অপেক্ষার তেরো বছর... - অধ্যায় ৯
রিহাদ নিজেও দ্রুত তৈরি হয়ে নিল। আম্মুর পছন্দের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সে একটা সাদা রঙের কাজ করা পাঞ্জাবি
আর পায়জামা পরল। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিয়ে সে আম্মুর ঘরে গেল। আম্মু তখন শেষবারের মতো
আয়নায় নিজের সিঁথি আর টিপটা ঠিক করে নিচ্ছিলেন। কমলা শাড়ি আর গাঁদা ফুলের সাজে আম্মুর সেই ভরাট শরীরটা
আজ যেন এক মায়াবী আলো ছড়াচ্ছে।
রিহাদ আলতো করে বলল, "চলো আম্মু, রিকশা নিচে অপেক্ষা করছে।"
বাসা থেকে বের হয়ে তারা একটা হুড তোলা রিকশায় উঠল। প্রোগ্রাম হলটা খুব বেশি দূরে নয়, রিকশায় মিনিট ২০-এর
পথ। বসন্তের শেষ বিকেলের হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। রিকশা চলতে শুরু করতেই রিহাদ আম্মুর খুব গা ঘেঁষে বসল।
রিকশার ঝাঁকুনিতে বারবার আম্মুর নরম শরীরটা রিহাদের বলিষ্ঠ কাঁধের ওপর এসে পড়ছে।
আম্মুর খোপায় লাগানো গাঁদা ফুলের সেই তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণ আর তাঁর গায়ের সেই চেনা সুবাস মিলে রিকশার ছোট
জায়গাটাতে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করল। রিহাদ অনুভব করছিল আম্মুর হাতের সেই লাল কাঁচের চুড়িগুলোর
টুংটাং শব্দ।
রিহাদ (নিচু স্বরে): "রিকশার এই ২০ মিনিট যেন শেষ না হয় আম্মু। এভাবে তোমার পাশে বসে থাকতে খুব ভালো
লাগছে।"
মা কোনো কথা বললেন না, শুধু লাজুকভাবে একটু হাসলেন। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো যখন আম্মুর মুখে
পড়ছিল, তখন তাঁর রূপ যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছিল। রিকশা যখন মোড় নিচ্ছিল, রিহাদ খুব সাবধানে নিজের
হাতটা আম্মুর কোমরের ওপর রাখল। শাড়ির পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে আম্মুর শরীরের তপ্ত উষ্ণতা রিহাদের হাতের
তালুতে অনুভূত হচ্ছিল।
মা একবার রিহাদের দিকে তাকালেন, কিন্তু হাতটা সরিয়ে দিলেন না। হয়তো আজকের এই সাজ আর পরিবেশ তাঁকেও
এক অন্যরকম আবেগে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। হুড তোলা রিকশায় সেই আধো-আলো আধো-ছায়ার মাঝে মা আর
ছেলের এই যাত্রা যেন এক নিষিদ্ধ কিন্তু রোমাঞ্চকর গল্পের সূচনা করছিল।
২০ মিনিট পর তারা যখন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে পৌঁছাল, তখন চারপাশ আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। রিকশা থেকে নামার সময় রিহাদ হাত বাড়িয়ে আম্মুকে নামতে সাহায্য করল। সেই মুহূর্তে তাঁদের হাতের স্পর্শে এক ধরণের বিদ্যুৎ খেলে গেল, যা বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে আজকের সন্ধ্যাটা তাঁদের দুজনের জন্যই খুব বিশেষ হতে চলেছে।
হল রুমে ঢোকার সাথে সাথেই আলোকসজ্জার ঝলকানি আর উচ্চস্বরে বাজতে থাকা বিয়ের গানে চারপাশটা
উৎসবমুখর হয়ে আছে। কমলা শাড়ি আর গাঁদা ফুলের সাজে আম্মু যখন ভেতরে ঢুকলেন, হলের অনেক মানুষের
চোখই একবারের জন্য থমকে গেল।
ভেতরে ঢুকেই আম্মু যেন একটু সচেতন হয়ে উঠলেন। তিনি রিহাদের হাত থেকে নিজের হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে
নিলেন।
মা (নিচু স্বরে): "এখন ছাড় রিহাদ। সবাই দেখছে তো, কেমন দেখায়! তুই একটু ওদিকে বোস, আমি শিরিন আপার সাথে দেখা করে আসি।"
রিহাদকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মা মহিলাদের ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখানে শিরিন আন্টিসহ আরও
