মায়ের নিষিদ্ধ টান - অধ্যায় ৫
পরের দিন সকালে আমি ইচ্ছে করে একটু দেরিতে উঠলাম। বাবা তখন অফিস চলে গেছেন। বাসাটা শান্ত। আমি বিছানায় শুয়ে শুনছিলাম মায়ের পায়ের শব্দ। তিনি রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। আজ আর চা নিয়ে আমার রুমে এলেন না। দূরত্ব রাখার চেষ্টাটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
আমি উঠে মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গেলাম। মা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আজ তিনি একটা পুরনো সাদা গাউন পরেছিলেন। গলাটা বেশ ঢাকা। তিনি আমাকে দেখে শুধু মাথা নাড়লেন। কোনো কথা বললেন না। চায়ের কেটলি থেকে আমার জন্য কাপ ঢেলে টেবিলে রেখে দিলেন। তারপর আবার চুলার দিকে ফিরে গেলেন।
আমি টেবিলে বসে চা খেতে লাগলাম। মায়ের পেছন দিকটা দেখছিলাম। গাউনটা ঢিলে হলেও তার কোমরের আকারটা বোঝা যাচ্ছিল। তিনি রান্না করতে করতে মাঝে মাঝে চুল সরাচ্ছিলেন। হাত তুললে গাউনের হাতা একটু উপরে উঠছিল। আমি চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। মা হঠাৎ পেছন ফিরে তাকালেন।
“চা খেয়ে গোসল করে নে। কলেজের জন্য বের হতে হবে।”
তার গলায় কোনো নরম ভাব ছিল না। শুধু নির্দেশ। আমি মাথা নাড়লাম। চা শেষ করে রুমে ফিরে এলাম। মায়ের সেই শুকনো গলার সুরটা কানে বাজছিল। তিনি ইচ্ছে করেই নিজেকে শক্ত করে রাখছেন। সাধারণ মায়ের ভূমিকায় ফিরে যেতে চাইছেন। কিন্তু আমি তার সেই চেষ্টার ভিতর দিয়েও তার শরীরের প্রতিটা নড়াচড়া নোট করে নিচ্ছিলাম।
কলেজে গিয়েও মন বসছিল না। ক্লাসে বসে মায়ের কথা ভাবছিলাম। তার সাদা গাউন, তার শুকনো গলা, তার দূরত্ব রাখার চেষ্টা। বন্ধুরা কথা বলছিল, আমি শুনছিলাম না। মাথায় শুধু বাসার ছবি ঘুরছিল। দুপুরে কলেজ থেকে ফিরে এসে দেখলাম মা বারান্দায় বসে কাপড় ভাঁজ করছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালাম।
মা আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, “খাবার রেডি আছে। গিয়ে খাইয়া নে।”
আমি তার পাশে চেয়ারে বসলাম। মা কাপড় ভাঁজ করতে করতে একটু দূরে সরে গেলেন। তার হাঁটু আমার হাঁটু থেকে সরে গেল। আমি লক্ষ করলাম তিনি সাবধানে জায়গা রাখছেন। কোনো স্পর্শ যাতে না হয়। আমি চুপ করে তার হাতের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মায়ের আঙুলগুলো কাপড়ের ভাঁজ তৈরি করছিল দ্রুত। তার কবজির হাড়টা সরু। চামড়া ফরসা। আমি কল্পনা করলাম সেই হাতটা যদি আমার হাত ধরে…
মা হঠাৎ কাপড়ের গাদা তুলে উঠে দাঁড়ালেন। “তুই গিয়ে খা। আমি কাপড় রেখে আসছি।” বলে তিনি ভিতরে ঢুকে গেলেন। আমি বারান্দায় বসে রইলাম কিছুক্ষণ। মায়ের দূরত্ব রাখার প্রতিটা চেষ্টা আমাকে আরও অস্থির করে তুলছিল। তিনি যত সরছেন, আমি তত কাছে যেতে চাইছিলাম।
বিকেলবেলা আমি ঘরে শুয়ে মোবাইল নিয়ে সময় কাটাচ্ছিলাম। মা আমার রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। হাতে এক গ্লাস পানি। তিনি গ্লাসটা টেবিলে রেখে বললেন, “পানি খাইয়া রাখ। গরম পড়েছে।”
