নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি (Manuscript of the Forbidden City) - অধ্যায় ২৫

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73118-post-6192136.html#pid6192136

🕰️ Posted on Thu Apr 23 2026 by ✍️ Vritra Shahryar (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2293 words / 10 min read

Parent
[ আগের অংশের পর থেকে... ] গভীর রাত্রি। ডঃ সায়ক সিনহা গাড়ির ভেতরে দরদর করে ঘামছেন। গাড়িতে এসি চললেও তাঁর শরীরের ভেতরের অস্থিরতা আর উত্তাপ কমছে না। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁর জীবনটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। সেই বন্ড পেপারে সই আর ডঃ লাহার নোংরা ব্ল্যাকমেইল—সবকিছু যেন একটা দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে। সামান্য এক মুহূর্তের ভুলে তিনি নিজের দীর্ঘদিনের সম্মান, কেরিয়ার সব হারিয়ে ফেললেন। যদি তাঁর স্ত্রী, তাঁর ছেলে-মেয়েরা কোনোদিন এই ভিডিওর কথা জানতে পারে, তবে সায়ক মুখ দেখাবেন কী করে? সায়ক একবার তাঁর পকেটের দিকে তাকালেন। ডঃ লাহা তাঁকে একবারের জন্যও ফোনটা ব্যবহার করতে দেননি। বেরোনোর আগে স্ত্রীকে শুধু একটা ছোট মেসেজ করে জানিয়েছেন যে আজ রাতে তাঁর ফিরতে দেরি হবে, হাসপাতালেই থাকবেন। গাড়ির সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসে আছেন ডঃ লাহা। রাতের এই শহর এখন একদম শান্ত, নিস্তব্ধ। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো সায়কের চোখের সামনে দিয়ে দ্রুত সরে যাচ্ছে, যেন তাঁর সুখের দিনগুলো এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে। ডঃ লাহা ঘাড় ঘুরিয়ে সায়কের দিকে তাকিয়ে একটা কুটিল হাসি হেসে বললেন, “সায়ক... অত টেনশন করার কী আছে? রিল্যাক্স ম্যান! আজ থেকে তোমার লাইফ চেঞ্জ হতে চলেছে। কাল সকাল থেকে তুমি নিজেকে অন্য উচ্চতায় দেখতে পাবে।” সায়ক কোনো কথা বললেন না। তাঁর মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। গাড়িটা 'MSIAME'-এর মেইন গেট দিয়ে ঢুকে সোজা মেডিকেল কলেজের ‘Advanced Pharmaceutical Research & Human Trial Simulation Lab’-এর সামনে এসে থামল। ডঃ লাহা গাড়ি থেকে নেমে দরজাটা খুলে দিলেন। তারপর কিছুটা তাড়া দেওয়ার সুরে বললেন, “সায়ক, তাড়াতাড়ি এসো! মেঘাদিত্য স্যার ভেতরেই বসে আছেন। ওনাকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।” সায়ক টলমল পায়ে গাড়ি থেকে নামলেন। ডঃ লাহা সামনে হাঁটতে শুরু করলেন, এদিক ওদিক তাকিয়ে খুব সতর্কভাবে। সোজা ল্যাবের ভেতরে ঢুকে পেছনের দিকে গিয়ে একটা কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে বললেন, “সায়ক, কাম কুইক!” সায়ক দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ডঃ লাহা দরজাটা একটু ঠেলে ভেতর দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্যার, আসব?” মেঘাদিত্য ভেতর থেকে গম্ভীর গলায় বললেন, “কাম ডঃ লাহা।” ডঃ লাহা আর ডঃ সায়ক কেবিনের ভেতরে ঢুকলেন। সায়ক ভেতরে ঢুকে দেখল অফিসটা দেখতে খুবই সাধারণ অথচ প্রচণ্ড বিলাসবহুল। বড় কাঁচের টেবিল, দামি লেদার চেয়ার, ঠাসা বইয়ের তাক, একপাশে একটা সোফা সেট আর দেওয়ালে তাঁর নিজের ডাক্তারি ডিগ্রির ফ্রেম ঝোলানো। মেঘাদিত্য সেন নিজের চেয়ারে বসে আছেন। সামনে সেই বিশাল টেবিল। আর টেবিলের এপাশে বসে আছেন দুজন মহিলা। মেঘাদিত্য সেন শান্ত গলায় বললেন, “ডঃ সিনহা অ্যান্ড ডঃ লাহা... কাম।” ডঃ লাহা যেন এক প্রকার ভয়েই তড়িঘড়ি দুটো চেয়ার টেনে টেবিলের সামনে বসে পড়লেন। সায়কও তাঁর পাশে বসলেন। মেঘাদিত্য সেন বললেন, “ডঃ লাহা... অল ইজ ওকে? অ্যান্ড ডঃ সায়ক... দিস ইজ ডঃ রুদ্রাণী চ্যাটার্জি, আমাদের মেডিকেল কলেজের ডিন। আর ইনি প্রফেসর নয়নিকা সেনগুপ্ত।” সবাই একে অপরকে ‘হ্যালো’ বলে সৌজন্য বিনিময় করল। সায়কের হৃৎপিণ্ড তখন ড্রামের মতো বাজছে। এরপর মেঘাদিত্য সেন রুদ্রাণীর দিকে ফিরে বললেন, “তাহলে অনন্যাকে প্ল্যান পুরো বুঝিয়ে দিয়েছ?” ডঃ রুদ্রাণী নির্বিকার গলায় বললেন, “ইয়েস স্যার... নয়নিকা ম্যাডাম তো ওকে এমন বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ও এখন একদম ঠিক আছে। স্যার, ও এখন ল্যাবেই আছে... সাবজেক্ট নম্বর ০৯... কেবিনে।” মেঘাদিত্য একটা নিষ্ঠুর হাসি হাসলেন। “এখনো একজন বাকি...।” তারপর রুদ্রাণী আর নয়নিকার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আচ্ছা তোমরা যাও, আমি মিটিংটা সেরে আসছি। অ্যান্ড ওয়েল ডান নয়নিকা...।” রুদ্রাণী চ্যাটার্জি আর নয়নিকা দুজনেই কেবিন থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাইরের সোফাতে বসে পড়লেন। মেঘাদিত্য সেনের এই কথাগুলো শুনে ডঃ সায়ক কিছুই বুঝতে পারছেন না। তাঁর মাথায় শুধু ঘুরছে— এই অনন্যা মেয়েটা কে? আর সাবজেক্ট ০৯ মানেই বা কী? মেঘাদিত্য সেন এবার ডঃ লাহার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ডঃ লাহা, আপনি যে এত সহজে ডঃ সায়ককে আনতে পারবেন, সেটা আমি বুঝতে পারিনি।” ডঃ লাহা দাঁত বের করে হেসে বললেন, “আর স্যার বলবেন না... ডঃ সায়ক তো আপনার নাম শুনেই এক কথায় রাজি হয়ে গেছে!” মেঘাদিত্য সেন পিছনে হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে শান্ত গলায় বললেন, “ডঃ সিনহা... আই হোপ আপনি জানেন আমাদের পলিসি— নো কোয়েশ্চেন আসকড। আজ আমি একটু তাড়া’তে আছি, সো সোজাসুজি বলে দিচ্ছি। আর যদি কোনো প্রবলেম হয়, তাহলে আপনি শুধু ডঃ লাহা বা