মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৭২

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6295006.html#pid6295006

🕰️ Posted on Sun Aug 23 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2513 words / 11 min read

Parent
৬ ২৯শে ডিসেম্বর, বিকেল সাড়ে তিনটে লেক গার্ডেনসের নির্জন গলিটায় রোদের আলো ফিকে হয়ে এসেছে। রাস্তার সামনে অবস্থিত প্রাচীন রাধাচূড়া গাছটার ছায়াতে সামনের ফুটপাথের অংশটা ঢাকা পড়েছে, শীতল বাতাসে শুষ্ক ভাব। উঁচু উঁচু পুরনো গাছপালার ফাঁক দিয়ে নেমে আসা শীতের মিহি রোদটায় এক ধরণের থমথমে আলস্য। দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলটায় ঢুকলে শহরের কোলাহল যেন কয়েক ডেসিবেল কমে যায়। পুরোনো দিনের ফ্ল্যাটবাড়ি, ড্রেনের ওপর জং ধরা লোহা দিয়ে বাঁধানো পথ আর রাস্তায় পড়ে থাকা নিম আর কৃষ্ণচূড়া গাছের ঝরা পাতার ওপর চালকের চাকার পেষণ, সব মিলিয়ে একটা ভারাক্রান্ত পরিবেশ। হলুদ ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়াটা মিটিয়ে দেওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে রইল অর্জুন।  জ্যাকেটের পকেটে দু-হাত গুঁজে সে মাথা তুলে চেয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো তিনতলা ফ্ল্যাটবাড়িটার দিকে। মুখে ক্লান্তি আর রাত জাগার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখের তারায় শার্পনেস অক্ষুণ্ণ। গত পঁচিশ তারিখ রাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শিশির কুমার রায়। উডল্যান্ডসের আইসিইউ-তে তার ভেন্টিলেশন সাপোর্ট খোলার পর ডাক্তাররা সরকারিভাবে মৃত্যু ঘোষণা করতেই নবান্নের একটা বড় অংশ নাকি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।  লালবাজার অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে কেস ফাইল বন্ধ করে দিয়েছে, ‘ড্রাইভিং আন্ডার দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ অ্যালকোহল অ্যান্ড র‍্যাশ ড্রাইভিং’।  মিডিয়া ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ওনার সম্পত্তি কে পাবে আর পোর্ট ট্রাস্টের ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান কে হবে তা নিয়ে। কিন্তু অর্জুন সেই স্রোতে গা ভাসায়নি। গত দু-দিনে একের পর এক ধাঁধার টুকরো জোড়া লেগে যে ছবিটা তৈরি হচ্ছে, সেটা কোন সাধারণ দুর্ঘটনার ইঙ্গিত দেয় না। হাঁটতে হাঁটতে বিগত তিন দিনের ঘটনাক্রমটা অর্জুনের মনের ভেতর মাইন্ড-ম্যাপের মতো খুলে যেতে লাগল। এই বিষয়টা তার কাছে একটা অবশেসনে পরিণত হয়েছে। সুব্রত চক্রবর্তীর দেওয়া হিন্ট আর প্যারাডিকের কথার সূত্র ধরে সে প্রথমে যোগাযোগ করেছিল ট্রাফিক সার্জেন্ট দেবাশীষের সাথে। বাইপাসের সেই বিটে ডিউটিতে থাকা দেবাশীষের সাথে দেখা করার পর অর্জুন জানতে পেরেছিল, অ্যাক্সিডেন্টের দিন দুপুর তিনটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বাইপাসের ওই এরিয়াতে কেএমডিএ-র চার-চারটে হাই-রেজোলিউশন সিসিটিভি ক্যামেরা সম্পূর্ণ 'অফ' ছিল। এই পাঁচ ঘণ্টার লাইভ ফিড লালবাজার কন্ট্রোল রুমের সার্ভারে পৌঁছায়নি। পুলিশের খাতায় এবং কেএমডিএ-র অফিসিয়াল লগে যা লেখা রয়েছে, তা শুনে অর্জুনের হাসি পেয়েছিল, 'এমার্জেন্সি মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড অপটিক্যাল ফাইবার কেবিল রিপেয়ারিং'। অর্জুনের এক নিজস্ব আইটি ফ্রিল্যান্সার বন্ধু, যে ডার্কওয়েব ও ট্রাফিক সার্ভারের পেছনের চিপ ট্র্যাকিংয়ে পারদর্শী, সে সায়েন্স সিটির মোড়ের একটা পেট্রোল পাম্পের সিসিটিভির ফুটেজ থেকে একটা অদ্ভুত জিনিস খুঁজে বার করে।  