আমি উঠে বসলাম। মা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তার সাদা গাউনটা হালকা হাওয়ায় নড়ছিল। আমি গ্লাস হাতে নিয়ে তার দিকে তাকালাম। মায়ের চোখদুটো একটু ক্লান্ত লাগছিল। তিনি কিছু বলতে চাইছেন হয়তো। কিন্তু বললেন না। শুধু বললেন, “রাতের খাবার একটু দেরিতে হবে। বাবা দেরিতে ফিরবেন।”
“ঠিক আছে মা।”
মা একটু দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি গ্লাসের পানি খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মায়ের ক্লান্ত চোখের ছবিটা মনে পড়ছিল। তিনি লড়াই করছেন নিজের সাথে। আমাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার চোখে একটা অস্বস্তি স্পষ্ট। আর সেই অস্বস্তিটাই আমাকে আশা দিচ্ছিল যে তিনি পুরোপুরি উদাসীন নন।
সন্ধ্যায় বাবা ফিরলেন দেরিতে। মুখ ক্লান্ত। তিনি এসেই মাকে বললেন, “খাবার দাও। খুব ক্লান্ত লাগছে।” মা দ্রুত খাবার গরম করে টেবিলে নিয়ে এলেন। তিনজন মিলে খেলাম। বাবা খেতে খেতে অফিসের কথা বলছিলেন। মা চুপচাপ শুনছিলেন। আমি মায়ের দিকে বারবার তাকাচ্ছিলাম। তিনি আমার দৃষ্টি এড়িয়ে চোখ নামিয়ে রাখছিলেন। একবার শুধু চোখাচোখি হলো। মা দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলেন। তার গালে আবার সেই হালকা লালচে ভাব।
খাবার শেষে বাবা ঘুমাতে চলে গেলেন। মা রান্নাঘর পরিষ্কার করতে লাগলেন। আমি একটু পরে গিয়ে দাঁড়ালাম দরজার কাছে। মা আমার উপস্থিতি টের পেয়েও পেছন ফিরলেন না। তিনি থালা ধুচ্ছিলেন। আমি গলা খাকারি দিলাম।
মা থেমে গিয়ে বললেন, “কী চাই আয়ান?”
“মা, তুমি কি আমার সাথে কথা বলবে না আর?”
মা হাতের কাজ থামিয়ে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছলেন। তারপর পেছন ফিরে আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে একটা ক্লান্তি আর বিরক্তি মিশে ছিল।
“কী কথা বলব? তুই যেমন আচরণ করছিস, তেমন আচরণ ভালো লাগছে না। আমি তোর মা। তুই সেটা ভুলে যাসনি তো?”
তার গলায় জোর ছিল। কিন্তু সেই জোরের নিচে একটা কম্পনও লুকিয়ে ছিল। আমি এক পা এগোলাম। মা পেছনে সরে গেলেন। তার পিঠ সিঙ্কের সাথে লেগে গেল।
“আমি ভুলিনি মা। কিন্তু আমি নিজেকে থামাতে পারছি না।”
মা চোখ বড় করে তাকালেন। তার ঠোঁট কেঁপে উঠল একটু। তিনি গলা নিচু করে বললেন, “থামা। এখনই থামা। নইলে আমি বাবাকে বলব।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভিতরটা চেপে গেল। মা ভয় দেখাচ্ছেন। তিনি সত্যিই বাবাকে বলতে পারেন। আমি থেমে গেলাম। মা আমার দিকে আর তাকালেন না। তিনি আবার থালা ধোয়ার দিকে ফিরে গেলেন। আমি চুপ করে রুমে ফিরে এলাম।
সেই রাতে ঘুম এল না অনেকক্ষণ। মায়ের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল। “নইলে আমি বাবাকে বলব।” তিনি ভয় পাচ্ছেন। অস্বস্তি বোধ করছেন। কিন্তু তার চোখের সেই কম্পন, তার গালের লালচে ভাব, তার পেছনে সরে যাওয়া সবকিছুই বলছিল তিনি পুরোপুরি উদাসীন নন। তিনি লড়াই করছেন। আর আমি সেই লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ধীরে ধীরে। টানটা এখন আর শুধু আমার একার নয়। মায়ের ভিতরেও কিছু একটা আলোড়ন তৈরি হয়েছে। তিনি সেটা দমিয়ে রাখতে চাইছেন। কিন্তু আমি জানতাম, এভাবে দমিয়ে রাখা সহজ নয়।