কয়েকজন প্রতিবেশী আড্ডা দিচ্ছিলেন। রিহাদকে একা এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মনের ভেতর একটা
খচখচে অস্বস্তি দানা বাঁধল। সে দেখল, মহিলারা আম্মুর সাজের প্রশংসা করছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের মাঝে কয়েকজনের লোলুপ দৃষ্টি আম্মুর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিশেষ করে, শিরিন আন্টির দেবর কামাল সাহেব। মাঝবয়সী এই লোকটা একটু বেশিই চঞ্চল প্রকৃতির। সে আম্মুর খুব
কাছে গিয়ে হাসিমুখে কথা বলতে শুরু করল।
কামাল: "ভাবি, আজ তো আপনাকে চেনা যাচ্ছে না! এই কমলা রঙটা আপনাকে যা মানিয়েছে না, পুরো হল রুমের আলো মনে হয় আপনার ওপরেই পড়ছে।"
মা একটু লজ্জা পেয়ে হাসলেন, কিন্তু রিহাদ দূর থেকে দেখল কামাল সাহেব কথা বলার ছলে আম্মুর খুব কাছাকাছি ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছেন। একবার তো লোকটা আম্মুর হাতের সেই গাঁদা ফুলের মালার প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁর হাতটা প্রায় ছুঁয়েই ফেলল।
রিহাদের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। যে আম্মুকে সে নিজের হাতে সাজিয়েছে, যাঁর ব্লাউজের ডোরি সে নিজে বেঁধেছে, সেই
আম্মুর দিকে অন্য কেউ এভাবে তাকাচ্ছে—এটা তার সহ্য হচ্ছিল না। সে পকেটে হাত দিয়ে শক্ত করে মুঠি পাকাল।
১০ মিনিট পার হওয়ার পর রিহাদ আর স্থির থাকতে পারল না। সে ভিড় ঠেলে সরাসরি আম্মুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
কামালের দিকে একটা কঠোর চাউনি দিয়ে সে আম্মুর কাঁধে হাত রাখল।
রিহাদ (একটু গম্ভীর গলায়): "আম্মু, তোমার মনে হয় খুব খিদে পেয়েছে। চলো, তোমাকে নিয়ে একটু ওপাশে বসি।"
মা: "আরে না রে, কামাল ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম—"
রিহাদ (কথা কেড়ে নিয়ে): "কামাল আঙ্কেল তো সারারাতই থাকবেন। চলো এখন।"
রিহাদ প্রায় জোর করেই আম্মুর হাত ধরে ভিড় থেকে সরিয়ে একটা অন্ধকার কোণায় থাকা টেবিলের দিকে নিয়ে এল। মা একটু বিরক্ত হলেন।
মা: "তুই এমন করছিস কেন রিহাদ? লোকটা শুধু প্রশংসা করছিল।"
রিহাদ (তীব্র স্বরে): "আমি জানি কী প্রশংসা করছিল। আমি তোমাকে এই সাজে সাজিয়েছি অন্য কারো নোংরা নজর
দেখার জন্য নয়। বাবা আসার আগে এই কয়েকটা দিন তুমি শুধু আমার, মনে থাকে যেন।"
আম্মু রিহাদের এই হিংস্র অধিকারবোধ দেখে একদম চুপ হয়ে গেলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা আবার কাঁপতে শুরু করল।
তিনি বুঝতে পারলেন, এই হলুদ সন্ধ্যার সাজগোজ কেবল উৎসবের জন্য নয়, বরং রিহাদের মনে এক ভয়ংকর ঝড়ের
সৃষ্টি করেছে যা এই ভিড়ের মাঝেও আগুনের মতো জ্বলছে।
হল রুমের পরিবেশ তখন তুঙ্গে। রিহাদ আর আম্মু যে কর্নারে বসে ছিলেন, সেখানে আলো কিছুটা কম ছিল। রিহাদ
আম্মুর খুব কাছে বসে তাঁর প্রতিটি নিশ্বাস অনুভব করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দূর থেকে দেখা গেল কামাল সাহেব আবার
সেদিকেই আসছেন, তাঁর হাতে দুটো ড্রিঙ্কসের গ্লাস।
কামাল সাহেব টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং অত্যন্ত অমায়িক ভঙ্গিতে একটা গ্লাস আম্মুর সামনে বাড়িয়ে
ধরলেন।
কামাল: "ভাবি, অনেকক্ষণ তো কথা হলো না। এই জুসটা নিন, একদম ফ্রেশ। আর রিহাদ, তুমি তো বড় হতে হতে বেশ
রাগী হয়ে গেছ দেখছি! বাবার মতো মেজাজ পেয়েছ বুঝি?"
