মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৩৬
"ভিকি... উফফ, আমি পড়ে যাব তো..." তানিয়া ভারসাম্য সামলাতে না পেরে বিক্রমের চওড়া কাঁধ দুটো দু-হাতে খপ করে ধরে ফেলল। ও পুরো শূন্যে ঝুলে, ওর শরীরের সমস্ত ভার এখন বিক্রমের কোমরের ওপর।
বিক্রম কোনো উত্তর দিল না। সে তানিয়ার নিটোল নিতম্ব দুটো দু-হাতে শক্ত করে ধরে, মেজেতে দাঁড়িয়ে এক তীব্র, ঊর্ধ্বমুখী ধাক্কায় নিজের পুরো বাড়াটা আবার ওর যোনির গভীরে সেঁধিয়ে দিল।
"আহহহহহ!"
তানিয়ার মাথাটা পেছনের দিকে হেলে গেল। এই পজিশনে বিক্রমের লিঙ্গটা সরাসরি ওর জরায়ুর মুখে গিয়ে আঘাত করল।
কিন্তু সে জানত না যে বিক্রমের চোখের সামনে আরেকজনের শরীর ভাসছিল। তাহলে সে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করত বলা কঠিন।
বিক্রম দেখছিল, তানিয়ার জায়গাতে তার কোমরে পা জড়িয়ে শূন্যে ঝুলে আছেন বিদিশা গাঙ্গুলি।
বিদিশার পা দুটো বিক্রমের কোমরকে জড়িয়ে রেখেছে। তার যুবতী নিটোল শরীরের পুরো ভার এখন বিক্রমের ওপর।
বিক্রমের প্রতিটা ঊর্ধ্বমুখী ঠাপের সাথে বিদিশার ভারী স্তনজোড়া ব্লাউজের ওপর উন্মুক্ত হয়ে ভয়ঙ্করভাবে দুলছে। তাঁর নিখুঁত, সুন্দর মুখটা এখন তীব্র সুখে লাল হয়ে উঠেছে।
বিক্রম একটা ক্রূর হাসি হেসে নিচ থেকে ওপরের দিকে একের পর এক নিরেট, ভারী ঠাপ মারতে লাগল।
তার প্রতিটা ধাক্কায় মাংসের সাথে মাংসের 'চটাচট' শব্দ চারদিকের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। বিক্রমের কল্পনায় বিদিশা তখন অসহায়ের মতো তার চুলগুলো খামচে ধরছেন, তাঁর সেই কর্পোরেট দেমাগ ধুলোয় মিশে গেছে।
তিনি গোঙাচ্ছেন, 'উহ্... বিক্রম... আর নিতে পারছি না... ফেটে যাবে... উফফ্...'
বাস্তবে তানিয়া তখন বিক্রমের হিংস্রতায় প্রায় সংজ্ঞা হারানোর মুখে। ওর যোনির চারপাশটা ঘর্ষণে লাল হয়ে উঠেছে, অনবরত রস ঝরছে। বিক্রমের পিঠে ওর নখের আঁচড়গুলো আরও গভীর হচ্ছিল।
বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে নিজের কোমরের গতি আরও বাড়িয়ে তুলল।
তানিয়া তখন বিক্রমের কাঁধে মুখ গুঁজে গোঙাচ্ছে, ওর চোখের জল বিক্রমের বুকে লেপ্টে যাচ্ছে।
ঠিক এই চরম কামোত্তেজনার মুহূর্তে, যখন খাটের আওয়াজ আর দুজনের শ্বাসের শব্দে ঘরটা কাঁপছে, তখন ঘরের ভারী মেহগনি কাঠের দরজার মাঝখানে যে পিতলের
কী-হোল আছে, তার ওপাশে একটা ছায়া এসে দাঁড়াল। স্যুটের ভেতরের মৃদু নীল আলো দরজার ফুটো দিয়ে বাইরে সামান্য ঠিকরে পড়ছিল, সেই আলোর পথটা হঠাৎ করেই একটা অন্ধকার অবয়ব আটকে দিল।
দরজার ফুটোয় একটা চোখ এসে স্থির হল। ওপাশে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে অত্যন্ত সাবধানে, নিঃশব্দে ভেতরের এই আদিম, হিংস্র লীলাখেলা দেখছিল। বিক্রম আর তানিয়া দুজনেই এখন যে অবস্থায় রয়েছে তাতে এসব লক্ষ্য করার মতো হুঁশ তাদের ছিল না।
সন্ধ্যা ছটা। মধ্য কলকাতা।
