মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৩৪

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6217562.html#pid6217562

🕰️ Posted on Sun May 24 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2363 words / 11 min read

Parent
এই চ্যাপ্টারটা গল্পের সবচেয়ে বড় চ্যাপ্টার। আগেরটা যেমন অ্যাভারেজের চেয়ে ছোট ছিল, এটা তেমনই অ্যাভারেজের চেয়ে অনেক বড়। তবে এই চ্যাপ্টারটা বড় করব বলে করিনি। এটা পুরোপুরি গল্পের উপর নির্ভর করে। আপনারা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এত রেপু দিয়েছেন এতে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। Colds নামে একজন দশটা রেপু দিয়েছেন। এনার একটা অনুরোধ মাথায় ছিল। এই চ্যাপ্টারে সুযোগ থাকায় সেটা পূরণ করার চেষ্টা করলাম। এতগুলো পয়েন্ট দেবার পরে এটা না রাখলে সত্যিই খারাপ লাগত। অধ্যায় বাইশ সকাল দশটা, বিদিশার কেবিন জানলার কাঁচ গলে সকালের নরম রোদ ডেস্কের একটা কোনায় এসে পড়েছে, সেই আলোয় বাতাসে ধুলোর কণাগুলো তিরতির করে কাঁপতে দেখা যাচ্ছে।  ডেস্কের ওপর ডেলিগেটদের লিস্ট, প্রেজেন্টেশন শিডিউল থরে থরে সাজানো। ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম শুরু হতে আর মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা বাকি। ডেলিগেটদের ফ্লাইট কনফার্মড, আইআইটি আর অন্যান্য জায়গা থেকে আসা প্রফেসরদের অ্যাকোমোডেশন রেডি, কেটারিংয়ের মেনুও ফাইনাল। কাল সকাল থেকে শুধু মেইন অডিটোরিয়ামের টেকনিক্যাল সেটআপ আর ফ্লোরাল ডেকোরেশনের কাজটুকু শুরু হওয়া বাকি। বিদিশা এই মুহূর্তে নিজের ডেস্কে ল্যাপটপের সামনে বসে কাজ করছেন, তার পরনে একটা নিরেট কালো রঙের লিনেন শাড়ি, চোখে অ্যান্টি-গ্লেয়ার চশমা। টানা খাটুনির ফলে তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হলেও, মেরুদণ্ড একদম সোজা, চোখের দৃষ্টি ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্থির। বাইরে থেকে তার চোখমুখ দৃঢ়, ফোকাসড মনে হলেও অভিজ্ঞ চোখে চাপা টেনশন ঠিকই ধরা পড়বে। তিনি এই মুহূর্তে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ডেটা আর ক্যালকুলেশনের জগতে বন্দি করে ফেলেছেন। করিডোর থেকে ভেসে আসা স্টুডেন্টদের কোলাহল পর্যন্ত তার কানে পৌঁছোচ্ছে না। ল্যাপটপে কালকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের স্পিকারদের টাইম-স্লটগুলো শেষবারের মতো দেখে নিতে নিতে বিদিশা নিজের মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করছিলেন। সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজানো, কোনো ত্রুটি নেই। শেষবারের মতো মিলিয়ে নিয়ে তিনি একবার চশমাটা খুলে চোখ বুজলেন।  আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব এত বড় কাজটা এই অল্প কদিনে সম্ভবের দোরগোড়ায় নিয়ে আসাটাই একটা বিশাল কৃতিত্বের বিষয়। এমন দায়িত্ব হাতে নেওয়া দূরে থাক, চিন্তা করতেও যেকোন মানুষ ভয় পাবে।  