প্রতিমার জীবন সংগ্রামের ইতিকথা - অধ্যায় ১৯
অষ্টাদশ পর্ব:-
সকালের আলো তখনও ধূসর। জানালার বাইরে পাড়ার লোকজনের কথা বলার আওয়াজ ভেসে আসছে। প্রতিমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তার আঙুলগুলো শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুচড়ে ধরেছে। সৌম্যর সামনে দাঁড়িয়ে সে যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সৌম্য তার হাত দুটো প্রতিমার কাঁধের ওপর রাখল। তার হাতের উষ্ণতা প্রতিমাকে কিছুটা স্থির করল।
"ভয় পেয়ো না, মা। আমি যাচ্ছি শুধু একটা রাস্তা খুঁজতে। খুব তাড়াতাড়ি সব ঠিক করে ফেলব।"
প্রতিমা মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল, "যদি কিছু না হয়? এই পাড়ার মানুষগুলো... তারা কি আমাকে আর শান্তিতে থাকতে দেবে?"
সৌম্য তার চিবুক ধরে মুখটা তুলল। চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
"আমি কথা দিয়েছি তোমায়। আর সৌম্য কথা দিলে তা রাখে। তুমি শুধু দরজা বন্ধ করে ভেতরে থাকো। বাইরের কথা একদম ভাববে না।"
সৌম্য বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ করার শব্দটা প্রতিমার কানে যেন একটা ভারী পাথরের মতো বাজল। সে ধীর পায়ে জানালার পাশে গিয়ে বসল। বাইরের রাস্তাটা এখন ব্যস্ত। নারীরা জল ভরতে যাচ্ছে, পুরুষেরা খবরের কাগজ নিয়ে আলোচনা করছে। প্রতিমা অনুভব করল, জানালার পর্দার আড়ালে থেকেও কেউ যেন তাকে দেখছে। ওই অদৃশ্য দৃষ্টিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে সে এখন এই সমাজের চোখে এক কলঙ্ক।
সময় যেন থমকে গিয়েছিল। ঘড়ির কাঁটার শব্দ প্রতিমার কানে ড্রামের মতো বাজছিল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সূর্যের সোনালি আলো যখন ঘরের দেয়ালে দীর্ঘ ছায়া তৈরি করল, প্রতিমার উদ্বেগ আরও বেড়ে গেল। সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি মিনিট যেন এক একটা যুগ।
সন্ধ্যে নামল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে প্রতিমার মনে এক অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধল। সে নিজেকে প্রশ্ন করল, "সৌম্য কি ফিরে আসবে? নাকি এই শহরের ভিড়ে সেও হারিয়ে গেল?"
ঠিক যখন সে চরম হতাশায় ডুবে যাচ্ছিল, তখনই দরজায় তিনটে মৃদু টোকা পড়ল। প্রতিমা প্রায় লাফিয়ে উঠল। সে দ্রুত দরজা খুলে দিল। সামনে সৌম্য দাঁড়িয়ে—চেহারায় ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে এক তীব্র উজ্জ্বলতা।
"কী হয়েছে? কিছু ব্যবস্থা হয়েছে?"
প্রতিমার কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠা স্পষ্ট। সৌম্য ভেতরে ঢুকে দরজাটা খুব সাবধানে বন্ধ করল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল।
"হ্যাঁ, মা। সব ব্যবস্থা করে এসেছি।"
প্রতিমা তার সামনে এসে দাঁড়াল, চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে।
"কীভাবে? কোথায় কথা বলেছ?"
সৌম্য তার হাত ধরে বিছানায় বসাল। তারপর শান্ত গলায় বলল, "আমার এক পরিচিত লোক আছে—আগে তার সাথে ব্যবসার সম্পর্ক ছিল। আমি তাকে ফোন করেছিলাম। সে মুম্বাইয়ের একটা বড় কোম্পানিতে আমার চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বেতন খুব ভালো, যা দিয়ে আমরা খুব আরামে থাকতে পারব।"
প্রতিমার মুখে খুশির রেখা ফুটে উঠল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই খুশি ভয় আর সংশয়ে বদলে গেল। সে সৌম্যর হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
"তাহলে... তুই কি আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবি না? আমাকে এখানে একা ফেলে যাবি?"