মা গ্লাসটা নিতে যাবেন, ঠিক তখনই রিহাদ টেবিলের নিচ দিয়ে আম্মুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে সরাসরি কামাল
সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল—
রিহাদ: "ধন্যবাদ আঙ্কেল। কিন্তু আম্মু বাইরের ড্রিঙ্কস খুব একটা পছন্দ করেন না। আর বাবার মেজাজ আমি পেয়েছি
কি না সেটা বাবা ফিরলেই বুঝতে পারবেন। আপাতত আমরা মা-ছেলে একটু একান্ত সময় কাটাচ্ছি, যদি কিছু মনে না
করেন..."
কামাল সাহেব অপ্রস্তুত হয়ে একটু হাসলেন। রিহাদের গলার স্বরে এমন একটা ধমক ছিল যে তিনি আর সেখানে
দাঁড়ানোর সাহস পেলেন না। "আচ্ছা আচ্ছা, তোমরা গল্প করো," বলে তিনি দ্রুত সেখান থেকে সরে গেলেন।
কামাল সাহেব চলে যেতেই মা রিহাদের দিকে ফিরে তাকালে দেখলেন রিহাদের চোখে এক অদ্ভুত আগুন। রিহাদ
তখনো আম্মুর হাতটা ছাড়েনি।
মা (একটু রাগত স্বরে): "রিহাদ! এটা কী করলি তুই? বড়দের সাথে এভাবে কথা বলতে হয়? মানুষ কী ভাববে?"
রিহাদ (তীব্রভাবে): "মানুষ কী ভাববে তাতে আমার কিছু যায় আসে না আম্মু। আমি তোমাকে কাল রাত থেকে বলছি,
আজ তুমি শুধু আমার। ওই লোকটা যেভাবে তোমার ব্লাউজের ডোরি আর কোমরের দিকে তাকাচ্ছিল, সেটা আমি
দেখেছি। আমি সহ্য করতে পারছি না কেউ তোমাকে এভাবে দেখুক।"
রিহাদ এবার টেবিলের নিচ দিয়ে আম্মুর শাড়ির আঁচলের ফাঁক দিয়ে তাঁর কোমরের সেই অনাবৃত অংশে নিজের হাতটা
রাখল। আম্মু চমকে উঠলেন, তাঁর সারা শরীর আবার একবার শিউরে উঠল। চারদিকে শত শত মানুষ, অথচ এই ভিড়ের
মাঝে রিহাদ তাঁর শরীরের ওপর নিজের অধিকার জাহির করছে।
মা (ফিসফিস করে): "রিহাদ, হাত সরা! কেউ দেখে ফেলবে। এটা পাবলিক প্লেস, পাগল হয়েছিস?"
