একটি পারবারিক গল্প - অধ্যায় ২
পর্ব ২
পরদিন সকালটা ছিল অন্যরকম। রাতে বৃষ্টির পর চারপাশটা বেশ স্নিগ্ধ। বাবা ভোরেই গলফ ক্লাবে গেছেন, ফিরতে দেরি হবে। ড্রয়িংরুমে বসে মা খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন। আমি আর আরিবা তখন ডাইনিং টেবিলে বসে কফি খাচ্ছি।
আরিবা হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, "ভাইয়া, মার আজকের লুকটা খেয়াল করেছিস? কেমন যেন একটা রহস্যময় হাসি লেগে আছে ঠোঁটে।"
আমি তাকালাম। আসলেই, মা যেন আজ মনে মনে কিছু একটা ছক কাটছেন। আমরা দুজনে গিয়ে মার পাশে সোফায় বসলাম। মা কাগজটা নামিয়ে রেখে বললেন, "আজ তোদের বাবার এক পুরোনো বন্ধুর আসার কথা। ওই যে সেই প্রফেসর চৌধুরী, যার কথা তোদের বাবা প্রায়ই বলেন।"
আরিবা চোখ কপালে তুলল, "ওহ! সেই খিটখিটে লোকটা? যে গতবার এসে আমাদের ড্রেসআপ নিয়ে লেকচার দিয়েছিল?"
মা মুচকি হাসলেন। "ঠিক ধরেছিস। তবে মজার ব্যাপার কী জানিস? প্রফেসর চৌধুরীর ওই গম্ভীর চেহারার আড়ালে একটা অদ্ভুত নেশা আছে। উনি ওনার স্ত্রীকে নিয়ে লুকিয়ে ক্যাসিনোতে যেতেন যখন বিদেশে ছিলেন।"
আমরা দুজন অবাক হয়ে তাকালাম। মা আমাদের অবাক হওয়া উপভোগ করে বলতে লাগলেন, "আসলে বাইরে আমরা সবাই একটা করে খোলস পরে থাকি। কেউ আধুনিকতার, কেউ শৃঙ্খলার। তোদের বাবা ওনাকে খুব শ্রদ্ধা করেন ওনার 'আদর্শ' চরিত্রের জন্য। কিন্তু আমি তো জানি, ওনারা যখন একান্তে বসেন, তখন ওনাদের আড্ডার ধরণ কেমন হয়।"
আরিবা হাসতে হাসতে বলল, "তার মানে বাবা আর প্রফেসর সাহেব যখন গম্ভীর মুখে দেশের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখন আসলে ওনাদের মনেও আমাদের মতো কোনো গোপন আড্ডা চলে?"
মা রহস্যময় হেসে বললেন, "হয়তো। মানুষের মনের ভেতরটা বোঝা খুব কঠিন রে। এই যে আমরা কাল রাতে ছাদে বসে সিগারেটে টান দিলাম, তোদের বাবা কি কল্পনাও করতে পারেন? অথচ আজ দুপুরে যখন তিনি লাঞ্চে বসবেন, তখন আমিই আবার তাঁর পাতে সবচেয়ে বড় মাছের টুকরোটা তুলে দেব আর উনি ভাববেন ওনার স্ত্রী কতটা নিবেদিত।"
বিকেলে প্রফেসর চৌধুরী এলেন। ড্রয়িংরুমে বাবার সাথে তাঁর গম্ভীর আলোচনা চলছে। আমরা ভেতর থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছি। বাবা খুব সিরিয়াস মুখে বলছেন, "বুঝলেন চৌধুরী সাহেব, আজকের প্রজন্মের মধ্যে সেই নীতিবোধটা আর নেই। একটু শাসন না করলে এরা গোল্লায় যাবে।"
ওপাশে চৌধুরী সাহেব মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছেন। ঠিক তখনই মা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকলেন। ওড়নাটা মাথায় আলগোছে দেওয়া, মুখে সেই মায়াবী 'আদর্শ বউ'য়ের হাসি।
মা চা দিতে দিতে বললেন, "ভাই সাহেব, আপনি কিন্তু অনেকদিন পর এলেন। শরীর-গতিক সব ভালো তো?"
