নতুন জীবন - অধ্যায় ৮
আরো খানিক সময় অপেক্ষার করার পর ৬৫০ টাকার মাছ ১৩০ টাকার সব্জি কিনে বাড়ির পথে দ্রুত হাঁটা দিলাম। মেইন রাস্তা থেকে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করার একটাই সরু পথ। এই পথে তেমন কোন মানুষের চলাচল নেই।
একমাত্র আমাদের বাড়ি প্রবেশ করা মানুষেরই পা পড়ে ।
তাই পথটার বেশি সময় কাটে সুনসান নিরবতার মধ্যেই, কারন তার উপর দিয়ে চলাচল করা দুটো অস্তিত্বের একজন তো থাকে সারাক্ষন লোকচক্ষুর আড়ালে।
মিনিটে পাঁচেক সময় লাগে বাড়ি যেতে । কিন্তু আজ যেন এই সামান্য পথটা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। এত দ্রুত হাটার পরও বাড়ির নাগাল পাচ্ছি না। সত্যি কি পথ বড় হয়ে গেছে নাকি বাড়ি ফেরার তাড়নায় এই সামান্য সময়টুকু ফুরাচ্ছেনা কিছুই বুঝতে পারছি না।
কিসের তাড়নায় এত হন্যে হয়ে ছুটছে এ অবুঝ মন। কিসের এত ব্যাকুলতা। আগে তো কখনো এমন হয়নি।
আগে তো আম্মু যখন বাজার করে অথবা কোন কাজে বাড়ি থেকে বের হতে বলত, নিজের অজান্তে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বের হত। বন্দী পক্ষী যেমন খাঁচা থেকে মুক্ত হলে স্বডানায় ভর করে উড়ে চলে দূর অজানায় । আমি ও তেমন করে ছুটে বের হতাম চার দেওয়ালের বন্দী বাড়িটা থেকে।
এই পথ যেন শেষ না হয়' এই কথা গুলোর সুরে গেয়ে উঠতাম.
এই কাজ যেন শেষ না হয়। কাজ শেষে ফিরে গেলেই যে চার দেওয়ালে আটকে থাকা।
এই আটকে থাকা যে এক অসহায় মায়ের স্বস্তি সেটা আমি ও বুঝতাম। তাই তো সব সময় নিজেও কেয়ারফুল হয়ে চলতাম।
লোভ যে মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে সেটা কারো অজানা নয়।
বাবা কতটা ধন সম্পদের মালিক ছিলো সেটা পুরোপুরি আমার জানা ছিলো না। তবে অনেক কিছুই ছিলো সেটা কেউ বলে দিতে হতো না। এখন বাবা নেই তাই তার সবকিছুর একমাত্র মালিক আমি।
আমি ও যদি না থাকি এতকিছুর মালিক কে হবেন ?
.আম্মমু
- না
আমি ছাড়া যে তার ও অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। নারী সন্তান ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু নাড়িছেঁড়া ধন ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। যদি থাকে সেটাকে থাকা বলে না।
তখন যে এতকিছুর মালিক হবে মানুষ নামে কিছু অমানষ।
এর সব কিছু জানা ছিলো এই স্বার্থ লোভী মানুষের। যাদের বসবাস অসহায় দুজন মানুষের পাশেই।
এই অমানুষ গুলোর কথা ভেবেই আম্মু যথাসম্ভব নারী ছেঁড়া ধন আগলে রাখতো।
উপরওয়ালার কৃপায় এখন পযর্ন্ত এরা কোন ক্ষতি করতে পারিনি। ভবিষ্যৎ কি হবে সেটাও জানা ছিলো না আমাদের। নাকি এদের মন মানুসিকতা চেঞ্জ হয়ে গেছে সেটাও. মা ছেলে না জানলে ও বিধাতা ঠিকই জানে আগামীতে কি হতে যাচ্ছে.
ওমা! এই সামান্য পথ পারি দিতে দিতে এত কিছু বলে ফেললাম। পথ যে ফুরাচ্ছিল না তাই হয়ত সময় পেয়েছি কিছু অজানা কথা বলতে..
অবশেষে দুই ধারে সারি সারি কলা গাছ বদ্দ সরু পথ পার হয় এ বাড়ি আসলাম।
বাড়ির পশ্চিম পাশে নতুন ষ্টীলের গেইট। গেইট পার হয়ে বাড়ির উঠানে পা রাখতেই আম্মু আমাকে দেখে উল্কাবেগে ছুটে আসলো.
- কিরে বাবা এত দেরী হলো ? উৎকন্ঠিত বদনে আম্মুর জিজ্ঞাসা.
- মাছ ওয়ালা ব্যাটা আসতে দেরী করছে হালকা হেসে বললাম.
নিমিষের মধ্যে মনের সকল অস্থিরতা কোথায় চলে গেল বুঝলাম না। বাড়ি আসার কারন নাকি অন্যকিছু । আগে যতবার বাড়ির বাহির গেছি বাড়ির আসার এত তাড়না ছিলো না। আসার পর এতটা ভালোও লাগেনি আজ যতটা লাগছে। এ রহস্য আমার অজানা।
মাছ আর তরকারীর ব্যাগ আমার কাছে থেকে নেওয়ার সময় আম্মুর হাতের সাথে আমার হাতের স্পর্শ লাগে।
আগেও অনেকবার লেগেছে, তবে আজ যেন একটু অন্যরকম মনে হলো।কেমন একটা শিহরণ জেগেছে ভিতরে।
বাজার করার পর যে টাকা অবশিষ্ট ছিলো সেটা দেওয়ার সময় আবার ও মায়ের হাতের স্পর্শ পেলাম। ইচ্ছায় হোক বা অনইচ্ছায় হোক। আবার ও শিহরণ জাগল মনে । আগের চেয়ে অনেক তীব্র ছিল এ শিহরণ। এ কোন শিহরণ । আগে তো কখনো এমন হতো না। আগে তো কখনো অনুভব হয়নি এমন।