শার্ট, হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। হাতে দুটো টেক-অ্যাওয়ে কফির কাপ, যা থেকে ধোঁয়া উঠছে। রাহুলের মুখে সেই পরিচিত স্নিগ্ধ হাসি। বিদিশার মনে হল তপ্ত দুপুরের জ্বালাপোড়া রোদে হঠাৎ এক পশলা বসন্তের বৃষ্টি এসে তাঁর ক্লান্ত সত্তায় এক পরম স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিয়ে গেল।
"মিস্টার বোস! আপনি এখানে?" বিদিশার ঠোঁটে একরাশ স্বতঃস্ফূর্ত হাসি ফুটে উঠল।
রাহুল ভেতরে এসে কফির কাপটা ফাইলের স্তূপে ভর্তি বিদিশার ডেস্কের একমাত্র ফাঁকা জায়গায় রাখলেন।
"প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে এই সেমিনারের 'আনঅফিসিয়াল' লায়াজোঁ অফিসার বানিয়েছেন। মূলত ডেলিগেটদের জন্য যে কালচারাল ইভেন্ট হবে সেটার তদারকি করতে। কিন্তু এখানে এসে দেখছি কো-অর্ডিনেটর নিজেই তো পাথরের মূর্তির মতো ফাইলের নিচে চাপা পড়ে আছেন।"
"কাজের পাহাড় মিস্টার বোস।" বিদিশা একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন।
"আমি চাইছি সব নিখুঁত হোক। ডক্টর বাগচী যেভাবে তক্কে তক্কে আছেন, সামান্য ভুল হলেই আমার চাকরিটা খাবেন।"
রাহুল ডেস্কের উপর সামান্য ঝুঁকে এলেন। তার চোখে গভীর মমতা, "আপনি বড্ড বেশি চাপ নিচ্ছেন। একটু হাসুন। অঙ্ক দিয়ে যুক্তি সাজানো যায়, কিন্তু জীবনটা উপভোগ করতে গেলে একটু সাহিত্যের রস লাগে।"
তিনি কফির কাপটা এগিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে যোগ করলেন, "তাছাড়া, আমি লিটারেচারের লোক হলেও, অঙ্কের এই উত্তাল মহাসমুদ্রে আমার কোনো সহকর্মী ডুবে যাচ্ছে কি না, সেই খবর রাখাটা তো আমার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে, তাই না?"
রাহুলের কথার সহজাত রসবোধ বিদিশার সমস্ত স্ট্রেস এক লহমায় হালকা করে দিল।
"ডুবে এখনো যাইনি, তবে যা প্রেশার, মনে হচ্ছে সিম্পোজিয়ামের ফাইলেই আমার সমাধি হবে", বিদিশা একটা কফির কাপ হাতে তুলে নিয়ে হাসলেন। কফির উষ্ণতা তার হাতের তালুতে একটা আরামদায়ক অনুভূতি ছড়িয়ে দিল।
"সমাধি হওয়ার আগে এই এসপ্রেসোটা খেয়ে নিন। ক্যাফেটেরিয়ার ওই জলমেশানো কফি নয়, এটা আমি স্পেশালি বাইরে থেকে আনিয়েছি", রাহুল সামনের চেয়ারটায় বসতে বসতে বললেন।
বিদিশা কফিতে চুমুক দিলেন। সত্যিই চমৎকার স্বাদ, "থ্যাংক ইউ মিস্টার বোস। দিস ওয়াজ মাচ নিডেড।"
রাহুল পকেট থেকে একটা ক্যাডবেরি সিল্ক বের করে বিদিশার সামনে রাখলেন, "এটা আমার পক্ষ থেকে একটা সুইট ব্রেইন-বুস্টার।"
বিদিশা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। রাহুলের এই ছোট ছোট রসিকতা আর যত্নশীল আচরণ তাকে মুহূর্তের জন্য সেমিনারের টেনশন, বিক্রমের জটিলতা থেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। তিনি অনুভব করলেন, রাহুল বোসের উপস্থিতিতে তিনি আবার পুরানো বিদিশা হয়ে উঠছেন, যিনি শুধু একজন শিক্ষিকা নন, একজন রক্তমাংসের নারীও বটে।
"ইউ আর ওয়ার্কিং টু হার্ড, বিদিশা", রাহুল হঠাৎ করে 'মিস গাঙ্গুলি'র বদলে তার নাম ধরে ডাকলেন। তবে তার ডাকার ভঙ্গিটা এতটাই সহজাত আর সম্মানপূর্ণ ছিল যে তাতে বিদিশার একটুও খারাপ লাগল না। বরং এই মানুষটার পরিণত সাহচর্য তাকে স্বস্তি দিচ্ছিল।
"দায়িত্ব যখন নিয়েছি, তখন তো খাটতেই হবে", বিদিশা ল্যাপটপটা বন্ধ করে রাহুলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