রিহাদ: "কেউ দেখবে না। সবাই গানের তালে ব্যস্ত। আম্মু, তুমি শুধু একবার বলো যে তুমি আজ আমার। বলো যে
কালকের পর থেকে তুমি আর কাউকে এভাবে কাছে আসতে দেবে না।"
আম্মু কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তাঁর হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হয়ে গিয়েছিল যে তিনি ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে
পারছিলেন না। রিহাদের হাতের সেই বলিষ্ঠ স্পর্শ আর তাঁর চোখের সেই নেশাতুর চাউনি আম্মুর ভেতরের সমস্ত
প্রতিরোধ ভেঙে দিচ্ছিল। বাবার আসার সেই ৫ দিনের কথা মনে করে তিনি এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আর রোমাঞ্চ অনুভব
করলেন।
সেই জনাকীর্ণ হলের এক অন্ধকার কোণে, হলুদ সন্ধ্যার ওই মাতাল গানে, রিহাদ সবার অগোচরে আম্মুর শরীরে নিজের মালিকানা যেন সিলমোহর করে দিচ্ছিল।
সারা রাত গান-বাজনা আর উৎসবের মাঝে হল রুমটা যেন এক মায়াবী রূপ নিল। রিহাদ আর আম্মু মিলে অনেক ছবি তুলল।
বিশেষ করে কমলা শাড়িতে আম্মুকে আজ এতই অপূর্ব লাগছিল যে রিহাদ বারবার তাঁর সাথে সেলফি তুলছিল। রিহাদের ফোনের গ্যালারি এখন আম্মুর হাসিমুখের ছবিতে ভরা।
অনুষ্ঠান যখন মাঝপথে, তখন শিরিন আন্টি হাসিমুখে এক বাটি মেহেদি নিয়ে তাঁদের কাছে এলেন।
শিরিন আন্টি: "কিরে রুনু, তুই কি হাত খালি রাখবি? আমার মেয়ের বিয়ে, একটু মেহেদি না দিলে হয়? আয় তো দেখি, হাতটা বাড়া।"
মা একটু ইতস্তত করে বললেন, "আরে না আপা, এই বয়সে আবার মেহেদি! থাক না।"
কিন্তু রিহাদ দমবার পাত্র নয়। সে আম্মুর পাশেই বসে ছিল। সে আম্মুর হাতটা আলতো করে ধরে শিরিন আন্টির দিকে বাড়িয়ে দিল।
রিহাদ: "আরে না আম্মু, শিরিন আন্টি যখন বলছেন, দিয়ে দাও না। দেখো না হাতের লাল চুড়িগুলোর সাথে মেহেদি কত
সুন্দর লাগবে!"
পাশ থেকে আরও দু-একজন প্রতিবেশী মহিলা রিহাদকে সমর্থন জানালেন। অগত্যা মা আর না করতে পারলেন না।
শিরিন আন্টি নিজে আম্মুর হাতের তালুতে সুন্দর করে নকশা করে মেহেদি দিতে লাগলেন।
মেহেদি দেওয়ার সময় আম্মু অর্থাৎ রুনুর মনটা এক অদ্ভুত দোলাচলে দুলছিল। একদিকে ছেলের এই প্রগাঢ়
ভালোবাসা আর অধিকারবোধ তাঁকে এক ধরণের নারীসুলভ তৃপ্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে মনের গভীরে থাকা সেই চিরন্তন ভয়—'আমি তো একজন মা, সমাজ কী বলবে? সৃষ্টিকর্তা কি আমায় ক্ষমা করবেন?'—এই চিন্তাটা তাঁকে ভেতরে ভেতরে
কুঁড়ে খাচ্ছিল।
রিহাদ ড্রয়িং রুমের এক কোণায় দাঁড়িয়ে দেখছিল মেহেদি দেওয়া হচ্ছে। সে দেখল, আম্মু যখন নিচু হয়ে মেহেদি
দিচ্ছিলেন, তাঁর আঁচলটা বারবার কাঁধ থেকে খসে যাচ্ছিল। রিহাদ এগিয়ে গিয়ে খুব সন্তর্পণে আঁচলটা তুলে আম্মুর কাঁধে
পিন করে দিল। সেই স্পর্শে মা আবার একবার শিউরে উঠলেন।
রিহাদ (নিচু স্বরে): "আম্মু, মেহেদিটা শুকিয়ে গেলে যখন গাঢ় লাল রঙ হবে, তখন তোমার হাতটা আমার হাতে রেখো।
মা একবার রিহাদের চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে এখন আর শাসন চেয়ে বেশি ছিল এক ধরণের আত্মসমর্পণ।
তাঁর রুনু নামটা যেন আজ এই সাজ আর রিহাদের মুগ্ধতায় নতুন কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিল।