সেখানে ডক্টর বাগচীকে মুখের উপর জবাব দেবার তীব্র ইচ্ছা থেকে বিদিশা সব জেনেশুনে এই মারাত্মক ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন।   এখন এই সিম্পোজিয়ামটা যাতে সফল হয় সেটা নিশ্চিত করা সবার সামনে তার যোগ্যতা আর আত্মসম্মান দুটোরই অগ্নিপরীক্ষা।  দীর্ঘ সময় ধরে বিদিশা অরুণের ছায়ায় বা বাবার বিপুল প্রতিপত্তির পরিচয়ে পরিচিত হতে না চাওয়ার যে গোপন ইচ্ছা মনে পোষণ করেছেন সেইটা বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে। পারিবারিক প্রভাবের জোরে নয়, কারোর সাথে কোনো আপস করে নয়, সম্পূর্ণ একা, নিজের যোগ্যতায়, নিজের মেধা আর হাড়ভাঙা খাটুনির জোরে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে চলেছেন।  একদিন বিদিশা যা করতে চেয়েছিলেন আজ তিনি সেটার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন। ঠিক এমন সময় কেবিনের দরজায় একটা প্রবল জোরে ধাক্কা পড়ল। যেন উন্মত্ত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে দরজাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইছে কেউ। নিস্তব্ধ ঘরে কর্কশ শব্দটা আক্ষরিক অর্থেই একটা বোমার মতো ফাটল। সেই বিকট আওয়াজে নিজের চিন্তায় এতক্ষণ মগ্ন থাকা বিদিশা চমকে উঠলেন।  তার অনুমতির অপেক্ষা না করে দরজাটা প্রায় আছড়ে খুলে ফেলে ভেতরে ঢুকল সাহিল। ওকে আজ চেনা যাচ্ছে না।  সাহিল ভীষণভাবে হাঁপাচ্ছে। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে আতঙ্ক, বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা কপাল থেকে গড়িয়ে চশমার কাঁচের ওপর জমেছে। হাতে ধরা নীলরঙের ফাইলটা থরথর করে কাঁপছে। দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র কোন ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখে ছুটে এসেছে।  যে সাহিল সবসময় মেপে মেপে পা ফেলে, যার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সবসময় একটা পরিমিতিবোধ থাকে, সেই পরিচিত রূপের সাথে আজকের চেহারার আকাশ-পাতাল পার্থক্য।  "ম্যাম!" সাহিলের গলাটা আতঙ্কে প্রায় বুজে এসেছে, স্বর বেরোতে চাইছে না। কিছু তো একটা ঘটেছে। বিদিশা মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিলেন। ইতালির সেই রাতের অভিজ্ঞতা থেকে কীভাবে চরম বিপদের মুখে নিজের স্নায়ুকে বরফশীতল রাখতে হয় সেটা তিনি শিখেছেন। এই অবস্থায় তিনি রিঅ্যাক্ট করলে সাহিল আরো ঘাবড়ে যাবে। তাকে শান্ত থাকতে হবে। বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সামান্য নামিয়ে দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা চশমাটা চোখে দিলেন। তারপর অত্যন্ত ধীরস্থির, শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে সাহিল? নক না করে এভাবে কেউ ভেতরে ঢোকে? তোমার ডিসিপ্লিন কোথায় গেল?" তার কন্ঠস্বর সবসময়কার মতোই মাপা আর নরম হলেও এভাবে দুম করে তার ঘরে ঢুকে পড়ার জন্য মনে মনে সাহিলের প্রতি তিনি যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু, সাহিল বিদিশার তিরষ্কার শোনার মতো অবস্থায় ছিল না। সে টলমল পায়ে বিদিশার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল। "আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, ম্যাম, রিয়েলি সরি! কিন্তু... কিন্তু একটা ডিজাস্টার হয়ে গেছে!