সৌম্য তার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল, "শোনো, প্রথমে আমাকে একা যেতে হবে। ওখানে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে, অফিসের কাজগুলো বুঝে নিতে হবে। সবকিছু সেটেল করতে একটু সময় লাগবে। আমি কথা দিচ্ছি, এক মাসের মধ্যে ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে যাব—চিরজীবনের জন্য। তুমি আর এই নরকে একা থাকবে না।"
প্রতিমার চোখ ছলছল করে উঠল। সে মাথা নিচু করে বলল, "এক মাস? আমি এখানে এক মাস থাকব কীভাবে, সৌম্য? প্রতিবেশীরা—তারা রোজ আমাকে শুনিয়ে নোংরা ও অশ্লীল মন্তব্য করবে। আমি তাদের চোখের সামনে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারব না। প্রতিবার বাইরে বেরোতে গেলে আমার মনে হবে আমি কোনো অপরাধী।"
সৌম্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারল প্রতিমার এই মানসিক যন্ত্রণা। সে মৃদু হেসে প্রতিমার কপালে একটা চুমু খেল।
"আমি সেটা ভেবেছি, মা। তোমার এই কষ্ট আমি বুঝতে পারছি।"
প্রতিমা অবাক হয়ে তাকাল, "মানে?"
"আমি আজই কলকাতায় দু'মাসের জন্য একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি। একদম নিরাপদ জায়গা। তুমি ওখানে থাকবে। সেখানে কেউ তোমাকে চিনবে না, কেউ তোমাকে বিরক্ত করবে না। সেখানে তুমি শান্তিতে থাকবে যতক্ষণ না আমি তোমাকে মুম্বাই নিয়ে যাচ্ছি।"
প্রতিমার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে সৌম্য এত দ্রুত সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
"সত্যি? তুই সেটাও ব্যবস্থা করে এসেছিস?"
সৌম্য তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল, "আমি তোমার জন্য সব করব, মা। তুমি শুধু ভয় পেয়ো না। আমি আছি তো।"
পরের কয়েকদিন প্রতিমা এক অদ্ভুত শূন্যতায় কাটাল। সৌম্যর দেওয়া ভরসা তাকে সাহস দিচ্ছিল, কিন্তু তার মনে জমে থাকা পুরনো ক্ষতগুলো তাকে দংশন করছিল। ভয় আর লজ্জার পাহাড় ধীরে ধীরে সরতে শুরু করল। এক বিকেলে, যখন ঘরটা শান্ত ছিল, প্রতিমা তার আলমারির একদম নিচে রাখা পুরনো একটা ডায়েরি বের করল।
ধুলো জমা পাতলা ডায়েরিটা খুলতেই তার সামনে ভেসে উঠল কিছু পুরনো নম্বর। তার বাবার নম্বর। প্রায় বিশ বছর সে এই নম্বরটা স্পর্শ করেনি। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল। মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে তার বাবা-মায়ের আদরে বড় হয়েছিল। তারপর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত, এক অভিমান, আর দীর্ঘ দুই দশকের নীরবতা।
সে ফোনটা হাতে নিল। নম্বরটা ডায়াল করার সময় তার বুক ধড়ফড় করছিল। রিং হচ্ছে... একবার, দুবার, তিনবার। প্রতিমা মনে মনে প্রার্থনা করছিল যেন অপর প্রান্তে তার বাবা - মা ফোনটা ধরে।
অবশেষে ফোনটা রিসিভ হলো। একটি গম্ভীর কিন্তু পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—জ্বলন্ত স্বরে, "হ্যালো?"
প্রতিমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু শব্দ বেরোলো না। অবশেষে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, "বাবা..."