রাত গভীর হতে শুরু করেছে। উৎসবের ধুমধাম শেষ করে এবার ফেরার পালা। আম্মুর হাতে এখন মেহেদির সেই কাঁচা
ঘ্রাণ, আর মনের ভেতর সেই নিষিদ্ধ শিহরণ আর ভয়ের সংঘাত।
রাত তখন প্রায় ২:৩০টা। অনুষ্ঠানস্থলের জৌলুস ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। হল রুমের এক কোণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
থাকা কিছু মেহমান বিদায় নিচ্ছেন। চারদিকে তখনো রান্নার মশলা আর রজনীগন্ধার একটা মিশ্র গন্ধ বাতাসে ভাসছে।
আম্মুর হাতের তালুর সেই সূক্ষ্ম নকশার মেহেদি এখন শুকিয়ে অনেকটা কালচে হয়ে এসেছে। তিনি শাড়ির আঁচলটা
ঠিক করতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন, মেহেদির একটা মৃদু সুবাস তাঁর নাকে এসে লাগছে। রুনু আয়নার দিকে তাকিয়ে
একবার নিজের সাজটা দেখে নিলেন; কয়েক ঘণ্টার উৎসবের ক্লান্তিতে তাঁর চোখেমুখে একটা স্নিগ্ধ আবেশ তৈরি
হয়েছে।
তিনি রিহাদকে কাছে ডেকে নিয়ে নিচু স্বরে বললেন, "রিহাদ অনেক রাত হয়েছে রে। এবার মনে হয় বাসায় যাওয়া
উচিত। শরীরটাও কেমন জানি মেজমেজ করছে।"
রিহাদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত আড়াইটা বাজে। সে জানে, এই নিস্তব্ধ রাতের শহর আর এই নির্জনতা তার জন্য
এক দারুণ সুযোগ। সে দ্রুত হলের বাইরে বেরিয়ে গেল রিকশা খুঁজতে। রিহাদ চলে যেতেই শিরিন আপা ব্যস্ত ভঙ্গিতে
আম্মুর কাছে আসলেন। তাঁর হাতে একটা ছোট কৌটোয় আরও কিছু গাঢ় মেহেদির পেস্ট।
শিরিন আপা হাসি মুখে বললেন, "রুনু, এই নে। এই মেহেদিটা একদম খাঁটি। কাল সকালে যখন ধুয়ে ফেলবি, দেখবি
হাতটা একদম টকটকে লাল হয়ে গেছে। তুই তো সারা রাত শুধু দৌড়াদৌড়িই করলি, ভালো করে মেহেদিও নিতে পারলি
না। আর শোন না, থেকে গেলে হতো না? রাত তো অনেক হলো!"
রুনু একটু লজ্জিত হাসি হেসে বললেন, "না গো আপা, রিহাদ আবার কাল সকালে ভার্সিটি যাবে কিনা ঠিক নেই, তাছাড়া
ঘরেরও তো মায়া আছে। তুমি বরং ব্যস্ত থেকো না, আমরা যাই।"
ইতিমধ্যে রিহাদ একটা হুড তোলা রিকশা নিয়ে হলের গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। সে এসে আম্মুকে ইশারা করতেই রুনু
শিরিন আপার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিকশার দিকে এগিয়ে গেলেন।
রিকশায় ওঠার সময় রিহাদ হাত বাড়িয়ে আম্মুকে ধরল। আম্মুর হাতে মেহেদির সেই ভিজে ভাব আর নতুন মেহেদির
ঘ্রাণ রিহাদকে মুহূর্তে পাগল করে তুলল। তারা দুজনে পাশাপাশি বসতেই রিহাদ রিকশার হুডটা একদম নিচে নামিয়ে
দিল।
রাতের ঢাকা তখন একদম নিঝুম। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোগুলো আম্মুর কমলা শাড়ির ওপর পড়ে এক
মায়াবী ছায়ার খেলা তৈরি করছিল। রিকশাওয়ালা যখন প্যাডেল মারছে, তখন সেই চাকার ছান্দিক শব্দে চারদিকের
নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে।
রিকশার সেই অল্প জায়গায় রিহাদ আর আম্মু একদম গা ঘেঁষে বসে আছেন। আম্মু তাঁর মেহেদিরাঙা হাতগুলো খুব
সাবধানে দুই হাঁটুর ওপর রেখেছেন যাতে কোথাও লেগে না যায়। রিহাদ আড়চোখে দেখল, বাতাসের ঝাপটায় আম্মুর
খোপার সেই গাঁদা ফুল থেকে একটা মিষ্টি সৌরভ ভেসে আসছে। সে অনুভব করল, আম্মুর শরীরের উত্তাপ তার সাদা
পাঞ্জাবির হাতা ভেদ করে ভেতরে ঢুকছে।
রিহাদ নিচু গলায় ডাকল, "আম্মু..."
