মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৫২

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6269459.html#pid6269459

🕰️ Posted on Tue Jul 21 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2386 words / 11 min read

Parent
৫ সুরঙ্গনা = স্বর্গীয় নারী, অপ্সরা। সায়েন্স টাওয়ারের কাঁচের দরজার ঠিক সামনে এসে অয়ন এক মুহূর্তের জন্য থামল। কাঁচের প্রতিফলনে সে নিজের মুখটা শেষবারের মতো একবার দেখল। তার মুখের ফিকে হয়ে আসা হলদেটে কালশিটের দাগ আর ফাটা ঠোঁটের ওপর ঝকঝকে রোদ এসে পড়ছে। অয়ন শান্তভাবে একটা লম্বা শ্বাস নিল। গত এক মাসের স্বেচ্ছানির্বাসন, পাগলামি, ইগোর লড়াই সব সে ক্লাসে আসার পথে লেকের শান্ত জলে বিসর্জন দিয়ে এসেছে। গত একমাস পর অয়ন আজ আবার নিজের ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিংয়ে পা রাখছে। ও জানে, ক্লাসে ভেতরে ঢোকার পর থেকেই ওর দিকে অজস্র চোখ ঘুরে যাবে। ওর মুখের এই দাগগুলো নিয়ে ফিসফাস হবে, ওকে নিয়ে আবার নতুন নতুন গসিপ তৈরি হবে। বিক্রম মালহোত্রার ছড়ানো মিথ্যে গল্পগুলো স্টুডেন্টদের মনে হয়তো ওকে একটা 'সাইকো' অথবা 'গুন্ডা' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু, সেসবে আজ অয়নের কিছু যায় আসে না। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর চোখের স্থির দৃষ্টিটা আরো একবার ধারালো হয়ে উঠল। অয়ন সোজা সায়েন্স টাওয়ারের কাঁচের স্লাইডিং দরজাটা ঠেলে বিল্ডিংয়ের ভেতরে পা রাখল। ভেতরে ঢুকতেই সেন্ট্রাল এসির কনকনে ঠান্ডা ওকে স্বাগত জানাল। মেইন বিল্ডিংয়ের করিডোরে এসময় একটা গমগমে ব্যাপার থাকে, এখানে সেটা নেই।  এখানকার পরিবেশটা অনেক বেশি সিরিয়াস, চুপচাপ। করিডোরের মেঝেগুলো সাদা মার্বেলের। ছাদ থেকে আধুনিক এলইডি প্যানেল ঝুলছে।  এই শান্ত পরিবেশে চকচকে ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝেতে ওর স্নিকার্সের শব্দটা একটা মৃদু প্রতিধ্বনি তুলল।  অয়ন লিফটের দিকে না গিয়ে চওড়া সিঁড়িটা ধরল। তার ফিজিক্স ক্লাসটা ফোর্থ ফ্লোরে, গ্যালারি থ্রি-বিতে। ফিজিক্সের ফার্স্ট সেমিস্টারের থিওরি ক্লাসগুলো সাধারণত সায়েন্স টাওয়ারের ফোর্থ ফ্লোরে হয়। সে এতদিন পর ক্লাসে ফিরছে।  অথচ সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তার মনের ভেতর ভয় বা অস্বস্তির জায়গায় একটা অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছিল।  ফোর্থ ফ্লোরে পৌঁছে অয়ন করিডোর ধরে হাঁটা লাগাল। করিডোরটা বেশ চওড়া। এখানে কোথাও কোন জটলা নেই, সবকটা রুমেই ক্লাস চলছে। গ্যালারি থ্রি-বি এর ভারী অ্যাকোস্টিক দরজাটা বন্ধ। ভেতরে ক্লাস চলছে। অয়ন ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।  ভেতর থেকে অত্যন্ত কনফিডেন্ট হাস্কি নারী কণ্ঠ মাইক্রোফোনের মাধ্যমে ভেসে আসছে। অয়ন এক মুহূর্তের জন্য সেখানে থমকে দাঁড়াল। সে জানে ভেতরে কে ক্লাস করাচ্ছেন। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে চর্চিত, সায়েন্স জোনের অন্যতম সুন্দরী, স্টুডেন্টদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্টুডেন্টদের আড্ডায় যার নাম 'সেক্সি ব্যানার্জী'। অয়ন ভারী কাঠের দরজাটায় হাত রাখল। তারপর অত্যন্ত শান্তভাবে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দরজার কব্জায় সামান্য ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হলো। বিশাল গ্যালারি-স্টাইলের লেকচার থিয়েটার। ধাপে ধাপে ওপরে উঠে গেছে সারি সারি ডেস্ক আর বেঞ্চ। অন্তত ষাট-সত্তর জন স্টুডেন্ট বসে আছে। আর একদম নিচে, বিশাল হোয়াইটবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সুরঙ্গনা ব্যানার্জী। দরজার আওয়াজে পুরো ক্লাসের সাথে সাথে সুরঙ্গনাও হোয়াইটবোর্ড থেকে মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালেন। অয়নের চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল সুরঙ্গনার ওপর। ঊনত্রিশ বছরের জীবন্ত একটি অগ্নিশিখা এই মুহূর্তে হোয়াইটবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সুরঙ্গনার পরনে একটা অফ-হোয়াইট রঙের স্লিভলেস শাড়ি, যার পাড়ে সরু কালো জিগজ্যাগ প্রিন্ট। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা একটা ডিপ-কাট, কালো রঙের স্লিভলেস ব্লাউজ। তার গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ কিন্তু সেই রঙের মধ্যে একটা অদ্ভুত মোহময়ী ভাব আছে। টিকালো নাক, বড় টানা টানা চোখ, যাতে সবসময়কার মতোই আজকেও মোটা করে আইলাইনার দেওয়া। তার ভরাট, আকর্ষণীয় ঠোঁটে একটা ডার্ক মেরুন লিপস্টিক। যেহেতু তিনি একজন ট্রেন্ড ক্লাসিক্যাল এবং কনটেম্পোরারি ডান্সার, তাই তার ফিগার অত্যন্ত টোনড আর নমনীয়। শাড়ির আঁচলটা একটু অযত্নেই কাঁধ থেকে নেমে কোমরের কাছে গোঁজা, যার ফলে তার নির্মেদ, ফ্ল্যাট পেট আর নাভির ওপরের মসৃণ ত্বক স্পষ্ট দৃশ্যমান। তার সুগঠিত থাই আর কোমরের নিখুঁত বাঁক (৩৪-২৬-৩৬) শাড়ির ভাঁজেও যেন এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করে রেখেছে। তার ডান হাতে একটা মার্কার পেন। হোয়াইটবোর্ডের ওপর জ্বলজ্বল করছে থার্মো-ডায়নামিক্স এবং স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্সের এনট্রপি-র ইকুয়েশন। ক্লাসের ভেতর পিন-ড্রপ সাইলেন্স বিরাজ করছিল তাই দরজা খোলার শব্দটা লেকচার থিয়েটারের অ্যাকোস্টিক পরিবেশে বেশ জোরেই প্রতিধ্বনিত হলো। সুরঙ্গনা ম্যাডাম মার্কারটা হোয়াইটবোর্ডের ওপর রেখেই ঘাড় ঘোরালেন। গ্যালারির একশো জোড়ার উপর চোখ একযোগে দরজার দিকে ঘুরে গেল। দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন। মুখে হলদে কালশিটের দাগ, ফাটা ঠোঁট আর নিস্পৃহ চোখ। নিস্তব্ধ ক্লাসরুমের পরিবেশ এক ঝটকায় ভারী হয়ে উঠল। সুরঙ্গনার আইলাইনার টানা চোখদুটো অয়নের মুখের ওপর স্থির হলো। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অয়নের মুখের হলুদ কালশিটে, ফাটা ঠোঁট আর ছড়ে যাওয়া কপালটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে স্ক্যান করে নিল। কিন্তু তার চোখে কোনো বিস্ময় অথবা বিরক্তি ফুটল না, বরং একটা প্রচ্ছন্ন কৌতূহল ফুটে উঠল। ফেস্টের আগে এই চুপচাপ ছেলেটাকে ক্লাসে প্রশ্ন করে ঘাঁটাতে তার বেশ লাগত।  "মে আই কাম ইন, ম্যাম?" অয়ন তার ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল। সুরঙ্গনা তার মার্কার পেনটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে একটা পা সামান্য বাঁকিয়ে দাঁড়ালেন। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটার মধ্যে এমনিই একটা সেক্সি রিদম বা দুলুনি আছে। এই মার্কার পেনটা নিয়ে যখন তিনি বোর্ডের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাঁটেন, তার ছন্দবদ্ধ সহজাত দুলুনি দেখে ক্লাসের ছেলেদের হার্টবিট বেড়ে যায়। "ওয়েল, ওয়েল..." সুরঙ্গনার গলার স্বরটা গমগম করে উঠল লেকচার থিয়েটারে। তার ভয়েসটা একটু হাস্কি, একটু খাদে নামানো, "লুক হু ডিসাইডেড টু গ্রেস আস উইথ হিজ প্রেজেন্স টুডে। মিস্টার চ্যাটার্জী।" সুরঙ্গনা ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন, "আমি তো ভাবছিলাম, আপনি বোধহয় আমাদের এই বোরিং ফিজিক্স ক্লাস থেকে পাকাপাকিভাবে সন্ন্যাস নিলেন। ভেতরে আসুন।" অয়ন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে গ্যালারির সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। পুরো ক্লাস তখন ঘাড় ঘুরিয়ে অয়নকে দেখছে। ফার্স্ট বেঞ্চে বসে আছে বৈশালী চৌধুরী। অয়ন ওর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বৈশালী চরম বিরক্তি নিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। অয়ন সেদিকে চেয়ে দেখল না। ও জানে বৈশালী কেন রেগে আছে। কিন্তু, তাতে ওর কিছু যায় আসে না। মাঝখানের একটা বেঞ্চে বসে আছে রজত আগরওয়াল, বা সিধু। বড়লোকের ছেলে, কিন্তু স্বভাবে একটু ভীতু। সে এইমুহূর্তে অয়নের মুখের কালশিটেগুলোর দিকে প্রায় হাঁ করে তাকিয়ে আছে। আর গ্যালারির একটু ওপরের দিকে বসে আছে উজ্জয়িনী মিত্র। সে এই মুহূর্তে হাতের পেনটা গালে ঠেকিয়ে খুব ইন্টারেস্ট নিয়ে অয়নকে দেখছে। অয়ন কোন দিকে না তাকিয়ে গ্যালারির একদম ওপরের দিকে, লাস্ট বেঞ্চের জানলার ধারের তার চিরপরিচিত কর্নার সিটটায় গিয়ে বসল। সে নিজের স্পোর্টস ব্যাগটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসল এবং তার শান্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সোজা হোয়াইটবোর্ডের উপরে। সুরঙ্গনা অয়নের বসে যাওয়া পর্যন্ত তার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। অয়ন বসতেই তিনি আবার বোর্ডের দিকে ঘুরলেন। "সো, ক্লাস..." সুরঙ্গনা তার সেই হাস্কি গলায় আবার শুরু করলেন। তার হাঁটার সময় শরীরের সেই সহজাত, ছন্দবদ্ধ দুলুনিটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।  "যেটা বলছিলাম। এনট্রপি। S = k_B \ln \Omega। বোল্টজম্যান আমাদের শিখিয়েছেন যে, এই মহাবিশ্বের আসল নিয়ম হলো বিশৃঙ্খলা বা ডিসঅর্ডার। একটা আইসোলেটেড সিস্টেমের এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলা সবসময় বাড়ে। \Delta S_{universe} \ge 0।" সুরঙ্গনা হঠাৎ করেই কথা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা লাস্ট বেঞ্চে বসা অয়নের চোখের দিকে তাকালেন।  