মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৪৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6269453.html#pid6269453

🕰️ Posted on Tue Jul 21 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2467 words / 11 min read

Parent
অধ্যায় 25 বিনীত অনুরোধ, এটা plot and character driven story, এখানে গল্পের প্রয়োজনে সেক্স আসবে। সেক্স চাই বলে অকারণে আমার মাথা খারাপ করবেন না। অয়নকে ছোটবেলায় দেখেই বোঝা গিয়েছিল তার মুখের নিখুঁত গড়ন, গায়ের উজ্জ্বল ফর্সা রং আর গভীর চোখ সবই অবিকল হুবহু তার মায়ের মতো। কিন্তু সে যত বড় হতে লাগল, ততই তার চারপাশের চেনা মানুষেরা টের পেতে লাগল যে অয়ন শুধু তার মায়ের মতো দেখতেই হয়নি, বিদিশার তীব্র অভিমান আর অনড় জেদী স্বভাব দুটোই সে মায়ের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে।  মা আর ছেলের অভিমানের ধরনটাও একদম এক। দুজনেই মানসিক ক্ষতগুলোকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে গোপনে ছটফট করতে থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় যেন পাথরের মূর্তি।  কেউ তীব্রভাবে আঘাত করলেও চট করে বাইরের খোলসে ফাটল ধরানো যায় না। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে দুজনের মনের ভেতরে কী চলছে। অনেকেই এটাকে চরম নিস্পৃহতা বলে ভুল করে।  এই খোলসের নিচে যে কতটা হাহাকার লুকিয়ে থাকে, তা বোধহয় তারা নিজেরাও পরিমাপ করতে পারে না। অভিমানের এই অদ্ভুত মিল তাদের একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দেয়, আবার এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধেও রাখে। কেউ নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতে পারে না যে 'আমি ভালো নেই'। কেউই কম জেদী নয়... ১ সকাল সাড়ে সাতটা সকালের ম্লান আলো, কুয়াশার চাদর ভেদ করে চ্যাটার্জী বাড়ির ফ্রেঞ্চ উইন্ডো গলে ড্রয়িংরুমের মার্বেলের মেঝেতে এসে পড়েছে। জানালার ভারী কাঁচের ওপারে কলকাতার কুয়াশাচ্ছন্ন, অলস সকালটা যেন একভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের কনকনে ঠান্ডার বিপরীতে, দোতলার আধুনিক হোম জিমের ভেতরে সেন্ট্রাল হিটারের ওম ছড়ানো। জিমের একদিকের দেওয়াল জুড়ে বিশাল আয়না, মেঝেতে পাতা কালচে রাবারের শক-অ্যাবসরবেন্ট ম্যাট। ঘরের এক কোণে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ওজনের ডাম্বেল আর কেটলবেলের রেক, অন্য প্রান্তে চকচকে অলিম্পিক বারবেল ও একজোড়া প্যারালেল বার। ছাদ থেকে ঝুলছে প্রফেশনাল জিমন্যাস্টিক রিং।  গত তিন সপ্তাহ ধরে কলেজের ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামের হাড়ভাঙা খাটুনি আর তীব্র স্নায়বিক চাপের কারণে বিদিশার রোজকার চেনা রুটিনটা পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল।তিনি এই ক'দিনে নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেবার একটুখানি ফুরসতও পাননি।  