মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৫০

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6269455.html#pid6269455

🕰️ Posted on Tue Jul 21 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1991 words / 9 min read

Parent
৩ ব্রেকফাস্ট শেষ করে বিদিশা প্লেট আর মগটা সিঙ্কে রাখলেন। আবার নিজের মনটাকে ডাইভার্ট করার জন্য তিনি ভাবতে লাগলেন আজ সারাদিন তিনি বাড়িতে থেকে কী করবেন। অনেকদিন হলো ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়নি।  বিদিশা ঠিক করলেন আজ তিনি বাড়িটা ভালো করে পরিষ্কার করবেন। অনেকদিন ঘর গোছানো হয়নি। কাজের মাসি ওপর ওপর ঝাড়পোঁছ করে চলে যায় ঠিকই, কিন্তু ভেতরের আলমারি, বুকশেলফগুলো ধুলোয় মলিন হয়ে আছে। অরুণ এখনো মুম্বই থেকে ফেরেনি। আজ নিয়ে আট দিন পার হয়ে গেল।  অরুণের কথা মনে পড়তেই বিদিশার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। আর সেই সাথে তাঁর মনে পড়ে গেল আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগের একটা দুপুরের কথা। [ফ্ল্যাশব্যাক] সেদিনও অরুণ একটা লং অফিশিয়াল ট্যুর যাবার জন্য বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিল।  বিদিশা ভেবেছিলেন বাড়িতে একা বসে কী করবেন, তাই অরুণের স্টাডি রুম আর তার মেহগনি কাঠের বিশাল রাইটিং ডেস্কটা একটু পরিপাটি করে গুছিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। ডেস্কের ড্রয়ারগুলো খুলে পুরানো কাগজ আর ফাইলগুলো যখন তিনি সর্ট করছিলেন, তখন একদম নিচের একটা ড্রয়ারের ভেতর একদম নিচে, কিছু সাধারণ ট্যাক্স ফাইলের তলায় বিদিশা একটা চামড়ার ফোল্ডার আর একটা ডায়েরি পেয়েছিলেন। সেই ফোল্ডারের ভেতরে কিছু খাম ছিল। কৌতুহলের বশে বিদিশা যেই ডায়েরিটার পাতা উল্টোতে গেছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই অরুণ ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে পড়েছিল। সেদিন নাকি তার ট্যুর ক্যানসেল হয়ে গিয়েছিল। তাই সে সাত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল। বিদিশাকে ওই অবস্থায় দেখে অরুণের চেহারা এক লহমায় পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। অরুণ চ্যাটার্জী সেদিন নিমেষের মধ্যে একটা উন্মাদের রূপ ধারণ করেছিল। অরুণের মুখটা রাগে মুহূর্তের মধ্যে রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছিল। সে চিৎকার করতে করতে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে হিংস্রভাবে বিদিশার হাত থেকে ফাইল আর ডায়েরিটা এক হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়েছিল। অরুণের সেই প্রবল ঝাঁকুনিতে বিদিশা টাল সামলাতে না পেরে টেবিলের কোণায় ধাক্কা খেয়েছিলেন। কিন্তু, অনুশোচনা দূরে থাক, অরুণ তখন রীতিমতো রাগে ফুটছে, ‘হাউ ডেয়ার ইউ, বিদিশা! তোমার সাহস কী করে হয় আমার পার্সোনাল জিনিসে হাত দেওয়ার? হু দ্য হেল টোল্ড ইউ টু টাচ মাই ড্রয়ার ?’ অরুণের গলা রাগে কাঁপছিল। তার চোখের তারা দুটো বড় বড় হয়ে গিয়েছিল।  স্তম্ভিত বিদিশা ততক্ষণে নিজেকে কোনরকম সামলে নিয়ে আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে গিয়েছিলেন। ‘আমি তো শুধু ঘরটা গোছাচ্ছিলাম। তোমার ফাইলে এমন কী আছে যার জন্য তুমি এমন ভাবে কথা বলছ ?’ ‘শাট আপ! জাস্ট শাট আপ! ব্লাডি উওম্যান !