নিয়োগ - অধ্যায় ২৬
নিয়োগ পর্ব ২৪ -- (২)
----------------------------------------------
"দিদিভাই.... ওঃ দিদিভাই.... বটতলা চলে এসছে তো..." , টানা রিক্সাটা নামিয়ে খুঁড়ো বললো।
মাধবী চিন্তায় বিভোর ছিল। চালক খুঁড়োর কথায় তা কাটলো।
"হ্যাঁ..? ওহঃ.. চলে এলাম!", বলে রিক্সা থেকে নামলো। ভাড়া মিটিয়ে আবার বি কে পালের সেই বাড়িটার দিকে অগ্রসর হল। কিন্তু বাড়িতে যে তখন কেউ নাই! সমরেশ ততক্ষণে মাধবীর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। পার্ক সার্কাসের দিকে, যেখানে মানিকের প্রোমোটারি অফিস আছে। ভেবেছে মাধবী হয়তো কোনো কারণে দলিল নিয়ে সেখানে গেছে।
বাড়ির সামনে এসে মাধবী দেখে বাড়ি তালাবন্ধ। সর্বনাশ! সমরেশকে কি তবে তাকে খুঁজতে মানিকের পার্টি অফিসের দিকে রওনা দিয়েছে? বিমল সাথে নেই তো? ভেবেই আঁতকে উঠলো মাধবী! এবার কি করবে সে? মাথায় হাত তার!
মাধবী পিছন ঘুরে জোরে পা চালালো, আবার হেদুয়ার দিকে। তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য এবার সে একটা ট্যাক্সি করে নিল, "দাদা, তাড়াতাড়ি চলুন! বিডন স্ট্রিট.."
"দেড়শো টাকা লাগবে দিদি.."
"ঠিক আছে..", দরাদরি করার সময় ছিলনা। মাধবীর তাড়া দেখে বিলক্ষণ তা বুঝতে পায় ট্যাক্সি ড্রাইভার। সেই সুযোগে দর হেঁকেছিল, এবং তা মঞ্জুরও হয়ে গেল।
গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্টি অফিসের সামনে কালো-হলুদ ট্যাক্সিটা এসে দাঁড়ালো। টাকাটা দিয়ে চটপট গাড়ি থেকে নামলো মাধবী। দেখে অফিসের সামনে সেই ছেলেগুলো আবার বসে আছে। তাদের জলপানি হয়েগেছে। ফিরে এসছে পচার দোকান থেকে। বৌদিকে আবার দেখে খানিকটা হতবাক হল সবাই। ঝুন্টু এগিয়ে আসলো, "বৌদি, আপনি? কিছু কি ভুলে গেছেন?"
"তোমাদের দাদা কোথায়?"
"দাদা তো ওই বুঁদোর বাড়িতেই আছে। এসছিল আপনার খোঁজ করতে। আমি বললাম আপনি যেখান থেকে এসেছিলেন সেখানে ফিরে গেছেন। মনে হল একটু অসন্তুষ্ট হয়েছে। দাদা ফেরা অবধি আরেকটু অপেক্ষা করতে পারতেন। দাদা তো রাগ করে আবার ওই ফুলমণির কাছে চলে গেল, মানে, খাবার খেতে। বুঁদোটাও সাথে গেল।"
"ওহঃ!! আর কোনো লোক এসছিল আমার খোঁজ করতে?"
"আর কে আসবে?", ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো ঝন্টু।
ঝন্টুর মনে তাকে নিয়ে কোনো গভীর কৌতূহল যাতে না জাগে তাই সমরেশকে স্বামীর স্থান দিয়ে সে বললো, "আমি আমার স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করছি। একটু ফর্সা, লম্বা, চল্লিশ ছুঁই ছুঁই সুদর্শন এক পুরুষ। দেখেছেন এরকম কাউকে?"
"ইম্ম্মমঃ! নাহঃ!", চিন্তা করার ভঙ্গিমায় বললো ঝন্টু। মনে মনে ভাবলো হয়তো বরের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে ফিরে এসেছে সে। এর মানে তার আন্দাজটাই ঠিক। দাদার সাথে বেশ ইন্টুমিন্টুই চলছে। বলিহারি এসব মেয়েদের, বাড়িতে বর থাকতেও বাইরে শুধু সুবিধা পেতে ক্ষমতাশালী নাগর জোটাচ্ছে। হঁহুহঃ!
