একটি পারবারিক গল্প - অধ্যায় ১
একটা পারিবারিক গল্প লিখবো যেখানে শুধু মা-ছেলে এবং বাবা মেয়ে থাকবে।
পরিবারের বাইরে কাউকে জড়াবো না।
পরিবার: প্রথম পর্ব
রিয়া মুচকি হেসে সিগারেটের শেষ অংশটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। মা সেটা হাতে নিয়ে এক টান দিয়ে বলল, "তোর বাবা যেন আবার টের না পায়। জানিসই তো, উনি নিজে সব বিষয়ে আধুনিক হলেও এই একটা ব্যাপারে বেশ কড়া। ওনার সামনে আমরা এখনো সেই লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে আর আমি আদর্শ বউ।"
সেদিন বিকেলটা ছিল বেশ গুমোট। বাবা এখনো অফিস থেকে ফেরেননি। আমি আমার ঘরের লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছি। বিকেলের শান্ত আলোয় ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকানো দেখতে আমার বেশ লাগে। হঠাৎ দরজায় নখের টোকা। তাকিয়ে দেখি আরিবা দাঁড়িয়ে।
আমাকে সিগারেট হাতে দেখে মোটেও অবাক হলো না। বরং ঠোঁট বাঁকিয়ে একটু হাসল। ধীরপায়ে বারান্দায় এসে আমার পাশেই দাঁড়াল। "ভাইয়া, একা একাই টানছিস? আমায় একটু দিবি না?" রিয়া বেশ ক্যাজুয়ালভাবে হাত বাড়িয়ে দিল।
আমি কোনো সংকোচ না করেই ওর হাতে সিগারেটটা বাড়িয়ে দিলাম। আরিবা বেশ দক্ষ হাতে সেটা ধরল এবং ধোঁয়া টেনে ছেড়ে দিয়ে বলল, "সারাদিন এই পড়ার চাপ আর সহ্য হয় না রে। এটা যেন মাঝে মাঝে একটু মুক্তি দেয়।"
আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম। আমাদের মধ্যে এই বোঝাপড়াটা আগে থেকেই ছিল। আমি ওর হাতে সিগারেটটা বাড়িয়ে দিলাম। ও বেশ আয়েশ করে একটা টান দিয়ে ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছেড়ে দিল। "উফ্, সারাটা দিন উটকো ক্লাসের পর এটা দরকার ছিল রে," ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
ঠিক সেই মুহূর্তে মা আমাদের ঘরে ঢুকল। আমাদের দুজনকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা মোটেও চেঁচামেচি করল না। উল্টো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মজা করে বলল, "বাহ! তোরা দেখি বেশ আসর জমিয়েছিস। আমাকে বাদ দিয়েই?"
আরিবা হেসে মাকে টেনে বারান্দায় নিয়ে এল। "এসো মা, তুমি ছাড়া কি আসর জমে?" ও হাতের সিগারেটটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
আরিবা মুচকি হেসে সিগারেটের শেষ অংশটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। মা সেটা হাতে নিয়ে এক টান দিয়ে বলল, "তোর বাবা যেন আবার টের না পায়। জানিসই তো, উনি নিজে সব বিষয়ে আধুনিক হলেও এই একটা ব্যাপারে বেশ কড়া। ওনার সামনে আমরা এখনো সেই লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে আর আমি আদর্শ বউ।"
২য় দিন বিকেলে আমাদেরে সেই রেগালার আড্ডা সিগারেটের ধোঁয়াটা মিইয়ে যেতেই মা বারান্দার আরামকেদারাটায় বসলেন। আমরা দুই ভাই-বোন মায়ের পায়ের কাছে ফ্লোর ম্যাটটায় বসে পড়লাম। সন্ধ্যাটা তখন বেশ জমে উঠেছে। আমাদের পরিবারে কোনো লুকোছাপা নেই বলেই হয়তো আমাদের আড্ডাগুলো এত প্রাণবন্ত হয়।
"আচ্ছা আরিবা," মা হঠাৎ আরিবার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন, "তোর ওই কলেজের লম্বা ছেলেটার কী খবর রে? নাম যেন কী ছিল... আহাদ?"
আরিবা একটুও লজ্জা না পেয়ে হেসে ফেলল। ও মায়ের হাঁটুর ওপর মাথা রেখে বলল, "উফ মা, তুমিও না! আহাদের সাথে তো ব্রেকআপ হয়ে গেছে মাসখানেক আগে। ও বড্ড পজেসিভ ছিল। এখন রাফাত নামের একজনের সাথে একটু আধটু কথা হচ্ছে। ছেলেটা বেশ কুল, একদম আমার টাইপ।"
মা মাথা নাড়লেন। "ভালোই করেছিস। সম্পর্কের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে এলে সেটা টেনে নেওয়ার কোনো মানে হয় না। জীবনটা এনজয় করার জন্য, কারো খাঁচায় বন্দী হওয়ার জন্য নয়।"
আমি আরিবাকে একটু খোঁচা দিয়ে বললাম, "নতুন নতুন প্রেম, ভালোই তো। আমার কথা তো কেউ জিজ্ঞেস করো না!"
