একাকীত্বের শেষ সীমানা (মা - ছেলে) - অধ্যায় ১৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-71881-post-6178769.html#pid6178769

🕰️ Posted on Mon Apr 06 2026 by ✍️ Masranga (Profile)

🏷️ Tags:
📖 3598 words / 16 min read

Parent
চ্যাপটার ১১ - দেয়াল ভাঙার পর দুপুরের খাবার টেবিল। সাদা টেবিলক্লথের উপর প্লেটগুলো সুন্দর করে সাজানো। গরম ভাতের খেয়ালি ধোঁয়া উঠছে, ঘন মসুর ডালের সোনালি আভা, আলু ভাজির ক্রিস্পি সোনালি রং, মাছের ঝোলের সুগন্ধ আর ছোট্ট সালাদের সবুজ সতেজতা। সবকিছু যেন নিখুঁত। কিন্তু শিউলির চোখে কিছুই পড়ছে না। তার হাত দুটো কাঁপছে। চামচটা তুলতে গিয়েও আবার নামিয়ে রাখছেন। আঙুলগুলো যেন নিজের ইচ্ছায় চলছে না। প্রতিবার চামচটা প্লেটে ঠেকানোর সময় একটা ছোট্ট কাঁপুনি উঠছে - ঠং করে একটা শব্দ হয়, যেন কেউ তাঁর বুকের ভেতরটা নিয়ে নাড়াচ্ছে। মনটা একদম অন্য জগতে। চোখের সামনে শুধু রাহাতের মুখ ভাসছে। ছেলেটার চোখে জল, তার অপেক্ষা, তার অস্থিরতা। রুবিনা চামচে ভাত তুলতে তুলতে আস্তে করে বললেন, গলায় গভীর স্নেহ আর উদ্বেগ মিশে, “শিউলি, তুই আজ এত চুপচাপ কেন রে? সকাল থেকে দেখছি তোর মুখটা একদম ফ্যাকাশে। কী হয়েছে বল তো? তুই তো এমনিতে অনেক কথা বলিস, আজ যেন পাথর হয়ে গেছিস। রাহাতের বাবা তো বাইরে, তুই একা সংসার সামলাচ্ছিস। শরীর কেমন লাগছে, কী হয়েছে বল তো। আমি তো আছি রে, তোর বড় বোন। তুই যেন কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছিস… চোখ দেখে আমার বুকটা কেঁপে উঠছে।” শিউলি জোর করে হাসার চেষ্টা করলেন। হাসিটা এত কৃত্রিম যে গালে টান পড়ে গেল। ঠোঁট কাঁপছে। চোখ নামিয়ে নিয়ে তিনি চামচটা প্লেটের ভাতে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। “না আপু… সত্যি বলছি, ঠিক আছি। একটু মাথা ব্যথা করছে। রাতে ঘুম হয়নি ভালো করে। তুমি চিন্তা কোরো না। খাও, ডালটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।” রুবিনা এক চামচ ভাত মেখে মুখে দিলেন। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে চিবিয়ে খেলেন। তারপর আবার বললেন, গলায় আরও গভীর উদ্বেগ, “শিউলি, তুই আমাকে কেন লুকাচ্ছিস রে? আমি তো তোর বড় বোন। তোর চোখ দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তোর জামাইয়ের খবর কী? রহমানের সাথে সব ঠিক আছে তো? শরীর-স্বাস্থ্য কেমন আছে ওর? তুই তো কিছুই বলিস না। আমি তোর বোন, তোর কষ্ট আমি বুঝি না? তোর চোখে যেন একটা বড় কষ্ট লুকিয়ে আছে। বল না রে, আমাকে বললে হয়তো তোর বুকটা একটু হালকা হবে। আমি তো আছি তোর পাশে।” শিউলির হাতটা একদম থেমে গেল। চামচটা প্লেটের উপর আছড়ে পড়ল। চোখ নামিয়ে নিলেন। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। গলার কাছে কষ্টের গিঁটটা আরও শক্ত হয়ে আটকে গেছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ধরা গলায় বললেন, “সব ঠিক আছে আপু… রহমান খুব ভালো মানুষ… সত্যি বলছি, খুব ভালো মানুষ… ও কখনো কিছু বলে না… আমি… আমি ঠিক আছি।” রুবিনা তাঁর হাতটা ধরে ফেললেন। হাতটা গরম, কাঁপছে। রুবিনার চোখেও জল চলে এসেছে। গলা ভেঙে গেছে, “শিউলি, দেখ তোর হাত কাঁপছে! চোখ দিয়ে জল পড়ছে! তুই কাঁদছিস কেন রে? আমি তোর বড় বোন। তোকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখলে আমার বুকটা ফেটে যায়। তোর জামাইয়ের সাথে কি কোনো সমস্যা হচ্ছে? কোনো কষ্ট হলে বল না আমাকে। লুকিয়ে কী করবি? আমাকে বল, আমি তোকে