সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো - অধ্যায় ৯১
সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো
তৃতীয় খণ্ড
সহ লেখক- nilr1
নবম অধ্যায়
নিম্ন লিখিত অধ্যায়টি সম্পূর্ণ রূপে কাল্পনিক। গল্পে উল্লিখিত স্থান, কাল, পাত্র এবং চরিত্র সব কাল্পনিক। গল্পে উল্লিখিত চরিত্রের নামের সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোন সম্পর্ক নেই।
Legal disclaimer
The following chapter is entirely fictional. The place, time, city name and character mentioned in the story are all fictional. The name of the character mentioned in the story has nothing to do with real life. This is a work of fiction. Any Resemblance to Actual Persons, Living or Dead, or actual events, is purely coincidental.
|| ১ ||
গতকাল রাত তিনটের পরে ঘুমালেও সুমিত্রার ঘুম ভেঙে যায় বেলা আটটা নাগাদ। যদিও সে রোজ এর দুঘন্টা আগেই উঠে পড়ে। উঠেই সংলগ্ন বাথরুমে যায় সে। খুব হিসি পেয়েছে। হিসি করতে গিয়ে একই সঙ্গে সে পায়খানাও সেরে ফেলে। কম ঘুম হওয়ার জন্যেই বোধহয় পেট ভাল করে পরিষ্কার হল না। মাত্র পাঁচ ঘন্টা ঘুম হওয়ার জন্যে শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে। তাড়াতাড়ি দাঁত মেজে স্নান করে ফেলতে হবে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আলনায় রাখা একটা শুকনো তোয়ালে নিয়ে আবার বাথরুমে ঢুকে সে ব্রাশে পেস্ট লাগায়।
সুমিত্রা যখন শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে স্নান করছে, সেই সময়ে সঞ্জয়ের ঘুম ভাঙে। পাক্কা নয় ঘন্টা ঘুমিয়ে একদম ফ্রেশ লাগছে। তাদের শোবার ঘরের লাগোয়া বাথরুমটির দরজা ঠেলে ঢুকতে গিয়ে দেখে বন্ধ। সে জানে মা বাথরুমে থাকলে হাঁকডাক করে কোনো লাভ নেই। মা শুনতে পাবে না। বিনা বাক্যব্যয়ে সে তাদের বসার ঘরের বাথরুমে ঢোকে।
বেরিয়ে দেখে সুমিত্রা স্নান করে, চুল আঁচড়ে, ঠাকুরের পুজো করছে। মার সিঁথিতে সিঁদুর, পড়নে নতুন কাচা সুতির হলদে কালো ডুরে শাড়ি। বুকে লাল ব্লাউজ।
“মা কেমন আছ এখন,” বলে সে জড়িয়ে ধরতে যায়।
“এখন নয় বাবু,” বলে ছিটকে পাশে সরে যায় সুমিত্রা। সঞ্জয় ক্ষান্ত দেয়। সে বারবার ভুলে যায়, পুজোর সময়ে মাকে ছুঁতে নেই।
পুজোর শেষে সুমিত্রা বসার ঘরে রান্নাঘরের সংলগ্ন ফ্রিজ থেকে নিচু হয়ে একটা প্লাস্টিকের কৌটো বের করে। রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে কৌটোর মুখ খোলে সে। আটা মেখে রেখেছে সে গতকাল দুপুরে। আজ শনিবার আটার পরোটা বানাবে। তার বাবু খেতে খুব ভালবাসে।
মায়ের পিছু পিছু সঞ্জয়ও রান্না ঘরে আসে। ঝুড়ি থেকে তিনটে আলু বের করে রান্নাঘরের সিঙ্কে ধুতে ধুতে মার মুখের দিকে তাকায়, “বললে না তো কেমন আছ তুমি?”
“আমি ভাল আছি রে,” সুমিত্রা ম্লান হাসে।
“ঘুম হয়েছে রাতে?” আলু ধুয়ে রান্নাঘরের স্ল্যাবে রেখে সঞ্জয় দ্রুত পায়ে ফ্রিজের কাছে যায়, গাজর ও রিং বিনস বের করে। সিঙ্কের জলে ধুতে ধুতে মার মুখে আবার তাকায় সে।
সুমিত্রা বেলন চাকি রান্নাঘরের সেলফ থেকে বের করে নিয়েছে। পরোটা বেলা শুরু করে একবার আড়চোখে ছেলের দিকে তাকায়, “নারে দেরি করে ঘুম এসেছে,” ফিকে হাসে সে।
সঞ্জয় দ্রুত চপিং বোর্ডে সব্জি কাটে, “হঠাৎ কি হয়েছে তোমার মা? কখনো এমন মন খারাপ দেখিনি তোমার আজ অব্ধি,” সে কালো জিরের ফোড়ন দিয়ে সব্জি কড়াইয়ে চাপিয়ে জল দেয়।
“দাঁড়া, বলব আমি, সময় দে আমায়,” সুমিত্রা তার দিকে কাতর চোখে তাকায়। তারপর আবার পরোটা বেলে।
“ঠিক আছে মা, তুমি রেডি হলে বোল,” সঞ্জয় থতমত খায়, “এক্সহস্টটা চালিয়ে দিই মা?”