আজ থেকে এই ঘরে ঢোকার আগে একশো বার চিন্তা করবে। আমার প্রফেশনাল লাইফ আর আমার কাগজপত্রের থেকে নিজের ফালতু কৌতুহল দূরে রাখবে। মাইন্ড ইওর ওন বিজনেস!’ অরুণ ফাইলটা আবার ড্রয়ারে ঢুকিয়ে চাবিটা নিজের পকেটে পুরে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। বিদিশা স্তব্ধ হয়ে বসে পড়েছিলেন। তিনি শুধু অরুণের ঘরটা গুছিয়ে দিতে এসেছিলেন। সেজন্য এমন ব্যবহার তিনি আশা করেননি। অরুণের প্রতিক্রিয়া, উন্মাদের মতো চিৎকার, অপমান, রুক্ষ ব্যবহার বিদিশার নরম মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল।  ইতালির ঘটনার বিপর্যয় তিনি তখনও পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেননি। সেই ঘটনার পর থেকে বিদিশা আর কোনোদিন অরুণের কোনো জিনিসে, এমনকী তার ঘরের চাবিতেও হাত দেননি। তার স্টাডিরুম থেকে একশো হাত দূরে থেকেছেন। তাদের সম্পর্কও আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি। [বর্তমান সময়] সেই কুৎসিত স্মৃতির কথা মনে পড়তেই বিদিশার মনটা এক পরম বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল।  তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, তাঁর নিজের জীবনে যা যা ঘটে চলেছে, - সবকিছু নিয়ে তাঁর একবার সেই সাইক্রিয়াট্রিস্টের সাথে বসা উচিত। ইতালির সেই অভিশপ্ত রাতের পর, যখন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তখন এই ডাক্তারবাবুই তাঁকে চরম ট্রমা আর প্যানিক অ্যাটাক থেকে টেনে বের করে এনেছিলেন।  এই মুহূর্তে তাঁর নিজের মনের কথা শেয়ার করার মতো কোনো দ্বিতীয় মানুষ নেই। তিনি ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ফোনটা তুলে ডাক্তারবাবুর পার্সোনাল নাম্বারে ডায়াল করলেন। কিন্তু ওপাশ থেকে রিং হওয়ার পর তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোনটা ধরে অত্যন্ত বিনীত গলায় জানাল, "সরি ম্যাম, ডক্টর মজুমদার এই মুহূর্তে একটা ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারে আউট অফ স্টেশন আছেন। উনি জানুয়ারির লাস্ট উইকের আগে কলকাতায় ফিরছেন না।" বিদিশা ম্লান মুখে ফোনটা কেটে দিলেন। ভাগ্যের কী আশ্চর্য পরিহাস! যখন তাঁর একটা মানুষের খুব প্রয়োজন, তখন চারপাশটা মরুভূমির মতো ফাঁকা। তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। এসব নেতিবাচক চিন্তা থেকে বাঁচতে হলে নিজেকে কোনো ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটির মধ্যে ব্যস্ত রাখতেই হবে। বিদিশা ঠিক করলেন আজ তিনি নিজের ঘরটা পরিষ্কার করবেন।  তিনি সোজা নিজের বেডরুমে চলে এলেন।   এসে নিজের শোওয়ার ঘরের বড় আলমারিটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কাঠের ভারী পাল্লা দুটো টেনে খুলে দিতেই ভেতর থেকে একটা হালকা ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে এল। ভেতরে জমে আছে কতদিনের চেনা-অচেনা অতীত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিদিশা নিজে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলেন, তারপর ভেতরে হাত বাড়ালেন।  খোপগুলোয় ধুলোর একটা সূক্ষ্ম আস্তরণ পড়েছে। থরে থরে সাজানো শাড়ি, ভেতর থেকে ভেসে আসছে ন্যাপথলিনের গন্ধ আর পুরোনো কয়েকটা অ্যালবাম। বিদিশা ক্ষণিকের জন্য থমকালেন, তারপর আলতো করে কয়েকটা ভাঁজ করা গরদের শাড়ি সরিয়ে ভেতরের ছোট ড্রয়ারটার দিকে তাকালেন তিনি।  