ঝন্টু জানতো মাধবীর মতো মেয়েদের পেতে হলে হয় তাদের স্বামীদের মতো সুদর্শন হতে হবে নাহলে দাদার মতো অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হতে হবে। সে দুটোর কোনোটাই নয়। চাইলেও এরকম নারী প্রাপ্তি তার হবেনা। মেনে নিয়েই মনের যত বেদনা তা ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়, এবং তখন সেই শখের নারীটির প্রতি তীব্র ঘৃণা জন্মায়। ভাবনা তার চরিত্রে দাগ লাগায়, তার সম্পর্কে বিরূপ কিছু জেনে বা না জেনেও।
এরই মধ্যে সাঙ্গ-পাঙ্গরা নিজেদের মাঝে মাধবীকে নিয়ে গোল বৈঠক শুরু করে দিয়েছিল। শুরুটা করলো পকাই। যথারীতি নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলে বসলো, "আচ্ছা, বৌদি আবার এলো কেন? তখন তো যাওয়ার সময় একবার দেখাও করে গেল না। গার্গল করতে গিয়ে একেবারে হাওয়া।"
"হাওয়া কোথায় হয়েছিল, ঝন্টুদা-কে বলে তো গেছিল", মঙ্গল বললো।
"সেই তো, বৌদি কি জনে জনে সবাইকে বলে যাবে। আমাদের কতটুকু চেনে সে...", শ্যামল তার বৌদির হয়ে সালিশি করলো।
"এই তুই চুপ কর তো শ্যামা, তুই সব বিষয়ে ঝোল টানিস, সাথে দোসর এই মংলা।.. আমার তো মনে হয় মানিকদার পর এবার ঝন্টু দার-ই নাম্বার.." ঠোঁটকাটা দিলীপ নিজের চরিত্রের পরিচয় দিল।
"এই দিলু, দেখ দেখ এখনো সেই ঝন্টুদার সাথেই কথা বলছে। আমরা যেন তার কেউ না.." পকাই হেসে উঠলো।
"ঠিক বলেছিস পকাই", সাথ দিল দিলীপ।
একদিকে ছিল শ্যামল আর মঙ্গল যারা বিষয়টা নিয়ে অত জলঘোলা করছিল না। অপরদিকে ছিল পকাই আর দিলীপ, যারা ভাবছিল ডালের মধ্যে ফোড়ন পড়েনি, পুরো ডালটাই ফোড়ন দিয়ে তৈরি।
ঝন্টু বেশ খানিকক্ষণ এক দৃষ্টিতে মাধবীর দিকে তাকিয়েছিল। মাধবীর তাতে বেশ অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। সে আর চায়না নতুন কোনো প্রেমিককে তার জীবনে। দুজনকে নিয়েই বেশ হিমশিম খাচ্ছে সে। তার উপর স্বামী তো রয়েইছে।
মাধবী কিছু না বলেই সেখান থেকে যেতে লাগছিল। সঙ্গে সঙ্গে খানিক দূর থেকে শ্যামল ডাকলো, "আরে বৌদি, চলে যাচ্ছেন আবার? একটু বসবেন না?"
দিলীপ পাশ থেকে বললো, "তুই এক কাজ কর, সাথে করে একটা মোড়া নিয়ে ঘোর। পথে ঘাটে যখুনি বৌদিকে দেখবি, আগিয়ে দিবি সেটা।"
দিলুর কথা পাত্তা না দিয়ে এবার শ্যামল এগিয়ে গেল মাধবীর দিকে। মাধবী তা দেখে একবার থামলো। কাছে এসে শ্যামা বললো, "এ কি বৌদি, এই এলেন, এই চলে যাচ্ছেন।"
এই গুন্ডা বদমায়েশের দলে শ্যামলকে দেখে মাধবীর মনে হল ব্যতিক্রম। চায়ের দোকানেও দেখেছে প্রথমে সেই নিজের জায়গাটা তার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। যদিও সে বসেছিল ঝন্টুর বাড়িয়ে দেওয়া মোড়াতে।
শ্যামলকে বললো মাধবী, "তুমি আমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবে?"