রুদ্রাণীর সাথে কথা বলে নেবেন।” মেঘাদিত্য সেনের এই নরম গলা শুনে সায়ক ভেতরে ভেতরে আরও বেশি ভয় পাচ্ছেন। মেঘাদিত্য সায়কের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইজ এভরিথিং ওকে ডঃ সিনহা?” সায়ক কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “ইয়েস স্যার!” মেঘাদিত্য আবার বলতে শুরু করলেন, “ডঃ সিনহা... আপনাকে আমি একটা নতুন পদ দিচ্ছি। পদের নাম — সিনিয়র কনসালট্যান্ট, সেক্সুয়াল সেন্সিটিভিটি অ্যান্ড অ্যাডভান্সড প্লেজার রিসার্চ। আপনার কাজ খুব সহজ। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ জন মেয়েকে আমি আপনার চেম্বারে পাঠাব। আপনি শুধু তাদের চেক করবেন। তাদের শরীরের প্রতিটা স্পর্শের সাড়া মাপবেন। কোন জায়গায় সবচেয়ে দ্রুত ভেজে, কোন জায়গায় সবচেয়ে জোরে কাঁপে, কত সেকেন্ডে তারা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে — সব ডেটা রেকর্ড করবেন।” তিনি একটা ছোট হাসি দিলেন। “এটা নতুন রিসার্চ। এখানে কোনো দয়া-মায়া চলবে না। সাবজেক্টদের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখাবেন না। তারা শুধু ডেটা। তাদের লজ্জা, ভয়, আর অসহ্য আরামের মিশ্র প্রতিক্রিয়া খুব ভালো করে নোট করবেন। যত বেশি লজ্জা পাবে, তত বেশি সাড়া পাবে। এটাই সৌন্দর্যের আসল রহস্য।” সায়কের হাতের ফাইলটা খুব সামান্য কাঁপছে। তিনি চুপ করে রইলেন। মেঘাদিত্য এবার সামনে ঝুঁকে এলেন। তাঁর চোখ দুটো ঠান্ডা আর তীক্ষ্ণ। “আর একটা কথা খুব পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি — যদি কোনো সাবজেক্ট একবার চয়েস করা হয়, তাহলে সে আর কখনো রিপ্লেস হবে না। কোনোদিন না। সে আপনার চেকিং-এর জন্য পার্মানেন্টলি অ্যাসাইনড থাকবে। যতদিন না আমি বলি।” তিনি একটু থামলেন। তারপর গলা আরও নিচু করে বললেন, “আপনার পার্কস খুব সুন্দর। লাক্সারি ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট। প্রাইভেট জিম, সুইমিং পুল। প্রতি মাসে ১০ লক্ষ টাকা স্যালারি প্লাস বোনাস। আমার এলিট সার্কেলে আপনার জায়গা হয়ে যাবে। আমার পার্টিতে নিয়মিত ডাক পড়বে।” তিনি একটু থামলেন। তারপর গলা আরও নিচু করে বললেন, “আর আপনার পরিবার... তাদের জন্য ২৪ ঘণ্টা প্রাইভেট সিকিউরিটি। সেরা কলেজ। সবকিছু আমি দেখব। তারা এখন আমার পরিবারের অংশ।” সায়কের মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। একটা সামান্য হাসি ফুটে উঠতে গিয়েও ভয়ে থেমে গেল। মেঘাদিত্য সোজা তাঁর চোখে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু ডক্টর সিনহা... মনে রাখবেন একটা কথা। যে হাত আপনাকে এত উপরে তুলছে, সেই হাতই আপনাকে এক মুহূর্তে নিচে ফেলে দিতে পারে। যদি কোনোদিন একটা রিপোর্টে একটা লাইনও বেশি লেখা