দুজনের মধ্যে সেমিনারের খুঁটিনাটি টুকটাক বিষয় এবং অন্যান্য অ্যাকাডেমিক বিষয় নিয়ে কথাবার্তা শুরু হলো। রাহুলের বুদ্ধিদীপ্ত সেন্স অফ হিউমার বিদিশার মুখের ক্লান্ত রেখাগুলোকে ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছিল। বিদিশা আজ বেশ কয়েকবার শব্দ করে হেসে উঠলেন।
ঠিক একই সময় কেবিনের বাইরে, করিডোরের ছায়ায় নিজেকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিল বিক্রম মালহোত্রা। তার হাতে স্পনসরশিপের একটা ফাইল। কিন্তু তার চোখদুটো করিডোরের আলো-আঁধারি চিরে বিদিশার কেবিনের গ্লাস প্যানেলটার ওপর আঠার মতো আটকে আছে।
ভেতরে বিদিশা হাসছেন। রাহুল বোসের কোনো একটা কথায় তিনি মন খুলে হাসছেন। সেটা একজন অফিস কলিগের মাপা হাসি নয়। একজন নারীর স্বতঃস্ফূর্ত হাসি চিনতে বিক্রমের কোন অসুবিধা হল না। আর সেটাই ওর পুরুষালি অহংকারে তপ্ত শেলের মতো গিয়ে বিঁধল। বিক্রমের সাথে কাটানো এতগুলো ঘণ্টার মধ্যে বিদিশা কোনোদিন নিজের এই রূপটা দেখাননি। এরকম হাসির এক কণাও তার ভাগ্যে জোটেনি। বিক্রমের চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল। বিদিশার দিক থেকে রাহুল বোসের দিকে তাকাতে তার চোখের তারায় ফুটে উঠল এক তীব্র আক্রোশ।
এই মালটা আবার এসে হাজির হয়েছে।
বিক্রমের বুকের ভেতরটা তখন ঈর্ষায় জ্বলে যাচ্ছে। সে যখন দিনের পর দিন বিদিশাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করেছে, তখন বিদিশা তাকে শুধুমাত্র একজন 'গুড বয়' হিসেবে দেখেছেন। সবসময় একটা অদৃশ্য লক্ষণরেখা টেনে রেখেছিলেন। আর আজকে এই চশমাওয়ালা আঁতেল মাস্টারটার সামনে সেই একই বিদিশা নিজের গাম্ভীর্য ভুলে হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে। সেই রাতে অয়ন চ্যাটার্জীর ঘুঁষির আঘাতের চেয়েও আজকে বিদিশার এই হাসি বিক্রমের মনে বেশি জ্বালা ধরালো।
রাগে তার হাতের মুঠো ফাইলের ওপর এত শক্ত হয়ে বসল যে কাগজগুলো দুমড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তার ফাটা ঠোঁটের ক্ষতটা, যেটা এতদিনে প্রায় শুকিয়ে এসেছে, সেটা রাগে আবার টানটান হয়ে চিনচিন করে উঠল। বিক্রমের ইচ্ছে হল লাথি মেরে ওই কেবিনের দরজা ভেঙে কেবিনের ভেতরে ঢুকে কলার ধরে রাহুল বোসকে চেয়ার থেকে তুলে ফেলতে।
কিন্তু, না, বিক্রম অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথার খেলোয়াড়।
বিক্রম নিজের রাগকে দমন করতে জানে, সে অয়ন নয়। ও জানত যে এই মুহূর্তে তেমন কিছু করা মানে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা। সে কলেজ থেকে রাস্টিকেট হতে চায় না। বিক্রম চুপচাপ দাঁড়িয়ে কেবিনের ভেতর কী চলছে সেটা দেখতে লাগল।
তবে সে এত সহজে হার মেনে ময়দান ছেড়ে পালাবার পাত্র নয়। বিদিশা ভেবেছিল ওকে এই সিম্পোজিয়ামের ভলান্টিয়ার টিম থেকে তাড়িয়ে সে জিতে গেছে। কিন্তু, সামনের দরজা বন্ধ হলে ব্যাকডোর দিয়ে কিভাবে ঢুকতে হয় সেটা বিক্রমের ভালো মতো জানা। ওভাবেই সে এই ইভেন্টে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
(ফ্ল্যাশব্যাক: দশদিন আগে, স্টাফরুম)