শ্যামল তাতে উৎফুল্ল হয়ে উত্তর দিল, "কোথায় বলুন না।"
"তাহলে চলো আমার সাথে" শ্যামলকে নির্দেশ দিয়ে ঝন্টুর দিকে একবার তাকিয়ে বললো, "আসছি। .."
এগিয়ে গেল মাধবী। পিছনে শ্যামল। দাঁড়িয়ে রইলো ঝন্টু। শ্যামলও তাকে হারিয়ে দিল! কিভাবে? ভাবলো একবার পিছু নেবে, কিন্তু দলের বাকিরা কি ভাববে তাহলে? মানিকের পর তাকেই তো সবাই সম্মান করে। এই ছ্যাঁচড়ামিটা করলে সেই সম্মানটা থাকবে? নিজেকেই শুধালো সে।.. তাই পিছিয়ে এলো।
কিছু দূর যাওয়ার পর শ্যামল জিজ্ঞাসা করলো, "কোথায় যাচ্ছি আমরা?"
"কাশী বোস লেন।.. তোমাদের দলে একটা ছেলে আছে না, বুঁদো.. তার বাড়ি যাব। সেখানেই তো তোমার দাদা আর ওই ফুলমণি আছে। তুমি চেনো তো?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ চিনি।"
"তাহলে আমাকে সঠিক পথ দেখিও।"
"ঠিক আছে।"
পচার দোকান বাম হাতে রেখে তার পাশ দিয়ে মাধবী শ্যামল যাচ্ছিল। পচা তখন দোকানের ঝাঁপি বন্ধ করে বিকেলের আমেজ নিচ্ছে। শ্যামা আর ওই মহিলাটাকে দেখে তার চক্ষু ছানাবড়া। দূর থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "এই শ্যামা, কোথায় যাস?"
"বুঁদোর বাড়ি", উত্তর এলো।
ওই মহিলাটা আছে দেখে আর কিছু শুধোলো না পচা।..
"তোমার নাম বুঝি শ্যামা?"
"ভালো নাম শ্যামল বিশ্বাস, সবাই শ্যামা বলে ডাকে।"
"দলে আর কে কে আছে?"
"আমি, বুঁদো, পকাই, দিলু, মংলা, ঝন্টু দা, আর আমাদের দাদা.. সবাই মিলে সাত ভাই, আর আপনি চম্পা.. হে হে..!!"
শ্যামলের লেম জোকে মাধবীও না হেসে পারলো না, "ভারী মজার মানুষ তো তুমি। দেখে মনেই হয়না তুমি গুন্ডা।"
"আমরা তো কেউ গুন্ডা নই। আমরা সবাই কমরেড!!"
"আচ্ছা বেশ বেশ!!"
কথা বলতে বলতে দেখলো উল্টো দিক দিয়ে মানিক আর বুঁদো আসছে। এ রাস্তায় মাধবীকে দেখে, তাও আবার শ্যামলের সঙ্গে, বেশ অবাক হল। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "তুমি এখানে?"
মাধবী বুঁদোকে এক ঝলক দেখে নিয়ে মানিকের দিকে তাকিয়ে বললো, "তোমার সাথে দরকার ছিল, তাই ফিরে এলাম।"
"তা শ্যামা, তুই কি করছিস?"
"বৌদি বললো তুমি যেখানে আছো সেখানে নিয়ে যেতে, তাই বুঁদোর ঠিকানায় যাচ্ছিলাম।"
"ঝন্টু ছিলনা?"
"বৌদি আমাকে সাথে নিল।"
"অঃ! তা তুই আর বুঁদো এখন যা। আমার তোদের বৌদির সাথে কিছু কাজ আছে ..", ভাবখানা মানিক এমন দেখাচ্ছিল যেন শ্যামল বুঁদো-দের সেই বৌদি যেন তারই বউ।
শ্যামল আর বুঁদো-কে পার্টি অফিসে পাঠিয়ে দিল। তারা রাস্তা থেকে বাঁক নিয়ে চোখের আড়াল হতেই মানিক মাধবীর হাত ধরে পাশের একটা ঘুপচি জায়গায় নিয়ে এলো।
"তুমি তখন চলে গেলে কেন? আমার জন্য একটু অপেক্ষা করতে পারলে না? একে তো তখন এত দেরী করে এলে, তার উপর কোনো কাজবাজ না সেরেই, ডিল না করেই চলে গেলে??"