রুনু বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, ছেলের ডাকে তাঁর বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল। তিনি খুব ক্ষীণ স্বরে বললেন,
"হুম, বল।"
রিহাদ তখন আম্মুর সেই মেহেদি মাখা হাতটার খুব কাছে নিজের আঙুল নিয়ে গেল। সে অনুভব করতে চাইল, এই
পবিত্রতা আর এই নিষিদ্ধ আকর্ষণের মাঝখানের দেয়ালটা কতটুকু পাতলা। বাবার আসার সেই হাতেগোনা কয়েকটা
দিনের কথা ভেবে রিহাদ যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল এই নির্জন রিকশা ভ্রমণে।
রিকশার সেই নিবিড় অন্ধকারে রিহাদ আর আম্মুর মাঝখানের দূরত্বটুকু যেন পুরোপুরি মুছে গেছে। রিকশার হুড তোলা
থাকায় বাইরের জগতের কেউ তাঁদের দেখতে পাচ্ছিল না। রিহাদ খুব সাবধানে আম্মুর সেই মেহেদিরাঙা হাতটা নিজের
হাতের শক্ত মুঠোয় তুলে নিল। মেহেদির সেই কাঁচা ঘ্রাণ আর আম্মুর হাতের কোমলতা রিহাদের মস্তিষ্কে এক ধরণের
নেশা ধরিয়ে দিল।
রিহাদ শুধু হাত ধরেই ক্ষান্ত হলো না। সে আরও একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে আম্মুর ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল।
আম্মুর খোপায় লাগানো সেই গাঁদা ফুলগুলো এখন কিছুটা ম্লান হলেও তাদের তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণ তখনো অমলিন। রিহাদ
চোখ বুজে সেই ঘ্রাণ বুক ভরে টেনে নিল। তাঁর তপ্ত নিঃশ্বাস আম্মুর ঘাড়ের সিক্ত চামড়ায় আছড়ে পড়ছিল।
রিহাদ (ফিসফিস করে): "আম্মু... এই ঘ্রাণটা সারাজীবন আমার নাকে লেগে থাকবে। তোমাকে আজ যে কী মায়াবী
লাগছে, আমি বলে বোঝাতে পারব না।"
রিহাদের শরীরের উত্তেজনা তখন চরমে। সাদা পাঞ্জাবির নিচে তার ধোন তখন এতটাই উত্তেজিত আর শক্ত হয়ে
উঠেছিল যে মনে হচ্ছিল সেটা প্যান্টের কাপড় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। একটা তীব্র যন্ত্রণা আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি
তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু রিহাদ নিজেকে সংযত রাখল; সে শুধু আম্মুর ঘাড়ের কাছে মুখ ঘষতে লাগল
আর সেই মাদকতাময় ঘ্রাণ নিতে লাগল।
মা অর্থাৎ রুনু তখন এক চরম দোটানায়। রিহাদের এই আগ্রাসী সান্নিধ্য তাঁর শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে আগুনের মতো
ছড়িয়ে পড়ছিল। তিনি বারবার রিহাদকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই প্রতিরোধ ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
মা (কাঁপা গলায়): "রিহাদ... না... ছাড়। রিকশাওয়ালা দেখে ফেলবে। তুই পাগল হয়ে গেছিস? এসব ঠিক না রে বাবা...