ট্যাক্সি থেকে নেমে অয়ন যখন ফুটপাতে দাঁড়াল, মধ্য কলকাতার ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। চারপাশের পরিবেশটা বালিগঞ্জের সেই শান্ত পাড়াটার চেয়ে একদম আলাদা।
এলাকাটা একদা পুরনো ব্রিটিশ কলকাতার আভিজাত্য আর আধুনিক বাণিজ্যিক চাকচিক্যের এক অদ্ভুত মিশেল। রাস্তার দু-পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের বিশাল লাল ইটের ইমারত আর আধুনিক বহুতল। একসময় বেশিরভাগ প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক অফিস ছিল এখন রেস্টুরেন্ট, শোরুম, মল পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার আলোয় নিয়ন সাইনবোর্ড ঝলমল করছে। রাস্তা থেকে ভেসে আসা ট্রাফিকের একটানা শব্দ, হর্নের শব্দ, ফুটপাথের ধারের খাবারের দোকান থেকে ভেসে আসা খাবারের গন্ধ, ফুটপাথ দিয়ে অজস্র মানুষের আসা-যাওয়া সব মিলেমিশে একটা অস্থির, চঞ্চল পরিবেশ তৈরি করেছে।
অয়ন যে বহুতলটার সামনে এসে দাঁড়াল, সেটার বাইরের দিকটা সম্পূর্ণ কালো কাঁচ আর অ্যালুমিনিয়ামের প্যানেল দিয়ে ঢাকা। বাইরে একটা স্টাইলিশ ডিজিটাল বোর্ডে রুপোলি অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে— 'দ্য আয়রন ফিস্ট: মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি বক্সিং অ্যান্ড এমএমএ ক্লাব'।
কাঁচের স্লাইডিং দরজাটা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই অয়ন এক লহমায় বাইরের জগতের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। পুরো ফ্লোরটা সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডায় হিমশীতল, বাতাসে ভাসছে লিনিমেন্ট তেল আর লেদারের কড়া গন্ধ।
অয়নের একটু ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করল। ওর পরনে একটা কালো ফুল-স্লিভ টি-শার্ট আর ডার্ক গ্রে ট্র্যাকপ্যান্ট। কাঁধে স্পোর্টস ব্যাগ।
ও চারদিকে চেয়ে দেখল। ক্লাবের ভেতরকার নকশা অত্যন্ত আধুনিক এবং সুপরিকল্পিত।
ছাদটা অনেক উঁচু, সেখান থেকে ঝুলে আছে বড় বড় এক্সপোজড ডাক্ট আর কালো রঙের ট্রাস। দেয়ালগুলো ইঁটের টেক্সচার দেওয়া হলেও তাতে উজ্জ্বল সাদা এলইডি স্ট্রিপ লাইটগুলো এক ধরনের অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে। মেঝের অনেকটা অংশ জুড়ে বিছানো রয়েছে উন্নতমানের চারকোল গ্রে রঙের ইমপ্যাক্ট-রেজিস্ট্যান্ট ম্যাট।
হলঘরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের একটি বড় বক্সিং রিং, যার চারপাশের নীল আর লাল দড়িগুলো ফ্লাডলাইটের তলায় চকচক করছে। রিংয়ের একপাশে সার সার সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ওজনের 'হেভি ব্যাগ' এবং 'স্পিড বল', যা প্র্যাকটিসের সময় একঘেয়ে কিন্তু ছন্দবদ্ধ 'ধাপ-ধাপ' শব্দে দুলে উঠছে।
একদিকের কাঁচের দেয়ালের ওপাশে দেখা যাচ্ছে একটি অত্যাধুনিক ফিটনেস জোন, যেখানে রয়েছে লেটেস্ট রোয়িং মেশিন, এয়ার বাইক আর কেটলবেলের বিশাল সংগ্রহ। সেখানে কোনো সাধারণ জিমের মতো বলিউডের গান বাজছে না, বরং স্পিকার থেকে ভেসে আসছে এক ধরনের লো-বেস ইনস্ট্রুমেন্টাল বিট, যা ফাইটারদের মনোযোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