তার ঠোঁটের কোণে একটা অর্থবহ হাসি ফুটে উঠেছে। "ইন ফ্যাক্ট, ফিজিক্সের বাইরে গিয়ে যদি আমরা হিউম্যান নেচার বা রিয়েল লাইফ সিস্টেমের দিকে তাকাই... সেখানেও কিন্তু এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলা কমানো যায় না। কোনো আইসোলেটেড, রাগী সিস্টেমকে বাইরে থেকে ফোর্স না দিলে তার ভেতরের কেওস বা বিশৃঙ্খলা বাড়তেই থাকে... তাই না, মিস্টার চ্যাটার্জী?" ক্লাসের অনেকেই সুরঙ্গনার এই ডাবল-মিনিং কথাটা বুঝতে পেরে মুখ টিপে হাসল। সুরঙ্গনা ফিজিক্সের থিওরি দিয়ে ফেস্টের রাতে অয়নের সেই আচরণকে টার্গেট করে একটা টিপ্পনী ছুঁড়ে দিলেন। অয়নের মুখের পেশি এক চুলও নড়ল না। সে সুরঙ্গনার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় উত্তর দিল, "আপনি ইকুয়েশনটার অর্ধেকটা বললেন, ম্যাম। বিশৃঙ্খলা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু আমরা যদি সিস্টেমের ওপর এক্সটার্নাল ওয়ার্ক ডান (External work done) করি, মানে বাইরে থেকে সঠিক কাজ বা এনার্জি অ্যাপ্লাই করি, তাহলে একটা পার্টিকুলার লোকাল সিস্টেমের এনট্রপি কমানো যায়। ডিসঅর্ডার থেকে আবার অর্ডারে ফিরে আসা যায়।" উত্তরটা শুনে পুরো ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গেল। যারা বাঁকা হাসছিল তাদের মুখের হাসি মুছে গেল। কেউ আশা করেনি লাস্ট বেঞ্চে বসা, একমাস পরে ক্লাসে দেখা দেওয়া একটা ছেলে সুরঙ্গনা ব্যানার্জীকে এভাবে মুখের ওপর ফিজিক্স দিয়ে লজিক্যাল কাউন্টার করবে।  ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে বৈশালী অবাক হয়ে পেছনে অয়নের দিকে তাকাল। অয়ন সেটা বুঝতে পারলেও মুখের ভাবে কিছু প্রকাশ করল না। সে সুরঙ্গনার দিকে চেয়ে রইল। সুরঙ্গনার আইলাইনার টানা চোখদুটো এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ে প্রসারিত হলো।  তারপর, তার ঠোঁটের হাসিটা আরো চওড়া হয়ে উঠল। অয়নের বুদ্ধিদীপ্ত আর আপসহীন মনোভাব সুরঙ্গনার ভীষণ ভালো লাগল। এই ছেলেটার ব্রেন আর মাসলের কম্বিনেশন তাকে সত্যিই ইমপ্রেস করেছে। "টাচে (Touché), মিস্টার চ্যাটার্জী। এক্সিলেন্ট পয়েন্ট।"  সুরঙ্গনা হাসিমুখে বলে আবার বোর্ডের দিকে ঘুরলেন।  "লুকস লাইক সামওয়ান ডিডন'ট লুজ হিজ ব্রেইন সেলস ইন দ্য ফাইট।" এরপর বাকি ক্লাসটা অত্যন্ত স্মুথলি চলল।  সুরঙ্গনা তার স্বভাবসিদ্ধ এনার্জি আর রিদমিক মুভমেন্ট নিয়ে থার্মোডায়নামিক্সের লেকচার শেষ করলেন। "দ্যাটস অল ফর টুডে"  সুরঙ্গনা হাতের মার্কারটা ডেস্কে রেখে বললেন। স্টুডেন্টরা সঙ্গে সঙ্গেই বইপত্র গুছিয়ে একে একে উঠতে শুরু করল। অয়নও নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে গ্যালারির সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। সে যখন দরজা দিয়ে বেরোতে যাবে, ঠিক তখনই সুরঙ্গনা তাকে পেছন থেকে ডাকলেন। "মিস্টার চ্যাটার্জী। জাস্ট আ মিনিট।" অয়ন থেমে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। সুরঙ্গনা ততক্ষণে নিজের ফোল্ডারটা হাতে গুছিয়ে নিয়েছেন। স্টুডেন্টরা প্রায় সবাই বেরিয়ে গেছে। "আপনি যাওয়ার আগে একবার আমার কেবিনে দেখা করে যাবেন,"  