মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৭৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6295007.html#pid6295007

🕰️ Posted on Sun Aug 23 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1923 words / 9 min read

Parent
৮ ২৯শে ডিসেম্বর  বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। জোকা-বিষ্ণুপুর ছাড়িয়ে দক্ষিণে আমতলায় দিকের বাইপাসে পৌঁছানোর আগেই ডিসেম্বরের ফ্যাকাশে, ম্লান রোদটুকু ছাইরঙা শীতের ধোঁয়াশায় ঝাপসা হয়ে আসছিল।  দু-পাশে মেহগনি, ইউক্যালিপটাস আর ঝাউগাছের দীর্ঘ সারি। কলকাতার ব্যস্ত, কোলাহলমুখর কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরের এই নির্জন রাস্তায় ট্রাফিকের হর্ন বা শহরের চেনা হাঁকডাক, কোনটাই পৌঁছায় না। একটি গাঢ় কালচে-ধূসর রঙের মার্সিডিজ-বেঞ্জ সি-ক্লাস সেডান এসে থামল তিন-মানুষ-সমান উঁচু, সুদৃঢ় পেটা লোহার কালো গেটটার সামনে। গাড়ির পেছনের দরজাটা খোলার সাথে সাথেই ভেতরে কনকনে ঠাণ্ডা উত্তরের হাওয়া এসে ঢুকল।  গাড়ি থেকে নামল অনন্যা মালহোত্রা। তার পরনে একটা নিখুঁত কাটের ডার্ক চকোলেট-ব্রাউন ওভারকোট, ভেতরে হাই-নেক ক্যাশমেয়ার সোয়েটার আর ডার্ক ব্লু ট্রাউজার্স। চোখে বড় ফ্রেমের কালো রোদচশমা। কাঁধে ঝোলানো ইতালিয়ান লেদারের সাধারণ একটা শোল্ডার ব্যাগ। পায়ে উঁচু হিলের ব্ল্যাক লেদার বুট। গাড়ির চাকা মাটির রাস্তায় থামতে যেটুকু শব্দ হয়েছিল, সেটা মিলিয়ে যাওয়ার পর চারপাশটা আবার এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতায় ডুবে গেছে। অনন্যা গাড়ি থেকে নেমে সেই নিস্তব্ধতার মাঝে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শ্বাস নিতেই তার নাকে এসে লাগল ভিজে ঘাস আর স্যাঁতসেঁতে মাটির সোঁদা গন্ধ।  ওভারকোটের পকেটে দুটো হাত পুরে দিয়ে সে মাথা তুলে একবার ওপরের দিকে তাকাল। আজ দুপুরে ফ্লাইট ধরে মুম্বই থেকে কলকাতায় এসে ল্যান্ড করার পরে সে এয়ারপোর্ট থেকে সে কাউকে ফোন করেনি, কোন হোটেলে ওঠেনি, আলিপুরের 'মালহোত্রা ম্যানশন'-এর ধারেকাছে ঘেঁষা তো দূরের কথা।  একটা প্রাইভেট কার ছুটিয়ে সে সোজা এই নির্জন প্রান্তরে এসে হাজির হয়েছে। কালো লোহার বিশাল গেটটির পাশে বড় বড় হরফে পেতলের বোর্ডে নাম খোদাই করা রয়েছে- 'হরাইজন সাইকিয়াট্রিক এন্ড নিউরোলজিক্যাল কেয়ার' গেট পেরিয়ে ভেতরে পা রাখলেই যেন এক অন্য জগৎ। যার সাথে কলকাতার চেনা কোলাহলের কোন মিল নেই। প্রায় পনেরো একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাঙ্গণটিকে বাইরে থেকে দেখলে প্রথমে কোন বিলাসবহুল রিসর্ট বলে ভুল হতে পারে। গেট থেকে সোজা মেন বিল্ডিংয়ের দিকে চলে গেছে দীর্ঘ ড্রাইভওয়ে। তার দু-পাশে নিখুঁতভাবে ছাঁটা মেহগনি ও দেবদারু গাছের সারি। ইতালিয়ান মার্বেলে তৈরি ফোয়ারাটার চারপাশে পাতা ঝরার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। তবে, এই রাজকীয় আভিজাত্যের ঠিক নিচেই জড়িয়ে আছে এক নিষ্ঠুর সত্য। খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় প্রকৃতপক্ষে এটি ভারতের অন্যতম ব্যয়বহুল প্রাইভেট সাইকিয়াট্রিক ফেসিলিটি। পুরো চত্বরটাই দশ ফুট উঁচু সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তার ওপর বসানো সূক্ষ্ম কাঁটাতারের জাল। প্রতি পঞ্চাশ মিটার অন্তর সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি ৩৬০ ডিগ্রিতে অনবরত ঘুরছে। মেহগনি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি গার্ডদের পরনে গাঢ় নীল রঙের পেশাদার ইউনিফর্ম, তাদের কানে ওয়ারলেস ইয়ারপিস।  