মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৫৩
৬
দুপুর তিনটে
ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার হাব, আর্টস অ্যান্ড কমার্স জোন।
ক্যাম্পাসের পশ্চিম দিকে অবস্থিত আর্টস ও কমার্স জোন। মেইন হেরিটেজ বিল্ডিং বা সায়েন্স টাওয়ারের নিস্তব্ধ, গুরুগম্ভীর পরিবেশের চেয়ে এখানকার হাওয়াটা বেশ অন্যরকম। এখানে সবসময় একটা ক্যাজুয়াল ভাইব থাকে।
শীতের পড়ন্ত বেলার সোনালি, তেরছা রোদ 'ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার হাব'-এর বিশাল গথিক জানলাগুলো ভেদ করে ভেতরে এসে পড়ছে। এই বিল্ডিংয়ের একতলায় রয়েছে কলেজের অন্যতম বৃহৎ লেকচার গ্যালারি।
গ্যালারিটা অনেকটা অ্যাম্ফিথিয়েটারের আদলে তৈরি। সারি সারি সেগুন কাঠের পালিশ করা বেঞ্চ ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে। হাই-সিলিং, অ্যাকোস্টিক প্যানেল লাগানো দেওয়াল আর বিশাল সব জানলা দিয়ে আসা শীতের পড়ন্ত বেলার সোনালি, তেরছা রোদের আলোয় পুরো গ্যালারিতে ধুলোর কণাগুলো তিরতির করে উড়ছে।
আজ এই বিশাল লেকচার গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। তিল ধারণের জায়গা নেই। ফার্স্ট সেমিস্টারের ফাইনাল এক্সাম আসতে আর মাত্র একমাস বাকি। এই কলেজে 'অ্যাবিলিটি এনহ্যান্সমেন্ট কম্পালসারি' (AEC) সাবজেক্ট হিসেবে ইংরেজি সবার জন্যই বাধ্যতামূলক। সারা সেমিস্টার ধরে যারা এই ক্লাসটাকে অবজ্ঞা করে কাটিয়েছে, তারা সবাই আজ অ্যাডমিট কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় পঁচাত্তর শতাংশ অ্যাটেনডেন্সের ভয়ে সুড়সুড় করে গ্যালারিতে এসে হাজির হয়েছে।
গ্যালারির মাঝামাঝি একটা বেঞ্চে বসে ছিল চন্দ্রিমা সেন।
তার চোখেমুখে চরম বিরক্তি আর অসহিষ্ণুতার ছাপ স্পষ্ট। আজ তার পরনে একটা অফ-শোল্ডার মভ রঙের রিভ ব্লেন্ডেড টপ আর স্কিনি ফিট ব্ল্যাক জিন্স। নিখুঁত মেকআপ, ঠোঁটে গ্লসি পিঙ্ক লিপস্টিক, আর খোলা চুলে ব্লো-ড্রাই করা পারফেক্ট বাউন্স। তার শরীর থেকে ভেসে আসছে দামি ক্রিশ্চিয়ান ডিওর পারফিউমের মোহময়ী সুবাস। কিন্তু, তার এই মোহময়ী রূপের তারিফ করার মতো তার নিজস্ব গ্যাংয়ের কোনো বন্ধুই আজ ক্লাসে নেই। সবাই প্রক্সি দেওয়ার আশায় বাঙ্ক করেছে, কিন্তু চন্দ্রিমা রিস্ক নিতে চায়নি।
তার কাছে এই ক্লাসটা আক্ষরিক অর্থেই একটা টর্চার। কানায় কানায় পূর্ণ বিশাল গ্যালারির গুমোট আবহাওয়া, চারপাশের ছেলেমেয়েগুলোর ফিসফিসানি আর একটানা চলা লেকচার তার ধৈর্য্য আর স্নায়ু দুটোর উপরেই চাপ ফেলছে।
তার বাঁ পাশের সিটটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। সেখানে সে অত্যন্ত অত্যন্ত অবহেলায় নিজের দামী 'লুই ভিতোঁ' (Louis Vuitton) ডিজাইনার ব্যাগটা রেখে দিয়েছে। গ্যালারিতে এত ভিড়, অনেক স্টুডেন্ট জায়গা না পেয়ে পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কারোর সাহস হয়নি চন্দ্রিমাকে ওই ব্যাগটা সরাতে বলার। কলেজের 'কুইন বি'-কে ঘাঁটানোর সাহস সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নেই।
