গোধূলি আলো'র গল্পগুচ্ছ - অধ্যায় ৮০
মা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না বিষয়টি। কিন্তু আমি যখন তার অনাগত সন্তানের পিতৃ পরিচয় আর সুন্দর ভবিষ্যতের ব্যাপারটা তুললাম তখন তিনি ধীরে ধীরে সহজ হয়ে বিষয়টি মেনে নিলেন। এরপর বোনদের রাজি করানোর পালা এলো। তারা মায়ের চেয়েও বেশি আপত্তি জানালো। কিন্তু সেটা ভুলে যেতে তাদের খুব বেশি সময় লাগলো না কারণ মেনে না নেয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই। এভাবেই জমি বিক্রিসহ যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করে ঢাকা ছেড়ে সাভারের এক মফস্বল এলাকায় আসলাম আমরা। বাড়ির কাছেই এক গার্মেন্টসে জব নিলাম আমি।
নতুন জায়গায় এসেই আমি আর মা এক রুমে থাকতে শুরু করলাম চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে। রিদম মাঝে মাঝে মায়ের কাছে রাতে থাকতে চায় পূর্বের অভ্যেস অনুযায়ী। কিন্তু আমি কিছুতেই তাকে রাখতে চাই না রুমে। তাকে বোনদের সাথেই থাকতে হয়। এতে মা কিছুটা ক্ষুন্ন হন। মুখ ভার করে বলেন, রিদমকে সাথে রেখেও তো তোর বাবা আর আমার কোনো সমস্যা হতো না।
জবাবে আমি বাঁকা হেসে বলি, বাবার সাথে তোমার দাম্পত্য জীবন ছিল পুরনো। তাই সঙ্গমে কোনো রং ছিল না। চুপেচাপে কোনো রকমে ঢুকাতে পারলেই হতো। কিন্তু আমাদের নতুন দাম্পত্য জীবনে তো অনেক রঙঢঙ করে করতে হয় তাই রিদমকে সাথে রাখা সম্ভব নয়।
মা মুখ ভার করে আমার কথা মেনে নেন। এভাবেই আমার পূর্ণ আনন্দে, মায়ের অপূর্ণ আনন্দে আর ভাইবোনের অস্বস্তিতে এগিয়ে চলছিল আমাদের দাম্পত্য জীবন। এক সময় মা পূর্ণগর্ভা হয়ে গেলেন। সারা দিন অফিসে থাকি বলে মায়ের যত্ন আত্তির ব্যাপারে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে গেলাম তাই একদিন মিতিকে ডেকে বললাম, জানিস তো তোর ভাবী খুব তাড়াতাড়ি মা হবে। একটু খেয়াল রাখিস। সারাদিন বাইরে থাকি। দেখাশোনার মতো আর কেউ তো নেই।
আমার কথা শুনে মিতি কিছু না বলেই সরে গেলো। এখানে আসবার পর মিতির সাথে ভাইবোনের সহজ সম্পর্কটা আর নেই। এখন সে বাবার মতোই সমীহ করে আমাকে তাই মায়ের কাছে গিয়ে বলল, এভাবে আর সইছে না মা। নিজের মাকে ভাবি ডাকতে হয়। তারপর আবার গর্ভবতী মায়ের যত্নও নিতে হবে। আবার বাচ্চাটা হলে তারপর না জানি নতুন নতুন আরও কতো কাহিনী হবে। এতো ঝামেলার দরকার নেই। আমার বিয়ে দিয়ে দাও।
মা অবাক হয়ে বললেন, সবে এস এস সি পাশ করলি? এখনই বিয়ে?
মিতি অগ্রাহ্য করে বলল, কী হবে এতো পড়াশোনা করে? সেই তো উনুনই ঠেলতে হবে।
মা বললেন, আচ্ছা। কিন্তু বিয়ের জন্য একটা পাত্রের তো দরকার।
মিতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, পাত্র আমি নিজেই ঠিক করে রেখেছি। গ্রীসে সেটেল্ড। ফেসবুকে দুই বছরের পরিচয় আমাদের।
মা আপত্তি জানিয়ে বললেন, ফেসবুকের পরিচয়ে কাউকে কি বিয়ে করা যায়?
মিতি আবারও কিছু সময় চুপ থেকে বললো, ফেসবুকে পরিচয় হলেই লোকটা মন্দ, এমন তো কোনো কথা নেই। দেশে তার আত্নীয় স্বজন আছে। সেখান থেকে ভালো ভাবে খোঁজ নিয়ে তো আগানো যায়। তাছাড়া এখানে যা চলছে তাতে এখান থেকে নরকে যেতেও আপত্তি নেই আমার।
মা ভীষণ আহত হয়ে আর কথা বাড়ালেন না। এর দুই মাসের মধ্যেই এই ছেলের সাথেই মিতির বিয়ে হয়ে গেলো। মিতিকে আমাদের কাছে রেখেই ওর বর আবার বিদেশে পাড়ি জমালো। এর কিছুদিন পরেই মায়ের কোল জুড়ে এলো আমাদের সন্তান অন্তু। এই ছোট্ট বাবুটাকে মিতি যেনো কোনোভাবেই সইতে পারছিল না। স্বামীকে নানা ভাবে তাগাদা দিচ্ছিল ওকে তার কাছে নিয়ে যেতে। সেই সাথে রিদমকেও। ভাইকে আর এখানে রাখতে চায় না সে। হলোও তাই। কিছুদিনের ভেতরেই ওর স্বামী এসে ওকে আর রিদমকে নিজের কাছে নিয়ে গেলো। এর এক বছর পরেই তার নিজের স্বামীর ওখানকার এক বন্ধুর সাথে তিথির বিয়ের ব্যবস্থা করলো মিতি। তিথি চলে যাবার পরে সংসারটা শুধু আমার, মায়ের আর আমাদের ছেলের হয়ে উঠলো। সব সময় অন্য ছেলেমেয়েদের অস্বস্তি দেখতে হয় না বলে মায়ের মনমরা ভাবটাও গেলো কেটে। সুখে সংসার করতে লাগলাম আমরা। এর কিছুদিন পরেই মা আবার গর্ভবতী হলেন। আর একটি পুত্র সন্তান এলো আমাদের ঘরে, প্রান্ত। অফিসে আমার পদোন্নতি হলো। সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে উঠলো আমাদের ঘর।
ভাবতে ভাবতেই বর্তমানে ফিরে এলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কাছাকাছি কোনো মসজিদ হতে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। সন্ধ্যার আকাশটা বিচিত্র রং ধারণ করেছে। এখন উঠতে হবে ভেবে আমি খেলায় রত ছেলেদের ডাক দিলাম। ওরা ফিরলে পরে স্ত্রী সন্তানদের হাত ধরে পার্ক ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
সমাপ্ত।