"কি করবো, তুমি তো সেই ফুলমণির পিছনে দৌড় দিলে? ওর কি খবর? ওকে ম্যানেজ করতে পেরেছো?"
"ধুর! ও তো একটা চুঁনোপুটি মেয়ে। ওকে ম্যানেজ করা কি এমন কঠিন কাজ!!"
"আমি একটু ঘাবড়ে গেছিলাম। তুমি ওভাবে পার্টি অফিসে আমাকে একা রেখে চলে গেলে। যাবার আগে ব্লাউজটাও ছিঁড়ে দিলে। জানো, এখনো সেই ছেঁড়া ব্লাউজ পড়েই ঘুরে বেড়াচ্ছি, সেই তখন থেকে। কোনোমতে আঁচল দিয়ে নিজের সম্মান ঢেকে রেখেছি।"
মাধবীর দুই গালে হাত রেখে আদর করে বললো, "ওহঃ, সরি সোনা। আমি বুঝতে পারিনি তুমি ঘাবড়ে যাবে। ভয়ের কি ছিল? ছেলেপিলেরা বুঝেছিল তুমি আমার খাস কেউ। তাই তারা কেউ তোমার গায়ে আঁচড়ও কাটতো না।"
"তাও, আমি তো তাদের ভালোমতো চিনিনা। তাছাড়া আমি এখন অন্য কারণে এসছি?"
"কি কারণ?"
"ফিরে গিয়ে দেখি সান্যাল বাড়ি বন্ধ। নিশ্চই সমরেশ আমাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। তাই ভাবলাম হয়তো তোমার কাছে এসছে!"
"ও আমার পার্টি অফিস চেনে না। পার্ক সার্কাসে আমার যে প্রোমোটারির অফিসটা আছে সেখানে কয়েকবার ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। বড়জোর সে সেখানে যেতে পারে? কিন্তু সে জানবে কি করে তুমি আমার কাছে এসছো? তুমি বলেছো কিছু তাকে?"
"নাহঃ।"
"তাহলে তো সে তোমার বাড়িতেও যেতে পারে?"
"বাড়ি যাবেনা। তবে বিমলের কাছে ওর অফিসে যেতে পারে।.."
"বিমল কে?"
"আমার হাসবেন্ড।"
"তাহলে যেতেই পারে।.. ওদের কথা ছাড়ো, তুমি আমার কাছে এসো। বলেছিলে সূর্যাস্তের আগে তুমি আমার হবে। এখনও সূর্য পুরোপুরি অস্ত যায়নি।"
"তাই বলে এখানে! এই অন্ধকার সরু গলিতে??"
"হোক না। এখানে সচরাচর কেউ আসেনা।"
"না মানিক। আমি আর ধরা খেতে চাইনা। প্রথমে সমরেশের নির্বুদ্ধিতার জন্য তোমার কাছে অপ্রস্তুত হলাম। তারপর ফুলমণি আমাদের একসাথে দেখে নিল। আমি জনে জনে সবাইকে জানাতে দিতে চাইনা আর কিছু। এইটুকু অনুনয় রাখো আমার.. সেরকম হলে, অন্য কোথাও নিয়ে চলো, আমি বাধা দেব না", না পারতে অবশেষে মাধবী তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েই ফেললো।
আর মানিক সেটা লুফে নিল। মাধবীর হাত ধরে গলি দিয়ে আরো ভেতরে ঢুকে, সেখান থেকে ছোট ছোট রাস্তা অতিক্রান্ত করে অলিগলি হয়ে শর্টকার্ট নিয়ে এসে পৌঁছল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে। মাঝে একটা ছোট্ট দোকানে দাঁড়িয়ে মাধবীর জন্য এক গাছা সেফটিপিন কিনলো।