চন্দ্রিমা একটা তাচ্ছিল্যের শ্বাস ফেলে নিজের আইফোন প্রো-ম্যাক্সের স্ক্রিনে ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করছিল। ক্লাসের দিকে তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। ঠিক সেই সময়, তার কানের খুব কাছে একটা হিমশীতল, রূঢ় কণ্ঠস্বর আছড়ে পড়ল।
"ব্যাগটা সরাও।"
গলার স্বরটায় ভদ্রতার লেশমাত্র নেই। আওয়াজটা এতটাই অপ্রত্যাশিত এবং কমান্ডিং ছিল যে, চন্দ্রিমা চমকে উঠে ওর হাত থেকে আইফোনটা প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল। রাগে ওর চোখদুটো জ্বলে উঠল। কার এত বড় সাহস যে চন্দ্রিমা সেনকে অর্ডার করে?
সে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে, চোখ পাকিয়ে মুখ তুলে রাসকেলটাকে কিছু একটা বলতে যাবে বলে মুখটা তুলল। কিন্তু, কণ্ঠস্বরের মালিকের দিকে তাকিয়ে তার গলার স্বর গলার ভেতরেই রয়ে গেল।
ওর চোখের তারা বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। শ্বাস-প্রশ্বাস এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
অয়ন চ্যাটার্জী!
গত এক সপ্তাহ ধরে চন্দ্রিমা পাগলের মতো ওর খোঁজ করার চেষ্টা করেছে। স্নেহার কাছ থেকে সেন্ট্রাল কলকাতায় অয়নের দেখা মেলার কথা শোনার পরে সে নিজের সোর্স লাগিয়ে অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওখানে অয়নের কোনো হদিস সে পায়নি। লাইব্রেরিতেও তো ওকে দেখা যায়নি, খেলার মাঠেও না।
আর আজ... এখন... এই বোরিং, গুমোট লিটারেচার গ্যালারিতে সে কিনা ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে?
(ফ্ল্যাশব্যাক: কয়েক ঘণ্টা আগে)
ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সুরঙ্গনা ম্যাডামের কেবিন থেকে বেরোনোর পর অয়ন সায়েন্স টাওয়ারের করিডোর ধরে হাঁটছিল। তার হাতে একটা বেশ মোটা ফাইল, যার ভেতরে গত এক মাসের ফিজিক্সের মিসড ক্লাসের নোটস আর অ্যাসাইনমেন্ট।
তার মুখের বাঁ দিকের ফিকে হয়ে আসা কালশিটে দাগ আর ফাটা ঠোঁট দেখে করিডোরের অন্যান্য স্টুডেন্টরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল। কেউ কেউ ভয়ে রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছিল।
ফেস্টের রাতের ঘটনা পুরো ক্যাম্পাসে অয়নের একটা 'ডেঞ্জারাস' ইমেজ তৈরি করেছে।
সুরঙ্গনা ম্যাডামের হাসি আর তাকে 'হিরো' বলে ডাকার বিষয়টা অয়নকে কিছুটা ভাবিয়েছিল। অন্য কোনো টিচার হলে এই কালশিটে পড়া মুখের জন্য জেরা করত, প্রিন্সিপালের কাছে পাঠিয়ে দিত। কিন্তু উনি উল্টে তাকে সাহায্য করলেন।
কেন?