অডিটোরিয়ামের স্টেজ ডেকোরেশন আর লাইটিংয়ের ভেন্ডাররা কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে! আমি ওদের আটকাতে গেছিলাম। কিন্তু, ওরা বলছে, এখনই পেমেন্ট ক্লিয়ার না হলে ওরা এক ইঞ্চি তার রাখবে না, সব খুলে নিয়ে চলে যাবে!" বিদিশার চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য সাহিলের উপর স্থির হয়ে রইল। তারপর তিনি আবার চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে দিলেন। মনের ভাবটা সম্পূর্ণ গোপন রেখে ভ্রু কুঁচকে সাহিলের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, "এখনই পেমেন্ট মানে ? ভেন্ডারদের সাথে আমাদের কন্ট্রাক্টে বলা-ই ছিল যে ইভেন্টের আগে ৫০% অ্যাডভান্স দেওয়া হবে। গতকালই তো চেক ইস্যু হওয়ার কথা ছিল। এতক্ষণে তো ওদের অ্যাডভান্স ক্লিয়ার হয়ে যাওয়ার কথা। এখন এই নাটক কেন?" "হয়নি ম্যাম!" সাহিল প্রায় কেঁদে ফেলার মতো অবস্থায় বলল।  "আমি অ্যাকাউন্টস সেকশনে দৌড়ে গিয়েছিলাম। সেখানে হেড ক্লার্ক জানালেন, ডক্টর সুব্রত সেনের অফিস থেকে পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্স ফাইলে সই হয়নি। স্যার ফাইলটা আটকে দিয়েছেন।" বিদিশার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। তার মনে হতে লাগলো ঘরের এসির বাতাসটা হঠাৎ করে ভারী হয়ে উঠছে। "সই হয়নি? কেন?" বিদিশার গলাটা এবার নিজের কানেই অন্যরকম শোনাল। "ডক্টর সেন ফাইলে একটা 'টেকনিক্যাল এরর' খুঁজৈ পেয়েছেন।" সাহিল মাথা নিচু করে বলল।  "উনি বলেছেন, জিএসটি ক্যালকুলেশনে নাকি বড় ভুল আছে আর লোকাল কর্পোরেট ফান্ডিংয়ের একটা ক্লজ নাকি ভায়োলেট করা হয়েছে। তাই উনি সই করেননি আর... আর উনি আজকে অফিশিয়াল ট্যুরে কলকাতার বাইরে গেছেন। ফিরতে ফিরতে পরশুদিন হয়ে যাবে।" এসি-র হিমশীতল হাওয়ার মধ্যেও বিদিশার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল।  "ফাইলটা কোথায়? আমাকে দাও তো দেখি", বিদিশা তার গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন, তার শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। তাঁর ফর্সা মুখটা এখন পাথরের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। সাহিল কাঁপা কাঁপা হাতে ফাইলটা বিদিশার দিকে এগিয়ে দিল। বিদিশা দ্রুত ফাইলটা খুলে চোখের সামনে ধরলেন। হৃদপিন্ডের গতি অস্বাভাবিক বেড়ে গেলেও তার মাথা এখনও কাজ করা বন্ধ করে দেয়নি। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। বিলের অ্যামাউন্ট, ট্যাক্স পার্সেন্টেজ আর ফাইনাল টোটালের ওপর দিয়ে তার চোখ স্ক্যান করে গেল। নাহ, ফাইলে তো কোন ভুল নেই। ডক্টর সুব্রত সেনের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কিন্তু, তিনি জেনেশুনে এমন কাজ কেন করবেন ? তাহলে কী ?.... এলোমেলো চিন্তা করতে করতে বিদিশার চোখের সামনে হঠাৎই এক পলকে স্টাফরুমের সেই দিনটার দৃশ্য ভেসে উঠল - ড. সেনের সেই অপমান আর তার জবাবে তার দেওয়া সেই চাবুকের মতো উত্তর, "গত বছর আপনার ন্যাশনাল কনফারেন্সের পেপারটা অ্যাকাডেমিক কমিটিতে রিজেক্ট হয়েছিল বলে শুনেছি..." মুহূর্তের মধ্যে, বিদ্যুতের ঝলকের মতো গোটা বিষয়টা বিদিশার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।  এর সাথে নিয়মের কড়াকড়ির কোন সম্পর্কিত নেই। গোটা বিষয়টা ঠাণ্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে 'স্যাবোটাজ' করা হয়েছে। বিদিশা ফাইলটা আস্তে করে ডেস্কের ওপর নামিয়ে রাখলেন।  তার ভেতরটা এখন সুব্রত সেনের প্রতি তীব্র আক্রোশে ফুঁসছে। ড.সেন কীভাবে সব বুঝে-শুনে এমন জঘন্য কাজ করতে পারলেন ? "ম্যাম, ভেন্ডাররা আধ ঘণ্টা সময় দিয়েছে।" সাহিল আতঙ্কিতভাবে গলায় বলল।  সাহিলের কথায় বিদিশার সম্বিত ফিরে এল। "এর মধ্যে অ্যাডভান্সের চেক না পেলে ওরা মেইন স্টেজের ব্লু-প্রিন্ট আর লাইটিং সেটআপ খুলে নিয়ে চলে যাবে। ওরা জাস্ট সব প্যাক করতে শুরু করেছে! গেস্ট হাউসের বুকিংও হোল্ডে চলে গেছে।হোটেল থেকে আলটিমেটাম এসেছে, এক ঘণ্টার মধ্যে পেমেন্ট না পৌঁছলে আমাদের সব বুকিং ক্যানসেল হয়ে যাবে! আমাদের হাতে কোনো ব্যাকআপ নেই। পুরো ইভেন্টটা ক্যানসেল হয়ে যাবে ম্যাম! প্রিন্সিপাল স্যার শুনলে..." সাহিলের গলাটা এবার কাঁদো কাঁদো শোনালো। "আমি সুব্রতবাবুকে কল করছি", বিদিশা নিজের ফোনটা তুলে নিলেন। তাঁর চোখের মণি দুটো অপমানে আর রাগে জ্বল জ্বল করছে। তিনি সাহিলের সামনেই ডক্টর সুব্রত সেনের নম্বর ডায়াল করে স্পিকার অন করলেন। দু-তিনবার রিং হওয়ার পরই ফোনটা রিসিভ হলো। "হ্যালো? মিস গাঙ্গুলি? এই অসময়ে? কোনো বিশেষ দরকার আছে কি?" ওপাশ থেকে সুব্রত সেনের গলাটা ভেসে এল। গলার স্বরটা ভীষণ নিরীহ, যেন এই সময় বিদিশার ফোন পেয়ে তিনি আকাশ থেকে পড়েছেন। "ডক্টর সেন", বিদিশা তার গলাটা যথাসম্ভব সংযত রাখতে চেষ্টা করলেন। "আমি এইমাত্র জানতে পারলাম আপনি নাকি 'টেকনিক্যাল এরর'-এর অজুহাতে সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিং ফাইলটা আটকে দিয়েছেন ?" ফোনের ওপার থেকে একটা নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।  "আহ... ইয়েস, মিস গাঙ্গুলি। ভেরি আনফরচুনেট। আমি নিজেও ভীষণ বিব্রত। বাজেটের জিএসটি ক্যালকুলেশনে একটা বড়সড় ব্লান্ডার চোখে পড়ল। আর আপনি তো জানেন, কর্পোরেট ফান্ডের ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট কতটা স্ট্রিক্ট। আমি তো রুলবুকের বাইরে গিয়ে কোন ফাইলে সই করতে পারি না। বুঝতেই পারছেন, আমার তো হাত বাঁধা।" "হিসেবে কোনো ভুল নেই, ডক্টর সেন।", বিদিশা এবার অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বললেন।  "আপনি চাইলে আমি এখনই ফাইলটা নিয়ে আপনার কেবিনে আসতে পারি। আমরা মুখোমুখি বসে এররটা দেখে নিতে পারি।" একটা শুকনো হাসির শব্দ স্পিকারে খড়খড় করে উঠল। "মিস গাঙ্গুলি, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন, অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট অলরেডি ফাইলটা ম্যানেজমেন্টের কাছে রিভিউর জন্য পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন তো আমার আর কিছু করার নেই। রিভিউ হয়ে ওটা ফিরে আসতে অন্তত তিন-চার দিন তো লাগবেই। তাছাড়া, আমি এই মুহূর্তে অফিসিয়াল কাজে আউট অফ স্টেশন। আপনি বরং প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলুন। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, আমি ইচ্ছা থাকলেও আপনাকে হেল্প করতে পারছি না।" টক করে লাইনটা কেটে গেল। বিদিশা ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন। কেবিনের ভেতর একটা নিশ্ছিদ্র নীরবতা নেমে এল। বিদিশার মুখটা অপমানে লাল হয়ে উঠেছে।  অন্যদিকে, সাহিলের মুখটা ভয়ে আর আতঙ্কে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। "ম্যাম... চার দিন ! পরশুদিন আমাদের ইভেন্ট! গেস্টরা আসা শুরু করবে, আমাদের স্টেজ নেই, লাইট নেই, হোটেল বুকিং ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছে! ভেন্ডারদের কী জবাব দেব?" সাহিলের গলাটা আর্তনাদের মতো শোনালো। বিদিশার বাইরের শান্ত খোলসটার নীচে ততক্ষণে একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ফুটতে শুরু করেছে। ইতালির সেই অভিশপ্ত রাতে বনগানি নামক রাক্ষসটার মুখোমুখি হওয়ার পর, আজ এই প্রথমবার তাঁর ধমনীর রক্ত এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বাস্টার্ড!  নিজের ইগো আর প্রতিহিংসার জন্য একটা ন্যাশনাল লেভেলের ইভেন্টকে কেউ এভাবে স্যাবোটাজ করতে পারে, সেটা তাঁর কল্পনার বাইরে ছিল। কেবিনের এসির শব্দটা ছাড়া আর কোথাও কোন শব্দ নেই। বিদিশার এই চুপচাপ ভাব দেখে সাহিল আরো ঘাবড়ে গেল। "ম্যাম... প্রিন্সিপাল স্যারকে কি ইনফর্ম করব?" সাহিলের কাঁপা কাঁপা গলাটা বিদিশার চিন্তার জালটাকে আবার এক ঝটকায় ছিঁড়ে দিল। বিদিশা ধীরে ধীরে চোখ তুলে সাহিলের দিকে তাকালেন। সাহিল অবাক হয়ে দেখল, বিদিশার চোখে সেই কয়েক সেকেন্ড আগের শূন্য ভাবটা নেই; সেখানে এখন ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তা। বিপদের মুখে বিদিশা সবসময়ই কাঠিন্য খুঁজে পান। ইতালিতে নিজের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও অরুণ আর অয়নের জীবনের বিনিময়ে বনগানির সাথে ডিল করতে তিনি ভয় পাননি।  "প্রিন্সিপাল স্যারকে ইনফর্ম করার কোনো প্রয়োজন নেই, সাহিল", বিদিশা অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন। তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের ডেস্কের ডান দিকের ড্রয়ারটা টেনে খুললেন। ড্রয়ারের নীচ থেকে বার করে আনলেন চামড়ার পার্সটা। পার্সের ভেতর থেকে বের করে আনলেন একটি অভিজাত লেদার-বাউন্ড চেক-বুক। সাহিল সেদিকে রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল।  