“দে,”সুমিত্রা ফ্রাইং প্যানে বাদাম তেল ঢালে। গরম হতেই পরোটা ভাজতে শুরু করে।
পনেরো মিনিটের মধ্যে আলু সব্জির তরকারি হয়ে যায়। সমস্ত পরোটা তার কিছু আগেই ভাজা হয়ে গেছে।
ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়ার সময় সঞ্জয় বলে, “মা তুমি চাইছিলে একবার একবার বীরভূমে মামাবাড়ি যাবে, যাবে মা?” সে এখন খুব সাবধান। অন্য প্রসঙ্গের কথা বলাই শ্রেয়।
“হ্যাঁ, তোর চাকরি পাওয়ার পর তো যেতে চাইছিলাম। সেই কত বছর আগে গেছি,” সুমিত্রা খেতে খেতে তার দিকে তাকায়। মার চোখে এখনও গভীর বেদনা, সঞ্জয়ের বুক মুচড়ে ওঠে।
“আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি, ঠিক বলেছি মা?” সঞ্জয় কথাবার্তা চালিয়ে যেতে চায়। তাই সে এখন সব কথা শেষ করে প্রশ্ন করে। মা তাহলে উত্তর দেবে। কথা বললে মার মন যদি ভাল হয়।
“হ্যাঁ, মনে হয় ঠিক বলেছিস,” সুমিত্রার চোখ একটু ভাবুক হয়।
“তাহলে প্রায় ন’ বছর আগে, ঠিক হিসেব করেছি না?” সঞ্জয় মনে মনে দ্রুত হিসেব করে।
“হুঁ,” সুমিত্রার ছোট্ট উত্তর।
“তুমি তো জানো, আমার চাকরিতে এক বছর প্রবেশন পিরিয়ড। এর মধ্যে কোনো ছুটি নেই সিক লিভ ছাড়া,” সঞ্জয় বলে।
“তাহলে তো যাওয়া হবে না মামাবাড়ি, না?” সুমিত্রার গলায় একটু হতাশ সুর বাজে।
সঞ্জয় ঠিক এই জিনিসটাই চাইছিল। মা যাতে একটু হতাশ হয়। এবারে সে মাকে খুশির খবরটা শোনাবে।
“তা কেন, তুমি একা তো যেতেই পারো,” তাদের খাওয়া হয়ে গেছে। সঞ্জয় চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরের সিঙ্কে এঁটো প্লেটটা রাখে।
“না, তোকে ছাড়া এখন আমি কোথাও যাব না,” সুমিত্রাও তার পিছু পিছু উঠে দাঁড়ায়।
সঞ্জয় বসার ঘরের বাথরুমের বেসিনে মুখ ধোয়। একবার পিছন ফিরে সে হেসে তাকায়। তারপর আবার বেসিনে কুলিকুচির জল ফেলে। ফিরে দাঁড়িয়ে হাতের জল ঝাড়তে ঝাড়তে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে চোখ নাচায়, “তাহলে উপায়?”
সুমিত্রাও বেসিনে মুখ ধুতে শুরু করে, “কি আবার উপায়?”