ছোট ড্রয়ারটার চাবিটা সবসময় লুকানো থাকে ওপরের তাকের একটা পুরোনো চশমার বাক্সের ভেতর। বিদিশা অন্ধের মতো হাতড়ে চাবিটা বের করলেন। পিতলের ছোট চাবিটা যখন ড্রয়ারের পুরনো তালায় ঢুকল, একটা চেনা ‘ক্লিক’ শব্দ হলো। শব্দটা নিঝুম ঘরের নিস্তব্ধতাটাকে এক ঝটকায় ভেঙে দিল। ধীরে ধীরে ড্রয়ারটা টানতেই কাঠের চড়চড়ানি আওয়াজ ছাপিয়ে একটা হালকা সুবাস বেরিয়ে এল। ন্যাপথলিনের ঝাঁঝালো গন্ধের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস, শুকনো বকুল ফুলের গন্ধ। ভেতরে রাখা একটা পুরোনো দিনের লোহার বাক্স। ওটার ওপর একটা নকশা করা চাবির গোছা রাখা। এই বাক্সের চাবি। বিদিশা জানেন ওর ভেতরে কী আছে। তার বাক্সটা এখন আর খুলতে ইচ্ছে হল না। তিনি ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিলেন। আলমারির একদম উপরের তাকে, যেখানে তাঁর বাবার দেওয়া কিছু পুরোনো বই আর দলিল রাখা ছিল, সেখানটা পরিষ্কার করার সময় তাঁর হাত একটা ভারী জিনিসের ওপর গিয়ে ঠেকল। এখানে ধুলোর আস্তরণটা অপেক্ষাকৃত পুরু। বিদিশা সাবধানে জিনিসটা টেনে বের করলেন। একটা পুরোনো, জীর্ণ মখমলের বাক্স। লাল রঙের মখমলটা সময়ের প্রলেপে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বাক্সের ওপরের পিতলের হুকটা মরচে ধরা। বাক্সটার ওপর হাত বোলাতেই মখমলের রোমগুলোর উপর পড়া ধুলোর আস্তরণ আঙুলে লেগে গেল।  বিদিশা বাক্সটা নিয়ে এসে বিছানার ওপর বসলেন। সাবধানে মরচে ধরা হুকটা খুলতেই একটা মৃদু ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ হলো। বাক্সের ভেতর থেকে পুরোনো কাগজ আর ন্যাপথলিনের একটা তীব্র গন্ধ ভেসে এল। ভেতরে রয়েছে একটা পুরোনো ফ্রেমের চামড়ায় বাঁধানো ফোটো অ্যালবাম। বিদিশার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে মোচড় দিয়ে উঠল। এটা তাঁর বাবা-মায়ের বিয়ের অ্যালবাম।  অ্যালবামটা হাতে নিয়ে ওপরে জমে থাকা ধুলোটা হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেললেন তিনি। প্রথম পাতায় সোনালি হরফে লেখা -‘আমাদের বিবাহ বাসর, ১৯৮৪’। এটা তাঁর বাবা-মায়ের বিয়ের অ্যালবাম। বিদিশার মা যখন মারা যান, তখন বিদিশার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। মায়ের কোনো স্পষ্ট স্মৃতি তাঁর মনে নেই। অবচেতনে মায়ের যে স্মৃতি তিনি ধরে রেখেছেন, সেটা আবছা, ঝাপসা। বাবার কাছেই তিনি বড় হয়েছেন, কিন্তু বাবা কখনও মায়ের ফোটো বা তার অতীত নিয়ে খুব একটা চর্চা করতেন না। কেন করতেন না, সেটা বিদিশা কোনোদিন জিজ্ঞেস করার সাহস পাননি। বাবার সাথে তার সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। বিদিশা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে অ্যালবামের পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলেন। সাদাকালো আর সেপিয়া টোনের ছবিগুলোয় তাঁর বাবার তরুণ বয়সের অবয়ব ফুটে উঠেছে।  আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক অসম্ভব রূপসী নারী। পাতা উল্টাতে উল্টাতে বিদিশা একবার থমকে স্থির দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল। মায়ের হাসির ধরণ, চোখের চাউনি, নাকের তীক্ষ্ণ গড়ন, ঠোঁটের কোণের চাপা অভিমানী ভঙ্গি... এ তো অবিকল তাঁর নিজের প্রতিবিম্ব!  ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিদিশা হঠাৎ খেয়াল করলেন, অ্যালবামের একদম শেষ পাতার পকেটটা একটু ফোলা। শেষ পাতা উল্টোনোর পর তিনি দেখলেন, ভেতরের পকেটে কিছু আলগা ছবি রাখা আছে। আশ্চর্য ! এগুলো তো তিনি আগে দেখেননি। তিনি ছবিগুলো বের করলেন। এই ছবিগুলোর মায়ের একার, এখানে বাবা অনুপস্থিত। বেশিরভাগই কোন পুরোনো বাগানে বা কোন বনেদি বাড়ির বারান্দায় তোলা। একটা ছবির উল্টো পিঠটা দেখে বিদিশার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। ছবির পেছনের সাদা অংশটা সময়ের নিয়মে কিছুটা হলদেটে হয়ে গেছে। তার ওপর গাঢ় লাল কালির ডট পেন দিয়ে কিছু নম্বর বা কোড লেখা রয়েছে। সেটাও সময়ের প্রভাবে ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। নম্বরগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ছোট ছোট হরফে লেখা: 24.7438° N, 88.5421° E — Vol. III / 104 এই ছবিটা আউটডোর লোকেশনে তোলা। ছবিতে মা একা কোন এক পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার পরনে একটা ভারী কাশ্মীরি শাল, চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত বিষাদের চিহ্ন। এই ধরনের সংখ্যার বিন্যাস বিদিশার চেনা। প্রথম অংশটা স্পষ্টতই কোনো ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক বা জিপিএস কোঅর্ডিনেটস।  কিন্তু, পরের অংশটা কী? কোনো বইয়ের খণ্ড আর পৃষ্ঠা নম্বর? মায়ের ছবির পেছনে এমন রহস্যময় কোড লাল কালিতে কে লিখে রাখতে পারে? বাবা? নাকি মা নিজে? আরেকটা ছবি হাতে নিয়ে সেটা উল্টে দেখতে বিদিশা চমকে উঠলেন। এই ছবির পেছনের সাদা অংশটাতেও গাঢ় লাল কালিতে, অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কিছু নম্বর আর অ্যালফাবেটের কোড লেখা আছে, যার অর্থ আপাতদৃষ্টিতে বোঝা অসম্ভব। কোডটা দেখতে এইরকম: N-54 / B-09 / Vol-IV / Ref: 1986-X বিদিশা একজন গণিতজ্ঞ। সংখ্যার কোনো প্যাটার্ন দেখলে তাঁর মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মানে খুঁজতে শুরু করে। এই কোডটা ফোন নম্বর নয়, কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরও নয়। এটা দেখতে কোনো বড় আর্কাইভ বা লাইব্রেরির ক্যাটালগ নম্বরের মতো।  কিন্তু মায়ের একটা ব্যক্তিগত ছবির পেছনে এমন অফিশিয়াল কোড লাল কালিতে কেন লেখা থাকবে? আগের ছবিটার কো-অর্ডিনেটসগুলোর মানেটাই বা কী ? আর, ‘1986-X’ মানে কী? ১৯৮৬ সাল? তার জন্মের আগের বছর? তিনি তড়িঘড়ি বাক্সের ভেতরের বাকি অংশটা খুঁজতে লাগলেন। অ্যালবামের নিচে তাঁর বাবার পুরোনো আমলের একটা খাকি রঙের ফাইল ছিল। ফাইলের ফিতেটা গলিয়ে খুলতেই ভেতরে কিছু হলদেটে হয়ে যাওয়া আইনি কাগজপত্র আর ল্যান্ড ডিডের নথি বেরিয়ে এল। বিদিশা নথিগুলো একে একে ওল্টাতে লাগলেন। বেশিরভাগই তাঁর বাবার কলকাতার পৈতৃক সম্পত্তির কাগজ। পুরোনো ট্যাক্স রসিদ আর ল্যান্ড ডিডের সাধারণ আইনি নথি। সেখানে নতুন অথবা সন্দেহজনক কিছুই নেই।  তার চোখ দ্রুত আবার ফিরে এলো বিছানায় ছড়ানো ছবিগুলোর দিকে। তিনি আরও দুটি আলগা ছবি তুলে নিলেন। তৃতীয় ছবিটা মায়ের একটা হাফ-প্রোফাইল ক্লোজআপ শট। কিন্তু, ছবির উল্টো পিঠের লেখাটা চেনা প্যাটার্নটা আরও গুলিয়ে দিল।  সেখানে এবার কোন নম্বর নেই, কেবল একটিমাত্র শব্দ লেখা আছে: ‘রাক্ষসী’।  বিদিশার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে এলো।  রাক্ষসী?  তার মায়ের সুন্দর একটা ছবির পেছনে এমন একটা কুৎসিত শব্দ কে লিখে রাখতে পারে? হাত কাঁপলেও কৌতূহল আর অবদমিত উত্তেজনায় বিদিশা আরেকটা ছবিটা উল্টে ধরলেন।  সেখানে লাল কালির ডট পেন দিয়ে লেখা: '১৯৫৩'। তার ঠিক পরের ছবিটার পেছনে লেখা: 'মোহময়ী - ১৯৩৩'। বিদিশা বিছানার ওপর চুপ করে বসে রইলেন।  ১৯৫৩? ১৯৩৩?  