বিক্রম যখন বুঝতে পারল যে বিদিশা তাকে নিজের গণ্ডি থেকে ছেঁটে ফেলছেন তখন সঙ্গে সঙ্গে সে এর প্রতিশোধ তুলবে বলে ঠিক করে। তার মতো অহংকারী ছেলের পক্ষে এই প্রত্যাখ্যান মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল। সঙ্গে সঙ্গে সে সিম্পোজিয়ামের টিমে ঢোকার একটা প্ল্যান বানিয়ে ফেলে। এত সহজে সে বিদিশাকে নিজের নাগালের বাইরে যেতে অ্যালাও করবে না। কিন্তু, এই চালটা সফল করতে হলে তার একজন প্রভাবশালী টিচারের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন ড. সুব্রত সেন।
সুব্রত সেনের মতো সুবিধাবাদী, ডিপার্টমেন্টাল পলিটিক্স করা টিচারদের সঙ্গে বিক্রমের মতো ছেলেদের এমনিতেই ভালো আঁতাত আছে। তাছাড়া, বিদিশার প্রতি সুব্রতর নিজের একটা আক্রোশ তো ছিলই। শত্রুর শত্রু সবসময়ই মিত্র হয়।
দিন দশেক আগে, ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমে বিদিশা যখন একা বসে সেমিনারের বাজেট চেক করছিলেন, সেইসময় সুব্রত সেন বিক্রমকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে ঢুকেছিলেন।
"মিস গাঙ্গুলি, আপনার সঙ্গে একটা জরুরি বিষয় ডিসকাস করতে এলাম", সুব্রত সেন নিজের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে এক কৃত্রিম পেশাদারি গম্ভীর গলায় বললেন।
"সিম্পোজিয়ামের স্পনসরশিপ আর ফান্ডিংয়ের দিকটা তো আমি দেখছি। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সেমিনারের ফান্ডিংয়ের একটা বড় অংশ আসে লোকাল কর্পোরেট বডিদের থেকে। কলেজের গভর্নিং বডির নিয়ম অনুযায়ী, স্টুডেন্ট অ্যাক্টিভিটি ফান্ডের সাথে যুক্ত স্পনসরশিপ গুলোর ক্ষেত্রে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের একজন রিপ্রেজেন্টেটিভকে 'লিয়াজোঁ অফিসার' হিসেবে রাখতে হয়।"
বিদিশা ফাইল থেকে মুখ তুলে বিক্রমের দিকে তাকিয়েছিলেন। ওকে দেখে তার চোখদুটো এক মুহূর্তের জন্য সরু হয়ে গিয়েছিল। সেই এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মনে ফেস্টের রাতের সেই কুৎসিত স্পর্শের স্মৃতি ফিরে এসেছিল।
"তাছাড়া" সুব্রত সেন বিক্রমের কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, "বিক্রম ভলান্টিয়ারিং টিমে না থাকলেও, ফাইন্যান্সিয়াল পার্টটা ওকে দেখতেই হবে। কলেজ ফেস্টের সময় এক্সটার্নাল ভেন্ডার আর বাইরের স্পনসরদের সাথে গত দুই বছর ধরে ও ডিল করছে। আই নিড হিম ইন মাই টিম। ও শুধু ফান্ডিংয়ের কাগজপত্রের কাজটা কো-অর্ডিনেট করবে। এতে আপনারও কাজের চাপ কমবে।"
বিদিশা অতটাও বোকা নয়, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সুব্রত সেন কলেজের রুলবুককে ঢাল বানিয়ে চালাকি করে বিক্রমকে আবার সেমিনারের কাজে ঢুকিয়ে নিচ্ছেন। চাকরির এই অল্প কদিনের অভিজ্ঞতায় বিদিশা একটা জিনিস বুঝেছেন, সব সত্য সবার সামনে উচ্চারণ করা যায় না। ফেস্টের রাতে বিক্রম তাঁর সাথে কী অসভ্যতা করেছিল, তা এই মুহূর্তে প্রিন্সিপাল বা ডক্টর সেনের সামনে তুলে ধরা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। এখন যদি তিনি ব্যক্তিগত আপত্তির খাতিরে বিক্রমকে 'না' বলেন, তবে সুব্রত সেন সেটাকে বিদিশার ‘পার্সোনাল ইগো’ বা ‘আন-প্রফেশনাল অ্যাটিটিউড’ বলে পুরো ম্যানেজমেন্টের সামনে রটিয়ে দেবেন।
বিদিশা নিজের আসল অনুভূতিটাকে নিখুঁতভাবে পেশাদারিত্বের মোড়কে লুকিয়ে ফেলেছিলেন।
"অফকোর্স, ডক্টর সেন। রুলস আর রুলস। আমরা কেউ প্রতিষ্ঠানের নিয়মের ঊর্ধ্বে তো নই", বিদিশা অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিয়েছিলেন। তারপর বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,