চৌধুরী সাহেব খুব বিনয়ের সাথে মার সাথে কথা বলছেন। আমরা আড়াল থেকে হাসি চেপে শেষ। এই তো জীবন! পর্দার সামনে এক চরিত্র, আর পর্দার পেছনে আমরাই আমাদের আসল রাজা।
রাতে যখন অতিথিরা চলে গেলেন, বাবা খুব তৃপ্তির সাথে বললেন, "দেখলি আমান, চৌধুরী সাহেবকে দেখে অনেক কিছু শেখার আছে। মানুষ হিসেবে কত উঁচু দরের!"
আমি আর আরিবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় হাসলাম। মা তখন ডাইনিং টেবিল গোছাতে গোছাতে আমাদের দিকে তাকিয়ে একবার চোখ টিপলেন।
সেদিন ছিল ছুটির দিন। বাবা সকাল থেকেই কেমন যেন ব্যস্ত। বাড়িতে বাইরের কাউকে আসতে দেখলাম না, কিন্তু কাজের লোক দিয়ে প্রচুর আয়োজন করালেন। আরিবা তো অবাক, "বাবা কি আজ কাউকে দাওয়াত দিয়েছেন নাকি?"
আমি কাঁধ ঝাকিয়ে বললাম, "হয়তো অফিসের কোনো গেস্ট হবে।"
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ড্রয়িংরুমের লাইটগুলো সব নিভিয়ে দেওয়া হলো। আমরা অন্ধকারে একে অপরের দিকে তাকালাম। ঠিক তখনই বাবা ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা রিমোট, টিপতেই পুরো ঘরটা মৃদু নীল আলোয় জ্বলে উঠল। ড্রয়িংরুমের টেবিলে সাজানো দামী ব্র্যান্ডের সিগারেট, সুন্দর গ্লাসে হুইস্কি আর হালকা স্ন্যাকস।
মা ভয়ে ভয়ে বললেন, "সাখওয়াত, এগুলো কী? বাড়িতে এসব কেন?"
বাবা মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো কাঠিন্য ছিল না, বরং ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
সাখওয়াত সাহেব: "কেন অবাক হচ্ছিস? গত এক মাস ধরে বারান্দায় বসে তোরা যে 'গোপন আসর' বসাচ্ছিস, তার খবর কি আমি রাখিনি ভেবেছিস?"
আমরা তিনজনে পাথরের মতো জমে গেলাম। বাবা সব জানতেন!
আরিবা: (তোতলানো গলায়) "বাবা... তুমি... মানে, তুমি সব জানতে?"
সাখওয়াত সাহেব: "হ্যাঁ। প্রথমদিন ধোঁয়ার গন্ধ পেয়েই বুঝেছিলাম। তারপর থেকে রোজই বুঝতাম। শুধু চুপ করে থাকতাম। আমি তোদের ছোটবেলা থেকেই একটা শৃঙ্খলা আর গম্ভীর আবহে বড় করেছি, ভেবেছিলাম সেটাই হয়তো আদর্শ। কিন্তু বারান্দার ওই খোলা হাওয়া আর তোদের অট্টহাসি শুনে আমার মনে হলো, আমি কোথাও ভুল করছিলাম।"
বাবা মা’র কাঁধে হাত রাখলেন।
সাখওয়াত সাহেব: "তুমি তো আমাকে ভয় পেতে, মনে করতে আমি এসব পছন্দ করব না। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি, একটা পরিবারের মানে শুধু নিয়ম নয়, বিশ্বাস। তোদের এই বন্ধুত্বের আড্ডায় আমি নিজেকে খুব একা মনে করতাম। আমি চাইনি আমার শাসন তোদের থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করুক।"
বাবা সোফার দিকে ইশারা করলেন।
সাখওয়াত সাহেব: "আজকের রাতটা কোনো বাবার, কোনো মায়ের বা কোনো সন্তানের নয়। আজকের রাতটা বন্ধুদের। নে, আরিবা, সিগারেটটা ধরা। আমান, তুই গ্লাসটা ভরা।"
আমি আর আরিবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের জল সামলালাম। মা তখন খুশিতে আত্মহারা।
মা: "তুমি এত বড় সারপ্রাইজ দিলে সাখওয়াত! আমি তো ভাবছিলাম, কোনোদিন যদি ধরা পড়ে যাই, তাহলে কি হবে!"