অয়ন লক্ষ্য করল, এখানে যারা প্র্যাকটিস করছে, তাদের প্রত্যেকের শরীরে হাই-পারফরম্যান্স কম্প্রেশন গিয়ার এবং হাতে ব্র্যান্ডেড বক্সিং র্যাপ। এদের কারো চোখেমুখে আড্ডা মারার ভঙ্গি নেই; প্রত্যেকেই যেন এক একজন একাগ্র সাধক, যারা এখানে নিজের শরীরকে অস্ত্র হিসেবে গড়ে তুলতে এসেছে। এইধরনের পেশাদারি গাম্ভীর্য অয়নকে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দিল। সে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল যে এটা কোনো শখ মেটানোর জায়গা নয়। এই পেশাদারিত্ব আর শৃঙ্খলার মোড়কে ঢাকা হিংস্রতা দেখে ওর মতো ছেলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
অয়নের মনে মনে অন্যরকম একটা পরিবেশ আশা করে এসেছিল, কিন্তু এখানে এসে ওর মনে হচ্ছিল এখানে লড়াইটা শিল্পের পর্যায়ে পড়ে।
ঠিক তখনই, রিংয়ের ঠিক পাশে রাখা বিশাল এক মেটাল র্যাকের আড়াল থেকে রৌণক বেরিয়ে এল।
"ওয়েলকাম টু দ্য রিয়েল ওয়ার্ল্ড, ব্রাদার", রৌণকের মুখে একটা চওড়া হাসি। ওর হাতে হ্যান্ড-র্যাপ জড়ানো।
"আমি জানতাম তুমি আসবে।"
"আমি এখানে মারপিট শিখতে আসিনি। আমি মারতে এসেছি", অয়ন অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল।
রৌণক হাসল।
"জানি। কিন্তু তার আগে এখানে মারার অধিকার অর্জন করতে হয়। এসো, তোমাকে কোচের সাথে আলাপ করিয়ে দিই।"
রৌণক অয়নকে নিয়ে ক্লাবের একদম মাঝখানে গেল। সেখানে একটা রিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক বিশালদেহী মানুষ। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, তার চওড়া বুক আর পেশিবহুল কাঁধ যেন স্যান্ডো গেঞ্জিটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার বাঁ কানের ওপর একটা গভীর কাটা দাগ চেহারায় এক ধরনের কাঠিন্য এনে দিয়েছে।
কোচ শের সিং।
"কোচ, এই সেই ছেলেটা। যার কথা আপনাকে বলেছিলাম," রৌণক অয়নকে দেখিয়ে বলল।
শের সিং ঘুরে দাঁড়ালেন। তিনি পা থেকে মাথা পর্যন্ত অয়নকে একবার স্ক্যান করলেন। অয়নের ফর্সা, চকচকে নিখুঁত চেহারা, তার শার্প হ্যান্ডসাম মুখ, পায়ে দামি স্নিকার্স আর পরিষ্কার স্পোর্টস ব্যাগ দেখে শের সিংয়ের মুখে একটা স্পষ্ট তাচ্ছিল্যর ছায়া নেমে এল।
আশেপাশের কয়েকজন ফাইটারও প্র্যাকটিস থামিয়ে এই 'বড়লোকের ছেলেটাকে' দেখতে লাগল। তাদের চোখে স্পষ্ট উপহাস।
"রৌণক, তুমি কি আমার সাথে মজা করছ? আমি তোমাকে বলেছিলাম র-ট্যালেন্ট খুঁজে আনতে। তুমি শোরুম থেকে একটা চকচকে পুতুল তুলে আনলে ?" শের সিংয়ের বাজখাঁই গলাতে গোটা জিম গমগম করে উঠল।
"এই জিমে আমি চ্যাম্পিয়ন ফাইটার তৈরি করি। এটা ইনস্টাগ্রাম মডেলদের অ্যাবস বানানোর জায়গা নয়। একে দেখে মনে হচ্ছে এর তো বক্সিংয়ের কোনো ব্যাকগ্রাউন্ডই নেই। এখানে রিংয়ে নামলে প্রথম হিটেই আমার ছেলেরা ওর চোয়াল নামিয়ে দেবে।"