হয়... যদি কোনো তথ্য বাইরে যায়... যদি আপনি আমার বিশ্বাস ভাঙার চেষ্টা করেন...” মেঘাদিত্য কথা শেষ করলেন না, কিন্তু তাঁর চোখের চাহনিই যথেষ্ট ছিল। ঘরের ভিতরে নীরবতা যেন পাথর হয়ে গেল। শুধু এসি-র হালকা শব্দ শোনা যাচ্ছে। মেঘাদিত্য পিছনে হেলান দিয়ে বসলেন। তাঁর ঠোঁটে সেই একই ঠান্ডা হাসি। “আমি যাদেরকে রক্ষা করি, তারাই শুধু আমার দ্বারা ধ্বংস হতে পারে। আপনি তো স্মার্ট মানুষ, ডক্টর সিনহা। আপনি কখনো বিশ্বাস ভাঙবেন না। তাই না?” সায়কের গলা একদম শুকনো। তিনি কোনোমতে বললেন, “না... স্যার। আমি... বুঝতে পেরেছি।” মেঘাদিত্য উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতটা সায়কের কাঁধে রাখলেন — যেন বন্ধুত্বের ছোঁয়া, কিন্তু সেই ছোঁয়ায় ছিল শীতল হুমকি। “ভালো। তাহলে কাল থেকেই আপনার প্রথম সাবজেক্ট আসবে। অনন্যা রায়... সাবজেক্ট নম্বর ০৯। আর মনে রাখবেন... সাবজেক্টদের প্রতি কোনো দয়া দেখাবেন না। এটা নতুন রিসার্চ। আর একবার চয়েস করা হলে কেউ আর রিপ্লেস হয় না।” তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষবার ফিরে তাকালেন। “স্বাগতম আমার দলে, ডক্টর সিনহা। এখন থেকে আপনার হাতে যে মেয়েগুলো আসবে... তাদের শরীর আর লজ্জা... দুটোই আমার।” ডঃ লাহা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলো সায়ক, তোমাকে পৌঁছে দিই।” সায়ক টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মাথার ভিতরে শুধু একটা কথাই ঘুরছে — এখন থেকে তাঁর জীবন আর তাঁর নিজের নয়। মেঘাদিত্য সেন কেবিন থেকে বেরিয়ে দেখলেন ডঃ রুদ্রাণী আর প্রফেসর নয়নিকা সোফায় বসে আছেন। তাঁদের সাথে আরও দুজন অল্পবয়সী ছেলে বসে আছে। মেঘাদিত্য তাঁদের কাছে আসতেই ডঃ রুদ্রাণী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “স্যার, দিস টু আর আওয়ার নিউ ডক্টরস... ডঃ অর্ণব আর ডঃ দিব্যেন্দু।” ঠিক সেই সময় কেবিন থেকে ডঃ লাহা আর ডঃ সায়ক সিনহা ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন। সায়ক মাথা নিচু করে ডঃ লাহার সাথে তাঁদের পাশ কাটিয়ে দ্রুত করিডোর দিয়ে চলে গেলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল ওই ঘর থেকে বেরিয়ে খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে না পারলে সে এখনই মরে যাবে। মেঘাদিত্য সেন নতুন দুই ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন। “হাই বয়েজ... থ্যাংকস ফর জয়েনিং আস।” অর্ণব আর দিব্যেন্দু দুজনেই মেঘাদিত্য সেনকে দেখে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। তারা এক স্বরে বলল, “স্যার, উই আর থ্যাংকফুল টু ইউ। আপনার আন্ডারে কাজ করার সুযোগ পাওয়া আমাদের জন্য অনেক বড় পাওনা।” মেঘাদিত্য তাঁদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “ওকে, চলো তোমাদের ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ দেখাই।” কথাটা বলে তিনি আবার নিজের কেবিনের ভেতরে ঢুকলেন। মেঘাদিত্যর পেছনে পেছনে রুদ্রাণী, নয়নিকা এবং নতুন দুই ডাক্তার ভেতরে এল। মেঘাদিত্য তাঁর টেবিলের পেছনের দেয়ালের সেই গোপন প্যানেলের কাছে গিয়ে একটা সুইচ টিপলেন। প্যানেলটা নিঃশব্দে সরে গিয়ে সেই গোপন লিফটটা বেরিয়ে এল। সবাই লিফটের ভেতরে ঢোকার পর মেঘাদিত্য সেন রেটিনা স্ক্যান করালেন। মুহূর্তেই যান্ত্রিক গলায় আওয়াজ এল— “Prism Access Granted. Welcome, Level-2 Operator.” লিফটটা যখন মাটির ৩০ মিটার নিচে নামতে শুরু করল, অর্ণব আর দিব্যেন্দুর মনে হলো তাদের পেটের ভেতরের নাড়িভুঁড়ি সব যেন ওপরের দিকে উঠে আসছে। এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর উত্তেজনা তাদের শরীরের ভেতর খেলা করতে লাগল। লিফটের দরজা খুলতেই তারা দেখল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ— প্রিজম বায়োসায়েন্স ল্যাবস। মাটির নিচে এত বড় একটা জগত থাকতে পারে, সেটা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল। চারদিকে ছোট ছোট কাঁচের কেবিন, কিন্তু প্রতিটা কেবিন ভারী পর্দা দিয়ে ঢাকা। বাইরে থেকে ভেতরে কী চলছে, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। ল্যাবের ভেতরে অনেক সিনিয়র ডাক্তার সাদা ল্যাব কোট পরে দ্রুত পায়ে যাতায়াত করছেন, কাজ করছেন। কিন্তু পর্দা ঘেরা ওই ঘরগুলোর ভেতর কী বিভীষিকা চলছে, তা কেউ টের পাবে না। মেঘাদিত্য সেন ধীর পায়ে ল্যাবের একদম মাঝখানের জায়গাটাতে এলেন। সেখানে একটা ছোট স্টেজ মতো করা আছে। রুদ্রাণী, নয়নিকা এবং দুই নতুন ডাক্তার নিচে দাঁড়িয়ে রইলেন। ল্যাবের বাকি সব ডাক্তার আর কর্মীরা কাজ থামিয়ে মেঘাদিত্য সেনের দিকে তাকালেন। সবার পরনেই ধবধবে সাদা অ্যাপ্রন। ডঃ মেঘাদিত্য সেন স্টেজে উঠে সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ বলিষ্ঠ গলায় বললেন, “লিসেন এভরিওয়ান... দিস ইজ প্রিজম বায়োসায়েন্স ল্যাবস। আ মডার্ন মেডিক্যাল রেভোলিউশন! আমরা এখানে এমন এক ইতিহাস লিখে চলে এসেছি, যা বাইরের পৃথিবী ভাবতেও পারবে না।” এক মুহূর্ত থামলেন তিনি। ল্যাবের পিনপতন নিস্তব্ধতায় তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। “ইতিহাস শুধু যুদ্ধের কথা বলে, কিন্তু ইতিহাস কখনো শরীর আর কামনার দমনের কথা বলে না। শতাব্দী ধরে এই তথাকথিত সভ্য সমাজ, এই পুরুষতন্ত্র—দুটো লিঙ্গকেই দুটো আলাদা খাঁচায় বন্দি করে রেখেছে। মানুষ ভাবে আমরা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে খুব প্রগতিশীল হয়ে গেছি। অথচ তারা জানেও না, এই তথাকথিত সভ্যতার ভিতটা আসলে দাঁড়িয়ে