ঐ বছরগুলোতে কী ঘটেছিল ? তাঁর বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছে ১৯৮৪ সালে। বিদিশার নিজের জন্ম ১৯৮৮ সালে।  ১৯৩৩ সাল তো তার বাবা-মায়ের জন্মের অনেক আগের কথা ! কী ঘটেছিল ?  বিদিশা মনে করার চেষ্টা করলেন, পারিবারিক সূত্রে তিনি কখনো কিছু শুনেছেন কিনা। তার মাথায় কিছু এল না। আর, এই শব্দগুলো -'রাক্ষসী', 'মোহময়ী'... বিদিশা মায়ের দুটি আলাদা ছবি হাতে তুলে নিয়ে পাশাপাশি রেখে দেখতে লাগলেন। 'রাক্ষসী' আর 'মোহময়ী' কি কোনো নারীর পরিচয়? নাকি এগুলো কোন রূপক ? নাকি কোন সাংকেতিক কোড?  মাথায় ঘুরতে থাকা এই ধাঁধা নিয়েই তিনি আবার প্রথম ছবিটার জিপিএস কোঅর্ডিনেটসের দিকে তাকালেন: 24.7438° N, 88.5421° E।  কি একটা ভেবে বিদিশা দ্রুত খাট থেকে উঠে এসে স্টাডি টেবিল থেকে ল্যাপটপটা তুলে নিলেন। স্ক্রিনটা অন করে কাঁপা আঙুলে ব্রাউজারটা খুললেন।  গুগল ম্যাপের সার্চ বারে সংখ্যাগুলো একে একে টাইপ করলেন : 24.7438, 88.5421 Enter টিপতেই স্ক্রিনের ম্যাপটা জুম হতে শুরু করল। সীমানা পেরিয়ে, কাঁটাতার ডিঙিয়ে ম্যাপের লাল পিনটা গিয়ে থমকে দাঁড়াল একটা বিস্তীর্ণ, নির্জন প্রান্তরের ওপর।  ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে, বাংলাদেশের একটা প্রত্যন্ত এলাকা। বিদিশার ভুরু কুঁচকে গেল।  নওগাঁ? তিনি তড়িঘড়ি উইকিপিডিয়া খুলে বসলেন। স্ক্রিনের নীলচে আলোয় তাঁর চোখ আর্টিকেলের উপর ওঠানামা করতে লাগল। দেশভাগের আগে নওগাঁ ছিল অবিভক্ত রাজশাহী জেলার একটা অংশ, প্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্গত ঐতিহাসিক এক ভূখণ্ড।  কিন্তু ম্যাপের ওই নির্দিষ্ট স্থানাঙ্কটা এর মধ্যে ঠিক কোন জায়গা নির্দেশ করছে?  মানচিত্রে আরও একটু গভীরভাবে খুঁজতে গিয়ে বিদিশার স্ক্রিনে ভেসে উঠল - 'ভাতকুণ্ডু কবরস্থান'।  সাতসকালে বিদিশার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। হোয়াট দ্য হেল ! কবরস্থান?  প্রাচীন বরেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষের কোলে লুকিয়ে থাকা একটা জনমানবহীন সমাধিক্ষেত্র? তাঁর মায়ের তরুণ বয়সের ছবির সাথে সেখানকার কী সম্পর্ক থাকতে পারে?  ল্যাপটপের আলোয় বিদিশা আবার বিছানায় ছড়ানো-ছিটানো ছবিগুলোর দিকে তাকালেন। রহস্যের জটটা খোলার বদলে যেন আরও কয়েক গুণ পেঁচিয়ে গেল। যদি প্রথম ছবির জিপিএস কোঅর্ডিনেটস কোনো কবরস্থানের দিকে নির্দেশ করে, তবে বাকি ছবিগুলোর কোডের মানে কী? ‘N-54 / B-09 / Vol-IV / Ref: 1986-X’ - এটা যদি কোনো আর্কাইভের ফাইল নম্বর হয়, তবে কী সেটা কোন মহাফেজখানায় বন্দি হয়ে আছে ? ১৯৮৬ সালের পাশে ‘X’ চিহ্নটার মানেই বা কী ? বিদিশার মনে হল ঘরটার ভেতরকার বাতাস আচমকাই যেন খুব ভারী হয়ে উঠেছে।  বেলা বেড়েছে, জানলার বাইরে রোদের আলো আরও উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু, বিদিশার মনে হল তিনি যেন এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশটা ঠাণ্ডা, কোথাও একটুও আলো নেই। বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। সার্চ বক্সের লাল পিনটা যেন এই মুহূর্তে তাঁর দিকে চেয়ে উপহাস করছে। কে ছিলেন তাঁর মা? কী এমন তথ্য বাবা এই মখমলের বাক্সের ভেতর লুকিয়ে রেখে গেছেন ? বেডরুমে ফ্যানটার একটানা যান্ত্রিক আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। বিদিশা ছবিগুলো বুকের কাছে চেপে ধরে জানলার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
Parent