সাখওয়াত সাহেব: (হেসে) "ধরা পড়ার মতো কিছু ছিল না। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম, তোরা কবে আমাকে সেই বন্ধুর আসনে জায়গা দিবি। তোদের এই আধুনিকতা, তোদের চিন্তাভাবনা—আমিও এগুলো এনজয় করতে চাই। পরিবার মানে তো একে অপরের কাছে স্বচ্ছ থাকা।"
আমরা চারজন গোল হয়ে বসলাম। ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা আজ উধাও। বাবা একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "শোন, অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ। কিন্তু মনের মুক্তি যেখানে, সেখানেই জীবনের আসল আনন্দ। আজ থেকে আমাদের বাড়িতে কোনো মুখোশ নেই।"
সেদিন রাতে আমরা চারজন মিলে যে আড্ডা দিলাম, তা যেন বহু বছরের জমানো সব দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে দিল। বাবার সেই গম্ভীর ব্যক্তিত্বের আড়ালে যে এমন এক আধুনিক বন্ধু লুকিয়ে ছিল, তা জানলে আমরা হয়তো আরও আগেই অনেক কিছু শেয়ার করতে পারতাম।
সেই রাতে সাখওয়াত সাহেব প্রমাণ করলেন, পরিবার কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়, বরং একে অপরকে বুঝে নেওয়ার এক অটুট বন্ধন। আমাদের সেই ছোট ঘরটা আজ পূর্ণতা পেল—যেখানে কোনো শাসন নেই, আছে কেবল ভালোবাসার আর বন্ধুত্বের এক নির্মল আকাশ।
ড্রয়িংরুমের নীল আলোটা যেন ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছিল। সাখওয়াত সাহেব আজ একদম অন্য মানুষ। টেবিলের ওপর সাজানো পানীয়ের গ্লাসগুলো একে একে খালি হচ্ছে। ঘরের ভেতর ধোঁয়ার এক ঘন আস্তরণ তৈরি হয়েছে। মা আজ যেন অনেক বেশি সাহসী। তিনি হাসতে হাসতে একটা সিগারেট ধরিয়ে বাবার ঠোঁটের কাছে ধরলেন।
মা: "কী গো প্রকৌশলী সাহেব, সারা জীবন তো ডিসিপ্লিন শেখালে। আজ একটু নিয়ম ভাঙার স্বাদটা নাও তো!"
বাবা মার হাতটা আলতো করে ধরলেন। মার আঙুলের ছোঁয়া নিজের ঠোঁটে অনুভব করে তিনি এক দীর্ঘ টান দিলেন। ধোঁয়াটা ছাড়ার সময় বাবার চোখ দুটো যেন বুঁজে আসছিল। নেশার ঘোর তাঁর স্নায়ুগুলোকে শিথিল করে দিয়েছে। ওপাশে আরিবাও আজ বেশ চনমনে। সে নিজের হাতের সিগারেটটা শেষ করে বাবার কাছে গিয়ে বসল।
আরিবা: "বাবা, আমি কি দেব আর একটা?"
বাবা আরিবার দিকে তাকালেন। নেশাতুর চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি একটু অদ্ভুতভাবে হাসলেন। আরিবা একটা নতুন সিগারেট ধরিয়ে বাবার মুখে তুলে দিল। বাবার আঙুলগুলো তখন আরিবার হাতের ওপর কিছুটা সময় স্থির হয়ে রইল। সেই স্পর্শে যেন কোনো শাসন নেই, ছিল এক অন্যরকম আদিম টান।
মা তখন আমার দিকে ফিরলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত মাদকতা। মা একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়াটা আমার মুখের ওপর ছাড়লেন।
মা: "কিরে আমান, খুব তো চুপিচুপি টানতিস। আজ আমার হাত থেকে একটু নে।"
আমি মার হাত থেকে সিগারেটটা নিতে গিয়ে অনুভব করলাম মার আঙুলের উষ্ণতা। নেশার প্রভাবে আমাদের চারজনের মাঝখানের সেই চিরাচরিত 'মা-বাবা-ভাই-বোন' দেয়ালটা যেন ধসে পড়ছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে সাখওয়াত সাহেবের আচরণে এক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। তিনি সোফায় একটু এলিয়ে বসে আরিবাকে নিজের দিকে টেনে নিলেন। নেশার ঘোরে বাবার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এসেছে।
সাখওয়াত সাহেব: "জানিছ আরিবা, তোকে যখন দেখি, আমার একদম তোর মার যৌবনের কথা মনে পড়ে যায়। ঠিক এইরকম ছিপছিপে গড়ন, এইরকম মায়াবী চোখ..."