আছে শরীর আর কামনার এক বিশাল অবদমনের ওপর। হাজার বছরের সেই পুরনো পিতৃতন্ত্র শুধু তার গায়ের চামড়াটা বদলেছে, কিন্তু তার চাবিকাঠিটা এখনো আমাদের মতো বিজ্ঞানীদের হাতেই রয়ে গেছে।” মেঘাদিত্যর চোখে এক অদ্ভুত পৈশাচিক দ্যুতি খেলে গেল। “পিতৃতন্ত্র... শব্দটা শুনলেই লোকে ভাবে শুধু অবদমন। কিন্তু তারা জানে না, এই সিস্টেমটা আসলে ছিল কামনার এক বিশাল জেলখানা, যার চাবিকাঠি ছিল আমাদের মতো ডাক্তারদের হাতে। আমি হাসি, যখন দেখি ১৮০০ শতাব্দীর সেই নথিপত্র। পুরুষকে তারা শিখিয়েছিল—বীর্যপাত মানেই মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। 'স্পার্মাটোরিয়া' (Spermatorrhea)—এক কাল্পনিক রোগের ভয় দেখিয়ে পুরুষের পৌরুষকে তারা খাঁচায় বন্দি করেছিল। লিঙ্গের চারপাশে লোহার কাঁটাওয়ালা আংটি, অণ্ডকোষে ইলেকট্রিক শক, আর সামান্য হস্তমৈথুনকে 'মস্তিষ্কের ক্ষয়' বলে দাগিয়ে দেওয়া—এসবই ছিল এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তারা চেয়েছিল পুরুষ যেন শুধু এক অনুগত 'প্রজনন যন্ত্র' হয়ে বেঁচে থাকে, তার আদিম বুনো আনন্দকে বিসর্জন দিয়ে।” তিনি এক পা এগিয়ে এলেন স্টেজের প্রান্তে। “আর নারী? তাদের জন্য ছিল আরও ভয়াবহ 'শাস্তি'। ক্লিটোরিসকে তারা ভাবত 'অতিরিক্ত কামনার বিষবৃক্ষ', তাই অবলীলায় সেটাকে কেটে বাদ দিয়ে দিত। 'হিস্টিরিয়া' (Hysteria) নাম দিয়ে নারীর প্রতিটা শরীরী আর্তনাদকে তারা 'মানসিক ব্যাধি' বানিয়ে ফেলেছিল। পেলভিক ম্যাসাজের নামে তাদের শরীরকে কাঁপানো হতো ঠিকই, কিন্তু সেটাকে 'প্যারক্সিজম' (Paroxysm) বলে আড়াল করা হতো—যাতে কোনো মেয়ে ভুলেও ওটাকে 'আনন্দ' না বলতে পারে। আট হাজার স্নায়ুকোষের সেই আগ্নেয়গিরিকে তারা ঢেকে দিয়েছিল এক পুরু 'লজ্জার চাদর' দিয়ে।” মেঘাদিত্য সেনের গলার স্বর এবার আরও গভীর আর ধারালো হয়ে উঠল। “আমি... ডঃ মেঘাদিত্য সেন, এই প্রিজম বায়োসায়েন্স ল্যাবস-এ বসে সেই হাজার বছরের পুরনো চাদরটা আজ এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলেছি। এখানে আমি কোনো ওষুধ তৈরি করি না। আমি তৈরি করি এক নতুন ধরণের দাসত্ব। আমাদের তৈরি করা এই আধুনিক ফর্মুলা যখন নারীর নিউরাল পথে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই আদিম আগুনটা দপদপ করে জেগে ওঠে। তার যোনিদ্বার থেকে নিঃসৃত সেই ঘন, আঠালো স্রাব যখন তার উরুকে সিক্ত করে দেয়, সে লজ্জায় কুঁকড়ে যায়—কিন্তু তার শরীর আর তার কথা শোনে না। একটা অর্গাজম শেষ হওয়ার আগেই দ্বিতীয়টা তার জরায়ুতে ঢেউ তোলে। সে নিজের আঙুল কামড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে মুক্তি চায়, কিন্তু আমাদের এই বিজ্ঞান তাকে কোনো তৃপ্তি দেয় না—শুধু ক্ষুধা বাড়িয়ে যায়। এক