এরা সবাই বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যেকোন ধরণের জরুরি অবস্থা বা হিংস্র রোগী সামলাতে অভ্যস্ত। এখানকার খরচ সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে।  মাসে লাখ লাখ টাকা গুনতে হয় স্রেফ একট রুমের পেছনে। শহরের উঁচুতলার মানুষজন- শিল্পপতি, অভিনয় জগতের লোকজন কিংবা এলিট পরিবারের যেসব সদস্যরা মানসিক সমস্যায় ভোগের অথবা নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন, যাদের কথা মিডিয়াতে প্রকাশ পাওয়া মানেই ফ্যামিলি বা ব্র্যান্ড ইমেজের চিরতরে ধস নামা; তাদেরকেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এনে এখানে রাখা হয়। গোপনীয়তাই এখানকার সবচেয়ে বড় পণ্য। কারা এখানে ভর্তি আছে, তাদের কী চিকিৎসা হচ্ছে, তারা বেঁচে আছে না মরে গেছে, সেসব খবর এই দশ ফুটের বিশাল প্রাচীর ডিঙিয়ে বাইরের আসবার কোনো রাস্তা নেই। ৯ অনন্যা ধীর পায়ে মূল ভবনের ইতালিয়ান মার্বেলে বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল। সে সামনে দাঁড়াতে স্বচ্ছ কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দু-পাশে সরে গেল। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে বাইরের ঠান্ডা হাওয়াটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল, তার জায়গা নিল সেন্ট্রাল হিটিংয়ের কৃত্রিম উষ্ণ হাওয়া। হাওয়ায় কড়া অ্যান্টিসেপ্টিক আর ক্লোরিনের গন্ধ, চারপাশে একটা থমথমে ভাব। রিসেপশনে বসে থাকা তরুণী এক্সিকিউটিভ অনন্যাকে দেখেই সোজা হয়ে দাঁড়াল। অনন্যার মুখের রোদচশমাটা ততক্ষণে ক্যাশমেয়ার সোয়েটারের কলারের ওপর নেমে এসেছে। মেয়েটি অনন্যাকে চেনে। সে এর আগে অনন্যাকে অনেকবার দেখেছে।  "গুড আফটারনুন, মিস মালহোত্রা।"  তরুণী খুব নিচু স্বরে বলল। তার গলায় যেমন কোন উচ্ছ্বাস নেই, তেমনই অতিরিক্ত কোন সতর্কতার সুর অনুপস্থিত।  "ডক্টর বোস ওনার কেবিনে আছেন। আমি কি ওনাকে খবর দেব?" "না।"  অনন্যা বরফ-শীতল গলায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত জবাব দিল। রিসেপশনিস্টের সাথে কথা বলার সময় তার চোখ ছিল ডানে প্রান্তের করিডোরের দিকে।  "কারো আসার দরকার নেই। আমি একাই যাচ্ছি।" "ইয়েস, ম্যাম। সুইট ১০৪ একদম রেডি।" অনন্যা কোন উত্তর দিল না। মার্বেল পাথরের পালিশ করা মেঝেতে হিলের 'ঠক, ঠক' শব্দ তুলে সে ডানদিকের ভিআইপি উইংয়ের লম্বা, নিঝুম করিডোরে মিলিয়ে গেল। এই করিডোরটা সাধারণ হাসপাতালের করিডোরগুলোর মতো নয়। এখানে লোকজনের যাতায়াত নেই। দেওয়ালে প্যাস্টেল শেডের দামি প্যানেলিং, মেঝেতে পুরু কার্পেট পাতা। গোটা করিডরে একনাগাড়ে নরম, হলুদরঙা এলইডি স্ট্রিপ লাইট জ্বলছে। পুরো পরিবেশটাই এমনভাবে তৈরি, যে এখানে সকাল কোনটা আর রাত কোনটা, তা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই। প্রতিটা ঘরের বন্ধ মেহগনি দরজার পাশে একটি করে ছোট ডিজিটাল মনিটর, যাতে রোগীর পালস, হার্ট রেট আর