নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি (Manuscript of the Forbidden City) - অধ্যায় ২৬
Chapter 6
❝ লজ্জার স্থপতি ❞
The Architect of Shame
১৯৯০ সাল।
ভারতবর্ষ তখন এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
রাস্তায় রক্তের গন্ধ, আকাশে ধোঁয়া। মণ্ডল কমিশনের আগুন তখনো নিভে যায়নি—ওবিসি (OBC) রিজার্ভেশনের দাবিতে ছাত্ররা নিজেদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে দিল্লির রাস্তায়। অন্যদিকে রামজন্মভূমি আন্দোলনের ঢেউ উত্তর ভারত থেকে পূর্বে ছড়িয়ে পড়ছে। লখনৌ, এলাহাবাদ, দিল্লি—সর্বত্র উত্তেজনা। বম্বের স্টক এক্সচেঞ্জ কাঁপছে। দেশটা যেন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে।
আর কলকাতা? কলকাতা চুপচাপ, কিন্তু সতর্ক।
বৃষ্টিতে ভেজা ট্রাম লাইন, হলদে মার্কারি বাতির নিচে চকচকে কালো রাস্তা, আর চায়ের দোকানে ফিসফিস করে বামপন্থী তর্ক।
এই সময়েই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যখন চারিদিকে ধুঁকছে, তখন কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল একদম অন্য পৃথিবীর মতো। ঠিক তেমনি ক্যালকাটা শহরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা 'ইম্পেরিয়াল কলেজ অফ মেডিকেল সায়েন্সেস অ্যান্ড অ্যাডভান্সড রিসার্চ'—এক অন্যরকম নিস্তব্ধতার সাক্ষী হয়ে আছে।
শহরের উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই কলেজটি ছিল এক প্রাচীন দুর্গের মতো। ব্রিটিশ আমলের লাল ইটের বিশাল বিল্ডিং, গথিক আর্চ, উঁচু ছাদ আর লম্বা করিডোর। এখানকার বাতাসে সারাক্ষণ ফিনাইল, ফরমালিন আর পুরনো কাগজের গন্ধ মিশে থাকত। এই কলেজে ভর্তি হওয়া মানে শুধু মেধার পরীক্ষা নয়, বংশের আভিজাত্যেরও পরীক্ষা ছিল। সাধারণ মানুষের স্বপ্ন এখানে প্রবেশের অনুমতি পেত না।
এই কলেজেরই সবচেয়ে উজ্জ্বল ছাত্রদের একজন ছিল মেঘাদিত্য সেন।
ফরসা চামড়া, সরু ফ্রেমের চশমা আর এক জোড়া বরফ-ঠান্ডা চোখ। মেঘাদিত্য কথা কম বলত, কিন্তু যা বলত তা ছিল সার্জিক্যাল স্ক্যালপেলের মতো ধারালো। তার বাবা ছিলেন কলকাতার প্রতিষ্ঠিত শিপ ক্রুজ বিজনেসম্যান আর মা হাউজওয়াইফ। কিন্তু মেঘাদিত্যের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল, তার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অবিনাশ সিংহ রায়ের সেই প্রখর পরামর্শে— “টাকা অনেকেই রোজগার করবে। কিন্তু যে মানুষের শরীর আর মনকে নিজের হাতের মুঠোয় আনতে পারবে, সে-ই হবে আগামী শতাব্দীর আসল রাজা।” সেই পরামর্শেই মেঘাদিত্যের এই কলেজে আসা। আর আসার কয়েক দিনের মধ্যেই ওর রিসার্চ স্কিল আর তীক্ষ্ণ মেধা বড় বড় গবেষকদের নজর কেড়ে নিল।
সেই কলেজেরই এক কোণে, পুরনো আমলের জরাজীর্ণ স্টাফ কোয়ার্টারের এক অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছেন ডঃ ফ্রেডরিখ হফম্যান। শুঁটকো শরীর, ফ্যাকাশে চামড়া। জার্মান বংশোদ্ভূত এই প্রবীণ গবেষক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রিটায়ার্ড, কিন্তু কলেজের ভেতরের কয়েকজন জানত—হফম্যান ১৯৬০-৭০ এর দশকে ভারত সরকারের কিছু “Classified Family Planning Project”-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সেই প্রজেক্টের নাম কখনো জনসমক্ষে আসেনি।
জানালার বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, যা কলকাতার পুরনো ড্রেনগুলোকে উপচে দিয়ে রাজপথকে নর্দমার জলে একাকার করে দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছে, যেন আকাশ নিজেই কলকাতার সমস্ত জমাট বাঁধা পাপ ধুয়ে ফেলতে চাইছে।