প্যারাডিক বলেছিল সিলভার ফরচুনারের কথা, কিন্তু এই হ্যাকার বন্ধু ফুটেজের ডিজিটাল পিক্সেল ক্লিন করে দেখায় যে শিশির রায়ের কালো স্কোডাটাকে অনুসরণ করছিল এক কুচকুচে কালো রঙের নম্বরপ্লেটহীন স্করপিও। সবচেয়ে মারাত্মক তথ্য যেটা অর্জুন পেয়েছে সেটা হল, সায়েন্স সিটির মোড় ঘুরেই এক্সিডেন্টের স্পটের আড়াইশো মিটার আগে সেই স্করপিও হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। ওটা মেটিকুলাসলি সার্ভিস রোডে নেমে একটা পে-অ্যান্ড-পার্কিংয়ের ভিড়ে ঢোকে, ঠিক চার মিনিটের মাথায় ওখান থেকে অন্য একটা নম্বরপ্লেট চড়িয়ে বের হয়ে যায় ! এরকম নিখুঁত সময় মেপে রাস্তা ব্ল্যাকআউট করা কোনো স্থানীয় গুন্ডার পক্ষে আর এরকমভাবে ট্রাফিক লগ ম্যানিপুলেট করা নিচুতলার ট্রাফিক কনস্টেবল-সার্জেন্টের পক্ষে অসম্ভব। এর পেছনে বড় ক্ষমতার হাত জড়িত। সাধারণ কোন পুলিশ অফিসারের নির্দেশে এভাবে সিসিটিভি ফিড বন্ধ হওয়া সম্ভব নয়। এরকম নির্দেশ কেবল আসতে পারে কেবল লালবাজারের অত্যন্ত ওপর তলা থেকে, নয়তো সরাসরি নবান্ন থেকে! গতকাল বিকেলে দেবোত্তম ওর ডেস্কে এনে ফেলেছিল বহু প্রতীক্ষিত সিডিআর এবং এনক্রিপ্টেড ব্যাংক স্টেটমেন্টের এক সুবিশাল ফাইল। দেবোত্তমের আনা সিডিআর চেক করতে গিয়ে অর্জুনের চোখে পড়েছিল সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা। দুর্ঘটনার ঠিক তিন ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ বিশে ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ, শিশির রায় তাঁর বোন অনুসূয়া সেনকে ফোন করেছিলেন। কলটা আট মিনিট সাত সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল। শিশির রায় অ্যাক্সিডেন্টের পরে ভেন্টিলেশনে চলে যাবার পর থেকে সেই আট মিনিটের কথোপকথন এখন এই খুনের রহস্যের একমাত্র প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী। পকেটে থাকা চিরকুটটায় চোখ বোলাল অর্জুন। লেক গার্ডেনস প্রেস ক্লাব লেন। সি-ব্লক, বিল্ডিং নম্বর ৪৭বি। একটা চারতলা পুরোনো ইটের ফিনিশিং দেওয়া ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। দেয়ালের গায়ে লালচে নোনা ধরা ছোপ, এক কোণে জং ধরা পাইপ দিয়ে ড্রেনের জল ফোঁটা ফোঁটা করে পড়ছে এক পুরোনো সিমেন্টের গামলায়। সিঁড়ির মুখের নেমপ্লেটগুলোর ওপর ধুলোর আস্তরণ। ৭ তিনতলায় ওঠার সিঁড়িটা বেশ খাড়াই, গোটা বিল্ডিংয়েই থমথমে নির্জনতা বিরাজ করছে। প্রতিটি ধাপে অর্জুনের বুটের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছে বাঁদিকের ভারী কাঠের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। দরজার একপাশে পেতলের একটা ছোট্ট ফলকে লেখা: 'অরূপ সেন / অনুসূয়া সেন'। অর্জুন বেল বাজাল। ভেতর থেকে কোন শব্দ এল না।  