সাহায্য করব। তোর চোখ দেখে আমার মনে হচ্ছে তুই যেন কোনো বড় কষ্টের সাগরে ডুবে আছিস। বল রে শিউলি, বল… তোর এই চুপ করে থাকাটা আমাকে আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছে।” শিউলির চোখ দিয়ে এবার জলের ধারা নেমে এল। তিনি চামচটা ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন। কাঁপা গলায়, ভেঙে ভেঙে বললেন, “সব ঠিক আছে আপু… সত্যি বলছি… রহমান খুব ভালো মানুষ… খুব ভালো মানুষ… ও কোনো দোষ করে না… আমি… আমি শুধু… একটু মন খারাপ… তুমি চিন্তা কোরো না… প্লিজ আপু, আমাকে আর জিজ্ঞেস কোরো না…” রুবিনা শিউলির হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। বোনকে দেখে তাঁর নিজের চোখেও জল গড়িয়ে পড়ছে। গলা ভেঙে, কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “শিউলি, তুই এভাবে কাঁদছিস কেন? তোর এই কষ্ট আমি আর দেখতে পারছি না রে। কী লুকাচ্ছিস তুই? আমি তো তোর আপু… তোর সব কথা শোনার জন্য আছি। বল না রে… বল… তোর এই চুপ করে থাকাটা আমার বুকটা ছিঁড়ে দিচ্ছে। আমাকে বল, প্লিজ… আমি তোকে একা ফেলে দিব না।” টেবিলের উপর গরম ভাত আর ডাল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কারোরই খাওয়ার মাথায় নেই। শুধু দুই বোনের মাঝে কষ্টের একটা অদৃশ্য ঝড় বয়ে চলেছে - একজন লুকিয়ে যাচ্ছেন, আরেকজন ভাঙতে চাইছেন সেই লুকানো দেয়ালটা। শিউলির কাঁধ কাঁপছে। রুবিনার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে আছেন, যেন ছাড়বেন না। চোখের জলে দুজনেরই গাল ভিজে গেছে। রুবিনা শিউলির হাতটা আরও জোরে চেপে ধরলেন। তাঁর আঙুলগুলো কাঁপছে। চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তিনি চোখ সরাচ্ছেন না। গলাটা একদম ভেঙে গেছে, কিন্তু স্নেহ আর জেদ মিশে আছে। “শিউলি… শোন রে, তুই এভাবে চুপ করে থাকিস না। আমি তোর আপু। তোর চেয়ে বড়। তোর কষ্ট আমি দেখলে আমার বুক ফেটে যায়। দেখ, তোর হাত কাঁপছে, চোখ দিয়ে জল পড়ছে… তুই কাঁদছিস কেন? বল না রে… আমাকে বল। আমি কাউকে বলব না। তোর কোনো কথা বাইরে যাবে না। প্লিজ শিউলি… এভাবে চেপে রাখলে তোর শরীর খারাপ হয়ে যাবে।” শিউলি মুখটা আরও নিচু করে ফেললেন। দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছেন। কাঁধ কাঁপছে। কয়েক মুহূর্ত চুপ। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “আপু… প্লিজ… আমাকে আর জিজ্ঞেস কোরো না। সব ঠিক আছে। রহমান খুব ভালো মানুষ। আমি… আমি ঠিক আছি।” রুবিনা ছাড়লেন না। তিনি শিউলির হাতটা নিজের কোলে টেনে নিলেন। গলায় আরও নরম, কিন্তু জোর করে বললেন, “না রে, ঠিক আছে না। তোর চোখ দেখে আমি বুঝতে পারছি। তুই কিছু লুকাচ্ছিস। রহমানের সাথে কি ঝগড়া হয়েছে? নাকি ও তোকে কিছু বলেছে? বল রে শিউলি… আমি তো তোর বোন। তোকে ছোটবেলা থেকে দেখছি। এত কষ্ট চেপে রাখিস না। তোর শরীরটা দেখ… মুখ ফ্যাকাশে, চোখ বসে গেছে। কতদিন ধরে এমন চলছে?” শিউলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধরা গলায় বললেন, “আপু… সত্যি বলছি… কোনো ঝগড়া হয়নি। রহমান খুব শান্ত মানুষ। ও কখনো রাগ করে না। আমি… আমি শুধু একটু মন খারাপ করে আছি।” রুবিনা মাথা নেড়ে বললেন, “না শিউলি। এটা শুধু মন খারাপ না। তোর চোখে যে কষ্ট দেখছি, সেটা অন্য কিছু। তোর জামাইয়ের সাথে তোর কি… মানে… সবকিছু ঠিক আছে তো? তোদের মধ্যে কি কোনো… দূরত্ব হয়েছে? রহমান তো অনেক ভালো ছেলে বলে জানি, কী করেছে ও, লজ্জা করিস না। আমি তো তোর আপু।” শিউলির শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। তিনি হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইলেন, কিন্তু রুবিনা ছাড়লেন না। চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে আসছে। গলা ভেঙে ভেঙে বললেন, “আপু… না… না… এসব কথা… আমি বলতে পারব না। তুমি বুঝবে না। প্লিজ… খাওয়া শেষ করো।” কিন্তু রুবিনা এবার আরও জোর দিয়ে বললেন, “শিউলি, তুই আমাকে অবিশ্বাস করিস? আমি তোকে কতবার বলেছি - তোর কোনো কথা আমি কাউকে বলব না। তোর কষ্ট আমার কষ্ট। দেখ, তোর হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। শরীর কাঁপছে। তুই যদি না বলিস, তাহলে আমি কী করে তোকে সাহায্য করব? বল রে… রহমানের সাথে তোর কি শারীরিক সম্পর্ক… মানে… স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কি ঠিক আছে?” শিউলি এবার একদম চুপ করে গেলেন। মুখটা দু’হাতে ঢেকে রেখেছেন। কাঁধ কাঁপছে জোরে জোরে। কয়েক সেকেন্ড পর গলা দিয়ে একটা ফোঁপানি বেরিয়ে এল। তারপর ধীরে ধীরে, খুব কষ্ট করে, প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “আপু… আমি… আমি বলতে পারছি না… লজ্জা লাগছে… তুমি যদি এত জোর করো…” রুবিনা তাঁর কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। গলায় অসীম ধৈর্য আর ভালোবাসা মিশিয়ে বললেন, “বল রে শিউলি। আমি তোর পাশে আছি। কোনো লজ্জা নেই। বল।” শিউলি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। চোখের জল মুছতে মুছতে, গলা কাঁপিয়ে, একদম ভেঙে পড়ে বললেন, “আপু… অনেক বছর হয়ে গেছে… রহমানের সাথে আমার… শারীরিক কোনো সম্পর্ক নেই। অনেক বছর… প্রায় সাত-আট বছর হবে। ও পারে না। আমিও আর জোর করি না।” বলেই শিউলি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কান্না-ভেজা গলায় বলতে থাকলেন, “তুমি প্লিজ কাউকে বোলো না আপু… আমি ভয় পাই। এভাবে বলে ফেললাম… তুমি হয়তো খারাপ ভাববে…” তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন শিউলি। মুখটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখেছেন। কাঁধ কাঁপছে অবিরাম। রুবিনা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর শিউলির মাথায় হাত বুলিয়ে, গলা ভেঙে বললেন, “ওরে আমার বোন… তুই এত বড় কষ্ট একা চেপে রেখেছিস? সাত-আট বছর? আর আমাকে বলিসনি? শিউলি… আমি তোকে খারাপ ভাবব কেন রে? তুই আমার ছোট বোন। তোর কষ্ট আমি বুঝি। এটা তো কোনো দোষ না তোর। কিন্তু তুই একা এত কষ্ট পাচ্ছিস… তোর শরীর খারাপ হচ্ছে… মন খারাপ… আর কাউকে বলারও জায়গা নেই… আয় রে, আমার কাছে আয়…” রুবিনা উঠে শিউলিকে জড়িয়ে ধরলেন। দুজনের চোখেই জল। টেবিলের উপর ভাত-ডাল একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু কারো খাওয়ার কথা মনেও নেই। শুধু দুই বোনের মাঝে একটা দীর্ঘদিনের লুকানো কষ্টের দেয়ালটা একটু একটু করে ভাঙছে। রুবিনা শিউলিকে জড়িয়ে ধরে রইলেন অনেকক্ষণ। শিউলির কাঁধ কাঁপছে। মাথাটা রুবিনার বুকে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। রুবিনার চোখ দিয়েও জল গড়াচ্ছে অবিরাম। টেবিলের উপর ভাত-ডাল-মাছের ঝোল সব একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু কারোরই সেদিকে নজর নেই। অনেকক্ষণ পর রুবিনা শিউলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তে করে বললেন, “শিউলি… শান্ত হ রে। কাঁদিস না। আমি তো আছি। তুই এত বছর ধরে এই কষ্ট একা বয়ে বেড়াচ্ছিস… আর আমাকে একবারও বলিসনি? সাত-আট বছর? এতদিন? ওরে