তারপর অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এটা বড়লোকের ছেলেদের স্ট্রেস-রিলিফের জায়গা নয় হে। আমি আনট্রেইনড ছেলেদের নিয়ে জিম চালাই না। তুমি বাড়ি ফিরে যাও।"
অয়নের চোখের দৃষ্টি এক ইঞ্চিও নড়ল না। সে কল্পনাও করেনি এখানে এসে এরকম তাচ্ছিল্য পেতে হবে। তার চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। ওর মাথার ভেতর সেই চিড়বিড়ে রাগটা আবার মাথা তুলতে লাগল।
"আপনার জিম কি শুধু কথা বলার জন্য, না কি ফাইটের জন্য ?", অয়ন শের সিংয়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল।
শের সিংয়ের হাসিটা থেমে গেল, তার চোখ সরু হয়ে এল।
"ওহ! দেমাক আছে দেখছি। তা...রিংয়ে নামবে?", তিনি একটা ক্রুর হাসি ছুঁড়ে দিলেন।
"ঠিক আছে। তোমার হিরোগিরির শখ আমি মেটাচ্ছি।"
তিনি রিংয়ের ভেতর প্র্যাকটিস করতে থাকা একটা ছেলেকে ডাকলেন।
"বিকাশ! এদিকে আয়।"
বিকাশ ছেলেটা রীতিমতো দানব। ছ'ফুট চার ইঞ্চি হাইট, সারা গায়ে উল্কি। সে এই ক্লাবের অন্যতম রাফ ফাইটার। অন্যরা ওর সাথে লড়তে ভয় পায়।
"এই মডেল ছোকরা! যদি ওর সাথে তিন মিনিট রিংয়ে টিকতে পারো, তাহলেই কথা হবে।"
"রৌণক, একে র্যাপ পরিয়ে দে। আমি চাই না কাল ওর বাবা এসে আমার নামে পুলিশ কেস করুক যে মারপিট করতে গিয়ে ছেলের হাত ভেঙেছে", শের সিংয়ের কথায় আবার হাসির রোল উঠল। রৌণক দ্রুত অয়নের দুহাতে শক্ত করে ব্যান্ডেজ বা র্যাপ জড়িয়ে দিল। তারপর একজোড়া পুরনো লেদারের গ্লাভস অয়নের হাতে গলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, "শুধু মাথাটা বাঁচাস ভাই।"
অয়ন কোনো কথা না বলে সোজা রিংয়ের দড়ি গলে ভেতরে ঢুকে গেল।
পুরো ক্লাব প্র্যাকটিস থামিয়ে রিংয়ের চারপাশে ভিড় জমাল। সবাই আজকে মজা নিতে চায়, দেখতে চায় বিকাশ এই চিকনা মালটার হাড়গোড় আজ কীভাবে ভাঙে। রৌণক রিংয়ের দড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে অয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখতে চায় অয়ন সম্পর্কে তার ইনস্টিংক্ট ঠিক কি না।
রিংয়ের মাঝখানে বিকাশ অয়নের দিকে চেয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তার গ্লাভস দুটো একসাথে ঠুকল।
"রেডি?" শের সিং চেঁচিয়ে উঠলেন। "ফাইট!"
'ফাইট' শোনা মাত্রই অয়ন কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে একটা ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো বিকাশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার মাথার ভেতর তখন শুধু ধ্বংসের নেশা। সে তার গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে বিকাশের চোয়াল লক্ষ্য করে একটা রাইট-হুক ছুঁড়ল।
কিন্তু বিকাশ পেশাদার বক্সার। সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মাথাটা সামান্য নিচু করে অয়নের ঘুঁষিটা এড়িয়ে গেল। অয়ন নিজের ঘুঁষির মোমেন্টামের টাল সামলাতে না সামলাতেই, বিকাশ তার বিশাল শরীরটা একটু ঘুরিয়ে অয়নের পাঁজরের ঠিক নিচে, লিভার তাক করে একটা মারাত্মক আপারকাট চালাল।
ঠাস!