বিদিশার মতো একজন নারীর পক্ষে নিজের শরীরের এই অবহেলা সহ্য করা কঠিন। দুদিন আগে ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামের ‘ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্ট’ প্রিন্সিপাল সান্যালের টেবিলে জমা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি এক সপ্তাহের জন্য অফিসিয়াল ছুটি জন্য আবেদন করেছিলেন। বিষয়টা আকস্মিক ছিল না, বিদিশা সেদিন ছুটির আবেদনপত্র নিজের সঙ্গে রেডি করে নিয়ে এসেছিলেন। গত তিন সপ্তাহে তাঁর তিন মাসের খাটুনি গিয়েছে বললেও কম বলা হয় না। এত শারীরিক আর মানসিক ধকলের পর তাঁর নিজেকে শারীরিক আর মানসিকভাবে একটু রিচার্জ করার ভীষণ প্রয়োজন ছিল।  ওদিকে, সেমিস্টার এক্সামের আর টেনেটুনে এক মাস বাকি। অন্য কোন শিক্ষক চাইলে এই সময়ে ছুটি পাওয়া দুষ্কর ছিল। কিন্তু, আঠারো দিনের নোটিশে বিদিশা যে অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন, যেভাবে কলেজের রেপুটেশন আর ফিউচারকে একার কাঁধে রক্ষা করেছেন, তারপর তার আবেদন নামঞ্জুর করার সাধ্য প্রিন্সিপাল সান্যালের ছিল না। তাই দীর্ঘদিন পর বিদিশা আবার নিজের চেনা ট্র্যাকে ফিরেছেন। কলেজে জয়েন করার আগেকার দিনগুলোর মতো, ভোর হতে না হতেই দেরি না করে সোজা জিমে ঢুকে পড়ছেন; শরীর আর মনের জমে থাকা সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে চাঙ্গা হওয়ার এক তীব্র তাগিদ নিয়ে।  কিন্তু, শারীরিক ক্লান্তি কাটলেও মানসিক শান্তি যে কিছুতেই আসছে না। কলেজের নানা বিষয়ের চিন্তা বাড়িতে তার মনকে সবসময় ভারাক্রান্ত করে রেখেছে।  তবু ব্যায়ামের সময়টুকু তার মন একদম ফোকাসড থাকে। সেসময় অন্য চিন্তা তার মনে একদমই প্রভাব ফেলতে পারে না। টানা কুড়ি মিনিট রানিং শেষ করে বিদিশা ট্রেডমিল থেকে নামলেন। তাঁর শরীর থেকে তখনো আগুনের মতো তাপ বেরোচ্ছে; মসৃণ কপাল, সুগঠিত কলারবোন আর স্তনদ্বয়ের মধ্যবর্তী গভীর খাঁজ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম গড়িয়ে নামছে। তিনি পাশে রাখা নরম তোয়ালেটা তুলে নিয়ে আলতো করে মুখের ঘাম মুছলেন।  ঘন্টায় সাড়ে বারো কিলোমিটার গতিতে একটানা দৌড়ানোর ফলে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস এখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ওঠানামা করছে।   স্পোর্টস ব্রা-র ডিপ-নেক কাটিংয়ের ফাঁক দিয়ে তাঁর বুকের ফর্সা, মসৃণ বক্ষবিভাজিকার গভীর খাঁজটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, পুরো জায়গাটা এখন ঘামে ভিজে চকচক করছে। গভীর শ্বাস নেবার সময় উন্নত, সুডৌল স্তনযুগলের চাপে স্পোর্টস ব্রা-এর পাতলা ইলাস্টিক ফ্যাব্রিকটা ছিঁড়ে যাবার উপক্রম।  মুখ আর গলা মুছে নেওয়ার পর বিদিশা হাতের তোয়ালেটি একপাশের স্ট্যান্ডে রেখে দিলেন। তারপর নিজের শরীরটাকে একটু শিথিল করতে জিমের দেওয়ালজোড়া বিশাল আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঘরের নরম আলোয় জিমের দেওয়ালজোড়া বিশাল আয়নাটা, তাঁর সাঁইত্রিশ বছরের তন্বী শরীরের প্রতিটি রেখাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আগেও বলা হয়েছে, বিদিশাকে দেখে কখনোই সাঁইত্রিশ বছর বয়সী মনে হয় না। তার বয়স বড়জোর পঁচিশ বছর। স্পোর্টস ব্রা আর হাই-ওয়েস্ট কম্প্রেশন লেগিংসের আঁটসাঁট বাঁধন তাঁর শরীরের প্রতিটি বাঁক ও খাঁজকে দারুণভাবে প্রস্ফুটিত করে তুলেছে। আজ তাঁর পরনে একটা স্কিন-টাইট, ডার্ক ব্লু রঙের জিম স্প্যান্ডেক্স অ্যাক্টিভ-ওয়্যার। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতেই বিদিশা কয়েক পা এগিয়ে ফ্লোর ম্যাটের ওপর এসে দাঁড়ালেন। তখনও তাঁর বুকটা দ্রুত, উত্তাল ভঙ্গিতে ওঠানামা করছে। পেটের নির্মেদ, ফর্সা, মসৃণ ত্বকে নাভির চারপাশে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দুগুলো মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করছে। দীর্ঘদিনের যোগাভ্যাস আর নিয়মানুবর্তিতার কারণে এই বয়সেও তাঁর শরীরে মেদের লেশমাত্র নেই, বরং তা এক টানটান, উদ্ধত যৌবনের মহিমায় দীপ্ত। শরীরটাকে রিল্যাক্স করার জন্য তিনি ম্যাটের ওপর দাঁড়িয়ে স্ট্রেচিং শুরু করলেন। বিদিশা যখন দু-হাত ওপরে তুলে শরীরটাকে এক অদ্ভুত নমনীয়তার সাথে পেছনের দিকে ধনুকের মতো বাঁকাতে শুরু করলেন, তখন স্পোর্টস ব্রার আঁটসাঁট বন্ধন ভেদ করে তাঁর সুডৌল ভারী স্তনজোড়া উপরের দিকে টানটান হয়ে উঠল।  টাইট লেগিংসের নিচে তাঁর সরু কোমরের নিখুঁত বাঁক আর পেটের মসৃণ ত্বকে পেশির সূক্ষ্ম সংকোচন-প্রসারণ স্পষ্ট হতে শুরু করল।  ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া শরীরটার সাথে সাথে লেগিংসের টানটান কাপড়ে তাঁর নিতম্বের সুঠাম গড়নটিও আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। এই ভঙ্গিতে লেগিংসের পাতলা ফ্যাব্রিকটা তাঁর নিতম্বের নিটোল অবয়বের সাথে ওতপ্রোতভাবে লেপ্টে গেল। বিশাল আয়নার সামনে তৈরি হওয়া সরু কোমরের খাঁজ এবং সুগঠিত আর উদ্ধত নিতম্বের তীব্র আবেদনমূলক দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরের আবহাওয়ায় এক তীব্র মাদকতার সঞ্চার করল। যা যেকোনো পুরুষের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিদিশা এবার সোজা হয়ে পা দুটো সামান্য ফাঁক করলেন এবং হাত দিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল ছোঁওয়ার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকলেন। নিজের হাত দিয়ে পায়ের আঙুল ছোঁওয়ার জন্য।  এই মোচড়ে তাঁর পিঠের কশেরুকা আর কোমরের সরু, ফর্সা বাঁকটা পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। ঘাড়ের কাছ থেকে ব্লো-ড্রাই করা অবাধ্য চুলের কয়েকটা গোছা আলগা হয়ে তাঁর মুখের দু-পাশে এবং ঘামে ভেজা কলারবোনের ওপর এসে পড়ল। কপালের ঘাম তীক্ষ্ণ নাকের ডগা বেয়ে, ঠোঁটের কোণ ছুঁয়ে ম্যাটের ওপর টপটপ করে ঝরে পড়ছে। সারাদিনের বাহ্যিক গাম্ভীর্য, চশমার আড়ালের কড়া প্রফেসরের নিচে একটা অত্যন্ত জীবন্ত, অবদমিত নারীত্ব আর অফুরন্ত এনার্জি ছটফট করে, জিমের এই নিভৃত মুহূর্তগুলোই তার প্রমাণ। ইতালির সেই অভিশপ্ত রাতের পর থেকে তিনি নিজের নারীত্বকে সচেতনভাবেই বাইরের জগত থেকে বন্দি করে