কয়েক সেকেন্ড পর আবার কলিং বেল টিপল সে। এবার ভেতর থেকে কাঠের দরজার ভেতরের ইন্টারলক খোলার একটা ধাতব 'ক্লিক' শব্দ পাওয়া গেল। দরজাটা ইঞ্চি তিনেক ফাঁক হলো। নিরাপত্তা চেনের আড়াল থেকে উঁকি দিল এক মাঝবয়সী নারীর মুখ। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। পরনে একটি অতি সাধারণ সুতির ছাপা শাড়ি, চুলে কোনো যত্ন ছাড়া খোঁপা করা, চোখে চশমা।  কিন্তু ওনার চেহারায়, চোখের কোণে জমে থাকা কালচে ছোপে শোাকের চেয়েও অনেক বেশি যা স্পষ্ট ফুটে উঠছিল, তা হল তীব্র আতঙ্ক। "কাকে চাই?" ওনার কণ্ঠস্বর খসখসে, থমথমে। "নমস্কার। ম্যাডাম অনুসূয়া সেন?"  অর্জুন নিজের স্বভাবসুলভ মার্জিত ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল।  "আমার নাম অর্জুন লাহিড়ী। আমি 'দ্য স্টেটসম্যান' পত্রিকা থেকে আসছি..." কথাটা শেষ হতে পারল না। 'স্টেটসম্যান' আর 'পত্রিকা' শব্দ দুটো শোনামাত্রই অনুসূয়া সেনের মুখখানা মুহূর্তে ঘৃণায় ও রাগে বিকৃত হয়ে উঠল। তিনি এক হেঁচকায় দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে গেলেন। "বেরিয়ে যান এখান থেকে! আপনাদের কোনো লজ্জা নেই? একটা মানুষ মারা গেল, পোস্টমর্টেমের পর বডি সৎকার হলো, আর আপনারা শকুনদের মতো এখনও মাংস ছিঁড়ে খেতে পেছনে লেগে আছেন? সংবাদমাধ্যমের এই নোংরামির জন্যই আমার দাদার এই অবস্থা হয়েছে! কোনো উত্তর দেব না আমি। জাস্ট গেট আউট!" দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে অর্জুন নিজের ডান হাতটা কাঠের ফ্রেমের খাঁজে আটকে দিল। সজোরে আঘাতটা ওর হাতে এসে পড়লেও ও মুখে কোন ব্যথার ভাব ফুটতে দিল না। অর্জুন এক চুলও নড়ল না। সে খুব শান্ত, কিন্তু খাদে নামানো বরফশীতল গলায় উচ্চারণ করল, "ম্যাডাম, আমি আপনার দাদার মৃত্যুর খবর বেচে খবর বিক্রি করতে আসিনি। আমি জানি ওনার রক্তে অ্যালকোহল ছিল না। আমি এখানে এসছি কারণ শিশির কুমার রায়কে কোনো অ্যাক্সিডেন্টে মারা হয়নি... ওনাকে নিখুঁত পরিকল্পনায় খুন করা হয়েছে। আর আপনিও সেটা জানেন।" কথাগুলো থমথমে বাতাসে যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। অনুসূয়া সেনের হাতটা হঠাৎ অবশ হয়ে আটকে গেল।  ওনার চোখের মণিতে এক মারাত্মক শিহরণ খেলে গেল। তিনি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে অর্জুনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, সেখানে সাংবাদিকের কৌতূহল নেই, বরং এক অদ্ভূত জেদ কাজ করছে। ধীরে ধীরে দরজার সিকিউরিটি চেনটা খুলে দিলেন অনুসূয়া দেবী। "ভেতরে আসুন। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। আমার স্বামী বাইরে গেছেন।"  ওনার গলাটা এবার কাঁপছে। বসার ঘরটা ছোট, ছিমছাম। জানলাগুলোতে গাঢ় নীল রঙের ভারী পর্দা ফেলা, ফলে দুপুরের রোদ সেভাবে ঘরে প্রবেশ করতে পারছে না। সেজন্য ভেতরটা বেশ অন্ধকার। দেওয়ালঘড়ির সশব্দ টিকটিক আওয়াজ ছাড়া চারপাশ নিঝুম। বসার ঘরে সাধারণ বেতের আসবাবপত্র, একপাশে বইয়ের তাক আর দেওয়ালে টাঙানো এক বয়স্ক দম্পতির পুরনো সাদা-কালো ছবি। অনুসূয়া দেবী অর্জুনকে বসতে না বলে নিজেই উল্টোদিকে সোফায় গিয়ে বসলেন। হাত দুটো কোলের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করা। "আপনি কী করে জানলেন যে দাদাকে খুন করা হয়েছে?"  তিনি সোজা অর্জুনের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেন। অর্জুন অনুমতি না নিয়ে সোফায় বসে পড়ল। বসেই নিজের জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা পকেট ডায়েরি বার করল। "কারণ সেদিন বাইপাসের পাঁচ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ নেই, উধাও করে দেওয়া হয়েছে, শিশিরবাবুর ব্লাড রিপোর্ট ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা হয়েছিল আর ওনার পেছনে যে নম্বরপ্লেটহীন গাড়িটা ছিল, তার খবর ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।  ম্যাডাম, আপনার দাদা শিশির রায় কোন ধোয়া তুলসী পাতা ছিলেন না। পোর্টের হাজার কোটি টাকার লিজিং, প্রোটোকল লিক আর ব্যাকডোর ডিলিংয়ের সাথে উনি যুক্ত ছিলেন। কিন্তু উনি একা একাজে যুক্ত ছিলেন না।" অনুসূয়া দেবী একটা তেতো হাসি হাসলেন। "জানি। সেজন্যই আমি ওর সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিলাম। দাদা শেষের দিকে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই ডাইনিটা ওকে গিলে খেল।" অনসূয়া দেবীর চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।  "মিডিয়া আর পুলিশ ওকে মাতাল বানিয়ে দিল! ও অত্যন্ত দায়িত্বশীল মানুষ ছিল।" অর্জুন ভ্রূ কুঁচকাল।  "ডাইনি? আপনি ওনার স্ত্রী অমৃতা রায়ের কথা বলছেন?" "স্ত্রী?"  অনুসূয়া সেন হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। ওনার গলার স্বর এবার উঁচুতে উঠে গেল। "অমৃতা সাক্ষাৎ কালনাগিনী! আপনারা সংবাদপত্রে লেখেন অমৃতা রায় নাকি প্রেম করে বিয়ে করেছিল! অ্যাক্সিডেন্টে মরে গিয়ে অমর হয়ে গেল ! সব মিথ্যে! বাজে কথা!" "মানে? ওদের বিয়ের পেছনে অন্য গল্প ছিল?" "শুনুন তবে," অনুসূয়া দেবী নিজের চশমাটা খুলে সশব্দে টি-পয়ের ওপর রাখলেন।  "দাদা আর অমৃতার বিয়ে ভালোবাসার টানে হয়নি। ওটা একটা ব্ল্যাকমেইল। অমৃতা কাস্টমস আর পোর্টের বেশ কিছু গোপন ফাইলের ক্লাসিফাইড কপি এবং কিছু এনক্রিপ্টেড পেনড্রাইভ নিজের কব্জায় নিয়েছিল। এমন কিছু ডেটা, যা বাইরে প্রকাশ পেলে দাদার চাকরি তো যেতই, সাথে ওকে জীবনের বাকি সময়টা জেলে পচতে হতো। অমৃতা সেই ফাইলগুলো দেখিয়ে বাধ্য করেছিল ওকে বিয়ে করতে!" অর্জুন সোজা হয়ে বসল। "আমার দাদাটা লোভী ছিল ঠিকই, কিন্তু এতটা নীচ ছিল না। অমৃতা ওর জীবনে ঢোকার পর থেকেই ও নিজের অস্তিত্ব হারাতে শুরু করে। বিয়েটা হবার পর পোর্টের গোপন সব ফাইল, টেন্ডারের ভিতরের খবর, সব অমৃতার হাত দিয়ে বাইরে পাচার হতো।" অর্জুন একটু থেমে প্রশ্নটা ছুঁড়ল,  "ম্যাডাম, অমৃতা রায় তো শিশিরবাবুকে বিয়ের আগে একটা লজিস্টিকস কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের পিএ হিসেবে কাজ করতেন?" অনুসূয়া দেবী একটা তেতো হাসি হাসলেন।  "পিএ? শুধু পিএ ছিল ভাবছেন আপনি? এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের সাথে অমৃতার সম্পর্ক শুধু পেশাদারি চাকরির ছিল না! ওই ডিরেক্টর ভদ্রলোক নিজেই অমৃতাকে শিশিরের পেছনে লাগিয়েছিলেন! উনিই তো একটা বিজনেস পার্টিতে প্রথম দাদার সাথে অমৃতার পরিচয় করিয়ে দেন ।" অর্জুন সোজা হয়ে বসল।  "তার মানে অমৃতা রায় আগেই ছক কষে শিশিরবাবুর কাছে এসেছিল?" "একদম!"  অনসূয়াদেবী ফুঁসে উঠলেন।  "অমৃতা সাধারণ মেয়ে ছিল না। বড় বড় প্লেয়ারদের সাথে ওর ওঠাবসা ছিল।" অর্জুনের অভিজ্ঞ ব্রেন হিসাব কষতে শুরু করল। যেই ডিরেক্টরের কথা বলা হচ্ছে... সেই অরুণের কথা অর্জুন আগে থেকেই জানে। অরুণের পুরো নাম অরুণ চ্যাটার্জী। সে অমৃতা চাকরি ছাড়ার বহু আগেই পুরনো লজিস্টিকস কোম্পানির পদ ছেড়ে বিশ্বখ্যাত ভ্যানগার্ড গ্লোবালে যোগ দেয় এবং এখন তাদের ইস্টার্ন জোনের সর্বেসর্বা! "ম্যাডাম।" অর্জুন জিজ্ঞেস করল,  "আপনি কি অরুণ চ্যাটার্জীর কথা বলছেন?"  অর্জুন নিচু, কড়া গলায় শুধাল। অনুসূয়া দেবী এক মুহূর্ত থমকালেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "হ্যাঁ! অরুণ চ্যাটার্জী। ব্যবসায়িক সূত্রে দাদার সাথে অরুণের বহু বছরের ওঠাবসা। বিজনেস সার্কেলে ওরা একে অপরকে ক্ষমতার চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করত। আপনি বিশ্বাস করবেন না, শিশির আর অমৃতার যখন রেজিস্ট্রি বিয়ে হয়, এই অরুণ চ্যাটার্জী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই ম্যারেজ রেজিস্টারে প্রধান সাক্ষী হিসেবে সই করেছিল!" অর্জুনের মাথার ভেতরে মুহূর্তের মধ্যে একাধিক সংযোগ জোড়া লেগে গেল! চাকরির বাইরেও অমৃতা আর শিশির রায়ের সাথে অরুণের একটা বোঝাপড়া ছিল! কিন্তু কেন? অরুণ চ্যাটার্জী নিজের সাবেক পিএ-কে শিশির রায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে যাবে কেন? "দুর্ঘটনার কদিন আগে..."  অনুসূয়া দেবীর গলা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল, ওনার চোখে চরম আতঙ্কের মায়াজাল। "দাদা হঠাৎ আমার এখানে এসেছিল। খবর না দিয়েই এসেছিল। আমি বহুবছর ওর সাথে সম্পর্ক রাখি না। ওকে ভীষণ আতঙ্কিত দেখচ্ছিল। আমি এত বছরে আমার দাপুটে দাদাকে কখনও ওভাবে ভয়ে তোতলাতে শুনিনি। ওর গলা কাঁপছিল।  ও আমাকে স্পষ্ট বলেছিল, 'অনু, আমি আর পারছি না... এরা আমাকে মেরে ফেলবে অনু... এরা আমাকে বাঁচতে দেবে না!'" অর্জুনের চোখের পাতা পড়ে থমকে গেল। এই কারণেই কি বাইপাসে সেই নৃশংস দুর্ঘটনা? একই সাথে অমৃতাকে নিশ্চিহ্ন করা আর শিশিরকে চিরতরে ভেন্টিলেশনে পাঠিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া? "আপনার কাছে কি কোনো লিখিত প্রমাণ আছে ম্যাডাম?"  অর্জুন নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত প্রশ্ন করল।  "শুধু মুখে বললে আইনের চোখে এটা টিকবে না। কোনো প্রমাণ... কোনো মেসেজ বা কাগজ?" অনুসূয়া দেবী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। ওনার মুখের অবয়বে এক মারাত্মক দ্বন্দ্ব চলছে। একদিকে নিজের প্রাণের ভয়, অন্যদিকে সত্য প্রকাশের ইচ্ছা। অবশেষে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।  