বাবা কথাগুলো বলতে বলতে আরিবার কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর হাতের তালুটা আরিবার অনাবৃত ঘাড়ের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছিল। আরিবাও নেশার ঘোরে বাবার এই স্পর্শে কোনো বাধা দিল না, বরং সে বাবার আরও কাছে ঘেঁষে বসল।
সাখওয়াত সাহেবের অবদমিত মনের কোনো এক গোপন কোণ থেকে যেন এক সুপ্ত বাসনা জেগে উঠছিল। তিনি আরিবার চুলের গন্ধ নিলেন এবং নিচু স্বরে বললেন, "তুই তো কেবল আমার মেয়ে নোস, তুই তো আমার গর্ব... আমার সবচেয়ে প্রিয় নারী।"
ঘরের আবহাওয়া তখন ভারী হয়ে উঠেছে। সিগারেটের ধোঁয়া আর সুরার গন্ধে মিশে আছে এক নিষিদ্ধ শিহরণ। মা আর আমি নিঃশব্দে সেই দৃশ্য দেখছি। আমাদের মধ্যেও যেন এক অদ্ভুত জড়তা আর আকর্ষণের খেলা চলছে। বাবার হাতটা তখন আরিবার কোমরে আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল।
মদের নেশা আর সিগারেটের ধোঁয়ায় ড্রয়িংরুমের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে। বাবা আরিবাকে জড়িয়ে ধরেই সোফায় এলিয়ে পড়েছেন, গভীর ঘুমে তাঁর নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আরিবাও বাবার বুকের ওপর মাথা রেখে নেশার ঘোরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। নীল আলোয় এই দৃশ্যটা এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
ওপাশে আমি আর মা তখনো জেগে। টেবিলের ওপর আধখাওয়া মদের বোতল আর অ্যাশট্রে ভর্তি সিগারেটের টুকরো। মা গ্লাসে শেষ চুমুকটা দিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। নেশায় মার চোখ দুটো অর্ধেক বোজা, গায়ের ওড়নাটা একপাশে খসে পড়েছে।
আমি মার দিকে একটু ঝুঁকে বসলাম। নেশার ঘোরে মনের ভেতর জমে থাকা কৌতুহলগুলো যেন আজ লাগামহীন।
আমি: "মা, বাবা তো দেখছি একটুতেই কুপোকাত। আচ্ছা, বাবা কি রাতেও তোমাদের একান্ত সময়ে এভাবেই কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঘুমিয়ে পড়েন?"
মা আমার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে এক ধরণের অবজ্ঞা আর মাদকতা মেশানো ছিল। তিনি ধোঁয়াটা ছেড়ে আমার খুব কাছে এগিয়ে এলেন।
মা: "তোর বাবা তো বরাবরই এমন। বাইরের ওই মেকি আভিজাত্য আর শৃঙ্খলার চাপে ওনার ভেতরকার পুরুষটা অনেক আগেই ঝিমিয়ে পড়েছে। বিছানায় গিয়েও ওনার ওই একই গম্ভীর ভাব, কোনো রোমাঞ্চ নেই, কোনো বুনো উল্লাস নেই। যেন একটা দায়িত্ব পালন করছেন।"
আমি মার চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে এক ধরণের অপূর্ণতার তৃষ্ণা দেখতে পেলাম।
আমি: "তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো, এই দীর্ঘ সময়ে বাবা তোমাকে কখনোই পুরোপুরি তৃপ্ত করতে পারেনি? তুমি কি সবসময় এভাবেই অতৃপ্ত থেকে গেছো?"