অয়ন অবশ্য সেটা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবল না। তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা কাজ করছে।
সায়েন্স ব্লক থেকে বেরিয়ে অয়ন ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়েছিল। এক কাপ ব্ল্যাক কফি আর দুটো স্যান্ডউইচ নিয়ে সে নোটস কপি করার কাজে লেগে গিয়েছিল। সেখানে আজ একাই লাঞ্চ করেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে তার মনের ভেতর যে শান্ত, স্থির পরিবর্তনটা এসেছে, সেটাকে সে আজ প্রথম ক্যাম্পাসের কোলাহলের মাঝে টেস্ট করছিল।
লাঞ্চের পর কোণের দিকের একটা টেবিলে বসে সে নিজের ফোনে ক্লাসের রুটিনটা চেক করছিল।
দুপুর দুটোর দিকে তার ফোনে ডিপার্টমেন্টের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে একটা নোটিফিকেশন আসে।
ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার হাবে বিকেল তিনটেয় AEC ইংলিশ ক্লাস। ফাইনাল এক্সামের আগে সবকটা ব্যাচকে একসাথে মার্জ করা হয়েছে।
অ্যাটেনডেন্স বাধ্যতামূলক।
তার মনে পড়ল, সেমিস্টার শুরু হওয়ার পর থেকে সে AEC ক্লাস হাতে গোনা দু-একবার করেছে। ফিজিক্স, ম্যাথ ম্যানেজ হয়ে গেলেও, এই কম্পালসারি পেপারটায় অ্যাটেনডেন্স শর্ট থাকলে অ্যাডমিট কার্ড আটকে দেবে।
সে নোটিশ বোর্ডে চেক করে জানতে পারল, পরীক্ষার আর মাত্র একমাস বাকি থাকায়, সিলেবাস দ্রুত রিভিশন করানোর জন্য এই সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে। আজকেই প্রথম ক্লাস।
অয়ন ঘড়ি দেখল, এখন বাজে দুপুর আড়াইটে।
অয়ন সাধারণত এই ক্লাসগুলো করে না। কিন্তু সেমিস্টার এক্সামের আগে অ্যাটেনডেন্সের কড়াকড়ির জন্য তাকে বাধ্য হয়েই ওখানে যেতে হবে।
সে কফির কাপটা ডাস্টবিনে ফেলে আর্টস জোনের দিকে হাঁটা লাগাল।
সায়েন্স জোনের সেই গোছানো পরিবেশ ছাড়িয়ে সে যখন আর্টস & কমার্স জোনে ঢুকল, তখন তিনটে বেজে গেছে। করিডোরে স্টুডেন্টদের ভিড়। অয়ন নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে, অত্যন্ত নিস্পৃহ মুখে ভিড় ঠেলে লেকচার গ্যালারি ঘরের সামনে এসে পৌঁছোল।
গ্যালারির ভারী, সাউন্ডপ্রুফ কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, তখন ক্লাস অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। বিশাল গ্যালারিটা ছাত্রছাত্রীতে গিজগিজ করছে। মাইক্রোফোনে একটা মিষ্টি, কিন্তু কড়া নারী কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
অয়ন দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ডায়াসের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন অঙ্কিতা মজুমদার। ল্যাঙ্গুয়েজ ডিপার্টমেন্টের সুন্দরী, কমবয়েসী এবং অত্যন্ত পপুলার টিচার। আজ তার পরনে একটা সি-গ্রিন রঙের শিফন শাড়ি, যা তার শরীরের প্রতিটি বাঁকের সাথে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে জড়িয়ে আছে। তার ফর্সা, মসৃণ মুখে উজ্জ্বল গ্লো। ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস, আর চোখের চাউনিতে একটা কড়া অথচ অদ্ভুত নেশা ধরানো ভাব।
দরজা খোলার শব্দে পুরো গ্যালারি এবং অঙ্কিতা সেনের নজর অয়নের ওপর গিয়ে পড়ল। তিনি পড়ানো থামিয়ে বিরক্ত চোখে অয়নের দিকে তাকালেন।