ঘরের কোণে রাখা একটা পুরোনো কাঠের আলমারির কাছে গেলেন। পকেট থেকে চাবি বের করে ড্রয়ারটা খুললেন। সেখান থেকে একটা ভাঁজ করা, হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো আর একটা প্রিন্টআউট বের করে নিয়ে আসলেন। তিনি কাগজ দুটো অর্জুনের হাতে তুলে দিলেন। "এটা শিশিরের হাতে লেখা শেষ নোটের টুকরো, যা সে গত মাসে আমার কাছে একটা সীল করা খামে পাঠিয়ে রেখেছিল। আর নিচেরটা হলো মৃত্যুর দু-দিন আগে শিশিরের ফোনে আসা একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজের স্ক্রিনশট, যা ও আমাকে ড্রপবক্স লিঙ্কে পাঠিয়েছিল।" অর্জুন চোখের পলক না ফেলে কাগজ দুটোর ওপর নজর বুলাল। হাতে লেখা নোটটায় শিশির রায়ের নিজের সই করা মেসেজ: 'If anything happens to me, look into the cross-docking servers. The Master Key has been sold.' আর পেছনের প্রিন্টআউটটায় একটা মেসেজের স্ক্রিনশট, যা পাঠানো হয়েছে এক আন-ট্রেসেবল ভার্চুয়াল আইডি থেকে:  'Your time is up, Roy. The files have shifted. Clean up your tracks or no place will be safe for you.' অর্জুনের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা তীব্র বিদ্যুত তরঙ্গ বয়ে গেল! সে ধীরেসুস্থে নিজের স্মার্টফোন বের করে কাগজ দুটোর স্পষ্ট হাই-রেজোলিউশন ছবি তুলে নিল। তারপর অত্যন্ত যত্নের সাথে মূল কাগজ দুটো অনুসূয়া দেবীর হাতে ফেরত দিল। "এগুলো নিজের কাছে খুব সাবধানে লুকিয়ে রাখুন আর চেষ্টা করবেন কিছুদিন কলকাতার বাইরে পরিচিত কারো বাড়িতে গিয়ে থাকতে। এই ফ্ল্যাটটা নিরাপদ নয়।"  অর্জুন গম্ভীর গলায় সতর্ক করল। অনুসূয়া দেবী ক্লান্তভাবে হাসলেন।  "আমার হারানোর আর কিছু নেই, অর্জুনবাবু। তবে আপনি সাবধানে থাকবেন। এরা কেউ মানুষ নয়।" অর্জুন নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়াল। "অনেক ধন্যবাদ, অনুসূয়াদেবী। আপনার এই সাহায্য একটা বিশাল বড় অন্ধকারকে আলোয় আনতে সাহায্য করবে।" দরজা খুলে সিঁড়িঘরের অন্ধকারে পা বাড়াল অর্জুন। ভারী কাঠের দরজাটা আবার পেছনে 'ঠাস' শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় অর্জুনের মনের ভেতরে ঝড় বইছে। অরুণ চ্যাটার্জী,  আগে অমৃতার বস আর একটা প্রাইভেট লজিস্টিকস কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ছিল।  অমৃতা শিশিরকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করে এবং পোর্টের গোপন খবর বাইরে পাচার করত। অতি সম্প্রতি, "মাস্টার কী" বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু, এই মাস্টার কী-টা কী জিনিস ? চার: হতে পারে এই মাস্টার কী হাতবদল হওয়ার অপরাধেই বাইপাসের বুকে সায়েন্স সিটির মোড়ে নিখুঁত মার্ডার! শিশির ও অমৃতা, উভয়কেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া! ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে গ্রিলের গেটটা ঠেলে ফাঁকা রাস্তায় এসে দাঁড়াল অর্জুন। হিমশীতল হাওয়াটা এসে ওর মুখে আছড়ে পড়ল। শীতের সূর্যটা আকাশ থেকে ধূসর এক আলো ছড়াচ্ছে। রাস্তায় নেমেই অর্জুনের ভেতরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎ তীব্র সতর্কতায় টানটান হয়ে উঠল। একজন পোড় খাওয়া ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টের এই ইনস্টিনক্ট কখনোই ভুল হয় না। সে পকেটে হাত গুঁজে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়াল। ডানপাশের