অয়নের মনে হলো কেউ যেন তার ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস এক লহমায় নিংড়ে বের করে নিয়েছে। তার চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সে যন্ত্রণায় দুমড়ে গিয়ে রিংয়ের ক্যানভাসের ওপর এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
পুরো ক্লাব একসাথে হো হো করে হেসে উঠল।
"কী রে হিরো? এক পাঞ্চেই হাওয়া বেরিয়ে গেল?" বিকাশ রিংয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের গ্লাভস দুটো একসাথে ঠুকে অয়নকে বিদ্রুপ করল।
"ওঠ! এখনো তো খেলা শুরুই হয়নি।"
অয়ন দাঁতে দাঁত চেপে, রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন তীব্র আক্রোশ। সে আবার এগিয়ে গেল। কিন্তু এবার বিকাশ তার সাথে আক্ষরিক অর্থেই ছেলেখেলা শুরু করল।
বিকাশ নিজের গার্ড তুলে অয়নের চারদিকে ঘুরতে লাগল। অয়ন পাগলের মতো ঘুঁষি ছুঁড়ছে, কিন্তু একটাও বিকাশের গায়ে লাগছে না।
ঠাস!
এবার কিছু বোঝার আগেই বিকাশের গ্লাভস সজোরে অয়নের বাঁ গালে আছড়ে পড়ল।আঘাতের চোটে অয়নের মাথাটা ছিটকে বাঁদিকে ঘুরে গেল।
ঠাস!
এবার ডান চোখের নিচ।
বিকাশের এক একটা ঘুঁষি হাতুড়ির মতো অয়নের মুখে আছড়ে পড়ছে। অয়নের ঠোঁট ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোল। চোখের কোলটা ফুলে উঠল। সে টাল সামলাতে না পেরে পেছাতে পেছাতে রিংয়ের দড়ির ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল।
ওর অবস্থা দেখে ক্লাবের ছেলেরা হো হো করে হেসে উঠল।
অয়নের মনে হল তার চোখের সামনে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে।
ওর অজান্তেই বিকাশ তখন নিঃশব্দে ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে আসছে, ফিনিশিং পাঞ্চটা দেওয়ার জন্য।
ক্লাবের ফাইটাররা সিটি বাজাচ্ছে। রৌণক রিঙের বাইরে দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে গোটাটা দেখছে। শের সিংয়ের মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব।
অয়ন দড়ির ওপর ভর দিয়ে প্রায় ঝুলে আছে। তার মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে। মুখের ভেতর নোনতা রক্তের স্বাদ। চোখ বুজে আসছে। ওর মনে হচ্ছে ও যেন এক্ষুণি ধড়মড়িয়ে রিঙের উপর পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
কিন্তু ঠিক সেইসময়, যখন অয়নের শরীর হার মেনে নিতে চাইছে, সে চোখে অন্ধকার দেখছে, তখন তার নিজের অজান্তেই, তার কানের কাছে ক্লাবের ফাইটারদের হাসির আওয়াজটা বিকৃত হতে আসতে শুরু করল। ওদের হাসিগুলো এক হয়ে বিক্রম মালহোত্রার ফেস্টের রাতের সেই বিজয়ী হাসির সাথে মিশে গেল।
বিকাশের ঘুঁষিতে ওর বাঁ গালে, ডান চোখের নীচে যে তীব্র জ্বালা হচ্ছিল, সেটা হঠাৎ করেই পাল্টে গিয়ে ওর মায়ের সেই দিন রাতে সজোরে মারা চড়ের জ্বালায় পরিণত হলো।
'তুমি একটা জানোয়ার হয়ে গেছ, মিস্টার চ্যাটার্জী!' বিদিশার সেই হিসহিসে গলাটা অয়নের মস্তিষ্কে সপাটে আছড়ে পড়ল।