সুরঙ্গনা সরাসরি অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন। তার গলায় কোনো রিকোয়েস্ট নেই, একটা ডিরেক্ট কমান্ড। কথাটা বলে তিনি নিজের স্লিভলেস ব্লাউজের ভাঁজটা একটু ঠিক করে নিয়ে তার স্বভাবসিদ্ধ হিল-দোলানো চালে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। অয়ন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্পোর্টস ব্যাগটা কাঁধে অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে সুরঙ্গনার কেবিনের দিকে পা বাড়াল। সায়েন্স টাওয়ারের সিক্সথ ফ্লোরে সুরঙ্গনার কেবিন। দরজা খোলাই ছিল। অয়ন দরজায় দাঁড়িয়ে নক করল। "কাম ইন", ভেতর থেকে সুরঙ্গনার গলা ভেসে এল। অয়ন ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতর একটা হালকা, রিফ্রেশিং সিট্রাস পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। সুরঙ্গনা ব্যানার্জীর কেবিনটা তার পার্সোনালিটির মতোই পরিপাটি এবং মডার্ন।  কাঁচের জানলা দিয়ে রোদ এসে সুরঙ্গনার ডেস্কের ওপর পড়েছে। ডেস্কে কোথাও কোনো অপ্রয়োজনীয় কাগজের একটা টুকরো অবধি নেই। একটা ম্যাকবুক, ফিজিক্সের কয়েকটা রেফারেন্স বুক, আর একপাশে একটা ছোট্ট ক্রিস্টালের ভাস।  সুরঙ্গনা নিজের চেয়ারে একটু আয়েশ করে বসে আছেন। শাড়ির আঁচলটা তার কাঁধ থেকে সামান্য সরে বক্ষভাঁজের একটা আভাস তৈরি করেছে, কিন্তু সেটা নিয়ে সুরঙ্গনার মধ্যে বিন্দুমাত্র সচেতনতার লক্ষণ নেই। তিনি এই বোল্ডনেসটাকে নিজের পাওয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে জানেন। অয়ন ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। "বোসো" অয়ন স্পোর্টস ব্যাগটাকে কোলের ওপর রেখে সামনের চেয়ারটায় বসল। সুরঙ্গনা ডেস্কের ওপর দুই হাতের কনুই রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন। তিনি কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বললেন না। তার বড়, আইলাইনার টানা চোখ দিয়ে তীক্ষ্ণভাবে অয়নকে স্ক্যান করলেন। তার মুখের হলুদ কালশিটে, ফাটা ঠোঁট, কপালের ছড়ে যাওয়া দাগ আর সবচেয়ে বড় কথা, তার চোখের দৃষ্টি। এক মাস আগে এই ছেলেটার চোখে একটা চাপা লাজুক ভাব ছিল। আজ সেখানে পাথরের মতো কঠিন ভাব। তার ঠোঁটের কোণে একটা মোহময়ী হাসি ফুটে উঠল। "কী ব্যাপার হিরো?"  সুরঙ্গনার হাস্কি গলাটা নিস্তব্ধ কেবিনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভাইব্রেশন তৈরি করল। "কোন সিনেমায় ভিলেন পেটালে?" অয়ন তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত করে রইল। সুরঙ্গনা নিজের চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে একটা কলম আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন,  "শুনলাম, তুমি স্টুডেন্ট কাউন্সিলকে সাইজ করেছ। দ্যাট ওয়াজ কোয়াইট আ শো অ্যাট দ্য ফেস্ট। পুরো ক্যাম্পাসে তো এখন তোমার নামে মিথ তৈরি হয়ে গেছে।" কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে তিনি কলমটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন, কিন্তু তার চোখের সেই চটুল দৃষ্টিটা গেল না। "কিন্তু এই হ্যান্ডসাম মুখটার এই হাল করেছ কেন?"  