“ঘরে এসো বের করি খুঁজে,” সঞ্জয় আবার হাসে। তাদের শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে। মার অপেক্ষা করে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সুমিত্রা ঘরে আসে। খাটে তার শোওয়ার জায়গাটিতে বসে।
সঞ্জয় মার মুখোমুখি ফিরে বসে বলে, “উপায় হল এই,” সুমিত্রা উৎসুক চোখে তাকায়।
“আজ শনিবার ২রা এপ্রিল। আগামী ১৫ই এপ্রিল,শুক্রবার, রাম নবমী। ওই দিন আমাদের ছুটি। পরের দুদিন শনিরবিবার। ছুটি,” সঞ্জয় বলে।
“তিনদিন হল,” সুমিত্রা উৎসুক হয়।
“আরও আছে, ১৪ই এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, বাংলা নববর্ষ আর আম্মেদকর জয়ন্তী। ছুটি! তাহলে ১৪,১৫,১৬,১৭, মোট চারদিন তোমার!” ম্যাজিসিয়ানদের মত হাসে সঞ্জয়।
“এই হতভাগা,” সুমিত্রার হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়, “লুকিয়ে রেখেছিলি, পাজি বদমাশ কোথাকার!” সে আর পারেনা নিজেকে সামলাতে। ছেলের বুকে দুমদুম কিল মারতে থাকে সে। দুচোখ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে তার গাল ভিজে যায়।
সঞ্জয় হাহা করে ঊচ্চৈস্বরে হাসে, “এই এই মিতা লাগছে, লাগছে!”
জড়িয়ে ধরে সে সুমিত্রাকে। বিছানায় শুইয়ে দেয়। নিজেও শোয় মার পাশে।
সুমিত্রা বিছানায় তার দিকে পাশ ফিরে শুয়ে ক্লান্ত স্বরে মৃদু হেসে বলে, “খুব ঘুম পাচ্ছে!”
“ঘুমোও মা,” দেয়ালের ঘড়ি দেখে বলে, “এখন সকাল সাড়ে নটা। সাড়ে এগারোটার আগে উঠবে না তুমি। আমি ডেকে দেব,” মার শরীর পাতলা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় সে। তারপর সন্তর্পণে খাট থেকে নামে। গরম পড়তে শুরু করেছে। সত্যিই তো। বৈশাখ আসতে আর দু’সপ্তাহও নেই। সে মাথার উপর সিলিং ফ্যানটা তিনে চালিয়ে দেয়। পুবের ব্যালকনির দরজা বন্ধ করে দেয়। ঘরে মোলায়েম আলো। এই আলোয় ঘুম আসে। সঞ্জয় ভাবে। আর আসে নিবিড় শরীরী প্রেম।
“তুই কি করবি এতক্ষণ?” সুমিত্রা দুই চোখ বোজে।
“চান করে নেব, তারপর বই পড়ব,” সঞ্জয় নরম সুরে বলে।
মিনিটখনেকের মধ্যেই সুমিত্রা ঘুমে তলিয়ে যায়।
মা ঘুলিয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে সে লঘু পায়ে বসার ঘরে যায়। ফ্রিজ খুলে দেখে ফ্রিজের ক্রেটে ভরা আছে অন্ততঃ দু ডজন ডিম। একটা স্টিলের বাটিতে রাখা মাছের ভাজা টুকরোগুলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আগামী কাল কিনলেই হবে। মুরগিও কিনে আনা যাবে। মা উঠলে মাকে বেগুন ও মাছের ঝোল বানাতে বলবে। সঙ্গে ধনেপাতা। মায়ের হাতে আগে খেয়েছে। অপূর্ব লাগে ওর।
এই রান্না বীরভূমের না। সুমিত্রা এই রান্না শিখছিল এক বাঙাল প্রতিবেশিনীর কাছ থেকে। পরেশের সঙ্গে বিয়ের প্রায় পরপরই। তখন পরেশ পাট কলে চাকরি করত। ওর থাকত পাটকলের কর্মচারীদের কোয়ার্টার্সে।
শোবার ঘরের বাথরুমে গেল না সঞ্জয়। মার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। সুমিত্রার ঘুম বেশ পাতলা। টুক করে শব্দ হলেও ভেঙে যায়। বসার ঘরের বাথরুমে গিয়ে স্নান করে নিল সে।