অয়নের 'ডোন্ট কেয়ার' বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আর মুখের ফিকে হয়ে আসা কালশিটের দাগগুলো দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
কিন্তু নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে তিনি অত্যন্ত বিরক্ত গলায় মাইকে বললেন, "ইউ আর লেইট। ডোন্ট স্ট্যান্ড দেয়ার লাইক আ স্ট্যাচু। গো টেক আ সিট।"
অঙ্কিতা সেন তার ডান হাত তুলে গ্যালারির দিকে ইশারা করলেন। পুরো গ্যালারির শত শত চোখ একযোগে অয়নকে দেখছে।
অয়ন কোনো রিয়্যাক্ট করল না। সে কোনো কথা না বলে, একটি বারও 'সরি' না বলে, কেবল মাথা নেড়ে গ্যালারির কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। সে পুরো গ্যালারিটা একবার স্ক্যান করে নিল।
তার চোখ গ্যালারিতে ফাঁকা সিট খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই। পুরো গ্যালারিতে শুধু একটাই সিট ফাঁকা পড়ে আছে। তিন নম্বর সারির বাঁ দিকের জানলার ধারের সিটটা। আর সেই সিটে বসে আছে এমন একজন, যাকে অয়ন ঘরের কোণের আসবাবপত্রের চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি কোনোদিন।
চন্দ্রিমা সেন।
মেয়েটার পাশে সিটের উপর একটা ডিজাইনার ব্যাগ রাখা। সে ফোনের জগতে মগ্ন। বাইরের জগতে কী ঘটে চলেছে সে জানতে পারেনি।
অয়ন এক মুহূর্তের জন্য থমকাল না। সে ধীর, মাপা পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। সে সোজা ওই সিটটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
(বর্তমান সময়)
"ব্যাগটা সরাও।"
চন্দ্রিমা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
পরক্ষণেই তার বুকের ভেতরে একটা চরম আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটল।
তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। শেষবার দেখা হবার সময় যে অয়ন চ্যাটার্জী তাকে চরম অপমান করেছিল, আজ সে নিজে থেকে তার পাশে বসতে এসেছে!
তারপর থেকে ও কত চেষ্টা করেছে। কিন্তু, অয়নের নাগাল পায়নি। আজ একটা বোরিং ক্লাসে, অয়ন ওর হাতের নাগালে ! ভাগ্য না চাইতেই ওকে অভাবনীয় এক সুযোগ এনে দিয়েছে।
"অফকোর্স। প্লিজ সিট", চন্দ্রিমার রিনরিনে গলায় একটা আহ্লাদি টান।
চন্দ্রিমা কোনো কথা না বলে, ঠোঁটের কোণে একটা সূক্ষ্ম, কামুক হাসি ঝুলিয়ে নিজের দামী লুই ভিতোঁ ব্যাগটা সিট থেকে তুলে নিজের কোলের ওপর রাখল।
'থ্যাংক ইউ' বলা তো দূরের কথা, অয়ন চন্দ্রিমার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। সে স্পোর্টস ব্যাগটা পায়ের কাছে রেখে ধপ করে কাঠের বেঞ্চটায় বসে পড়ল।
সিটে বসার পর দুজনের মধ্যে দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চির। চন্দ্রিমার শরীর থেকে ভেসে আসা দামী 'ডিওর পয়জন' (Dior Poison) পারফিউমের কড়া সুবাসটা অয়নের নাকে ধাক্কা মারল।
অন্যদিকে চন্দ্রিমার নাকে এসে পৌঁছোল অয়নের শরীর থেকে আসা গন্ধ; পুরুষালি ঘাম আর অ্যান্টিসেপ্টিক মলমের একটা হালকা ঝাঁজ। সেই গন্ধটা চন্দ্রিমার মনের গহীনে গিয়ে আঘাত করল। তার রক্ত চঞ্চল হতে শুরু করল, শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল বিদ্যুৎ তরঙ্গ। তার ভেতরের নারীসত্তা উত্তেজিত হয়ে উঠতে শুরু করল।