সুরঙ্গনা তার ভরাট ঠোঁট সামান্য উল্টে, ঢং করে একটু আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলেন।  "জানো, তোমার এই মুখটা দেখে ক্লাসের অর্ধেক মেয়ের রাতে ঘুম হয় না? আর তুমি সেটাকে পাঞ্চিং ব্যাগ বানিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ?" অয়ন নিজের স্পোর্টস ব্যাগের স্ট্র্যাপটা শক্ত করে ধরল।  "এটা ভিলেন পেটানোর দাগ নয়, ম্যাম। আমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল।"  অয়ন অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে, ফ্ল্যাট গলায় উত্তর দিল।  সুরঙ্গনা খিলখিল করে হেসে উঠলেন।  "রাইট। তুমি অ্যাক্সিডেন্ট করেছ আর আমি ফিজিক্স পড়ানো ছেড়ে সাইকোলজি পড়ানো শুরু করেছি।"  কথাটা বলে তিনি চোখ টিপলেন।  কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই, কোন মন্ত্রবলে, তাঁর মুখের সেই চপল হাসিটা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। হাসিটা থামিয়েই তিনি সরাসরি অয়নের চোখের দিকে তাকালেন।  চোখের পলক ফেলার আগেই, এক লহমায় তার মুখের ভাব পাল্টে গেল। সেখানে এখন আর কোন কৌতুক নেই। তার গলার স্বর একদম প্রফেশনাল এবং সিরিয়াস, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, "এনিওয়ে, আমি তোমার পার্সোনাল লাইফে নাক গলাতে চাই না। আমি তোমাকে ডেকেছি তোমার অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্সের জন্য। তুমি আমার ক্লাসের অন্যতম ব্রাইট স্টুডেন্ট। কিন্তু, গত এক মাস ধরে তুমি আমার ক্লাসে অ্যাবসেন্ট।" কথা বলতে বলতে সুরঙ্গনা একটু সামনে ঝুঁকলেন। "ল্যাব প্র্যাকটিক্যালগুলোতে তোমার অ্যাটেনডেন্স জিরো। ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টে তোমার খারাপ মার্কস এসেছে। আর কদিন বাদেই সেমিস্টার এক্সাম। এই হিরোগিরি আর মারপিট করে তুমি যদি ভাবো যে সেমিস্টারের ফুল মার্কস পেয়ে যাবে, তাহলে তুমি ভুল ভাবছ।" অয়ন সোজা হয়ে বসল। "আমি কোনো এক্সকিউজ দিচ্ছি না, ম্যাম। আমার যত ক্লাস মিস হয়েছে, আমি এক সপ্তাহের মধ্যে ল্যাব আর থিওরি, দুটোরই নোটস আর অ্যাসাইনমেন্ট কভার করে নেব।" সুরঙ্গনা একটু অবাক হলেন। তিনি আশা করেছিলেন ছেলেটা হয়তো অজুহাত দেবে, 'ম্যাম আমার ওপর দিয়ে খুব প্রেশার যাচ্ছে' বা 'আমাকে একটু সময় দিন'।  কিন্তু অয়নের স্ট্রেটকাট, নো-ননসেন্স জবাবটা তাকে ইমপ্রেস করল। "গুড। আই লাইক দ্যাট অ্যাটিটিউড", সুরঙ্গনা ডেস্কের ড্রয়ার থেকে একটা মোটা স্পাইরাল বাইন্ডিং করা ফাইল বের করে অয়নের দিকে এগিয়ে দিলেন। "এখানে গত এক মাসের সমস্ত ক্লাসনোটস, অ্যাসাইনমেন্ট আর ডেরিভেশনগুলো আছে। আগামী সোমবারের মধ্যে এই অ্যাসাইনমেন্টগুলো সলভ করে তুমি আমার ডেস্কে জমা দেবে। আর ল্যাবের জন্য মিস্টার পালের সাথে কথা বলে তোমার পেন্ডিং এক্সপেরিমেন্টগুলো ক্লিয়ার করে নেবে।" অয়ন একটু অবাক হলো। একজন টিচার, যিনি তার স্টুডেন্টদের সাথে ক্লাসের বাইরে খুব একটা পার্সোনাল লেভেলে মেশেন না, তিনি নিজে থেকে এত দরদ দেখিয়ে তার জন্য নোটস ফটোকপি করিয়ে রেখেছেন ? "থ্যাংক ইউ, ম্যাম" অয়ন ফাইলটা হাতে নিল। "জাস্ট থ্যাংক ইউ?" সুরঙ্গনা একটু সামনে ঝুঁকলেন।  "বিনিময়ে কিন্তু আমার সেমিস্টারে টপ গ্রেড চাই, মিস্টার চ্যাটার্জী। আমি আমার ইনভেস্টমেন্টের রিটার্ন খুব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিই।" অয়ন ফাইলটা হাতে নিল।  "আমি সোমবারের আগেই সাবমিট করে দেব, ম্যাম। থ্যাংক ইউ।" সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। "আর একটা কথা, চ্যাটার্জী", অয়ন দরজার দিকে পা বাড়াতেই সুরঙ্গনা তাকে পেছন থেকে ডাকলেন। অয়ন ঘুরে দাঁড়াল। সুরঙ্গনা আবার চেয়ারে হেলান দিয়েছেন। তার মুখে সেই মোহময়ী হাসিটা আবার ফিরে এসেছে। তিনি অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম, কিন্তু অর্থপূর্ণ গলায় বললেন, "ক্যাম্পাসের পলিটিক্সে যারা খুব বেশি মাথা গলায়, তারা সাধারণত বেশিদিন সারভাইভ করতে পারে না। তুমি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। নিজের ব্রেনটাকে ফিজিক্সে কাজে লাগাও, স্ট্রিট-ফাইটে নয়। আর হ্যাঁ..." কথা বলতে বলতে সুরঙ্গনা নিজের চোখদুটো একটু সরু করলেন, "মুখের ওই দাগগুলোতে একটু বরফ ঘষো। দাগগুলো ফেড হয়ে গেলে তোমাকে আবার আগের মতোই হ্যান্ডসাম লাগবে।" অয়ন কয়েক সেকেন্ড সুরঙ্গনার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মহিলা নামে 'সেক্সি ব্যানার্জী' হলেও, বাস্তবে ইনি ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন এবং ক্যাম্পাসের পালসটা খুব ভালো বোঝেন। সে ভদ্রতার খাতিরে মাথা নামিয়ে শান্ত গলায় বলল বলল, "আই উইল কিপ দ্যাট ইন মাইন্ড, ম্যাম। থ্যাংক ইউ ফর দ্য অ্যাডভাইস। আসছি।" কথাটা বলে সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সে ঘুরে সোজা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সুরঙ্গনা ব্যানার্জী কয়েক মুহূর্ত বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি সাধারণত কোনো স্টুডেন্টকে এতটা ফেভার করেন না। যে ছেলে একমাস ক্লাস বাঙ্ক করে, তাকে তো সোজা এইচওডি-র কাছে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত।  কিন্তু অয়নের ব্যাপারটাই আলাদা।  সুরঙ্গনা এতক্ষণ ওর সাথে কথা বললেন, ফ্লার্ট করারও চেষ্টা করলেন। কিন্তু, ওর চোখের দৃষ্টি একবারের জন্যও সুরঙ্গনার বুকের খাঁজের দিকে ঘুরে যায়নি, শাড়ির ফাঁক দিয়ে অনাবৃত কোমরে উঁকি মারেনি। ছেলেটা কারোর তোয়াক্কা করে না, যেন কারোর কাছে ওর নিজেকে প্রমাণ করার দায় নেই। এই 'ব্যাড বয়' ইমেজের নিচে যে একটা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা লুকিয়ে আছে, সেটা সুরঙ্গনা দেখতে পান।সবকিছুর প্রতি ওর ওই ডেভিল-মে-কেয়ার অ্যাটিটিউড সুরঙ্গনার মনস্তত্ত্বে অদ্ভুতভাবে সুড়সুড়ি দেয়। সুরঙ্গনা চেয়ারে হেলান দিয়ে নিজের ল্যাপটপটা আবার খুললেন। তার আকর্ষণীয়, ভরাট ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময়, তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি ঠোঁট কামড়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠলেন। "ইন্টারেস্টিং... ভেরি ইন্টারেস্টিং।"
Parent