স্নান করে সে একটা হাত কাটা স্যান্ডো গেঞ্জির উপরে সাদা ফতুয়া ও নিম্নাঙ্গে ঢোলা পায়জামা পরল। শনিবার ছুটির দিন ঢিলে ঢালা থাকতে তার ভালই লাগে। ডাইনিং টেবিলে বসে মোবাইল খুলে সে পড়তে শুরু করল দিন সাতেক আগে ডাউন লোড করা একটি পিডিএফ বই। মাকে কখনও বলেনি এই বইটির কথাটা। আগেও পড়েছে। তবে টুকরো টুকরো। ভেঙ্গে ভেঙ্গে। মার চোখ এড়িয়ে। আজ পুরো দুঘন্টা নিশ্চিন্তে মন দিয়ে পড়ল সে বইটি। নারীর ঋতুচক্র ও প্রজনন নিয়ে এ যাবত তার বিশেষ ধারণা ছিল না। আজ মোটামুটি সঠিক ধারণা হল। এমন কি সে জানত না সাধারণতঃ নারীর ঋতুচক্রের দৈর্ঘ্য দুধরনের। কারও ২৮ দিনের এবং কারও বা ৩২ দিনের। মা তাকে আগে বলেছিল, তার মনে আছে, যে তার ঋতু ২৮ দিনে হয়। বইটি পড়ার পর ইন্টারনেটে অনেকগুলি সাইটে গিয়ে সে বিস্তারিতভাবে বিষয়টি নিয়ে গভীর পড়াশুনো করে নিল।
আধ ঘন্টা পরে সুমিত্রা উঠল বেলা বারোটায়। মোট প্রায় আট ঘন্টা ঘুমিয়ে নিয়ে শরীর খুব ঝরঝরে লাগে তার। মার বাথরুমের কোমোড ফ্লাশ করার শব্দে সঞ্জয় শোবার ঘরে যায়।
“কেমন ঘুমিয়েছো মা?” সুমিত্রা বাথরুম থেকে বেরোতেই জিজ্ঞেস করে সে।
সুমিত্রা মুখ তুলে হাসে, “হ্যাঁ, ভাল লাগছে এখন। চল, রান্না করতে যাই।”
ঘুমিয়ে তার চোখদুটো ফুলে গেছে। কী ভালো যে দেখতে লাগছে মার ফোলা ফোলা মুখচোখ। সে বাম হাত বাড়িয়ে সুমিত্রার বাঁ কাঁধ জড়িয়ে ধরে, “হ্যাঁ চল মা!” তার গলায় খুশি।
রান্নাঘরে যেতে যেতে সুমিত্রা প্রশ্ন করে, “আজ কি খাবি?”
“তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে, তখনই আমি ফ্রিজ খুলে দেখে নিয়েছি। কিছু ভাজা মাছের টুকরো পড়ে,” একটুও না ভেবে উত্তর দেয় সঞ্জয়, “তখনই ভাবলাম যে ওই বাঙাল রান্নাটা খাব”।
“কোন্টা রে?” মাছ দিয়ে তো বেশ কয়েকটা বাঙাল রান্না জানে সে।
“কালোজিরে ফোড়ন, বেগুন, কাঁচা লঙ্কা আর ধনে পাতার কুচি,” সঞ্জয় লালারস মুখে শব্দ করে টেনে নেয়।
সুমিত্রা হাসে, “ও ওটা আমারও খুব প্রিয়, তাহলে ওর সঙ্গে পটল ভাজা আর পাঁচ ফোড়ন দিয়ে মুসুর ডাল করি?”
“দারুন হবে মা! আমি ভাত চাপিয়ে দিই,” সঞ্জয় খুশিতে অকস্মাৎ তার ডান গালে চুমু খায়।
সুমিত্রা এক চুম্বনে কেঁপে ওঠে। অলকা মাসির কথা মনে পড়ে তার। একা বাঁচবে কি করে সে। বুক হুহু করে ওঠে। কিছু তো করতে হবে তাকে। কিছু একটা করে তাকে এই নিদারুণ বিচ্ছেদ ভুলে থাকতে হবে। বাঁচা শিখতে হবে একা। পরে আরও কষ্ট পাওয়ার থেকে আগে সময় থাকতে সরে যাওয়া ভাল। ডুকরে কান্না গলায় উঠে আসে তার। সময় থাকতে? সময় কি আর আছে? সে তো প্রাণ মন দেহ তার প্রিয়তম পুরুষের কাছে সঁপে দিয়ে বসে আছে।
মন স্থির করতে চেষ্টা করে সুমিত্রা। ছোট একটা ছুরি দিয়ে ধনে পাতা কুচোয়। কুচোতে কুচোতে বলে, “জানিস বাবু, অলকা মাসির একটা কথা খুব মনে লেগেছে। তুই তো আট-ন’ ঘন্টা রোজ অফিসে থাকিস। এই পুরো সময়টা আমি একা ঘরে কি করি বল্তো?”
সঞ্জয় চাল ধুতে ধুতে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসে, “হ্যাঁ মা, কিছু তো করবেই। এক্সারসাইজ করে নিজের শরীর মজবুত করতে পারো এই সময়টা,” তার চোখে হাসির ছটা ঝিলিক মারে।
“ধ্যাৎ, পুরো আট ঘন্টা? মাথা খারাপ হয়েছে তোর?” সুমিত্রা রুষ্ট হয়।