মা আমার উরুর ওপর একটা হাত রাখলেন। তাঁর হাতের তালুর উষ্ণতা আমার স্নায়ুগুলোতে বিদ্যুৎ খেলে গেল।
মা: "তৃপ্তি? সে তো অনেক বড় কথা রে আমান। তোর বাবা তো জানেই না শরীরের ভাষা কীভাবে পড়তে হয়। উনি মনে করেন একঘেয়ে ওই কয়েকটা নিয়ম মানলেই বুঝি সব পাওয়া হয়ে যায়। আমার মনের ভেতর যে চাকাটা ঘোরে, সেটা ধরার ক্ষমতা ওনার নেই।"
আমি মার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। মা বাধা দিলেন না, বরং আঙুলগুলো দিয়ে আমার তালুতে এক অদ্ভুত সুড়সুড়ি দিতে লাগলেন।
আমি: "তাহলে এই যে এত বছর ধরে তুমি 'আদর্শ বউ'য়ের অভিনয় করে যাচ্ছো, এটা কি কেবলই লোকদেখানো? তোমার ভেতরের এই যে আগুন, এটা কি কেউ কোনোদিন নেভাতে পারেনি?"
মা আমার খুব কাছে সরে এলেন, তাঁর নিঃশ্বাসে মদের কড়া গন্ধ। তিনি নিচু স্বরে বললেন, "নেভানোর মতো কাউকে তো পাশে পাইনি এতকাল। সবাই তো শুধু নিয়ম মেনে চলতেই ব্যস্ত। কিন্তু আজ এই নেশার ঘোরে তোকে দেখে মনে হচ্ছে, তুই হয়তো ওনার মতো নোস। তোর চোখে আমি এক ধরণের ক্ষুধা দেখতে পাচ্ছি, যা আমার খুব পরিচিত।"
আমরা দুজনেই নিঃশব্দে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাবার নাক ডাকার শব্দ আর বাইরের নিস্তব্ধতা মিলে পরিবেশটাকে আরও বেশি ব্যক্তিগত আর নিষিদ্ধ করে তুলল। মা আমার ঠোঁটের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন, "তোর বাবা ঘুমিয়ে আছে বলেই হয়তো আজ আমরা এই সত্যগুলো বলতে পারছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, নিয়ম ভাঙার মধ্যেই আসল সুখ লুকিয়ে আছে।"
ড্রয়িংরুমের সেই নীল আলোয় মা আর ছেলের সম্পর্কটা যেন এক নতুন, নামহীন আর রোমহর্ষক বাঁকে এসে দাঁড়াল। যেখানে কেবল শরীর আর মনের গোপন হাহাকারগুলোই শব্দ হয়ে ঝরে পড়ছে।
ড্রয়িংরুমের সেই নীলচে অন্ধকারে সময় যেন থমকে গেছে। বাবার নাক ডাকার শব্দ আর আরিবার নিস্তব্ধতা মিলে এক অদ্ভুত নির্জনতা তৈরি করেছে, যা আমাদের দুজনকে আরও কাছাকাছি টেনে আনল। মা সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন, নেশায় তাঁর শরীরটা যেন চুইয়ে পড়ছে। হাতে ধরা সিগারেটের শেষ অংশটা থেকে পাতলা ধোঁয়ার রেখা ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।
আমি মার আরও কাছে সরে এলাম। আমাদের মধ্যে এখন আর কোনো লুকোছাপা নেই। আমি মার চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর একটা টান দিলাম সিগারেট থেকে। ধোঁয়াটা ফুসফুসে আটকে রেখে আমি মুখটা মার ঠোঁটের একদম কাছে নিয়ে গেলাম। মা বুঝলেন আমি কী চাইছেন। তিনি চোখ দুটো বন্ধ করে তাঁর ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করলেন।
আমি খুব ধীরে ধীরে আমার মুখ থেকে ধোঁয়াটা মার মুখের ভেতর ছেড়ে দিলাম। মা সেই উষ্ণ ধোঁয়াটা নিজের নিশ্বাসের সাথে টেনে নিলেন। এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল মার শরীরে। ধোঁয়াটা ছাড়ার পর মা ফিসফিস করে বললেন, "উফ আমান... তোর এই ধোঁয়ার ছোঁয়াটা বাবার দেওয়া হাজারটা উপদেশের চেয়েও অনেক বেশি নেশালো।"
এবার মা নিজের হাতের সিগারেটটায় একটা লম্বা টান দিলেন। তিনি হাসিমুখে আমার কলারটা ধরে আমাকে নিজের কাছে টেনে নিলেন। মার ঠোঁট আর আমার ঠোঁটের মাঝে তখন মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধান। মা ধোঁয়াটা আমার মুখে ছেড়ে দিতে দিতে বললেন, "নে, এবার আমার ভাগটা তুই নে।"