"তুমি শুধু ফাইনান্সিয়াল ডকুমেন্ট আর স্পনসরশিপের লেটারগুলো চেক করবে, বিক্রম। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বা ভলান্টিয়ারদের কাজের মধ্যে তোমার ইনভলভমেন্টের কোনো দরকার নেই।"
বিক্রম অত্যন্ত বিনীতভাবে, মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে একটা ইনোসেন্ট হাসি দিয়ে বলেছিল, "সিওর ম্যাম। আমি শুধু ব্যাকএন্ডের পেপারওয়ার্কগুলো দেখব। আপনার কোর টিমকে আমি একটুও ডিস্টার্ব করব না।"
(বর্তমান সময়)
করিডোরে দাঁড়িয়ে সেদিনের কথাটা মনে করে বিক্রম একটা কুটিল হাসি হাসল।
"হাসো, বিদিশা। রাহুল বোসের সাথে বসে যত খুশি হেসে নাও।", বিক্রম নিজের মনে বিড়বিড় করল। তার চোখের দৃষ্টি এখন শিকারি সাপের মতো।
"তুমি আজকাল একটু বেশিই উড়ছো। তোমার ডানা ঠিক কীভাবে ছাঁটতে হয়, সেটা আমার জানা আছে।"
বিক্রম ফাইলটা বগলে চেপে ধরে রাহুল বোস কেবিন থেকে বেরোনোর আগেই নিঃশব্দে করিডর থেকে সরে পড়ল।
রাত আটটা।
দক্ষিণ কলকাতার একটা বেশ অন্ধকার, ধোঁয়াটে এবং চোখের আড়ালে থাকা অফ-ক্যাম্পাস বার। জায়গাটার নাম 'দ্য ডেন'। এখানে সাধারণত কলেজের স্টুডেন্টরা আসে না। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা হাওয়ায় এখানে সবসময় একটা স্যাঁতসেঁতে ভাব, বাতাসে সিগার আর দামি হুইস্কির গন্ধ ভাসতে থাকে।
বারের একদম শেষ প্রান্তের একটা কর্নার টেবিলে, আবছা নিয়ন আলোর নিচে মুখোমুখি বসে আছে দুজন মানুষ। ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি ডক্টর সুব্রত সেন এবং স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারার বিক্রম মালহোত্রা।
টেবিলের ওপর রাখা দুটো ক্রিস্টালের গ্লাস। সুব্রত সেনের গ্লাসে ডার্ক রাম আর বিক্রমের গ্লাসে সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি।
সুব্রত সেন নিজের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বরফের কিউবগুলোকে আস্তে আস্তে ঘোরালেন। কাঁচের গায়ে বরফের ঠকঠক আওয়াজে বারের এই নিভৃত কোণায় একটা অদ্ভুত ছন্দ তৈরি হচ্ছিল।
"আমি তোমাকে আগেই ওয়ার্ন করেছিলাম, মালহোত্রা", সুব্রত সেন রামের গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিয়ে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা হাসলেন।
"নতুনদের রূপের দেমাগ বড় মারাত্মক জিনিস। আজ প্রিন্সিপাল স্যারের মদত পেয়েছে বলে মিস গাঙ্গুলি মাটিতে পা ফেলছেন না। তুমি ফেস্টে গাধার মতো খাটলে আর ম্যাডাম তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ওই রাহুল বোসের সাথে কেবিনে বসে কফি খাচ্ছেন।"
বিক্রমের হাতের মুঠোটা টেবিলের নিচে শক্ত হয়ে গেল। তার চোখের সামনে আজ দুপুরের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল।
সে নিজের হুইস্কির গ্লাসটা এক টানে অর্ধেক খালি করে দিল। তার ফাটা ঠোঁটের প্রায় শুকিয়ে আসা জায়গাটা অ্যালকোহলের ছোঁয়ায় হালকা জ্বালা করে উঠল বটে, কিন্তু সেই জ্বালা তার বুকের ভেতরের অপমানের আগুনের কাছে কিছুই নয়।
"উনি খুব বড় ভুল করেছেন, স্যার", বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে, অত্যন্ত শীতল গলায় হিসহিস করে বলল।
"অহংকার মানুষের চোখ অন্ধ করে দেয়। মিস গাঙ্গুলি ভাবছেন উনি আমাকে ইউজ করে ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন আর আমি চুপ করে বসে বসে সেটা দেখব?"