অসহ্য, নোংরা, অন্তহীন ক্ষুধা।” ল্যাবের বাকি ডাক্তাররা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। মেঘাদিত্য বলে চললেন, “আর পুরুষের জন্য আমার উপহার আরও ভয়ঙ্কর। আমি তাদের টেস্টোস্টেরনকে এমন এক আদিম উচ্চতায় নিয়ে গেছি যে তাদের লিঙ্গ এখন এক জীবন্ত চাবুক। শিরা ফুলিয়ে শক্ত হয়ে থাকা সেই মাংসের পিণ্ডটা প্রতি মুহূর্তে বীর্যের ভারে নুয়ে পড়তে চায়। একবার নারীর শরীরের গন্ধ নাকে গেলেই তাদের মস্তিষ্কের সব সভ্যতা ধুলোয় মিশে যায়। তারা আর মানুষ থাকে না, তারা হয়ে ওঠে এক উন্মত্ত শিকারি। এটা কোনো স্বাধীনতা নয়। এটা এক নতুন, অন্ধকার নরক।” শেষে তিনি একটু হাসলেন, যে হাসি বরফের মতো শীতল। “পিতৃতন্ত্র যে কামনার আগুনকে শত শত বছর ধরে ছাই চাপা দিয়ে রেখেছিল, আমি সেই ছাই সরিয়ে দিয়েছি। এবার সেই আগুন আর বাইরের কাউকে পোড়াবে না—সেটা তাদের নিজেদের শরীরকেই ভেতর থেকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। তারা নিজের কামনার সামনে নিজেরাই হাঁটু গেড়ে বসবে, নিজের রক্ত আর বীর্যের মধ্যে গড়াগড়ি খাবে, আর আকাশ ফেটে পড়া চিৎকারে বলবে—'আর পারছি না!' এটাই আমার বিজ্ঞান। এটাই লজ্জার স্থপতির শেষ নকশা। স্বাগতম... প্রিজম বায়োসায়েন্স ল্যাবসে।” রক্তনগর শহর থেকে বহু দূরে... পশ্চিমবঙ্গ আর ওড়িশা বর্ডারের এক গভীর জঙ্গল। চারিদিকে ঘন শাল আর মহুয়ার গাছে ঘেরা এক জনমানবহীন নিস্তব্ধতা। সেই অন্ধকারের বুকে একটা ছোট তাবু পাতা। তাবুর ভেতরে একটা টিমটিমে হারিকেন জ্বলছে, ভোরের আলোয় চারপাশের ছায়াগুলো দেওয়ালে অদ্ভুতভাবে নাচছে। ভোরের সেই হাড়কাঁপানো নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাত কর্কশ স্বরে বেজে উঠল একটা অ্যালার্ম।সেই রহস্যময় বৃদ্ধ, যাঁর কথা ইতিহাস এক নিষ্ঠুর সত্যের মতো মনে করিয়ে দেয়, তিনি নিজের শিয়রে রাখা ফোনটার দিকে হাত বাড়ালেন। তাঁর চোখের সেই হালকা লালচে আভা ভোরের ম্লান আলোয় আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি অ্যালার্মটা বন্ধ করলেন না। ফোনের স্পিকার থেকে অ্যালার্মের সুর হিসেবে বেজে উঠল একটা পুরনো কাওয়ালির সুর। গানের প্রতিটা শব্দ যেন ওই শান্ত জঙ্গলের বুকে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিচ্ছে— (গানের কলি) "জুল্ম কি ইনতেহা হ্যায় আজ তেরি দহলিজে পে, লহু কা হিসাব হোগা আব হ্যায় হার এক কতরে মে... তুনে বানায়া জিসে আপনা গুলাম এ জাহিল, ওহি তুঝে মিটায়েগা তেরি হি বনায়ে হর এক দস্তুরে মে!" (অনুবাদ: তোর দোরগোড়ায় আজ জুলুমের শেষ সীমা, এখন প্রতি ফোঁটা রক্তের হিসাব হবে। ওরে মূর্খ, তুই যাকে নিজের গোলাম বানিয়েছিস, সেই তোকে শেষ করবে তোরই বানানো নিয়মের জালে!) End of chapter 5 To be continued...
Parent