একটা বন্ধ দোকানের কাঁচের ডিসপ্লেতে পড়া প্রতিফলনে চোখ রাখল। রাস্তার উল্টোদিকে, প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে, মেহগনি গাছের ছায়ায় স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা গাঢ় ধূসর রঙের হেডলাইট-ঢাকা স্পোর্টস বাইক। বাইকের ওপর যে লোকটা বসে আছে, তার মাথায় চড়ান একটা কুচকুচে কালো রঙের ফুল-ফেস ভাইজার ওয়ালা হেলমেট। গাঢ় চামড়ার জ্যাকেট পরা। সে একদম স্থির হয়ে অর্জুনের প্রতিটি মুভমেন্ট লক্ষ্য করছে। অর্জুন খেয়াল করল, বাইকের পেছনের নম্বরপ্লেটটা কাদার চটে এমনভাবে ঢাকা যে একটা অক্ষরও পড়া যাচ্ছে না! অর্জুনের বুকটা হালকা ধক করে উঠল। সে লেক গার্ডেনসের এই ফ্ল্যাটে এসেছে মাত্র আধঘণ্টা আগে, আর ইতিমধ্যেই তার ওপর সার্ভেল্যান্স বসিয়ে দেওয়া হয়েছে! তার মানে একটা অদৃশ্য হাত অর্জুনের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর ছায়ার মতো নজর রাখছে! অর্জুন বিন্দুমাত্র আতঙ্কের চিহ্ন প্রকাশ করল না। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কঠিন, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে জ্যাকেটের পকেট থেকে সিগারেট বের করার ছলে পিছন ঘুরে সোজা বাইকারটার দিকে দু-সেকেন্ড তাকাল, তারপর খুব ধীরে সুস্থে হাঁটা দিল মেন রোডের দিকে, যেখানে ট্যাক্সি পাওয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে অর্জুন পকেট থেকে নিজের এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করল। দ্রুত ডায়াল করল দেবোত্তমের নম্বর। দ্বিতীয় রিংয়েই দেবোত্তম ফোন তুলল।  "হ্যাঁ অর্জুনদা! বল।" "দেবোত্তম,"  অর্জুনের গলার স্বর সাবধানী কিন্তু পাথরের মতো শক্ত। "তোর কাজ আরও বেড়ে গেল। এক্ষুনি আমাদের প্রাইভেট ডেটাবেস খুলে অরুণ চ্যাটার্জীর একটা কমপ্লিট পার্সোনাল ব্যাকগ্রাউন্ড প্রোফাইল বের কর।" "অরুণ চ্যাটার্জী কে?"  দেবোত্তম অবাক হয়ে শুধাল। "ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন জোন হেড।"  অর্জুন ট্যাক্সির জন্য হাত বাড়াতে বাড়াতে বলল। "ওনার পাস্ট হিস্ট্রি, আগে কোন কোন কোম্পানিতে ছিলেন, অমৃতা রায়ের সাথে ওনার অফ-দ্য-রেকর্ড লেনদেন, আর সবচেয়ে বড় কথা, ভ্যানগার্ডের প্রাইভেট সার্ভারের সাথে পোর্ট ট্রাস্টের কী কী চুক্তি সম্প্রতি সই হয়েছে, সব চাই। কাল সকালের মধ্যে।" "হয়ে যাবে অর্জুনদা। কিন্তু তুমি কোথায় এখন?" "আমি এইমাত্র একটা বিষাক্ত সাপকে লেজ ধরে টেনে গর্ত থেকে বের করেছি।"  অর্জুন হেঁয়ালিভরা উত্তর দিল। বলতে বলতেই একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে ওর সামনে দাঁড়াল। ট্যাক্সির দরজা খোলার আগে অর্জুন আবার আড়চোখে পিছন ফিরে দেখে নিল। সেই গাঢ় ধূসর বাইকটা ধীর গতিতে ওর ট্যাক্সির পিছন পিছন এগোতে শুরু করেছে। অর্জুন ট্যাক্সির পেছনের সিটে উঠে বসে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করল। "সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ চল।"  ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল অর্জুন। ট্যাক্সিটা লেক গার্ডেনসের গলি ছেড়ে মেন রোডে পড়তেই অর্জুন সিটে গা এলিয়ে দিল।
Parent