এই দেওয়া-নেওয়ার খেলায় আমাদের দুজনের মাথা তখন পুরোপুরি ঝিমঝিম করছে। আমি টেবিলের ওপর থেকে মদের গ্লাসটা হাতে নিলাম। এক চুমুক কড়া পানীয় মুখে নিয়ে গিলে না ফেলে সেটা গালের ভেতর জমিয়ে রাখলাম। মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন আমি কী করতে যাচ্ছি। মার চোখে তখন এক ধরণের চ্যালেঞ্জ আর প্রশ্রয় মেশানো অদ্ভুত চাহনি।
আমি মার হাতটা ধরলাম। মা তাঁর মুখটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি আমার গালের জমা মদটুকু খুব সন্তর্পণে মার ঠোঁটের ভেতর দিয়ে তাঁর মুখে চালান করে দিতে লাগলাম। আমাদের ঠোঁটগুলো তখন একে অপরকে স্পর্শ করছে। মার গলার পেশিগুলো নড়তে দেখলাম, তিনি সেই নেশাটুকু তৃপ্তির সাথে গিলে নিলেন।
মা তাঁর মুখটা সরিয়ে নিয়ে ঠোঁট চাটলেন। তাঁর চোখের কোল তখন ভিজে উঠেছে নেশায়।
আমি: "কেমন লাগল মা? বাবার দেওয়া মদের চেয়ে আমার দেওয়া এই অবশিষ্টাংশটুকু কি বেশি কড়া নয়?"
মা আমার গালে হাত রেখে আদর করে বললেন, "তোর মুখ থেকে পাওয়া এই এক ফোঁটা বিষও যেন অমৃতের মতো লাগছে রে। তোর বাবা তো গ্লাসে ঢেলে দেয়, কিন্তু তুই তো দিলি তোর শরীরের উত্তাপ মিশিয়ে। এটাই তো আমি সারাজীবন চেয়েছি—একটু বুনো আর অন্যরকম কিছু।"
আমরা আবার সিগারেটের ধোঁয়া অদলবদল করতে শুরু করলাম। একবার আমি দিচ্ছি, একবার মা দিচ্ছেন। ধোঁয়ার সেই মেঘের আড়ালে আমাদের পরিচয়গুলো হারিয়ে যাচ্ছিল। মা আবার গ্লাস হাতে নিলেন এবং এবার তিনি নিজের মুখে মদ নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন।
মার ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া মদের কয়েকটা ফোঁটা যখন তাঁর গলার খাঁজে গিয়ে পড়ল, আমি বুঝতে পারলাম এই রাতটা আর সাধারণ কোনো পারিবারিক আড্ডার গল্প হয়ে থাকবে না। নিয়ম আর অনিয়মের মাঝখানের সেই সুতোটা আমরা অনেক আগেই ছিঁড়ে ফেলেছি। এখন কেবল আছে এই নীল আলো, সিগারেটের কড়া ধোঁয়া আর একে অপরের শরীরের তীব্র ঘ্রাণ।
ভোরের আলো ফুটতেই ড্রয়িংরুমের সেই নীল বাতিটা ম্লান হয়ে এসেছে। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা প্রথম ধূসর আলোয় রাতের সেই নিষিদ্ধ আসরের অবশিষ্টাংশগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। সাখওয়াত সাহেবের ঘুমটা ভাঙল সবার আগে। নেশার ঘোর কেটে গেলেও শরীরে একটা হালকা ঝিমঝিম ভাব রয়ে গেছে।
তিনি সোফায় হেলান দিয়ে শোয়া অবস্থা থেকে নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিতে গিয়েই থমকে গেলেন। তাঁর বুকের ওপর আরিবা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মেয়ের শরীরের উষ্ণতা আর এলোমেলো চুলগুলো তাঁর বুকের ওপর ছড়িয়ে আছে। সাখওয়াত সাহেব নিজের অজান্তেই একবার মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন। কিন্তু তাঁর নজর যখন ঘরের অন্য পাশে পড়ল, তখন তাঁর হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
ফ্লোর ম্যাটের ওপর মা আর আমান পাশাপাশি শুয়ে। মা তাঁর ছেলের বুকের ওপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছেন, আর আমানের একটা হাত মায়ের পিঠের ওপর আলগোছে রাখা। যেন এক পরম তৃপ্তির ঘুম।