ছাড় আমাকে।"
কিন্তু রিহাদ তাঁর কথা শুনছিল না। সে আম্মুর হাতের ওপর নিজের আঙুল দিয়ে আলতো করে ঘষতে লাগল। আম্মু
বারবার নিজের শরীরটাকে সংকুচিত করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু রিকশার ছোট জায়গায় রিহাদের বলিষ্ঠ শরীরের চাপ
থেকে তিনি নিজেকে বাঁচাতে পারছিলেন না। রুনুর নিজের ভেতরটাও তখন কামনার এক নিষিদ্ধ আগুনে জ্বলছিল, যা
তিনি কোনোভাবেই প্রকাশ করতে পারছিলেন না।
রাতের নিস্তব্ধতায় রিকশার চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর দুজনের দ্রুত হতে থাকা হৃদস্পন্দনের শব্দ মিলে এক অদ্ভুত
পরিবেশ তৈরি হলো। রিহাদ শুধু ঘ্রাণ নিয়েই যাচ্ছিল, আর মা তাঁর সেই মায়াবী প্রতিরোধের দেয়ালটা ধরে রাখার আপ্রাণ
চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুজনের কেউই জানতেন না যে, এই নিষিদ্ধ মুহূর্তগুলো তাঁদের সম্পর্কের সমীকরণকে চিরতরে
বদলে দিচ্ছে।
রিকশা যখন বাসার গেটের সামনে থামল, চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় গলিটা এক রহস্যময় রূপ নিয়েছে। রিহাদ প্রথমে রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিল, তারপর হাত বাড়িয়ে দিল আম্মুকে নামতে সাহায্য
করার জন্য।
আম্মু যখন রিকশার উঁচু অংশ থেকে নামতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর কাঁধের পিনটা আলগা হয়ে শাড়ির আঁচলটা
মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কমলা রঙের পাতলা সুতি শাড়ি আর সেই আঁটসাঁট ব্লাউজের ভেতর দিয়ে আম্মুর
শরীরের ঊর্ধ্বাংশ অনেকটাই অনাবৃত হয়ে গেল। ব্লাউজের গভীর গলার (cleavage) সেই ভরাট দুধের খাঁজটি রিহাদের
চোখের সামনে স্পষ্টভাবে ধরা দিল।
রিহাদ এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। তার স্থির দৃষ্টি তখন আম্মুর উন্মুক্ত বুকের সেই গভীর বিভাজিকার
ওপর। রাতের এই নির্জনতায় আম্মুর শরীরের সেই নিষিদ্ধ সৌন্দর্য রিহাদের চোখের নেশাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে
দিল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল।
মা অর্থাৎ রুনু দ্রুত সামলে নিলেন নিজেকে। তিনি বুঝতে পারলেন রিহাদ কোথায় তাকিয়ে আছে এবং তার চোখের সেই
তৃষ্ণার্ত চাহনি তাঁকে ভেতরে ভেতরে কাঁপিয়ে দিল। তিনি লজ্জায় আর জড়তায় দ্রুত মাটি থেকে আঁচলটা তুলে নিলেন
এবং হাত দিয়ে বুকের সেই অনাবৃত অংশটুকু ঢেকে ফেললেন।
মা (একটু গম্ভীর কিন্তু কাঁপা গলায়): "কী দেখছিস ওভাবে? চল, ভেতরে চল।"
তিনি আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাসার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর হাঁটার ছন্দে এখন এক ধরণের দ্রুততা আর অস্থিরতা, যেন তিনি রিহাদের ওই নেশাতুর চাহনি থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন। রিহাদও কোনো কথা
বলল না, শুধু আম্মুর সেই দুলে ওঠা ছিপছিপে শরীরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে পেছনে এগোতে লাগল।
বাসার মূল দরজা খোলার সময় আম্মুর হাত কাঁপছিল।