মেঘাদিত্য বিছানার পাশে নিঃশব্দে বসে ছিল। ওর চোখে কোনো আবেগ নেই, আছে শুধু এক গভীর তৃষ্ণা। হফম্যান হঠাৎ কাঁপা হাতে মেঘাদিত্যের কব্জি চেপে ধরলেন। ওঁর ঘোলাটে চোখ দুটোয় অদ্ভুত এক নেশা আর ভয় মিশে ছিল।
“তুমি এসেছ… ভালো। মেঘাদিত্য, তুমি আমার দেখা বেস্ট অফ দ্য বেস্ট... তুমি আমার ফেভারিট...।” একটু থেমে হফম্যান আবার বললেন, “আমি আর বেশিদিন নেই, মেঘাদিত্য। এই তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থা তোমাকে বড়জোর একজন নিপুণ কসাই বা ডাক্তার বানাতে পারবে। কিন্তু আমি তোমাকে শেখাব—কীভাবে ঈশ্বর হতে হয়।”
বৃদ্ধ খুব কষ্টে বালিশের নিচ থেকে একটা কালো কাপড়ে মোড়ানো বান্ডিল বের করলেন। হালকা কাশতে কাশতে তিনি বললেন, “মেঘাদিত্য, জানো এটা কী? এটা শুধু পুরনো কাগজের পাতা না... এটা প্রায় ১৫০০ সালের পুরনো নথি। এটা আমাদের মডার্ন মেডিক্যাল সায়েন্সের থেকেও অনেক বেশি অ্যাডভান্সড...।”
মেঘাদিত্য সেগুলো হাতে নিতেই একটা কয়েকশো বছরের পুরনো, পচা চামড়ার গন্ধ ওর নাকে এল। হফম্যান ফিসফিস করে বললেন, “এগুলো সাধারণ মানুষের জন্য নয়। তান্ত্রিক শারীরবিদ্যা, প্রাচীন অ্যালকেমি, আর হরমোনাল রিসার্চ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই নিষিদ্ধ জ্ঞান। আমি এর অর্ধেক পড়ে একটা ভয়ঙ্কর ভুল করেছিলাম… ১৯৭৬ সালে, ইন্ডিয়ান ইমার্জেন্সির (Emergency) সময়।”
ওঁর গলা কেঁপে গেল। স্মৃতিগুলো যেন ওঁর কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। “আমরা কয়েকটা বিশেষ সিরাম তৈরি করেছিলাম। প্রথমে পরীক্ষা করা হয়েছিল কয়েকজন ‘নির্বাচিত’ মানুষের ওপর। ফলাফল ছিল… বিভীষিকাময়। মেয়েরা নিজের স্বামী-সন্তান ছেড়ে একজন পুরুষের পেছনে পশুর মতো ছুটছিল। পুরুষরা অস্বাভাবিক কামোন্মাদনায় নিজেদের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। চারটে গ্রামে এক অদ্ভুত ‘মরণ কামলীলা’ শুরু হয়েছিল। কামড়ের দাগ, শরীরের বিকৃতি, অজ্ঞাত মৃত্যু… এক মাসের মধ্যে সতেরোশো লাশ। সরকার সবকিছু চাপা দিয়েছিল। আমাকে বলা হয়েছিল—‘কলেরার মহামারী ’।”
মেঘাদিত্যের চোখদুটো যেন চকচক করে উঠল। সে দাঁত চেপে খুব নিচু স্বরে বলল, “স্যার, ইউ মিন দিস বুক ইজ দ্য কি টু কন্ট্রোল এভরিওয়ান ইন দিস ওয়ার্ল্ড? আপনি এটা কোথায় পেয়েছিলেন?”
হফম্যান ম্লান হেসে বললেন, “মেঘাদিত্য, তোমার কিউরিওসিটি তোমাকে সবার থেকে আলাদা করে... কিন্তু মনে রেখো, ডোন্ট বি আ শ্রোডিঞ্জার ক্যাট (Schrödinger's Cat)...। আর তোমাকে এই বুক দিচ্ছি কারণ আমি যেটা পারিনি, সেটা তুমি পূরণ করবে। আর তার আগে বুকটা ভালো করে পড়ে নেবে, আমার মতো ভুল কোরো না। আমার এই কষ্ট আর ভালো লাগছে না মেঘাদিত্য...।”
মেঘাদিত্য পুঁথিটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর খুব ধীরেসুস্থে পাশ থেকে একটা বালিশ তুলে নিয়ে সজোরে হফম্যানের মুখে চেপে ধরল। হফম্যান ছটফট করে উঠলেন, ওঁর পা দুটো বিছানায় আছাড় খাচ্ছিল কয়েক মুহূর্ত। কিন্তু মেঘাদিত্যের হাতের ধরা বিন্দুমাত্র শিথিল হলো না। আস্তে আস্তে সব নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। ঘরটা নিস্তব্ধ।
মেঘাদিত্য পুঁথিটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার আগে একবার প্রফেসর হফম্যানের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“স্যার, লেটস বিগিন আ নিউ এরা ইন মেডিক্যাল সায়েন্স।”
[ Chapter 6 Continue......]