ঠিক এইভাবেই ওর মা ওকে ব্যাকস্টেজে চড় মেরেছিল। ঠিক এইভাবেই বিক্রম মালহোত্রা ওকে দেখে হেসেছিল। ওর মায়ের অবজ্ঞা, অপমান, প্রিন্সিপালের অফিসে বিক্রমের পক্ষ নেওয়া, সেদিন দোজোতে বাচ্চাটার কাছে হেরে যাওয়ার অপমান আর এই কদিন ওর ভেতরে জমে থাকা সমস্ত জ্বালা, ক্ষোভ, রাগ, দমবন্ধ করা শূন্যতা; সবকিছু যেন এক লহমায় একটা বোমার মতো ফেটে পড়ল।
মারের চোটে অয়ন চেতনা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল।
কিন্তু, ক্লাবের ফাইটারদের হাসির শব্দ, সিটির আওয়াজ, ঘুঁষির আঘাতের তীব্র জ্বালা আর মুখের ভেতরের রক্তের স্বাদ সব মিলেমিশে ওর অবচেতন মনে চেপে রাখা স্মৃতিগুলোকে যেমন টেনে বার করে আনল, তেমনই ওর ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা একটা সত্তাকে আবার জাগিয়ে দিল।
বিকাশ ততক্ষণে অয়নের মুখের সামনে এসে তার বিশাল ডান হাতটা পেছনে টেনে একটা ফিনিশিং হুক মারার জন্য তৈরি হচ্ছে।
এমন সময় অয়ন দড়ি থেকে মুখ তুলে বিকাশের দিকে তাকাল।
তার চোখদুটো এখন আর মানুষের নয়। সেখানে কোন ব্যথার চিহ্ন নেই। বরং রক্তপিপাসু বুনো জানোয়ারের দৃষ্টির সাথে এই দৃষ্টির মিল আছে।
বিকাশ জানে না তবে ফেস্টের রাতে বিক্রম মালহোত্রা অয়নের চোখে এই দৃষ্টি দেখেছিল।
সে পাঞ্চ মেরে ম্যাচটা শেষ করতে এগিয়ে এল।
কিন্তু ঘুঁষিটা অয়নের মুখে আছড়ে পড়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে, অয়ন তার ফুটবলারের ক্ষিপ্রতায় রিংয়ের দড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে স্প্রিংয়ের মতো বাউন্স ব্যাক করল। সে বিকাশের ঘুঁষিটা ব্লক করার কোনো চেষ্টাই করল না। বরং সে মাথাটা সামান্য সরিয়ে ঘুঁষির আঘাতটা নিজের কাঁধে নিয়ে নিল।
বিকাশ চমকে গেল। কেউ এভাবে ফিনিশিং পাঞ্চ বডিতে নেয় না! অ্যাভয়েড করার চেষ্টা করে।
অয়ন আঘাতটা গায়ে নিয়ে সোজা বিকাশের ডিফেন্সের একেবারে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মুহূর্তের বিহ্বলতায় বিকাশ অয়নকে ডজ করতে পারল না।
সে যতক্ষণে বুঝতে পারল ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বক্সিংয়ে এক সেকেন্ড অনেকটা সময়। অয়ন একটা নেকড়ের মতো ক্ষিপ্রতায় সোজা বিকাশের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ওই অবস্থায় বিকাশ পাঞ্চ ছোঁড়ার চেষ্টা করল বটে কিন্তু সফল হল না। অয়ন নিজের শরীরের মোমেন্টাম কাজে লাগিয়ে সোজা বিকাশের পাঁজরে একটা আন্ডারকাট মারল।
বিকাশ ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে একটু পেছানোর চেষ্টা করল। কিন্তু, ততক্ষণে অয়ন সোজা বিকাশের থুতনি লক্ষ্য করে ডান হাতের আবার একটা বিধ্বংসী আন্ডারকাট মারল।
ক্র্যাক!
বিকাশের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য ঘোলাটে হয়ে গেল।
অয়ন তাকে রিকভার করার কোনো সুযোগ দিল না। তার ভেতরের দমবন্ধ করা শূন্যতা, তার জমে থাকা অপমান, তার মায়ের প্রত্যাখ্যান, সবকিছু আজ তার দুই হাতের পেশিতে ভর করেছে। সে বিকাশের গার্ডের তোয়াক্কা না করে পাগলের মতো, পাঞ্চ ছুঁড়তে শুরু করল।
লেফট হুক! রাইট ক্রস! আবার লেফট!