চন্দ্রিমা বুঝতে পারল, এটাই সুযোগ। এই লিটারেচার ক্লাসের বোরিং লেকচারের মাঝখানে সে আজ অয়নকে ডিস্ট্র্যাক্ট করবেই। সে নিজের দেহ, শরীরী ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল।
সে অত্যন্ত ধীরেসুস্থে, যেন আনমনা, এরকম ভান করতে করতে নিজের চুলগুলো ডান হাত দিয়ে সরিয়ে বাঁ কাঁধের ওপর আনল। এই সামান্য নড়াচড়ায় তার অফ-শোল্ডার টপের ফাঁক দিয়ে তার ফর্সা, মসৃণ কলারবোন আর ঘাড়ের একটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। সে নিজের বাঁ পা-টা ডান পায়ের ওপর তুলে ক্রস করে বসল, যাতে তার পায়ের সাথে অয়নের পায়ের ঘষাঘষি হয়।
তারপর সে নিজের অফ-শোল্ডার টপের গলাটা সামান্য নিচে টেনে দিল, যাতে তার ফর্সা, নিটোল কলারবোন আর বক্ষবিভাজিকা অয়নের চোখের সামনে আরও একটু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে ইচ্ছে করে গভীর শ্বাস নিতে শুরু করল, যাতে তার স্তনযুগল ফুলে ওঠে এবং অয়নের কনুইয়ের খুব কাছ দিয়ে যায়।
এর মধ্যে অয়ন নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে একটা খাতা আর পেন বের করে সামনের ডেস্কে রাখল। তার চোখ সোজা ডায়াসের দিকে, যেখানে অঙ্কিতা সেন পড়াচ্ছেন।
চন্দ্রিমার ইগোতে ধাক্কা লাগল।
এই ছেলেটা কি লোহা দিয়ে তৈরি নাকি?
"হাই..." এসবে কাজ হচ্ছে না দেখে সে এগিয়ে গিয়ে অয়নের দিকে সামান্য ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল। তার নিঃশ্বাসের গরম হাওয়াটা অয়নের ঘাড়ের কাছে এসে পড়ল।
"অনেকদিন পর দেখা হলো। কালশিটে দাগগুলোতে তোমাকে কিন্তু বেশ রাফ অ্যান্ড সেক্সি লাগছে।"
যেন শুনতে পায়নি এরকম ভঙ্গি করে অয়ন সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে রইল।
চন্দ্রিমার এই সস্তা সিডাকশন টেকনিকগুলো ওর কাছে মুখের সামনে একটা মাছি ভনভন করার মতো বিরক্তিকর মনে হচ্ছিল।
"তোমার এই সস্তা সার্কাসগুলো অন্য কাউকে দেখিও"
সে চন্দ্রিমার দিকে ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল।
অয়নের গলাটা এতটাই নিস্পৃহ ছিল যে, চন্দ্রিমার হাস্কি ভয়েসটা এক লহমায় থমকে গেল।
"আমি এখানে ক্লাস করতে এসেছি। সো শাট আপ অ্যান্ড ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট।"
চন্দ্রিমার মুখটা অপমানে লাল হয়ে গেল। তার এত নিখুঁত সেডাকশন, তার এত রূপ; এই ছেলেটার কাছে কোনকিছুর মূল্য নেই ? তার ইগোতে কেউ যেন সজোরে লাথি মারল। কিন্তু এবার সে দমে গেল না, বরং তার জেদটা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে সোজা হয়ে বসল।
'দেখছি কতক্ষণ তুমি পাথরের মূর্তি হয়ে বসে থাকো, অয়ন চ্যাটার্জী', চন্দ্রিমা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল।
অঙ্কিতা সেন মাইকে সেইসময় 'ম্যাকবেথ' থেকে লেডি ম্যাকবেথের সাইকোলজি নিয়ে একটা ভারী লেকচার দিচ্ছিলেন।
গ্যালারির পরিবেশটা মোটামুটি চুপচাপ, মৃদু গুঞ্জন আছে অবশ্য। অয়ন খাতার ওপর পেন ঘোরাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়, তার ঠিক পেছনের বেঞ্চ থেকে দুটো ছেলের খুব নিচু গলার ফিসফিসানি তার কানে এল।
ছেলেদুটো আর্টসের স্টুডেন্ট, সম্ভবত ব্যাকবেঞ্চার। তারা লেকচার শোনার বদলে রসালো আলোচনায় ব্যস্ত।
"ভাই, ইংলিশের অঙ্কিতা ম্যামের গ্লো দেখেছিস ?"