আমার বোন… তুই কী করে সামলাচ্ছিলি?” শিউলি মুখ তুললেন না। গলা ভেঙে বললেন, “আপু… কী বলব… প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। রাতে ঘুম হতো না। কিন্তু পরে… পরে অভ্যাস হয়ে গেল। রাহাতের পড়াশোনা, সংসার… সব সামলাতে সামলাতে মনে হতো এটাই হয়তো আমার ভাগ্য।” রুবিনা শিউলির চুলে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু ইদানীং তোর শরীর খারাপ লাগছে বললি… কী কী হয় রে? মাথা ঘোরে? দুর্বল লাগে? মেজাজ খিটখিটে হয়? আর কিছু?” শিউলি চোখ মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বললেন, “হ্যাঁ আপু… মাথা ঘোরে অনেক। সকালে উঠতে কষ্ট হয়। শরীরটা দুর্বল লাগে সারাদিন। কখনো কখনো বুক ধড়ফড় করে। মেজাজটা একদম খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু কাউকে বলতে পারি না।” রুবিনা চোখ বড় বড় করে বললেন, “ডাক্তার দেখিয়েছিস কখনো? গাইনোকলজিস্ট? নাকি কোনো মেডিসিন ডাক্তার? কোনো চেকআপ করিয়েছিস? হরমোনের সমস্যা হতে পারে তো… এতদিন ধরে এমন চললে তো শরীরের ভেতরে অনেক কিছু গোলমাল হয়ে যায় রে!” শিউলি মাথা নেড়ে বললেন, “না আপু… কখনো যাইনি। লজ্জায় যেতে পারিনি। একবার ভেবেছিলাম একা একা কোনো মহিলা ডাক্তারের কাছে যাব। কিন্তু তারপর ভয় লাগল। কী যদি জিজ্ঞেস করে? কী উত্তর দেব? আর রহমানকে বলব কী করে? ও তো কখনো নিজে থেকে কিছু বলে না। আমিও আর জোর করি না।” রুবিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তুই একা একা এত কষ্ট সহ্য করছিস… আর আমি কিছুই জানতাম না। শিউলি, তুই কি কখনো কাউন্সেলিং করিয়েছিস? বা দুজনে মিলে কোনো কাউন্সেলরের কাছে যাওয়ার কথা ভেবেছিস? এভাবে তো চলতে পারে না রে। তোর শরীরও নষ্ট হচ্ছে, মনও ভেঙে যাচ্ছে।” রুবিনা শিউলির গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিলেন। গলাটা একদম নরম, কিন্তু ভেতরে গভীর কষ্ট মিশে, বললেন, “শোন রে শিউলি… আমি তোর কষ্টটা খুব ভালো করে বুঝি। সত্যি বলছি, তোর কষ্ট আমার কষ্ট। ঠিক একই রকম। তুই যা বললি… সাত-আট বছর… আমারও তো প্রায় এরকমই চলছে রে বোন। করিমের সাথে… অনেকদিন ধরে আমাদের মধ্যেও কোনো সম্পর্ক নেই। আমি তোকে কখনো বলিনি। লজ্জায়। কিন্তু আজ তোর মুখে শুনে মনে হচ্ছে আমরা দুজনেই একই নৌকায় বসে আছি। তোর কষ্টটা আমার বুকে লাগছে রে। আমি যেন নিজেকেই দেখছি।” শিউলি অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকালেন। চোখ দুটো লাল, ফোলা। “আপু… তুমি… তুমিও?” রুবিনা কাঁদছেন, তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ রে। আমিও। অনেক বছর। আমিও চুপ করে সহ্য করে যাচ্ছি। কিন্তু আজ তোকে দেখে আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। আমরা দুজনেই একই কষ্টের মধ্যে আছি। তোর কষ্ট আমার কষ্ট। আমি তোর পাশে আছি। ডাক্তার দেখাতে হলে একসাথে যাব। কথা বলতে হলে একসাথে বলব। কোনো লজ্জা নেই, কোনো ভয় নেই। আমরা দুই বোন। একে অপরের ছায়া।” শিউলির চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এবার কান্নার সাথে একটা হালকা অনুভূতি। তিনি রুবিনার হাতটা শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “আপু… তুমি না থাকলে আমি পাগল হয়ে যেতাম।” রুবিনা শিউলিকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “আমিও রে বোন। আমিও। এখন থেকে আমরা একা নই।” টেবিলের উপর ঠান্ডা খাবার পড়ে রইল। কিন্তু দুই বোনের মাঝে একটা নতুন, অনেক দিনের লুকানো ব্যথার