দৃশ্যটা দেখে সাখওয়াত সাহেবের সারা শরীরে এক তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেল। দীর্ঘ কয়েক দশকের বিবাহিত জীবনে তিনি যে নিয়ম আর শৃঙ্খলার বেড়ি পরেছিলেন, তা যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি হঠাৎ অনুভব করলেন তাঁর শরীরের ভেতর এক আদিম উত্তেজনা জেগে উঠছে। বছরের পর বছর যে কামদণ্ডটি প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল, আজ এই অদ্ভুত আর নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখে সেটি অভাবনীয়ভাবে শক্ত হয়ে উঠেছে। নিজের এই শারীরিক পরিবর্তন তিনি নিজেও অনেকদিন অনুভব করেননি।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, "এটাই কি তবে মুক্তি? আমি যাকে ভয় পেতাম, যাকে পাপ ভাবতাম, সেই অনিয়মই কি আমাকে আজ এই যৌবনের স্বাদ ফিরিয়ে দিল? আমার স্ত্রী আমার ছেলের বুকে, আর আমার মেয়ে আমার নিজের বাহুবন্দি—এই যে জটিল এক রসায়ন, এটাই কি তবে আমাদের আসল পরিবার?"
সাখওয়াত সাহেব খুব সাবধানে আরিবাকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। নিজের শরীরের সেই জেগে ওঠা উত্তেজনাকে তিনি আজ আর শাসন করলেন না, বরং এক ধরণের গর্বের সাথে সেটাকে অনুভব করলেন। তিনি ধীর পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের স্নিগ্ধ বাতাস তাঁর উত্তপ্ত শরীরটাকে ছুঁয়ে গেল।
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালেন তিনি। প্রথম টানের ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছেড়ে দিয়ে তিনি মনে মনে এক নতুন সংকল্প করলেন।
সাখওয়াত সাহেব: (বিড়বিড় করে নিজের মনেই) "সাখওয়াত, তুমি বৃথা এতদিন শৃঙ্খলার পেছনে ছুটেছ। ওই ঘরের ভেতর আজ যে সত্যটা পড়ে আছে, সেটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ। আজ থেকে আর কোনো পর্দা নেই, কোনো আড়াল নেই। এই লুকোচুরি খেলাটা যদি আমাদের এভাবে বাঁচিয়ে তোলে, তবে এই খেলাটাই চলুক অনন্তকাল।"
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মৃদু শব্দ হলো। তিনি তাকিয়ে দেখলেন মা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর চোখগুলো এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন কিন্তু মুখে এক ধরণের তৃপ্তির আভা।
মা: "তুমি কি অনেকক্ষণ আগে উঠেছ? আজ তোমাকে দেখে যেন অন্যরকম লাগছে..."
সাখওয়াত সাহেব সিগারেটে আরও একটা গভীর টান দিয়ে মায়ের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের সেই বুনো চাহনি দেখে মা একটু কেঁপে উঠলেন। বাবা মৃদু হেসে বললেন, "আজ সকালটা অন্যরকম হবে। তোরা যে আনন্দটা কাল শুরু করেছিস, আমি চাই সেটা আজ পূর্ণতা পাক। কোনো জড়তা রাখিস না। আমান আর আরিবা উঠুক, আজ আমরা সবাই মিলে এক নতুন সকালের শুরু করব যেখানে কোনো নিয়ম আমাদের আলাদা করতে পারবে না।"
মায়ের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বুঝলেন, সাখওয়াত সাহেব কেবল সব জেনেই যাননি, বরং এই নিষিদ্ধ স্রোতে তিনিও এখন একজন দক্ষ নাবিক হয়ে উঠেছেন। বারান্দার সেই স্নিগ্ধ আলোয় সিগারেটের ধোঁয়া আর চারজনের হৃদয়ের গোপন বাসনাগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। এক নতুন, অন্ধকার অথচ রোমাঞ্চকর ভবিষ্যতের দিকে পরিবারটি পা বাড়াল।