পেছনের একটা ছেলে ফিসফিস করে বলল। তার গলায় একটা লোলুপ সুর।
"হুঁ, দেখব না আবার! শাড়ির ভাঁজ থেকে ফিগারটা যা লাগছে না... জাস্ট বম্ব!" দ্বিতীয় ছেলেটা উত্তর দিল।
"আরে ভাই, তুই আসল খবরটাই জানিস না,"
একটা হাসি চাপার আওয়াজ এল।
"মালটা পুরো চেঞ্জ হয়ে গেছে। গত এক মাস ধরে ও রুডির চোদন খাচ্ছে! রুডি ওকে এমন বাজিয়েছে যে মাগীর পুরো চেহারাই পালটে গেছে।আজকাল তো শুনি ডিপার্টমেন্টের কাজ মিটলে সোজা রুডির কাছে চলে যায়।"
অয়ন সাধারণত এসব সস্তা গসিপ বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না। অঙ্কিতা সেন কার সাথে শোয়, বা তার স্কিনে কতটা গ্লো, তা নিয়ে অয়নের কোনো মাথাব্যথা নেই। সে খাতার পাতায় লেকচার থেকে নোটস নিচ্ছিল।
কিন্তু প্রথম ছেলেটার পরের কথাটা অয়নের হাতকে থামিয়ে দিল।
"রুডি? মানে রুদ্রপ্রতাপ?"
দ্বিতীয় ছেলেটা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"আরে, ওটা তো স্টুডেন্ট কাউন্সিলের একজন মাথা।"
"আবে হ্যাঁ রে! তুই বিক্রম মালহোত্রাকে দেখছিস তো? ও রুডির বেস্ট ফ্রেন্ড! রুডি স্টুডেন্ট কাউন্সিলে আছে বলেই বিক্রম এত ওড়ে। আসল ব্যাকআপ তো ওই রুডিই দেয়। রুডি ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে বাইরের পলিটিক্স সব হ্যান্ডেল করে।"
বিক্রম মালহোত্রা!
নামটা শোনা মাত্রই অয়নের মনের ভেতরে 'বীপ' করে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হল। চারপাশের মৃদু গুঞ্জন এক মুহূর্তেই ওর কানে ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল। ওই ছেলেগুলো কী বলছে সেটাও আর ওর কানে ঢুকছিল না। শুধু তার চোখের মণি দুটো সামান্য সংকুচিত হলো।
ও সেইসময় নিজের চোখের সামনে ফেস্টের রাতে বিক্রমের ফাটা ঠোঁটের সেই হাসিটা দেখতে পাচ্ছিল।
অয়ন হাতের পেনটা খাতার ওপর শক্ত করে চেপে ধরল। সে সামনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিজের এই নতুন ইনফরমেশনটাকে মনে মনে ডিকোড করতে শুরু করল।
রুডি বা রুদ্রপ্রতাপ। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের একজন মাথা এবং বিক্রম মালহোত্রার বেস্ট ফ্রেন্ড।
এদের কথা অনুযায়ী বিক্রমের পাওয়ার সোর্স।
তাহলে, বিক্রম নিজে কোন বড় পাওয়ার নয় ? সে অন্য কারোর দয়ায় বাঁচে ?