দেয়ালটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। বাইরে দুপুরের রোদ ঝলমল করছে, কিন্তু ঘরের ভেতর দুজনের চোখের জলে একটা নতুন আশার আলো ফুটে উঠছে। রুবিনা শিউলির হাতটা আরও একবার শক্ত করে চেপে ধরলেন। তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিলেন। দুজনের চোখেই এখনো জলের দাগ লেগে আছে, গাল ভেজা। টেবিলের উপর ভাত-ডাল-মাছের ঝোল-আলু ভাজি সব একদম ঠান্ডা হয়ে পড়ে আছে। সাদা টেবিলক্লথের এক কোণে একটা ছোট্ট ডালের দাগ লেগেছে। কিন্তু কারোরই আর খাওয়ার মাথায় নেই। ঘরের ভেতরটা যেন একটা ভারী নীরবতায় ডুবে আছে - শুধু ঘড়ির টিকটিক আর বাইরের রাস্তায় কোনো গাড়ির হর্নের আওয়াজ ভেসে আসছে। শিউলি চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে ঠিক করলেন। গলাটা এখনো ধরা ধরা, কিন্তু জোর করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন। “আপু, তুমি বসো। আমি থালা-বাসনগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যাই। ধুয়ে রেখে আসি। চা বানাব পরে। তুমি আর কষ্ট কোরো না।” রুবিনা মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক আছে রে। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নিই। চোখ-মুখটা ধুয়ে নেব। তোর কথাগুলো শুনে মাথাটা একদম ভারী হয়ে গেছে।” তাঁর গলা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখলেন, কিন্তু ভেতরটা তখনো ঝড়ের মতো তোলপাড় করছে। শিউলি থালা-বাসনগুলো একসাথে তুলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। তাঁর পায়ের আওয়াজ - চটির নরম শব্দ - ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। রান্নাঘর থেকে প্লেটের ঠনঠন আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। রুবিনা কয়েক মুহূর্ত সোফায় বসে রইলেন। তারপর উঠলেন। পা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী। তিনি আস্তে আস্তে শিউলির বেডরুমের দিকে গেলেন। ঘরের দরজাটা আধখোলা। ভেতরে ঢুকে তিনি একবার চারপাশে তাকালেন। ঘরটা চেনা, কিন্তু আজ যেন অচেনা লাগছে। বিছানার চাদরটা একটু এলোমেলো, জানালা দিয়ে দুপুরের আলো এসে পড়েছে। তিনি সোজা ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসলেন। আয়নায় নিজের মুখটা দেখলেন। চোখ দুটো লাল, চোখের নিচে কালো ছায়া আর ফোলা ভাব। গালে জলের শুকনো দাগ। চুলগুলো একদম এলোমেলো হয়ে গেছে কান্নায়। তিনি টেবিলের উপর রাখা চিরুনিটা হাতে নিলেন। কয়েকটা চুল আঁচড়াতে গিয়ে মনে হলো এটা খুব পুরনো, চুল টেনে ধরছে। “আরেকটা চিরুনি বা ক্লিপ থাকলে ভালো হতো,” মনে মনে ভাবলেন। নিচের ড্রয়ারটা টেনে খুললেন - চুরি-টিপ, হেয়ার ক্লিপ, একটা ছোট আয়না আর চিরুনি খুঁজবেন বলে। ড্রয়ারটা খুলতেই চোখে পড়ল একটা ছোট্ট সাদা-নীল প্লাস্টিকের প্যাকেট। প্রথমে বুঝতে পারলেন না। তারপর চোখটা স্থির হয়ে গেল। একটা পুরো স্ট্রিপ - contraceptive pills। পাশে আরেকটা ছোট প্যাকেট - emergency contraceptive pill। একটা মাত্র ট্যাবলেট। প্যাকেটের উপর স্পষ্ট লেখা আর তারিখ। রুবিনার হাতটা পুরোপুরি থেমে গেল। চিরুনিটা হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তিনি একদম শক্ত হয়ে বসে রইলেন। বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে। গলা শুকিয়ে গেছে। মাথার ভেতরে যেন একটা বোমা ফেটেছে। হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। ‘কী এটা? শিউলি… তুই… এই পিল খাস? সাত-আট বছর ধরে রহমানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই বললি… তাহলে এগুলো কেন? কার জন্য? কে… কে তোর সাথে…?’ তাঁর মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। হয়তো কোনো গোপন সম্পর্ক। রহমান তো বাইরে বাইরে থাকে, শিউলি একা। হয়তো কোনো পুরুষ… কলেজের কোনো স্যার? নাকি পাড়ার কোনো পরিচিত লোক? কোনো অফিসের সহকর্মী? নাকি একদিনের ভুল? তাই emergency পিল? কবে খেয়েছে? কতবার? কতদিন ধরে চলছে এটা? শিউলির ফ্যাকাশে মুখ, চোখের অস্থিরতা, সকাল থেকে হাত কাঁপা, সবকিছু এখন নতুন করে মনে পড়ছে। কিন্তু একবারের জন্যও রাহাতের নামটা তাঁর মাথায় এল না। ঘুনাক্ষরেও না। তিনি শুধু ভাবতে লাগলেন - বাইরের কোনো পুরুষ। কোনো অচেনা, অজানা সম্পর্ক। শিউলি এতদিন ধরে এই কষ্টের সাথে আরেকটা বড় গোপনীয়তা লুকিয়ে রেখেছে। হয়তো লজ্জায়, হয়তো ভয়ে। রুবিনা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। হাত কাঁপছে। ড্রয়ারের ভেতরটা আরেকবার দেখলেন। পিলের প্যাকেটটা সাবধানে স্পর্শ করলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে ভাবলেন, ‘এখন জিজ্ঞেস করব? এইমাত্র ও আমাকে ওর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের কথা বলল। এখন এটা তুললে ও হয়তো ভেঙে পড়বে। হয়তো আর কিছুই বলবে না। না… এখন না। পরে কোনো একসময়… যখন ও নিজে থেকে বলতে চায়। আমি তো ওর আপু। ওকে আরও কষ্ট দেব না।’ তিনি ধীরে ধীরে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিলেন। চিরুনিটা আয়নার সামনে রেখে দিলেন। চুলটা ঠিক করে আঁচড়ালেন, কিন্তু হাত এত কাঁপছিল যে চিরুনিটা দু-তিনবার পড়ে গেল। চোখের জল মুছে নিলেন। মুখে একটা স্বাভাবিক ভাব ফেরানোর চেষ্টা করলেন। আয়নায় নিজেকে দেখে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর উঠে পড়লেন। পা দুটো টলমল করছে। বেডরুম থেকে বেরিয়ে সোজা ড্রয়িং রুমে চলে এলেন। রিমোটটা তুলে টিভি চালিয়ে দিলেন। যেকোনো একটা চ্যানেলে খবর চলছিল। তিনি সোফায় বসে পড়লেন। চোখ টিভির দিকে, কিন্তু মন পুরোপুরি অন্য কোথাও। মাথায় শুধু সেই ড্রয়ারের ছবিটা ঘুরছে। কয়েক মিনিট পর শিউলি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। হাত মুছতে মুছতে। মুখে একটা ক্লান্ত, কিন্তু হালকা হাসি। গলাটা নরম করে বললেন, “আপু… চা খাবে? আমি বানিয়ে আনি। দুধ-চিনি কম দিয়ে?” রুবিনা টিভি থেকে চোখ সরিয়ে শিউলির দিকে তাকালেন। এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর জোর করে হাসলেন। গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললেন, “হ্যাঁ রে… খাব। একটু দুধ-চিনি কম দিস। আর গরম করে দিস।” শিউলি মাথা নেড়ে আবার রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। রুবিনা আবার টিভির দিকে তাকালেন। কিন্তু তাঁর চোখের সামনে তখনো ভাসছে সেই সাদা-নীল পিলের প্যাকেট। তিনি চুপ করে বসে রইলেন। কিছুই বললেন না। এখন না। হয়তো কখনোই না। শিউলি রান্নাঘর থেকে দুটো গরম চায়ের কাপ নিয়ে এলেন। একটা কাপে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে, অন্যটা সাবধানে ধরে। তাঁর চোখ এখনো একটু লাল, কিন্তু মুখে একটা হালকা স্বস্তির ছায়া। যেন এতক্ষণের কান্না আর কথা বলার পর বুকটা একটু হালকা হয়েছে। “আপু, নাও। দুধ-চিনি একদম কম দিয়েছি। গরম আছে, সাবধানে নাও।” বলে তিনি রুবিনার সামনে কাপটা রেখে দিলেন। নিজের কাপটা নিয়ে সোফার অন্য পাশে বসলেন। পা দুটো একটু ভাঁজ করে, শাড়ির