ঘুঁষিগুলোতে বক্সিংয়ের টেকনিক ছিল না ঠিকই, কিন্তু তাতে ভরপুর র' পাওয়ার ছিল।অয়ন বক্সিং রুলসের পরোয়া করছে না। ওর কোনো গার্ডও নেই, এই অবস্থায় বিকাশ সপাটে একটা জ্যাব সোজা অয়নের মুখে মারল, সঙ্গে সঙ্গে অয়নের নাক দিয়ে ছিটকে রক্ত বেরোল।
কিন্তু, অয়ন যেন ব্যথাটা টেরই পেল না। সে মার খেয়েও সামনে এগোতে থাকল আর প্রতিটা মারের বদলে বিকাশের মুখ আর শরীর লক্ষ্য করে তিনটে পাঞ্চ ছুঁড়তে লাগল। বিকাশ যথাসম্ভব নিজেকে প্রোটেক্ট করতে লাগল। বিকাশ এতক্ষণ বক্সিং করছিল, কিন্তু এখন সে একটা বেপরোয়া স্ট্রিট ফাইটারের মুখোমুখি।
অয়নের মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই মন্ত্র বাজছে, 'ধ্বংস! সব ধ্বংস করে দাও!'
বিকাশ এবার ভয় পেয়ে গেল। রৌণক রাস্তা থেকে একটা আস্ত পাগল উঠিয়ে নিয়ে এসেছে।
একটা সময় ওর গার্ড ভেঙে গেল। বিকাশ নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিল, এমন সময় অয়ন ওর পাঁজরে সজোরে পাঞ্চ করতে শুরু করল। বিকাশ ব্যথায় গার্ড নামাতেই, অয়নের একটা পারফেক্ট, সলিড রাইট হুক সোজা বিকাশের বাঁ কানের নিচে, জ-লাইনে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
ধড়াস!
বিকাশের বিশাল, উল্কি-আঁকা শরীরটা একটা কাটা কলাগাছের মতো সজোরে রিংয়ের ক্যানভাসের ওপর আছড়ে পড়ল।
পুরো ক্লাব পিন-ড্রপ সাইলেন্ট। ঘড়ির কাঁটা এখনো তিন মিনিট পার করেনি।
বিকাশ মাটিতে পড়ে হাঁপাচ্ছে, তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। সে আর ওঠার মতো অবস্থায় নেই।
বিকাশ মাটিতে পড়ে হাঁপাচ্ছে, তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।
আর রিংয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন চ্যাটার্জী। তার নাক থেকে রক্ত গড়িয়ে চিবুক বেয়ে নিচে পড়ছে, কিন্তু তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। কিন্তু, তার চোখদুটো এখনো বিকাশের দিকে স্থির, যেন সে আরও মারতে চায়। তার ভেতরের ওই দানবটা এখনো শান্ত হয়নি।
শের সিং এবং রৌণক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাবের বাকি ফাইটারদের মুখের তাচ্ছিল্যের হাসিগুলো ততক্ষণে উবে গেছে। সে জায়গায় চরম বিস্ময় আর ভীতি জায়গা করে নিয়েছে।
একটা জিরো-টেকনিক, আনট্রেইনড ছেলে যে আগে কখনো বক্সিং করেছে কিনা সন্দেহ সে শুধু নিজের 'র' অ্যাগ্রেশন দিয়ে ওদের অন্যতম সেরা ফাইটারকে নকডাউন করে দিয়েছে!
শের সিং ধীরে ধীরে রিংয়ের কাছে এলেন। তার চোখে এখন আর কোনো তাচ্ছিল্য নেই।
"তোর নাম কী, ছেলে?" শের সিংয়ের বাজখাঁই গলাটা এখন নিচু, কিন্তু তার স্বরটা পাল্টে গেছে।
অয়ন নিজের রক্তাক্ত গ্লাভস পরা হাতদুটো নামাল। সে রক্তমাখা ঠোঁট দিয়ে একটা গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে বলল, "অয়ন... অয়ন চ্যাটার্জী।"
শের সিং রৌণকের দিকে একবার তাকালেন, তারপর আবার অয়নের দিকে ফিরলেন।
"টেকনিক জিরো। স্টান্স জিরো।" শের সিং বললেন। "রিফ্লেক্স আর ফুটওয়ার্ক খারাপ নয়। পেইন টলারেন্স,পাওয়ার... আর কিলার ইনস্টিংক্ট... একদম পারফেক্ট।"
তারপর অয়নের দিকে ফিরে নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে ছুঁড়ে দিলেন।
অয়ন সেটা লুফে নিল।
"মুখের রক্তটা মুছে নে, ছোকরা। কাল ঠিক সন্ধে ছ'টার সময় চলে আসবি।"
উত্তরে অয়ন কোনো জবাব দিল না। তার পা দুটো তখন কাঁপতে শুরু করেছে।