'রুদ্রপ্রতাপ', অয়ন নিজের মনে মনে নামটা উচ্চারণ করল।
বিক্রমের সর্বনাশ করতে গেলে আগে ওর এই তথাকথিত খুঁটিটা কে সেটা জানতে হবে। তাকে স্টাডি করতে হবে। সেটা বার করার একটা সূত্র এইমাত্র তার পেছনের ব্যাকবেঞ্চাররা তাকে দিয়ে দিয়েছে - অঙ্কিতা সেন!
অঙ্কিতা সেনের সাথে রুডির কানেকশনকেও এক্সপ্লয়েট করা যেতে পারে। এই রুদ্রপ্রতাপের খোঁজ তাকে লাগাতেই হবে।
তার এই চিন্তা-ভাবনার মাঝেই গ্যালারির মাইকে অঙ্কিতা সেনের গলাটা একটু জোরে বেজে উঠল।
"স্টুডেন্টস, অ্যাটেনশন প্লিজ!"
পুরো গ্যালারির ফিসফিসানি এক মুহূর্তে থেমে গেল। অয়নও নিজের চিন্তার জাল থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে তাকাল।
অঙ্কিতা সেন ডায়াসের ওপর দাঁড়িয়ে একটু সোজা হলেন। তার সি-গ্রিন শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে সামান্য খসে পড়েছে, কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না।
"তোমাদের ফার্স্ট সেমিস্টারের এক্সাম তো পরের মাসে। কিন্তু আমি আজকেই তোমাদের সেকেন্ড সেমিস্টারের একটা ইম্পর্ট্যান্ট প্রজেক্টের অ্যানাউন্সমেন্ট কর দিতে চাই। ইউনিভার্সিটির গাইডলাইন অনুযায়ী, সেকেন্ড সেমিস্টারের ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের জন্য একটা বড়সড় 'ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রজেক্ট' তৈরি করতে হবে। এই প্রজেক্টের ওপর তোমাদের এই সেকেন্ড সেমিস্টারের ফাইনাল গ্রেডের থার্টি পার্সেন্ট মার্কস ডিপেন্ড করছে।"
পুরো গ্যালারিতে একটা অসন্তোষের গুঞ্জন উঠল।
সেকেন্ড সেমিস্টারের প্রজেক্ট এখনই ? ফার্স্ট সেমিস্টার এক্সামের এক মাস আগে ?
"সাইলেন্স!"
অঙ্কিতা সেন কড়া গলায় ধমক দিলেন।
"প্রজেক্টটা শুরু হতে এখনো এক মাস সময় বাকি থাকলেও, আমি আজকেই তোমাদের পার্টনার নির্বাচন সেরে ফেলতে চাই। আমি চাই না পরে তোমাদের পার্টনার খোঁজার জন্য প্রজেক্ট সাবমিট করতে দেরি হোক বা সেটা তোমাদের এক্সকিউজ হয়ে উঠুক।
দিস উইল বি আ পেয়ার প্রজেক্ট। দু'জন করে স্টুডেন্ট একটা করে টিম হবে। আর এই প্রজেক্টের কাজ তোমাদের আগামী ছ মাস ধরে একসাথে করতে হবে।"
অয়নের কপালে একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। ছয় মাসের প্রজেক্ট! তাও আবার পেয়ার প্রজেক্ট? তার তো এই ক্লাসে চেনা কেউ নেই।
আর্টসের কারোর সাথে তাকে জুড়ে দিলে শুধু শুধু ঝামেলার সৃষ্টি হবে।
গ্যালারির স্টুডেন্টরা নিজেদের বন্ধুদের সাথে চোখ চাওয়াচাওয়ি করতে শুরু করল। সবাই চাইছে নিজের বন্ধুকে পার্টনার বানাতে।
কিন্তু অঙ্কিতা সেনের পরের কথাটা পুরো গ্যালারির আশায় জল ঢেলে দিল।
"টু মেক ইট ফেয়ার অ্যান্ড স্ট্রিক্ট...কোনো বন্ধু বা নিজেদের পছন্দমতো পার্টনার বাছা যাবে না।আমি কোনো বায়াসনেস বা ফ্রেন্ডশিপ গ্রাউন্ডে পার্টনারশিপ অ্যালাও করব না", অঙ্কিতা সেন অত্যন্ত কড়া, অথরিটেটিভ গলায় বললেন।
"তোমরা এখন যে যেখানে বসে আছো, যে যার পাশে বসে আছো.....দ্যাটস ইট! সেটাই তোমাদের টিম। এভরি বেঞ্চমেট ইজ ইওর প্রজেক্ট পার্টনার। নো চেঞ্জেস উইল বি অ্যালাউড আন্ডার এনি সারকামস্ট্যান্সেস!"