ইলেকট্রনিক লক স্ট্যাটাস দেখা যাচ্ছে। বাইরে থেকে ভিজিটর এলেও ভেতর থেকে দরজা লক করে রাখা নিয়ম। অনন্যা একটার পর একটা বন্ধ দরজা পার হয়ে এগিয়ে চলল। প্রতিটা সুদৃশ্য, ঝকঝকে ঘরের ভেতরে যারা বন্দি হয়ে আছে, তারা সবাই আসলে 'উধাও হয়ে যাওয়া' কিছু আত্মা। শহরের এলিট সমাজে অথবা খবরের কাগজের পাতায় এদের কারোর খোঁজ মিলবে না। করিডোরের একদম শেষ মাথায়, সাউথ-ওয়েস্ট কর্ণারে শেষ দরজাটার সামনে এসে অনন্যা থেমে গেল। দরজার ওপর পিতলের পাতের ওপর খোদাই করা, '104'। অন্যান্য ঘরগুলোর মতো এই ঘরের দরজার পাশে কোনো ডিজিটাল বোর্ড নেই। অনন্যা পকেট থেকে একটা এনক্রিপ্টেড কার্ড বের করে দরজার পাশে সেন্সরে স্পর্শ করালো। সাথে সাথেই একটা 'বীপ' শব্দ হলো। ভারী, সাউন্ডপ্রুফ মেহগনি কাঠের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। অনন্যা এক মুহূর্ত দরজাটার হ্যান্ডেল আঁকড়ে ধরে করিডরে দাঁড়িয়ে রইল। তার মেদহীন চোয়ালটা ক্ষণিকের জন্য ভীষণ শক্ত হয়ে উঠল, কপালে দুটো সূক্ষ্ম রগ ফুটে উঠল। সে একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস টানল। অ্যান্টিসেপ্টিক আর ঘরের ভেতরের এক অদ্ভুত পুরনো বন্ধ হাওয়ার মিশ্রণ তার বুকের ভেতরটা ভারী করে দিল। এতবার এখানে আসার পরেও এই ঘরে পা রাখতে গেলে সে স্থবির হয়ে যায়।  তারপর অত্যন্ত আলতো ভাবে দরজাটা ঠেলে সে ভেতরে পা রাখল আর পেছন থেকে দরজাটা নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিল। ১০ রুম 104 একটি সাধারণ মানসিক হাসপাতালের সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডের মতো নয়। আটশো স্কোয়ার ফিটের এই সুইটটি অত্যন্ত সুসজ্জিত হলে কী হবে, বীভৎস রকমের প্রাণহীন। ঘরের একদিকের দেওয়ালে প্রকাণ্ড একজোড়া সুউচ্চ ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, কিন্তু তার কাঁচগুলো ইমপ্যাক্ট-রেজিস্ট্যান্ট।  জানালাগুলোর বাইরে লোহার মজবুত গ্রিলগুলো সুন্দর কাঠের জাফরির আড়ালে এমনভাবে লুকোনো যে বাইরে থেকে দেখলে স্থাপত্যের নকশা বলে মনে হবে। জানালার ভারী, গাঢ় নীল রঙের ভেলভেটের পর্দাগুলো অর্ধেক টানা। সেই ফাঁক দিয়ে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে ঘরের একপাশে। ঘরের মধ্যিখানে পাতা রয়েছে একটি চওড়া, আরামদায়ক সেমি-মেডিকেটেড বেড। তার ধবধবে সাদা চাদরে কোথাও এক ফোঁটা ভাঁজ নেই। ঘরে কোনো কাঁচের টেবিল বা ধাতব ভাস্কর্য রাখা হয়নি, কারণ তা ভেঙে সহজেই ধারালো কিছু বানিয়ে নেওয়া সম্ভব। সব আসবাবপত্রের কোণগুলো গোল করে তৈরি, অত্যন্ত নরম ফোম আর দামি লেদারে মোড়ানো। ঘরের এক কোণে রাখা একটা নিচু সোফা আর অন্য কোণে একটি বড় ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের আর্মচেয়ার জানালার দিকে মুখ করে রাখা। সেই আর্মচেয়ারটিতে নিশ্চল হয়ে বসে আছেন এক প্রৌঢ়া মহিলা। প্রথম দর্শনেই ওনাকে দেখলে মনে হতে পারে, উনি কোনো জীবিত মানুষ নন। ওনার পরনে একটি ধবধবে সাদা, অত্যন্ত নরম সুতির লিনেন হাউজ-গাঢ় গাউন, যার কলারটা গলার কাছে পরিপাটি করে বোতাম দেওয়া। কাঁধের ওপর আলতো করে ফেলা একটি হালকা ছাইরঙা দামী শাল। এক নজরে দেখে মহিলার বয়স আন্দাজ করা কঠিন। শুধু এটাই বোঝা যাচ্ছে ভাঙা স্বাস্থ্য আর বয়সের ছাপ মিলে ওনাকে আসল বয়সের চেয়ে অনেকটাই বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে। এককালে তিনি যে সুন্দরী ছিলেন সেটা তার মুখের হাড়ের গঠনে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ওনার গায়ের রং রক্তশূন্যতার কারণে আর বছরের পর বছর রোদ না পেয়ে ফ্যাকাশে, নিস্তেজ। চোখের নিচে গাঢ়, কালচে গর্ত। গালের হাড় দুটো চামড়া ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে পাতলা, খসখসে রেখার মতো হয়ে গেছে। মাথার কাঁচা-পাকা দীর্ঘ চুল অত্যন্ত যত্নে আঁচড়ে একটা আলগা খোঁপা করে কাঁধের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। অথচ সেই চুলের বেশির ভাগ জুড়ে জেঁকে বসেছে অকাল বার্ধক্যের নিষ্ঠুর, ধবল ছাপ। কিন্তু সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ হলো ওনার চোখ দুটো। আধ-বোজা, ঘোলাটে, ধূসর মণি দুটি এক্কেবারে স্থির। জানালার কাঁচ পেরিয়ে বাইরে মেহগনি গাছের পাতার ওপর নেমে আসা শীতের কুয়াশার দিকে তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। চোখের সামনে অনন্যা এসে দাঁড়ালেও ওকে দেখে ওনার চোখের মণি এক মিলিমিটারও নড়ল না। যেন ওনার চেতনার শেষ সলতেটুকু বহু আগে কেউ এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ওনার বুকের খাঁচাটা শাল আর লিনেন গাউনের নিচ থেকে খুব ধীর ছন্দে, অতি কষ্টে ওঠানামা করছে। উনি শ্বাস নিচ্ছেন। কিন্তু, তার মধ্যে জীবনের কোনো স্পন্দন নেই। উনি এই পৃথিবীতে শারীরিকভাবে উপস্থিত আছেন ঠিকই; কিন্তু, ওনার মন, ওনার আত্মা বহু আগেই এক অসীম অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। উনি বেঁচে থাকা এক অনুভূতিহীন লাশ। অনন্যা ঘরের কাঠের মেঝের ওপর নিঃশব্দে কয়েক পা এগিয়ে এল। তার প্রতিটা পদক্ষেপে সাথে সাথে শান্ত, ক্ষুরধার, কর্পোরেট অনন্যা মালহোত্রার শক্ত বর্মটা একটু একটু করে খসে পড়তে শুরু করল। আর্মচেয়ারটার খুব কাছে এসে দাঁড়াতেই, অনন্যার হাত থেকে ব্যাগটা কার্পেটের ওপর খসে পড়ল। অনন্যা কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে প্রৌঢ়া মহিলার দিকে তাকিয়ে রইল।  বাইরে থেকে আসা সেই ম্লান আলোয় মহিলার ফ্যাকাশে, রক্তহীন গাল আর ঘোলাটে চোখের মণি দুটো স্পষ্ট হয়ে উঠতেই অনন্যার ভেতরে শক্ত করে বেঁধে রাখা আবেগের দেয়ালগুলো যেন এক লহমায় চুরমার হয়ে যেতে লাগল। সে কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে আর্মচেয়ারটির ঠিক পাশে, মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার দু-হাতে দামী ডার্ক চকোলেট-ব্রাউন ওভারকোটের হাতা গুটানো। সে অত্যন্ত সযত্নে, যেন একটু জোরে ছোঁয়া লাগলেই সামনের মানুষটি কাঁচের পুতুলের মতো ভেঙে যাবে, এমন আশঙ্কা নিয়ে, নিজের কাঁপতে থাকা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। তার হাতটা গিয়ে স্পর্শ করল প্রৌঢ়া মহিলার ডান হাতকে। মহিলার হাতটি বরফের মতো ঠান্ডা। চামড়া আলগা হয়ে এসেছে, চামড়ার নিচ দিয়ে নীলচে রক্তনালীগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠে মার্বেল পাথরের নকশার মতো দেখাচ্ছে। অনন্যার উত্তপ্ত হাতের স্পর্শ পেয়েও ওনার শরীরের পেশিতে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। তার হাতের আঙুলগুলো একটুও নড়ল না, একদম স্থির রইল।  