বিদিশা একটি ফাউন্টেন পেন বের করে চেক-বইয়ের পাতাটা খুললেন। অত্যন্ত ধীরেসুস্থে নিখুঁত, সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখলেন— 'One Lakh Fifty Thousands Only'। তারপর নিচে নিজের সিগনেচারটা করে চেকটা ছিঁড়ে সাহিলের দিকে এগিয়ে দিলেন। সাহিল চেকটার দিকে তাকিয়ে আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়ে জমে গেল। একটা কলেজের ফ্যাকাল্টি, নিজের পকেট থেকে একটা ইভেন্টের জন্য এক কথায় দেড় লাখ টাকার চেক দিচ্ছে? কোন দ্বিধা, কোন চিন্তাভাবনা ছাড়া ? সুব্রত সেন আর বিক্রমের পরিকল্পনা নিখুঁত হলেও তাদের বিদিশার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। তারা বিদিশার পারিবারিক আভিজাত্যের ইতিহাসের কথা জানত না।  বিদিশার বাবার রেখে যাওয়া অগাধ সম্পত্তির কাছে আড়াই লাখ টাকা সমুদ্রের এক ফোঁটা জলের মতো। তার কানাকড়ি বিদিশা কখনো জাহির করেননি। এখানে তিনি এসেছেন নিজের পরিচিতি গড়তে, টাকা দিয়ে প্রতিপত্তি কিনতে নয়। যিনি চাইলে এক কথায় কলেজের ডিমড ইউনিভার্সিটি ফাণ্ডের জন্য কলেজের ফান্ডে পঞ্চাশ লাখ টাকা দেবার ক্ষমতা রাখেন তার কাছে আড়াই লাখ টাকা খুব ছোট অ্যামাউন্ট।  "ম-ম্যাম... এটা...মানে...এভাবে...আপনার পার্সোনাল মানি" সাহিল তোতলাচ্ছে, তার গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। "তুমি এখনই অ্যাকাউন্টস সেকশন বা ম্যানেজমেন্টের কারো সাথে কথা বলবে না, সাহিল", বিদিশা চেকটা সাহিলের হাতে ধরিয়ে দিলেন, তার চোখের দৃষ্টি ধারালো, গলা স্টেডি।  "তুমি সোজা ভেন্ডারদের কাছে যাবে। ওদের হাতে এই চেকটা দিয়ে বল কাজ যেন এক মিনিটের জন্যও না থামে। তারপর হোটেল আর গেস্ট হাউসে কল করো; বলবে, পনেরো মিনিটের মধ্যে ওদের অ্যাকাউন্টে ডিরেক্ট ফান্ড ট্রান্সফার হয়ে যাবে। বুকিং কনফার্ম করে আমাকে আধ ঘণ্টার মধ্যে আপডেট দাও। আর হ্যাঁ, এই পেমেন্ট ইস্যু নিয়ে ক্যাম্পাসে যেন কোনো প্যানিক না ছড়ায়। সিম্পোজিয়াম পরশুদিন যেমন শিডিউল করা আছে, ঠিক তেমনই হবে। নাউ গো।" "ই-ইয়েস ম্যাম... বাট..." সাহিল তখনো ঘোরের মধ্যে আছে। "গো, সাহিল," বিদিশার একটা কড়া ধমকে সাহিল আর দাঁড়াল না। সে চেকটা হাতে নিয়ে প্রায় দৌড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে বিদিশার মুখোশটা খসে পড়ল। তিনি হাতের মুঠিটা এত জোরে টেবিলের ওপর চেপে ধরলেন যে তাঁর নখগুলো টেবিলের কাঁচের ওপর সাদা হয়ে এল। সুব্রত সেনকে অভিসম্পাত করতে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল নন্দিতা দাশগুপ্তের সেই সতর্কবাণীর কথা - 'যারা এদের কথা শোনে না, এরা তাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ এনে, তাদের কেরিয়ার নষ্ট করে দেয়। গত বছর ফিজিক্সের একজন অত্যন্ত কড়া স্যারকে এরা তাড়াতে বাধ্য করেছিল...' সঙ্গে সঙ্গে তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর প্রখর মস্তিষ্ক সমস্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে একটা সুতোয় গেঁথে ফেলল।  