রাখেন। কিন্তু, জিমের এই সময়টুকু আসলে তার নিজের কাছে নিজের ফেরার মতো। পৃথিবীর আড়ালে এই চার দেওয়ালে যে বিদিশা স্রেফ নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়, সে কেবলই এক মুক্ত, আদিম প্রাণশক্তি। কলেজের রাশভারী নারীর সাথে তার কোন মিল নেই। স্ট্রেচিং শেষ করে বিদিশা এক মুহূর্তের জন্য আয়নার সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর আবার আলতো করে তোয়ালেটা তুলে নিয়ে নিজের গলার ফর্সা ত্বক আর স্তনের মধ্যবর্তী খাঁজের ঘামটুকু মুছে নিলেন। ঘাম মুছতে মুছতে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস তাঁর বুক চিরে বেরিয়ে এল। ব্যায়াম বন্ধ হতেই আবার বিদিশার মনের সমস্ত স্মৃতি এক লহমায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।  কাল সন্ধ্যায় তিনি অয়নের নম্বরটা প্রায় ডায়াল করেই ফেলছিলেন। আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর ‘কল’ বোতামটার উপর গিয়েও থমকে গিয়েছিল। ফোনটা তিনি প্রায় করেই ফেলেছিলেন।  বিদিশা নিজের মনে হাসলেন। তার ছেলেকে তার থেকে ভালো আর কে চেনে?  অয়ন যা মারাত্মক জেদী আর একগুঁয়ে, তাতে যা-ই ঘটে যাক না কেন, মায়ের ফোন সে কিছুতেই তুলবে না। বরং, অয়ন তার নম্বর ব্লক করে দিলেও বিদিশা অবাক হবেন না। ২ জিম থেকে বেরিয়ে বিদিশা সোজা চলে এলেন নিজের বেডরুমে। গা থেকে জিমের পোশাকটা বদলে অ্যাটাচড বাথরুমে একটা শাওয়ার নিয়ে একটা ঢিলেঢালা, হালকা সুতির গাউন পরে নিয়ে তিনি একতলায় নেমে এলেন। একতলাটা ফাঁকা, নিস্তব্ধ। অরুণ এখনও মুম্বই থেকে ফেরেনি, কবে ফিরবে ফোন করে জানাবার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেনি। কিচেনের কাউন্টারে সকালের আলো এসে পড়েছে। আজ আর সাত সকালে অফিসে বেরোবার কোনো তাড়া নেই, তাই তিনি ধীরেসুস্থে এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। বিদিশা কিচেনের সেলফ থেকে কফি বিনের জারটা বের করলেন। ক্যাবিনেট থেকে কালো রঙের ইলেকট্রিক কফি বিন ক্রাশারটা বের করে জারের ভেতর কয়েক চামচ রোস্টেড ডার্ক কফি বিন ঢেলে ঢাকনাটা বন্ধ করলেন।  যন্ত্রটার বোতাম টিপতেই কর্কশ ঘরঘর শব্দে কিচেনের এতক্ষনের নীরবতা ভেঙে গেল। কফি বিনগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই কোকোর কড়া সুবাস পুরো কিচেনের বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এই যান্ত্রিক শব্দের মাঝে বিদিশার মন আবার ফিরে গেল তার কর্মক্ষেত্রে। অয়ন, কলেজের নোংরা রাজনীতি, সিনিয়র কলিগের পেছন থেকে ছুরি মারা, উপরতলার দুর্নীতি, দিনকয়েক আগে কমন স্টাফরুমে অনামিকা রায় নামে সেই অচেনা ভদ্রমহিলার সাথে পরিচয় আর হেঁয়ালিভরা, রহস্যময় কথাগুলো, 'এই ক্যাম্পাসের আসল নার্ভটা কিন্তু ক্লাসরুম বা অ্যাকাডেমিক্সের মধ্যে থাকে না, মিস গাঙ্গুলি... ম্যানেজমেন্ট চায় সব কিছু কন্ট্রোলে থাকুক। ওরা তো আপনার মতো ডেডিকেটেড, ইন্টেলিজেন্ট আর স্ট্রং মানুষদেরই চায়...' বিদিশা ক্রাশার মেশিনটা বন্ধ করে কফির তাজা গুঁড়োটা কফি মেকারের ফিল্টার