আঁচলটা কোলে টেনে নিলেন। রুবিনা চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। গরম বাষ্প মুখে লাগছে। কিন্তু তাঁর মন পুরোপুরি অন্য জায়গায়। চোখের সামনে এখনো ঘুরছে সেই ড্রয়ারের ভেতরের সাদা-নীল পিলের প্যাকেটটা। হাতটা একটু কাঁপল। চামচ দিয়ে চা নাড়তে নাড়তে তিনি জোর করে হাসলেন। গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন। “ধন্যবাদ রে শিউলি। চা-টা খুব ভালো লাগছে। তুইও বস। এতক্ষণ ধরে কেঁদে কেঁদে তোর গলা শুকিয়ে গেছে নিশ্চয়ই।” শিউলি চায়ে চুমুক দিয়ে আস্তে করে বললেন, “হ্যাঁ আপু… খুব হালকা লাগছে এখন। তুমি না থাকলে হয়তো আরও অনেকদিন চেপে রাখতাম। তুমি যে আমাকে বলতে দিলে… সেটাই অনেক।” রুবিনা চায়ের কাপটা দু’হাতে ধরে রেখেছেন। চোখ টিভির দিকে, কিন্তু কিছুই দেখছেন না। মাথার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে - ‘তাহলে কে? কার সাথে? শিউলি এত সুন্দর করে সংসার সামলাচ্ছে, রাহাতকে মানুষ করছে… আর এদিকে এই পিল…?’ ঠিক তখনই শিউলির ফোনটা টেবিলে ভাইব্রেট করে উঠল। একবার, দুবার, তিনবার। শিউলি চট করে ফোনটা তুলে নিলেন। স্ক্রিন দেখে তার চোখে একটা অস্থির আলো জ্বলে উঠল। তিনি রুবিনার দিকে একবার তাকিয়ে লুকিয়ে মেসেজ চেক করলেন। রাহাতের মেসেজ - “মা, খালামণি এখনো আছে? আমি কলেজে বসে আছি, ক্লাসে মন বসছে না। তুমি কী করছো?” শিউলি দ্রুত টাইপ করলেন, “আছে রে। চুপ করে থাক। পরে কথা বলব।” ফোনটা রেখে দিলেন, কিন্তু মুখটা লাল হয়ে গেছে। রুবিনা চোখের কোণ দিয়ে দেখলেন। কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন বাজল। এবার রাহাত লিখেছে, “মা, দুপুরের খাবার খেয়েছ? আমার খুব মন খারাপ। খালা চলে গেলে আমি সোজা বাসায় আসব।” শিউলি আবার লুকিয়ে রিপ্লাই করলেন। তার আঙুল কাঁপছে। রুবিনা এবার স্পষ্ট দেখলেন। তিনি চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, “কে রে শিউলি? এতবার ফোন বাজছে। কার সাথে কথা বলছিস এত?” শিউলি চমকে উঠলেন। জোর করে হাসলেন। “রাহাত আপু। ও কলেজে বসে আছে। দুপুরের খাবার খেয়েছি কি না জিজ্ঞেস করছে। আমিও একটু খোঁজ নিলাম।” রুবিনা মাথা নেড়ে হাসলেন, কিন্তু চোখে সন্দেহের ছায়া। “ও… ঠিক আছে।” কিন্তু মনে মনে ভাবলেন, ‘রাহাত? এতবার? আর শিউলির মুখটা এমন লাল হয়ে গেল কেন? না না, নিশ্চয়ই অন্য কোনো লোকের সাথে চ্যাট করছে। রাহাত তো এখন কলেজে। এত ঘন ঘন মেসেজ আসছে কেন? শিউলি নিশ্চয়ই কোনো বাইরের লোকের সাথে কথা বলছে। সেই লোকটার সাথে, যার জন্য পিল খায়।’ বিকেলের দিকে আবার ফোন বাজল। এবার রাহাত লিখেছে, “মা, চা খেয়েছ? খালামণি কখন যাবে? আমি আর পারছি না। ক্লাসে বসে শুধু তোমার কথা ভাবছি।” শিউলি দ্রুত রিপ্লাই করলেন। রুবিনা এবার সরাসরি দেখলেন শিউলি ফোনের স্ক্রিনে হাসছে। রুবিনা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আবার রাহাত? এতবার? কী এত জরুরি কথা হচ্ছে রে?” শিউলি একটু থতমত খেয়ে বললেন, “হ্যাঁ আপু… ও কলেজে কী খেলো তাই বলল।” রুবিনা মাথা নেড়ে চুপ করে গেলেন। কিন্তু ভেতরে সন্দেহ আরও গভীর হলো। ‘রাহাত? না, এটা রাহাত না। শিউলি নিশ্চয়ই অন্য কোনো পুরুষের সাথে চ্যাট করছে। চোখের ওই চকচকে ভাব, লুকিয়ে হাসি - সব মিলিয়ে যাচ্ছে। পিলের প্যাকেটটা তো সেই লোকটার জন্যই। আমি জানবই কে সে। কিন্তু এখন কিছু বলব না। শিউলি যেন কিছু বুঝতে না পারে।’ শিউলি মনে মনে ভাবছেন, ‘রাহাত… তুই কলেজে বসে এত মেসেজ করছিস কেন রে? খালা তো পাশেই বসে আছে। আমারও তো তোর কথা ছাড়া আর কিছু মনে পড়ছে না। জলদি বাসায় আয়।’ রাহাত কলেজের ক্লাসরুমে বসে ফোন হাতে ধরে আছে। তার চোখে অস্থিরতা। ‘মা… খালামণি এখনো আছে? আমি এখানে বসে পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি কী করছো? আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না।’ দুজনের ভাবনায় এখনো ঝড় চলছে, কিন্তু রুবিনা পাশে বসে সবকিছু লক্ষ করছেন। তাঁর সন্দেহ ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আলোয় ঘরটা হালকা সোনালি হয়ে এসেছে। জানালা দিয়ে পড়ন্ত রোদ এসে সোফার এক কোণে পড়ছে। টিভিতে খবরের আওয়াজ চলছে, কিন্তু কেউই আর শুনছে না। শিউলি রাহাতের ঘর গুছিয়ে ফিরে এসেছেন। তিনি রুবিনার পাশে বসে একটা হালকা নিশ্বাস ফেললেন। দুজনেই চুপচাপ। হঠাৎ দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে চারটার ঘণ্টা বেজে উঠল। রুবিনা চমকে উঠে হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। চারটা বেজে গেছে। তাঁর মুখটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। ভেতরে এখনো সেই ড্রয়ারের ছবিটা ঘুরছে - সাদা-নীল পিলের প্যাকেট, ইমার্জেন্সি পিলের ছোট্ট প্যাকেট। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না। জোর করে একটা স্বাভাবিক হাসি ফুটিয়ে তুললেন। তিনি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে আস্তে করে বললেন, “আরে, চারটা বেজে গেছে! উঠি রে শিউলি। আর বসা যাবে না।” শিউলি অবাক হয়ে তাকালেন। “এখনই চলে যাবে আপু? আরেকটু বসো না। চা-টা তো শেষ হয়নি। রাহাত এলে একসাথে বসে একটু গল্প করতাম।” রুবিনা মাথা নেড়ে শিউলির কাঁধে হাত রাখলেন। গলায় স্নেহ মিশিয়ে, কিন্তু একটু তাড়াহুড়ো করে বললেন, “না রে, সত্যি বলছি আর বসা যাবে না। বাসায় অনেক কাজ পড়ে আছে। আর ছেলেটা এখনই বাসায় আসবে। এসে যদি আমাকে না পায়, তাহলে খুঁজবে তো। ওকে বিকেলে নাস্তা বানিয়ে দিতে হবে।” শিউলি উঠে দাঁড়িয়ে রুবিনার হাত ধরলেন। চোখে একটু অনুরোধ মিশে, “প্লিজ আপু কাউকে বলো না।” রুবিনা শিউলির হাতটা আলতো করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখে একটা ক্লান্ত হাসি। কিন্তু ভেতরে সেই অস্বস্তিটা এখনো কাঁটার মতো বিঁধছে। রুবিনা বললেন, “তুই টেনশন করিস না, আমি তোকে কাল ফোন দিব। তুইও বিশ্রাম নে। রাহাত এলে ওর সাথে একটু সময় কাটা। আর শোন… যা বললাম, সেটা মনে রাখিস। একা একা আর কষ্ট করিস না। আমি আছি। যেকোনো সময় ফোন করবি।” শিউলি চোখ নামিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক আছে আপু। সাবধানে যেয়ো।” রুবিনা ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলেন। দরজার দিকে এগোতে এগোতে আরেকবার পেছনে তাকালেন। শিউলির ফ্যাকাশে মুখটা দেখে বুকটা আবার কেঁপে উঠল। কিন্তু কিছু বললেন না। শুধু হালকা করে হেসে বললেন, “আমি যাচ্ছি রে।” দরজা খুলে রুবিনা বেরিয়ে গেলেন। শিউলি দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁর চলে যাওয়া দেখলেন। রাস্তায় পা ফেলার আগে রুবিনা একবার পেছন ফিরে হাত নাড়লেন। কিন্তু তাঁর মাথার ভেতরে তখনো ঘুরছে সেই একটা প্রশ্ন - ‘কে রে শিউলি? কে সেই লোকটা যার জন্য তুই পিল খাস? আজ যে মেসেজগুলো দেখলাম, সেগুলোও নিশ্চয়ই তারই।’ বাইরের বিকেলের রোদটা ধীরে ধীরে লাল হয়ে আসছে। আর দুই বোনের মাঝে একটা নতুন, অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে - যেটা শিউলি এখনো টের পাননি।
Parent