অনন্যা আলতো করে ওনার ঠাণ্ডা, শীর্ণ হাতটি নিজের দু-হাতের মুঠোর মধ্যে টেনে নিল। সে তার গরম তালু দিয়ে ওনার জমে যাওয়া হাতটায় একটু উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু প্রৌঢ়া মহিলার দৃষ্টি আগের মতোই জানালার বাইরের ফাঁকা আকাশের দিকে স্থির রইল। অনন্যার ঠোঁট থরথর করে কেঁপে উঠল। কিন্তু, গলার বাতাস চিরে কোন শব্দ বের হলো না। স্রেফ ঠোঁটের কোণে এক থরথর কম্পন তৈরি হয়ে তা আবার ঘরের থমথমে বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে গেল। অনন্যা অন্য হাতটা তুলে প্রৌঢ়া মহিলার মাথার কাঁচা-পাকা চুলে রাখল। তার লম্বা, সুগঠিত আঙুলগুলো দিয়ে সে অত্যন্ত সাবধানে, অপার মমতায় ওনার চুলে হাত বুলাতে লাগল। চুলে হাত বোলাতে বোলাতে অনন্যা নিজের শরীরটাকে আরেকটু ওপরের দিকে তুলে ওনার ফ্যাকাশে গালের খুব কাছে নিয়ে এল। অনন্যা কোনোদিন কারোর সামনে নিজের দুর্বলতা দেখায় না। ঝানু কর্পোরেট প্লেয়ারদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সময় হোক বা মিটিংয়ে কোনরকম ডিল করার সময়, অনন্যার মুখ পাথরের মতো ভাবলেশহীন থাকত। কিন্তু আজ, এই নির্জন ঘরের ভেতরে, এই প্রৌঢ়া মহিলার হাঁটুতে মাথা ছোঁয়াতেই অনন্যার সেই পাথুরে মুখোশটা ভেঙে সম্পূর্ণ চুরমার হয়ে গেল। তার চোখ দুটো ভিজে উঠল। কপালের চারপাশের রগগুলো ফুলে উঠলো। চোখের পাতা বেয়ে টপ টপ করে প্রৌঢ়া মহিলার লিনেন গাউনের কোলের ওপর গরম অশ্রুজল ঝরে পড়তে লাগল। কিন্তু অনন্যার কান্নায় ফুঁপিয়ে ওঠার কোন আওয়াজ ছিল না। যে কান্না গলার ভেতর আটকে রেখে কোন মানুষ ভেতরে ভেতরে নিজেকে প্রতি মুহূর্তে তিলে তিলে জ্বালিয়ে মারে, এটা সেই প্রকৃতির নীরব আত্মদহন। অনন্যা এবার ওনার কপালে নিজের কপালটা ঠেকালো। প্রৌঢ়া মহিলার ত্বক ঠান্ডা, কোনো উত্তাপ নেই।  অনন্যার চিবুক কাঁপছিল। একসময় তার ভিজে যাওয়া চোখের মণির ভেতরে কান্নার জলের নিচে, হিংস্রতা ফুটে উঠল। অনন্যা আবার ওনার হাত দুটো নিজের গালের সাথে চেপে ধরল। প্রৌঢ়া মহিলার ঘোলাটে চোখের মণি তখনও স্থির। উনি জানেন না ওনার কোলে কে মাথা রেখে নিঃশব্দে অশ্রু ফেলছে। উনি জানেন না ওনার জীবনের কোন অভিশাপ এই মেয়েটির রগে রগে বিষ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। উনি স্রেফ অপলক চোখে জানালার অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অনন্যা নিচু গলায় ফিসফিস করে ওনার কানে কান ঠেকিয়ে বলে উঠল, "আর বেশি দিন নয়...। আর বেশি দিন নয়।" ওর গলার স্বর থমথমে ঘরের জমাট বাতাসকে যেন এক লহমায় চাবুকের মতো কেটে বেরিয়ে গেল। কে এই প্রৌঢ়া মহিলা? যার নাম, পরিচয়, উপস্থিতি সবকিছু এই পনেরো একরের সুরক্ষিত প্রাচীরের নিচে বন্দি করে রাখা হয়েছে? অনন্যা মালহোত্রা, যে নিজের পরিবার আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখে বাইরের দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ায়, তার সাথে এই রহস্যময় মহিলার কী সম্পর্ক? উত্তরগুলো অধরাই রইল। শুধু বিকেলের ম্লান আলোটুকু জানালার কাঁচ থেকে মুছে গিয়ে রুম 104-এর ভেতরে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে শুরু করল সন্ধ্যার অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের ভেতর নিঃশব্দে বসে রইল দুটি নারী।
Parent