বাস্কেটে ঢাললেন। একটা ফিল্টার পেপার সুন্দর করে সেট করে দিয়ে মেশিনটার সুইচ অন করতেই ভেতরের জল গরম হওয়ার হালকা হিসহিস শব্দ শুরু হলো। কফি মেকার থেকে ফোঁটা ফোঁটা কালো তরল যখন নিচের কাঁচের জগে জমা হচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওটা আদৌ বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ ছিল না। ওভাবে কে কথা বলে ? অনামিকা রায় যেন রেডি হয়ে বসেছিলেন, কখন উনি আসবেন। বিদিশার মনে হচ্ছে অনামিকা আসলে তাকে উপরতলার তরফ থেকে একটা প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়ে গেলেন। আর এতটাও বোকা তিনি নন যে সেটা বুঝে উঠতে পারবেন না। কিন্তু, তার পরেও প্রশ্ন থেকেই যায়, অনামিকা কোন পক্ষের লোক ? ডঃ বাগচী না অন্য কোন ব্যক্তি ? তিনি কী বার্তা দিতে এসেছিলেন ?  এই মুহূর্তে হাজার একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কফি মেকারের শেষ ফোঁটাটা জগে পড়তেই বিদিশা মেশিনটা বন্ধ করলেন। জিমের ওয়ার্কআউটের পরে তার পেট এখন কার্বোহাইড্রেট আর প্রোটিন দুটোই চাইছে, কিন্তু মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো সেই খিদেটা কিছুটা ম্লান করে দিচ্ছে। তিনি কাউন্টারের ওপর রাখা পাউরুটির প্যাকেট থেকে দুটো ব্রাউন ব্রেড বের করে টোস্টারে গুঁজে দিলেন। টোস্টারের লিভারটা নিচে নামানোর 'খট' করে একটা শব্দ হলো। চিন্তাগ্রস্ত বিদিশা কিছুটা অন্যমনস্ক মনে গ্যাস ওভেনটা অন করে তাতে একটা নন-স্টিক প্যান বসালেন। তাতে একটা মাখনের টুকরো দিয়ে ফ্রিজ থেকে দুটো ডিম বের করে অভ্যস্ত হাতে প্যানের কিনারে আলতো করে ঠুকলেন।  ক্র্যাক।  ডিম দুটো ফাটিয়ে প্যানে ঢালার সময় তাঁর চোখের দৃষ্টি ছিল শূন্য, ফোকাসহীন; যা অন্যমনস্কতার চিহ্ন। প্যানে মাখন গলার সময় ‘চর্ চর্’ শব্দের সাথে সাথে তাঁর চিন্তার গতিও তীব্র হতে লাগল। অনামিকা কী সত্যিই আগে থেকেই জানতেন বিদিশা ওখানে আসবেন ? তাহলে কী কেউ সবসময় তার উপর নজর রাখছে ?  কুসুম আর সাদা অংশটা প্যানের গরম মাখনের ওপর ছড়িয়ে পড়তেই একটা ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ উঠল। ধোঁয়া ওঠা প্যানের দিকে তাকিয়ে বিদিশার চোখ দুটো সরু হয়ে এলো।  কিন্তু তিনি কেন ?  কলেজের ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টে নতুন জয়েন করা, কারো সাতে পাঁচে না থাকা, একজন নতুন অ্যাসিটেন্ট প্রফেসরকে কেন হঠাৎ করে কলেজের পলিটিক্সের কেন্দ্রে টেনে আনা হচ্ছে ? ঠিক তখনই টোস্টার থেকে একটা যান্ত্রিক শব্দ করে দুটো ব্রাউন ব্রেড ওপরের দিকে ছিটকে উঠল। সেই আকস্মিক শব্দে বিদিশার ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল। প্যানের মাখনের বুদবুদগুলো কমে আসছে।  বিদিশা আলতো করে স্প্যাচুলাটা ডিমের ওমলেটটা উল্টে দেওয়ার সময় ভাবলেন ভাগ্যের কী আশ্চর্য পরিহাস! এই কলেজে তিনি জয়েন করেছিলেন নিজের জীবনের নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য, একটা মিনিংফুল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য, নিজের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্বটাকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার জন্য।  