জবাবে সুব্রত সেন একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছাড়লেন। তার চোখের তারায় শিয়াল-পণ্ডিতের মতো ধূর্ত একটা চাউনি। বাইরে স্বাভাবিক আচরণ করলেও গত সপ্তাহের স্টাফরুমের দৃশ্যটা তার স্মৃতিতে এখনো দগদগে। বিদিশা গাঙ্গুলির সেদিনকার ওই অপমানটা তিনি জীবনেও ভুলবেন না। ওই অপমানজনক কথাগুলো এখনো তার কানের কাছে মাছির মতো ভনভন করছে।
'গত বছর আপনার ন্যাশনাল কনফারেন্সের পেপারটা অ্যাকাডেমিক কমিটিতে রিজেক্ট হয়েছিল বলে শুনেছি...' একটা ছোকরি, যার চাকরির এখনো দুমাস হয়নি, সে সবার সামনে ডক্টর সুব্রত সেনের অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে খোঁটা দিচ্ছে!
মেয়েছেলেটা তাকে শুধু অপমান করেই ক্ষান্ত হয়নি; তার মতো একজন সিনিয়র ফ্যাকাল্টিকে সোজা স্পনসরশিপ আর ফান্ডিংয়ের তদারকি করতে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাঁকে একটা দালালের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। এই এত বড় সিম্পোজিয়ামে তার কোন অ্যাকাডেমিক রোল নেই। ভাবা যায় !
ডক্টর সুব্রত সেন সহজে কোন কিছু ভোলেন না, বিশেষ করে অপমান।
কিন্তু, তিনি এটা জানেন, বিদিশাকে এখন সরাসরি আঘাত করাটা বোকামি। সে তুলনামূলক ভাবে শক্তিশালী পজিশনে আছে। এই অহংকারী মেয়েছেলেটার ডানা ছাঁটার জন্য আপাতত তার একজন পার্টনার দরকার। আর বিক্রমের চেয়ে ভালো পার্টনার এই মুহূর্তে আর কেউ হতে পারে না।
"রাগ দেখিয়ে কোনো লাভ নেই, বিক্রম। মাথা ঠান্ডা রাখো", সুব্রত সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বর এখন একজন ষড়যন্ত্রকারীর মতো নিচু তারে নেমে এসেছে।
"সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিং আর স্পনসরশিপের পুরো দায়িত্বটা আমার হাতে। আর তুমি হলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারার। তুমি বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাইছি?"
বিক্রমের চোখদুটো অন্ধকারে নেকড়ের মতো জ্বলে উঠল। যদিও সে আন্দাজ করতে পারছে তবু হুইস্কির গ্লাসটা নামিয়ে রেখে সুব্রতর চোখের দিকে তাকাল।
"ডিটেইলসে বলুন, স্যার।"
সুব্রত একটা কুটিল হাসি হাসলেন।
"সিম্পোজিয়াম অর্গানাইজ করার সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট পার্ট হলো বাইরে থেকে আসা গেস্ট লেকচারারদের অ্যাকোমোডেশন আর মেন অডিটোরিয়ামের টেকনিক্যাল সেটআপ। এই দুটোর জন্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বাজেট বরাদ্দ হয়েছে। মিস গাঙ্গুলি তো একদম ঘড়ি ধরে শিডিউল বানিয়েছেন। কিন্তু ভাবো তো, ইভেন্টের ঠিক আগের দিন যদি ভেন্ডাররা পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ার জন্য কাজ বন্ধ করে দেয়? যদি ফাইভ-স্টার হোটেল থেকে ডেলিগেটদের বুকিং ক্যানসেল হওয়ার নোটিশ আসে?"