ওপার থেকে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো পৃথিবীটা থেমে গেছে। তারপর বাবার কণ্ঠ কেঁপে উঠল, একদম ভেঙে পড়া স্বরে, "প্রতিমা? তুই? সত্যিই তুই?"
প্রতিমার বাঁধ ভেঙে গেল। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
"হ্যাঁ বাবা, আমি... অনেক বছর পরে ফোন করলাম। তোমরা কেমন আছো? তোমরা তো আমার কোনো খোঁজখবর নাও না..."
ফোনের ওপাশে তখন হইচই শুরু হয়েছে। প্রতিমার মা সম্ভবত ফোনের কাছে চলে এসেছেন। মায়ের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বাবা আবার জিজ্ঞেস করছেন, "কোথায় তুই? কেন এই এত বছর ফোন করিসনি মা? আমরা তো প্রতি মুহূর্তে তোর কথা ভাবতাম।"
প্রতিমার মন ভরে গেল। এত বছর পর, এত অভিমান আর দূরত্বের পর, সে বুঝতে পারল তাদের ভালোবাসা আজও একই আছে। কোনো ঘৃণা নেই, কোনো অভিযোগ নেই—আছে শুধু পাওয়ার আকুলতা।
বাবা আবেগপ্লুত গলায় বললেন, "তুই আমাদের কাছে একবার আয়, মা? আমরা অনেক দিন তোকে দেখিনি। একবার আয়, প্লিজ একবার আয়।"
প্রতিমা কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিল, "হ্যাঁ বাবা, আমি আসব। দুই দিনের মধ্যে আসব।"
সেই বিকেলে ফোনটা রাখার পর প্রতিমা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, যেন দীর্ঘ অন্ধকার কাটিয়ে তার জীবনে আলোর দেখা মিলল।
সন্ধ্যেবেলা সৌম্য যখন বাড়ি ফিরল, প্রতিমা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক অন্যরকম প্রশান্তি।
"সৌম্য, আজ আমি আমার মা-বাবাকে ফোন করেছি। অনেক বছর পর তাদের সাথে কথা হলো।"
সৌম্য অবাক হয়ে তাকাল, "কী! সত্যিই? তাহলে কী বললেন তারা?"
"তারা আমাকে ওনাদের কাছে যেতে বলেছে। আমি দুই দিনের মধ্যে তাদের কাছে যাব।"
সৌম্যর মুখে প্রথমে একটু চমক খেলেছিল, কিন্তু পরক্ষণেই এক বিশাল হাসি ফুটে উঠল। সে প্রতিমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "বাহ! সত্যি? এটা তো দারুণ খবর! তুমি অনেক দিন পর তোমার বাবা-মাকে দেখবে। আমি খুব খুশি, মা।"
প্রতিমা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তবে তুই তো মুম্বাই চলে যাচ্ছিস—আমি কি ওখানে একা থাকব? আমার ভয় লাগছে।"
সৌম্য তাকে আলতো করে টেনে বিছানায় বসাল। সে প্রতিমার চোখের গভীরে তাকিয়ে খুব গুরুত্ব দিয়ে বলল, "শোনো, তুমি এক মাস তোমার বাবা-মায়ের কাছে থাকো। দাদু-দিদার সাথে সময় কাটাও। পুরনো স্মৃতিগুলো নতুন করে খুঁজে নাও। আমি মুম্বাই গিয়ে সব ব্যবস্থা করে ফিরে আসব। তারপর আমি তোমাকে নিয়ে মুম্বাই চলে যাব।"
প্রতিমা চুপ করে শুনছিল। সৌম্যর কণ্ঠে এক নতুন পরিকল্পনা ছিল। সে আরও নিচু স্বরে বলল, "আর সেখানে পৌঁছে—এক মন্দিরে তোমাকে বিয়ে করব, মা। ভগবানের সামনে তুমি আমার স্ত্রী হবে।"
প্রতিমা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল, চোখে ভয় আর বিস্ময়।
"বিয়ে? কিন্তু... কিন্তু লোকে যদি জানে যে আমি তোমার মা? লোকে কী বলবে?"
সৌম্য তার হাত শক্ত করে ধরল। তার দৃষ্টিতে কোনো সন্দেহ ছিল না।
"ওখানে কেউ জানবে না। তোমার বয়স মাত্র ৩৯-৪০, কিন্তু তোমাকে দেখলে এখনো ২৫-৩০ বছর মনে হয়। তোমার এই রূপ, এই যৌবন ও সৌন্দর্য—কেউ সন্দেহ করবে না। আমি তোমাকে আমার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেব, আর কেউ প্রশ্ন করার সাহস পাবে না।"
প্রতিমা ভয়ে আর লজ্জায় কথা খুঁজে পেল না। সে শুধু মাথা নিচু করে রইল। সৌম্য তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "কোনো ভয় নেই। আমি চিরজীবন তোমার সঙ্গে আছি। আমরা এক নতুন জীবন শুরু করব, যেখানে কেউ আমাদের বিচার করবে না। তাছাড়া সমাজ কী বলল তাতে কিছু যায় আসে না। তুমি শুধু আমার উপর বিশ্বাস রাখো।"
প্রতিমা তার বুকে মাথা রেখে শুনল—সৌম্যের হৃদস্পন্দন। স্থির, দৃঢ় আর ভরসাপূর্ণ। জানালার বাইরে রাত আকাশের তারাগুলো জ্বলছিল, আর প্রতিমার মনে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত শান্তি নামছিল। সে অনুভব করল, সে আর একা নয়। তার ছেলে, তার প্রেমিক, তার ভবিষ্যৎ স্বামী—সবই এই এক পুরুষের মধ্যে। আর সে তাকে আর কোনোদিন ছেড়ে যেতে দেবে না।
খানিকক্ষণ পর, যখন তারা নীরবতায় বসে ছিল, প্রতিমা আবার বলল, "আমি দুই দিনের মধ্যে তোর দাদু-দিদার কাছে যাব।"
সৌম্য এবার চুপ হয়ে গেল। তার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ফুটে উঠল। সে প্রতিমার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলল, "দু’দিন বাদে না, মা। আজ রাতেই তোমাকে দাদু-দিদার বাড়ি পৌঁছে দেবো।"
প্রতিমা চমকে উঠল, "আজ রাতেই? কিন্তু এত রাতে? এটা কীভাবে সম্ভব?"
সৌম্য তার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল—একটা মিষ্টি, কিন্তু অবিচল হাসি।
"হ্যাঁ, এখনই। সকালে উঠে তোমাকে আর এই প্রতিবেশীদের মুখ দেখতে হবে না। তাদের নোংরা ও অশ্লীল কথা শুনতে হবে না। আজ রাতেই সব শেষ করি। এই বাড়ি, এই পরিবেশ—সব ফেলে দিয়ে বেরিয়ে যাই, আমি এখনই ফোনে ট্যাক্সি বুক করে নিচ্ছি, তুমি তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নাও, মা।"
প্রতিমার মন দুলে গেল—বিশ্বাস আর ভয়ের মাঝখানে। কিন্তু সৌম্যের কথা শুনে তার ভেতরে এক অদ্ভুত স্বস্তি জাগল। সে বুঝতে পারল, সৌম্য তাকে এই মানসিক অত্যাচার থেকে দ্রুত মুক্তি দিতে চায়।
"ঠিক আছে," প্রতিমা মৃদু স্বরে বলল।
সে তাড়াতাড়ি তার কিছু প্রয়োজনীয় জামাকাপড়, গয়নার বাক্স, আর পুরনো কিছু ছবি গুছিয়ে নিল। সৌম্য পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তার প্রতিটি নড়াচড়া দেখছিল। তার চোখে ছিল এক ধরনের জয়ের তৃপ্তি।
রাতের নিস্তব্ধতা তখন গভীর। তারা খুব সাবধানে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। দরজার শব্দ যাতে না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখল তারা। পায়ের শব্দ কমিয়ে কমিয়ে তারা গলির মুখে এল। প্রতিবেশীদের সব ঘর অন্ধকার, কেউ জেগে নেই। বাইরে একটি হলুদ ট্যাক্সি অপেক্ষা করছিল, যা সৌম্য আগে থেকেই ডেকে রেখেছিল।