কিন্তু, সেজন্য কলেজে পড়াতে গিয়ে তিনি এভাবে একটার পর একটা নোংরা, কুৎসিত ঘটনায় জড়িয়ে পড়বেন, তা তিনি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি। কলকাতার এত নামী, অভিজাত একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঝকঝকে খোলসের আড়ালে এমন মারাত্মক, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আর সিন্ডিকেট রাজ চলে, সেটা তাঁর ভাবনাচিন্তার বাইরে ছিল। বিদিশা প্যান থেকে ডিমের ওমলেটটা প্লেটে তুলে রেখে, কাঁচের জগ থেকে গাঢ় কালো কফিটা নিজের প্রিয় মগটায় ঢাললেন। তারপর কিচেন কাউন্টারের চেয়ারটায় বসলেন। কফিতে প্রথম চুমুকটা দিতেই তাঁর কপাল চিন্তায় কুঁচকে গেল। তিতকুটে উষ্ণ তরলটা গলা দিয়ে নামতেই এক অদ্ভুত জেদ চেপে বসল তাঁর মনে। তিনি এমন কী করলেন, যার জন্য উপরতলার নজর তার উপর পড়ল ?  তিনি কোন রাজনীতি করতে যাননি। ক্ষমতা দখলের জন্য কারোর সাথে লড়াইতে নামেননি। প্রভাবশালী ডোনারদের অযোগ্য ছেলেদের অঙ্কের খাতায় অন্যায্যভাবে পাস করাতে রাজি হননি, ব্যস এটুকুই তাঁর অপরাধ!  কথাটা ভাবতে ভাবতেই টোস্টেড ব্রেডের ওপর ওমলেটের একটা টুকরো রেখে মুখে দিলেন। রুক্ষ টোস্ট আর ডিমের টুকরোটা চিবোতে চিবোতে তাঁর নিজের মনে তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি হল। নীতির প্রশ্নে আপস না করার মাশুল কি এভাবে দিতে হবে? অপমানিত হওয়ার জন্য বা কোনো নোংরা সিন্ডিকেটের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়ার জন্য তো তিনি আসেননি! শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে তিনি নিজের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই নোংরা সিস্টেম তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। কফির মগটা সজোরে কাউন্টারে নামিয়ে রেখে বিদিশার মনটা এবার গভীর বিতৃষ্ণায় আর রাগে উতলা হয়ে উঠল।  কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ?  সকালের এই শান্ত পরিবেশটাকে স্রেফ কলেজের নোংরা রাজনীতির চিন্তায় নষ্ট হতে দিতে চাইলেন না তিনি।  বিদিশা জানেন, এই ধরনের ভাবনার কোনো শেষ নেই; এ যেন এক চোরাবালি, যেখানে একবার ঢুকলে যুক্তি আর বুদ্ধির মাথা খেয়ে ক্রমাগত তলিয়ে যেতে হয়।  তিনি জোর করে নিজের মনটাকে এই নোংরা চিন্তার বৃত্ত থেকে বের করে আনার চেষ্টা করলেন।  কফির মগটা কাউন্টারে সশব্দে নামিয়ে রাখার পর থেকে যে তীব্র রাগ আর বিতৃষ্ণা বিদিশাকে গ্রাস করেছিল, তিনি সচেতনভাবেই তার লাগাম টানলেন। একজন গণিতের শিক্ষিকা হিসেবে তিনি ভালো করেই জানেন, অতিরিক্ত আবেগ যেকোনো জটিল পরিস্থিতিকে আরও গুলিয়ে দেয়। ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে হলে মনকে শান্ত রাখা জরুরি। তাছাড়া, এই জঘন্য সিস্টেমের কথা ভেবে নিজের সকালটা নষ্ট করা মানে তাদের কাছে পরোক্ষভাবে হার মেনে নেওয়া। নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ তিনি অন্য কারও হাতে এভাবে ছেড়ে দিতে পারেন না। নিজের মনকে শান্ত করতে তিনি চোখ বুজে কয়েকটি দীর্ঘ শ্বাস নিলেন আর ছাড়লেন। চিন্তাটা কলেজ থেকে সরিয়ে ব্রেকফাস্টের ওপর মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করলেন। প্লেট থেকে ব্রাউন ব্রেডের টুকরোটা তুলে নিয়ে তাতে আরেকটা কামড় দিলেন। মুচমুচে টোস্ট আর মাখনে ভাজা ডিমের পোচ চিবোতে চিবোতে কান পাতলেন জানলার বাইরে উড়ে যাওয়া চড়ুই পাখিদের কিচিরমিচিরে।  কফির মগে আরও একটা বড় চুমুক দিয়ে গরম তরলটার ওম নিজের গলায় অনুভব করলেন।  এতে কাজ হল, আস্তে আস্তে বিদিশার মন শান্ত হয়ে এল। প্লেটের শেষ ওমলেটের অংশটা ব্রেডের সাথে মুড়িয়ে মুখে পুরে দিয়ে, ধীরে ধীরে চিবিয়ে ব্রেকফাস্টটা শেষ করলেন তিনি। কাউন্টার থেকে টিস্যু পেপার টেনে হাত ও মুখ মুছে প্লেট-মগগুলো সিঙ্কে রাখার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। সেই মুহূর্তেই তাঁর চোখ গেল কাউন্টারের কোণে রাখা নিজের ফোনটার দিকে। স্ক্রিনটা অন্ধকার, কিন্তু ওপরের কোণে একটা ছোট্ট নীল রঙের নোটিফিকেশন লাইট নিভে নিভে আবার জ্বলছে।  এক মুহূর্তের জন্য বিদিশার বুকটা ধক করে উঠল।  তাহলে কী অয়ন কোনো মেসেজ পাঠিয়েছে ? ফোনটা হাতে তুলে লক স্ক্রিনটা খুলতেই বিদিশার মনের চঞ্চলতা আবার এক রাশ হতাশায় পরিণত হলো। না, অয়ন নয়, কোনো একটা ব্যাঙ্কের প্রমোশনাল মেসেজ।  ফোনটা আবার লক করে দিতে গিয়ে ওয়াল পেপারের ছবিটার দিকে চোখ আটকে গেল তাঁর। অয়নের হোস্টেলে চলে যাবার ঠিক আগের দিন তোলা ছবি। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ওর চির চেনা হাসি। কাল রাতে ফোনটা কেটে দেওয়ার পর তিনি আর অয়নকে কল করার চেষ্টা করেননি।  তিনি মনে মনে নিজেকে বোঝালেন অন্যায়টা অয়ন করেছে। স্থান-কাল-পাত্রের পরোয়া না করে, অ্যানুয়াল ফাংশনের দিনে স্টেজের উপরে বিক্রমের ওপর ওইভাবে জানোয়ারের মতো আক্রমণ করাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অয়ন যতই প্রোভোকড হোক, বিক্রমের আসল মতলব যতই নোংরা হোক, তার চেয়েও বড় সত্য হলো অয়ন সবার সামনে একটা রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটিয়েছে। এটা বেআইনি। এটার কোনো জাস্টিফিকেশন হয় না।  এটা কোনোভাবেই একজন ছাত্রের আচরণ হতে পারে না।   এসব চিন্তা করতে করতে বিদিশার ভেতরের কড়া শিক্ষিকার সত্তাটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, অয়নকে তার নিজের ভুল বুঝতে হবে। সে যে জঘন্য অপরাধ করেছে, এটা তাকে মানতেই হবে। তাই সম্পর্কের এই বরফ গলাতে হলে, ওকেই আগে ক্ষমা চাইতে হবে। বিদিশা নিজে থেকে আর এক পা-ও এগোবেন না।  কিন্তু, এই কঠোর, যুক্তিবাদী শিক্ষিকা সত্ত্বার আড়ালে তার মনের একান্ত অনুভূতি বিদিশা কীভাবে নিজের কাছে লুকোবেন ?  তিনি ডাইনিং টেবিলের ফাঁকা চেয়ারটার দিকে আর একবার ফিরে তাকালেন, যেখানে একটা সময় অয়ন এসে বসত। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর কড়া শিক্ষিকার খোলসটা চুরমার হয়ে গেল।
Parent