মা হাসলেন। "তোর খবর কি আমি রাখি না আমান? ওই যে মেয়েটা, নীলা, যার সাথে তুই লাইব্রেরিতে বসে থাকিস ইদানীং? ওর চোখ দুটো কিন্তু বেশ মায়াবী।"
আমি একটু অবাক হলাম। "মা, তুমি এত খবর রাখো কোত্থেকে? আসলে নীলার সাথে আমার ওয়েভলেংথটা খুব ভালো মেলে। তবে আমরা এখনো কোনো সিরিয়াস কমিটমেন্টে যাইনি। স্রেফ সময় কাটাচ্ছি, একে অপরকে জানছি।"
আরিবা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, "ভাইয়া তো মায়ের মতো রোমান্টিক হতে পারবে না। মায়ের প্রেমের গল্পটা একবার শোন না!"
আমি উৎসাহ নিয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। "হ্যাঁ মা, বাবার সাথে তোমার সেই প্রেম শুরুর দিককার কথা বলো তো। আমরা তো শুধু জানি পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছে, কিন্তু আসল টুইস্টটা কী?"
মা একটু দূরে তাকিয়ে যেন পুরনো দিনে ফিরে গেলেন। "তোদের বাবা তখন মাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরিতে ঢুকেছে। কী ভীষণ গম্ভীর আর ডিসিপ্লিনড ছিল লোকটা! কিন্তু আমাকে দেখার পর ওনার সব ডিসিপ্লিন গুলিয়ে গিয়েছিল। লুকিয়ে চিঠি দেওয়া, রিকশা করে ঘুরতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা—সবই ছিল। বিয়ের আগে আমরা প্রায় এক বছর চুটিয়ে প্রেম করেছি, যেটা তোদের দাদু-দিদারা টেরই পাননি।"
আরিবা অবাক হয়ে বলল, "বাবা এত রোমান্টিক ছিল? ভাবাই যায় না!"
মা একটু লাজুক হাসলেন। "তোদের বাবার সামনে তোদের এই সিগারেট খাওয়া বা প্রেমের গল্প বলা হয়তো যাবে না, কারণ উনি এখনো সেই পুরনো দিনের মুরুব্বিয়ানা বজায় রাখতে ভালোবাসেন। কিন্তু মানুষটা ভেতর থেকে খুব নরম। আমাকে এখনো সেই প্রথম দিনের মতোই আগলে রাখেন। তবে হ্যাঁ, তোদের সাথে আমার যে বন্ধুত্ব, সেটা ওনার সাথে নেই। সেটা শুধু আমাদের তিনজনের গোপন আড্ডার রসদ।"
রাতের শহরটা জেগে উঠছে। আমরা তিনজনে মিলে ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ আর প্রেমের কথাগুলো এভাবে ভাগ করে নিলাম। কোনো বিচার নেই, কোনো অনুশাসন নেই—স্রেফ এক বুক খোলা হাওয়া আর স্বচ্ছ বন্ধুত্ব। আমাদের এই ছোট্ট জগতের বাইরে হয়তো অনেক নিয়ম, কিন্তু এই ঘরের কোণে আমরা শুধুই চার বন্ধু (যদিও বাবা এখনো কিছুটা আড়ালে)।
হঠাৎ নিচে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। "বাবা চলে এসেছেন!" আরিবা চট করে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের জানালাগুলো খুলে দিল যাতে ধোঁয়ার গন্ধটা বেরিয়ে যায়। মা মুচকি হেসে আলমারি থেকে নিজের ওড়নাটা ঠিক করে নিলেন। আবার শুরু হবে 'আদর্শ' পরিবারের সেই চেনা নাটক, যেখানে আমরা সবাই লক্ষ্মী।
মা একবার দরজার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিলেন সাখওয়াত সাহেব অর্থাৎ বাবা এসেছেন কি না। তারপর বেশ আয়েশ করে একটা টান দিলেন। মা আমাদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "তোদের বাবার কান যেন আবার খাড়া না হয়। উনি তো মনে করেন আমার ছেলেমেয়ে দুধের শিশু আর আমি সতী-লক্ষ্মী এক স্ত্রী। ওনার সামনে এই নাটকটা চালিয়ে যেতে হবে, বুঝলি?"
মা, আমি আর আরিবা—তিনজনে মিলে বারান্দার ওই অল্প একটু জায়গায় হাসিতে ফেটে পড়লাম। আমাদের মধ্যে কোনো জটিলতা নেই, নেই কোনো অদ্ভুত যৌন আকাঙ্ক্ষা বা নেতিবাচক চিন্তা। স্রেফ একটা ভরসার জায়গা, যেখানে একে অপরের দোষ-গুণ সবটুকু নিয়ে আমরা মিশে থাকতে পারি।
মা আরিবার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, আর আমি দেখছিলাম বাইরের আকাশে ফুটে ওঠা প্রথম তারাটা। সাখওয়াত সাহেব হয়তো একটু পরেই কলিং বেল টিপবেন, তখন আমরা আবার সাধারণ এক পরিবারের মুখোশ পরে নেব। কিন্তু ভেতরের এই অটুট বন্ধুত্বটুকু শুধু আমাদের তিনজনের একান্ত গোপন সম্পদ হয়েই রইল।
বাবা ড্রয়িংরুমে বসে হয়তো আজকের খবর দেখবেন, আর আমরা এখানে নিজেদের ছোট্ট একটা নিষিদ্ধ আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছি। আমাদের এই মেলামেশাটাই আমাদের পরিবারকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে।