একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) - অধ্যায় ১২
চ্যাপ্টার ১০ – অপেক্ষার যন্ত্রণা (Part 3)
রুবিনা খালা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হাসিমুখে বললেন, “তোর কলেজ কেমন চলছে রাহাত? আমি তো শুনেছি তুই খুব মন দিয়ে পড়িস। তোর মা তো সবসময় তোর প্রশংসা করে।”
রাহাত মাথা নিচু করে চায়ের কাপটা দুহাতে ধরে রইল। তার গলা শুকিয়ে গেছে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তার মন পুরোপুরি মায়ের কাছে। খালার প্রশ্নটা তার কানে যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। সে জোর করে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু হাসিটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“ভালোই চলছে খালামণি… মানে, ঠিকঠাক।”
রুবিনা খালা চোখ সরু করে তাকালেন। তাঁর মায়াবী হাসির আড়ালে তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যেন সবকিছু লক্ষ্য করছে। তিনি চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে আস্তে করে বললেন,
“ঠিকঠাক মানে কী রে? এইচএসসি তো জীবনের বড় সময়।”
শিউলি পাশে বসে চুপ করে ছিলেন। তার শরীরেও একই অস্থিরতা। হাতে চামচটা ধরা, কিন্তু চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
“আমি রান্নাঘরে যাই। আপু, দুপুরে কী খাবে? আজ তোমার জন্য বিশেষ কিছু রান্না করব।”
রুবিনা খালা হেসে উঠলেন। তার হাসিতে স্নেহ আর একটু খোঁচা মিশে আছে।
“তুই অস্থির হোস না শিউলি। যা আছে তাই খাব। আমি কি মেহমান নাকি? তোর বাড়িতে এসেছি বলে তোর উপর চাপ দিতে এসেছি? তুই অসুস্থ মানুষ, যা আছে তাই খাব।”
শিউলি জোর করে হাসলেন। হাসিটা খুবই কৃত্রিম।
“না আপু, ঠিক আছি। একটু মাথা ব্যথা করছিল।”
শিউলি রান্নাঘরে চলে গেলেন। তার পা যেন ভারী হয়ে গেছে। রান্নাঘরে ঢুকে তিনি দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। চোখ বন্ধ করে ফেললেন। রাহাত… তুই কোথায় রে? তোর খালা যদি না থাকত… আজ আমরা এখন কী করতাম… তার শরীর কাঁপছে।
কয়েক মিনিট পর রাহাতও উঠে পড়ল। তার মন একদম বসছিল না। সে রান্নাঘরের দিকে গেল।
রান্নাঘরে ঢুকে সে দরজার কাছে দাঁড়াল। তার গলা শুকিয়ে গেছে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“মা… খালামণি কখন যাবে?”
শিউলি রাহাতের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে গভীর কষ্ট আর আকাঙ্ক্ষা মিশে আছে। চোখের কোণে জল চলে এসেছে। তিনি রাহাতের হাতটা ধরে ফিসফিস করে বললেন, গলা কাঁপছে,
“রাহাত, তুই কলেজে যা। খালা বিকেল পর্যন্ত থাকবে। বাসায় থেকে কোনো লাভ নেই রে।” শিউলি জানেন রাহাত যদি বাসায় থাকে তাহলে তার আরও বেশি কষ্ট হবে। কাছে পেয়েও ছুঁতে পারবে না। সেটা তার জন্য আরও যন্ত্রণার। শিউলি বললেন, “বিকেলে খালা চলে গেলে আমরা দুজন একা থাকব। কলেজ মিস করার দরকার নেই। পড়াশোনাটা তো তোর জীবনের বড় অংশ।”
রাহাতের চোখে জল চলে এসেছে। সে মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, গলা ভেঙে যাচ্ছে,
“মা… আমি আর পারছি না। সারাদিন তোমার কথা ভেবে কলেজে বসে থাকব কী করে? খালামণি চলে গেলে আমি সোজা বাসায় আসব।”
শিউলি রাহাতের গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে, চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, তার গলাও কাঁপছে,
“আমিও পারছি না রে। কিন্তু তুই যা। বিকেলে ফিরে আয়। আমি তোর জন্য অপেক্ষায় থাকব।”
রাহাত অনিচ্ছায় কলেজের জন্য রেডি হলো। তার চোখে জল, মন ভারী। বের হওয়ার আগে সে রুবিনা খালাকে বলল,
“খালামণি, আমি কলেজে যাচ্ছি।”
রুবিনা খালা হেসে বললেন,
“যা রে, ভালো করে পড়।”
রাহাত বের হতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন শিউলি বেডরুম থেকে ডাকলেন,
“রাহাত, এই রুমে আয়… টাকা নিয়ে যা।”
রাহাত থমকে দাঁড়াল। সে বেডরুমের দিকে গেল। রাহাত ঘরে ঢুকতেই তিনি দরজাটা হালকা করে ভেজিয়ে দিলেন। জড়িয়ে ধরলেন রাহাতকে। তার হাত রাহাতের কোমরে, বুক রাহাতের বুকে চেপে গেল।
শিউলি তার ঠোঁটে একটা তীব্র, কিন্তু ছোট্ট চুমু খেলেন। ঠোঁট চেপে ধরলেন। চুমুটা লম্বা হলো না, কিন্তু তাতে সারাদিনের অপেক্ষা, সব যন্ত্রণা ঢেলে দিলেন।
রাহাতের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। শিউলিরও। দুজনের গালে জল মিশে গেল। শিউলি ফিসফিস করে বললেন, গলা ভেঙে,
“জলদি ফিরিস রে… আমি আর পারছি না…”
রাহাত মায়ের কপালে চুমু খেয়ে, চোখ মুছে বলল,
“মা… আমিও পারছি না। বিকেলে ফিরে আসছি।”
দুজনেই চোখের জল মুছে নিল। রাহাত বেরিয়ে গেল।
বাইরে তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশ যেন তাদের এই অস্থিরতা আর অপেক্ষার গল্পটা নিজের চোখে দেখে মুচকি হাসছে। ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা পাতায় পাতায় ঝরছে, যেন প্রকৃতি নিজেই চোখের জল ফেলছে - কখনো বিচ্ছেদের, কখনো মিলনের আশায়। রাহাত বৃষ্টির মধ্যেই হেঁটে চলেছে। পিচ ঢালা রাস্তায় বৃষ্টির ছিটা পড়ছে। সে একবার উপরের বারান্দার দিকে তাকাল। শিউলি দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ দুটো যেন দূর থেকেও রাহাতের বুকে এসে বিঁধছে।
ঠিক তখনই একটা বৃষ্টির ফোঁটা তার চোখে পড়ল। দৃষ্টি ঘোলা হয়ে গেল। চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিশে একাকার। রাহাত চোখ মুছল। ঘোলা দৃষ্টিতে মায়ের ছায়াটা আরও অস্পষ্ট হয়ে গেল। সে নিচের দিকে তাকিয়ে হেঁটে চলল। প্রতি পদক্ষেপে তার হৃদয়টা যেন বলছে - “ফিরে আয়… ফিরে আয়…”। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার কাঁধে, মাথায়, গালে পড়ছে। প্রকৃতি যেন ফিসফিস করে বলছে, “অপেক্ষা করো বাবা… অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয় বটে।”
রাহাত হেঁটে চলেছে। তার শরীর ভিজে যাচ্ছে। চোখের সামনে শুধু মায়ের মুখ। আর প্রকৃতি চুপচাপ দেখছে - এই দুটি হৃদয়ের নিঃশব্দ যুদ্ধ, যেখানে বৃষ্টি হয়ে গেছে তাদের অশ্রু, আর অপেক্ষা হয়ে গেছে তাদের প্রার্থনা।