তারা ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসলে চালক ইঞ্জিন চালু করল। গাড়িটি ধীরে ধীরে সরু গলি পেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠল। জানালার বাইরে কলকাতার রাতের ম্লান আলো প্রতিমার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছিল। সৌম্য তার পাশে নীরব বসে ছিল, কিন্তু প্রতিমার হাত তার হাতের মুঠোয়—উষ্ণ, স্থির।
তারা কথা বলছিল না, কিন্তু প্রতিমা অনুভব করতে পারছিল, এই নীরবতায় সৌম্য তাকে অনেক কিছু বলছে। সে যেন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল যে সে তাকে আর কোনোদিন কষ্ট পেতে দেবে না, যে সে ফিরে আসবে তাকে নিতে।
প্রায় ২ ঘন্টা পর, গাড়ি যখন কলকাতার প্রতিমার পুরনো পাড়ায় ঢুকল, প্রতিমার চোখ জল ভরে গেল। বিশ বছর। দীর্ঘ বিশ বছর পর সে এই রাস্তায় ফিরেছে। রাস্তার পাশের পুরনো বাড়িগুলো, বারান্দার ঝুলন্ত গাছগুলো—সব যেন সময়ের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আবার বাস্তব হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে।
সৌম্য দাদূবাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে বলল, "মা পৌঁছে গেছি।"
প্রতিমা কাঁপাকাঁপা হাতে দরজায় কড়া নাড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই দরজা খুলে গেল। বাবা-মা প্রায় দৌড়ে সামনে এলেন। মা কাঁদতে কাঁদতে প্রতিমাকে জড়িয়ে ধরলেন। প্রতিমার বাবা দাঁড়িয়ে রইলেন, চোখ মুছতে মুছতে তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তার মেয়ে সত্যিই ফিরে এসেছে।
সৌম্য একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। প্রতিমার বাবা তাকে কাছে ডেকে বললেন, "তুমি আমাদের মেয়েকে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছ, বাবা। আমরা তোমার কাছে চিরঋণী। তুমি না হলে হয়তো আমরা ওকে আর কোনোদিন দেখতে পেতাম না।"
সৌম্য মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে বলল, "উনি আমার মা। আমার সব। আমার একমাত্র কাজ হচ্ছে ওঁনাকে সুখী রাখা।"
প্রতিমার বাবার চোখে সৌম্যর জন্য এক গভীর শ্রদ্ধা তৈরি হলো। তিনি বুঝলেন, এই যুবকটি প্রতিমার ছেলে, প্রতিমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
এরপর প্রতিমা তার বাবা-মায়ের সাথে পুরনো স্মৃতি, অনেক কথা, আর কান্নার মধ্য দিয়ে কেটে গেল কয়েকটা দিন। প্রতিমা অনুভব করল, সে যেন আবার ছোটবেলার সেই ছোট্ট মেয়েটি হয়ে গেছে।
কয়েকদিন পর, মাকে বিদায় জানিয়ে সৌম্য তার দাদুর বাড়ি থেকে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাওয়ার আগে সে প্রতিমার কাঁধে একবার হাত রাখল এবং ফিসফিস করে বলল, "এক মাস, মা। শুধু এক মাস। তারপর আমরা আমাদের নিজেদের দুনিয়ায় চলে যাব।"
প্রতিমা হাসল, তার চোখে এখন আর ভয় নেই, আছে এক উজ্জ্বল অপেক্ষা। সে জানত, সৌম্য আসবে। সে জানত, তাদের নতুন জীবন শুরু হতে আর দেরি নেই। কিন্তু প্রতিমা জানতো না যে তার এই অপেক্ষার অবসান হবে কিনা? সেটা হয়তো ভবিষ্যতের গহ্বরে লেখা আছে।