বিক্রমের ঠোঁটের কোণে একটা শয়তানি হাসি ফুটে উঠতে শুরু করল।
"সেই পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্সের চেকে সই করার অথরিটি আপনার।"
"অ্যাবসোলিউটলি," সুব্রত সেন সিগারেটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে ফেললেন।
"আমি কাল ইভেন্টের ঠিক আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে একটা টেকনিক্যাল ফল্ট দেখিয়ে ফান্ডটা আটকে দেব। ভেন্ডাররা পেমেন্ট না পেয়ে যখন মালপত্র গুটিয়ে নিতে শুরু করবে, তখন গাঙ্গুলির ওই অহংকারী মুখোশটা নিজের থেকে চুরমার হয়ে যাবে। প্রিন্সিপালের কাছে ওর সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। ন্যাশনাল লেভেলের ইভেন্ট, একটা ছোট ভুল মানেই ক্যারিয়ার শেষ। এধরনের অহংকারী মেয়েছেলেদের মাথা নোয়ানোর একটাই রাস্তা, তাদের সবচেয়ে গর্বের জায়গাটাকে জনসমক্ষে গুঁড়িয়ে দেওয়া। আমি চাই ওর ওই দেমাগটা ভাঙতে।"
বিক্রম টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে এল।
"আর ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন উনি চারদিক থেকে অন্ধকার দেখবেন, তখন আমি এন্ট্রি নেব।"
বিক্রমের গলাটা উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করল।
"আমি স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ইমার্জেন্সি ফান্ড আর আমার পার্সোনাল কানেকশন ইউজ করে ভেন্ডারদের ম্যানেজ করে দেব। কিন্তু..."
"কিন্তু কী?" সুব্রত সেন ভুরু কোঁচকালেন।
"কিন্তু সেই হেল্পটা আমি ফ্রি-তে করব না, স্যার।"
কথা বলতে বলতে বিক্রমের গলার স্বরটা একদম খাদে নেমে গেল।
"উনি আমায় অপমান করেছেন। আমাকে সবার সামনে ইগনোর করেছেন। আমার স্পেস থেকে আমাকে বের করে দিয়েছেন। উনি নিজের গরজে, নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য ভিক্ষে চাইতে আমার কাছে আসলে আমি আমার প্রাইসটা উশুল করে নেব। এবার উনি বাধা দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকবেন না।"
সুব্রত সেন কয়েক সেকেন্ড বিক্রমের কামার্ত, সাইকোপ্যাথিক চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা অট্টহাসি হেসে উঠলেন।
"ব্রিলিয়ান্ট, মালহোত্রা! ব্রিলিয়ান্ট! তুমি তোমার চাহিদা মিটিয়ে নাও আর আমি ওর ওই অহংকারী মাথাটা আমার জুতোর তলায় নামিয়ে আনব। পারফেক্ট ডিল।"
দুজনের চোখেই একটা উল্লাস নেচে উঠল। ক্রিস্টালের গ্লাসদুটো আবার একসাথে 'ঠক' করে উঠল।
বিদিশা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলেন না যে তার সর্বনাশের ব্লু-প্রিন্ট এই অচেনা বারের আবছা অন্ধকারের মধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে গেল।
বিক্রম মদে একটা চুমুক দিল। বাইরে আত্মবিশ্বাসী আচরণ করলেও ভেতরে ভেতরে সে দোলাচলে ভুগছিল।
এতটা ঝুঁকি নেওয়া কী আদৌ ঠিক হচ্ছে ?
বিক্রম মালহোত্রা কাঁচা খেলোয়াড় নয়। সে যখন নিজে কোন ছক কষে, তখন সে সবার আগে একটা পালানোর পথ আগে থেকে তৈরি করে রাখে যাতে প্ল্যানটা ভণ্ডুল হলেও আঁচটা তার গায়ে এসে না লাগে।
কিন্তু এই খেলার চালটা সম্পূর্ণ ডক্টর সেনের হাতে। নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে হঠকারিতা করে যদি ড. সেন কোনো প্রমাণ রেখে যান? যদি জলঘোলা হয়ে বিষয়টা প্রিন্সিপালের হাত ধরে শেষমেশ পুলিশ অবধি গড়ায় ?
নিজের মনের তীব্র সংশয় আর অস্থিরতাটাকে নিখুঁতভাবে আড়াল করল বিক্রম। সুব্রত সেনের চোখের সামনে নিজের চেহারায় একটুও দুর্বলতা প্রকাশ পেতে দিল না সে। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, ক্রুর হাসির রেখাটা ফুটিয়ে রেখে, মনের ভাবটা গোপন রেখে বিক্রম মদের গ্লাসে আবার একটা চুমুক দিল।
To be continued...