বিদিশার মনে হল, তিনি এতক্ষণে পুরো খেলাটা ধরে ফেলেছেন। সুব্রত সেন এত বড় একটা ডিসিশন একা নিতে পারে না।  সুব্রত সেন একটা সাধারণ, মেরুদণ্ডহীন লোক। তার এত সাহস কোত্থেকে আসবে যে সে কলেজের এত বড় একটা ন্যাশনাল ইভেন্টকে একার হাতে ধ্বংস করবে? প্রিন্সিপাল সান্যাল তো তাকে ছেড়ে কথা বলবেন না। এই পুরো চক্রান্তের আসল মাস্টারমাইন্ড হলেন ডক্টর বাগচী। আসল খেলাটা উনিই খেলেছেন। নিশ্চয়ই ওর পেছনে ম্যানেজমেন্ট আর ডোনারদের সাপোর্ট আছে। ওইসব প্রভাবশালী পরিবারের ছেলেগুলোকে ফেল করানোর শাস্তি হিসেবেই তাকে আজ এই ফাঁদে ফেলা হয়েছে।  তার মানে সিনিয়র প্রফেসররা, ম্যানেজমেন্ট সবাই মিলে তাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।  ইতালির সেই অভিশপ্ত রাতের কথা মনে পড়ল তাঁর। যখন বনগানি নামক সেই পিশাচটা তাঁর সম্ভ্রমের দিকে হাত বাড়িয়েছিল, বিদিশা ভয় পাননি। সে তাকে শারীরিকভাবে ছিঁড়ে খেতে চেয়েছিল আর আজ এই সিন্ডিকেট তাকে সামাজিকভাবে আর পেশাগতভাবে শেষ করে দিতে চাইছে।  বিদিশার মনে হলো সেদিনের পর আজ আবার কেউ তার অস্তিত্বের ওপর, তার যোগ্যতার ওপর সজোরে লাথি মেরেছে। তার চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল।  ইতালির সেই রাতের পর বিদিশা শপথ করেছিলেন, তিনি আর কোনোদিন কারোর সামনে মাথা নোয়াবেন না। সেজন্যই ডক্টর বাগচী যখন তাকে ওই ডোনারদের ছেলেদের পাস করিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন তখন বিদিশা তাকে মুখের ওপর না করে এসেছিলেন।  সেজন্যই এই চিত্রনাট্য তৈরি করা হয়েছে। ওই ফিজিক্স প্রফেসরকে তাড়ানো হয়েছিল স্টুডেন্ট হ্যারাসমেন্টের অপবাদ দিয়ে আর ফান্ডিং ক্রাইসিস তৈরি করে তাকে তাড়ানো হবে অযোগ্যতার তকমা দিয়ে। সবার সামনে, ন্যাশনাল ডেলিগেটদের সামনে বিদিশা গাঙ্গুলিকে একটা অপদার্থ, অযোগ্য কো-অর্ডিনেটর প্রমাণ করতে পারলেই কেল্লা ফতে। তারপর এই কলঙ্কের দায়ভার ঘাড়ে নিয়ে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করানো হবে। ভাবতে ভাবতেই বিদিশার চোখের সামনে ভেসে উঠল ডক্টর বাগচীর মুখটা।  'মিস গাঙ্গুলি, আপনি কিন্তু আপনার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন!'  সেদিন তার শান্তভাবে দেওয়া শাসানি আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।  বিদিশার সমস্ত রাগ, সমস্ত ঘৃণা পূঞ্জীভূত হল ডক্টর বাগচী আর অচেনা কলেজ ম্যানেজমেন্টের ওপর।  "বেশ, আপনার কথাই রইল তবে", বিদিশা নিজের মনে বিড়বিড় করলেন।  বিদিশা একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার, তার চাকরি এখনো পার্মামেন্ট হয়নি; সেখানে ডক্টর বাগচী হলেন HOD যার পেছনে আবার ক্ষমতাশালীদের সমর্থন আছে। অসম একটা লড়াই। কিন্তু, যাই হয়ে যাক না কেন, এসব মাফিয়ার সামনে তিনি কিছুতেই মাথা নত করবেন না। আগে, সিম্পোজিয়ামটা মিটে যাক। তারপর, যেভাবে হোক কলেজের এই নোংরা রাজনীতির বিষদাঁত তিনি নিজের হাতে উপড়ে ফেলবেন। To be continued...
Parent