কথাটা শেষ হওয়ামাত্রই গ্যালারিতে একটা পিন-ড্রপ সাইলেন্স নেমে এল।
কথাগুলো শুনে অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো এক লহমায় শক্ত হয়ে উঠল। তার মাথার ভেতরটা এক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল।
'যে যার পাশে বসে আছো...মানে!"
সে অত্যন্ত ধীর গতিতে, একটা দমবন্ধ করা অস্বস্তি নিয়ে ডানদিকে নিজের ঘাড় ঘোরাল।
তার ঠিক পাশেই বসে আছে চন্দ্রিমা সেন।
অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো আরো শক্ত হয়ে উঠল। সে এই মেয়েটাকে দু চোখে সহ্য করতে পারে না। এর ইগো, এর সস্তা এটেনশন সিকিং বিহেভিয়ার অয়নের কাছে চরম বিরক্তিকর। অয়ন ভাবল সে এই নিয়ে একবার মিস সেনের কাছে অবজেকশন ওঠাবে কিনা।
ততক্ষণে চন্দ্রিমাও ধীরে ধীরে তার ঘাড় ঘুরিয়ে অয়নের দিকে তাকিয়েছে।
তার চোখেমুখে এখন একটু আগের রাগের কোন চিহ্ন নেই। তার বদলে এখন সেখানে উল্লাস। তার ঠোঁটের কোণে একটা বিজয়ী হাসি ফুটে উঠেছে।
চোখ দুটো যেন ওকে বলছে,
'এবার তুমি কোথায় পালাবে, চাঁদু ? এখন তুমি আমার হাতের মুঠোয়।'
তার চোখদুটো উত্তেজনায় রীতিমতো চকচক করছে।
ভাগ্য তাকে ছপ্পড় ফুঁড়ে দিচ্ছে। আজ নিজের হাতে অয়ন চ্যাটার্জীকে তার থালার ওপর সাজিয়ে দিয়েছে।
যে ছেলেটা তাকে অবজ্ঞা করেছিল, এখন প্রজেক্টের খাতিরে, মার্কসের দায়ে তাকে আগামী ছয় মাস চন্দ্রিমার সাথেই সময় কাটাতে হবে। চন্দ্রিমা জানে, ছয় মাস অনেক লম্বা সময়। একটা পাথরের মূর্তিতে ফাটল ধরানোর জন্য এই সময়টা যথেষ্ট।
চন্দ্রিমা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এল। সে অয়নের কানের একদম কাছে এসে, তার ডিওর পারফিউমের গন্ধ আর উষ্ণ নিঃশ্বাস ছড়িয়ে
নিজের পারফেক্ট, গ্লসি ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক করে আবেদনভরা গলায় ফিসফিস করে বলল,
"লুকস লাইক... উই আর পার্টনার্স নাউ, মিস্টার চ্যাটার্জী।"
অয়ন কোনো উত্তর দিল না। তার চোখের হালকা বিস্ফারিত দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য চন্দ্রিমার হাসি মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল।
তারপর সে খাতাটা বন্ধ করে আবার ডায়াসের দিকে তাকাল। তার কপালের একটা শিরা দপদপ করছে। একটু আগে রুডিকে নিয়ে যেসব চিন্তা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, এইমুহূর্তে সে সব ওর মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।