প্রতিমার জীবন সংগ্রামের ইতিকথা - অধ্যায় ২৭
ষড়বিংশ পর্ব:-
মুম্বাইয়ের জেলের লোহার গেটটা যখন একটা কর্কশ শব্দ করে খুলে গেল, সৌম্যর মনে হলো সে এক অন্ধকার গুহা থেকে আলোর পৃথিবীতে এসে পড়ল। কড়া রোদ তার চোখের ওপর এসে পড়ল, যেন তাকে স্বাগত জানাচ্ছে না, বরং তার পাঁচ বছরের অপরাধবোধের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়াল। কংক্রিটের চার দেয়াল, লোহার শিক আর ঘাম আর পচা গন্ধের সেই জীবনটা এখন পেছনে।
পকেটে হাত দিল সে। কিছু খসখস টাকা। জেলের ভেতরে ছোটখাটো কাজ করে, কয়েকের শরীর খাটিয়ে কামানো সামান্য পুঁজি। তার শরীরটা আগের চেয়ে শুকিয়ে গেছে, চোয়ালটা তীক্ষ্ণ হয়েছে, আর মুখে গজানো ঘন কালো দাড়ি তাকে আরও কয়েক বছর বয়স্ক দেখায়।
সৌম্যর মনে পড়ল তার মায়ের কথা। প্রতিমা। পাঁচ বছর আগে যে মানুষটাকে সে ছেড়ে এসেছিল, সে কি এখনো তাকে মনে রেখেছে? সে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারের একটা পুরনো পাবলিক ফোন বুথের দিকে এগিয়ে গেল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে নম্বরটা ডায়াল করল। এই নম্বরটা সে মুখস্থ রেখেছে, যেন তার জীবনের একমাত্র নোঙর।
ফোনের ওপার থেকে যান্ত্রিক এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
"এই নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।"
সৌম্যর হাতটা জমে গেল। সে আবার চেষ্টা করল। একই কথা। তিনবার, চারবার, দশবার। প্রতিবারই সেই যান্ত্রিক প্রত্যাখ্যান। সে ফোনটা জোরে রিসিভারে রেখে দিল। বুকটা যেন কেউ শূন্য করে নিল।
"বন্ধ? মা নম্বরটা বন্ধ করে দিল?"
সে কিছুক্ষণ রাস্তার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মুম্বাইয়ের এই ঘিঞ্জি শহর তাকে এখন আরও অচেনা মনে হচ্ছে। তার মনে পড়ল দাদু-দিদার কথা। মুম্বাই যাওয়ার আগে তার মা প্রতিমাকে দাদুর বাড়িতেই রেখে এসেছিল সে। কলকাতা। সেই পুরনো শহর, যেখানে তার মায়ের শিকড়।
সৌম্য স্টেশনে গেল। ট্রেনের টিকিট কাটল ও ট্রেনে উঠে জানালার পাশে বসলো । ট্রেন যখন চলতে শুরু করল, বাইরের দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পাঁচ বছর আগের সেই শেষ রাতগুলো। প্রতিমার শরীরের উষ্ণতা, সেই নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা, আর সেই অন্ধকার ঘরের নিস্তব্ধতা। সে মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল, মা কি তাকে অপরাধী মনে করেন বা ক্ষমা করতে পেরেছে সেই কাজের জন্য? নাকি ঘৃণা করে আজও সেই রাতের কথা মনে করে?
কলকাতা স্টেশনে যখন নামল, শহরের ভিড় আর শব্দ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরল। চোখে জল এসে ভিড় করল। সে একটা রিকশা ধরল।
"দাদুর বাড়িটা কোথায় জানো?"
রিকশাওয়ালা মাথা নাড়ল। "ঠিকানাটা বলুন বাবু।"
সৌম্য ঠিকানাটা বলল। রিকশা যখন পুরনো গলির ভেতরে ঢুকল, সৌম্যর হৃৎপিণ্ড দ্রুত গতিতে স্পন্দিত হতে লাগল। সামনেই সেই বাড়ি। প্লাস্টার খসে পড়া পুরনো দেওয়াল, সামনে সেই বিশাল আম গাছটা, যার ডালগুলো যেন বাড়ির ওপর ঝুঁকে পড়েছে। সৌম্যর মনে হলো সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
সে দরজায় কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পর ভেতরে থেকে শব্দ এল। দরজা খুললেন দিদা। সাদা শাড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তিনি সৌম্যর দিকে তাকালেন, কিন্তু চিনতে পারলেন না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই দীর্ঘদেহী, দাড়িওয়ালা মানুষটি তার নাতি হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি।
"কে তুমি, কাকে চাই?"
দিদার গলায় সন্দেহ আর সতর্কতার সুর।
"দিদা, আমি সৌম্য। তোমার নাতি।"
দিদার হাত থেকে জলের গ্লাসটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তিনি চোখ সরু করে তাকালেন, তারপর হঠাৎ তার মুখটা ভেঙে পড়ল।
"ও মা! সৌম্য! তুই ফিরে এসেছিস? তুই ফিরে এসেছিস রে!"
দিদা তাকে জাপটে ধরলেন। সৌম্যর মাথা দিদার কাঁধে। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। পাঁচ বছরের জমে থাকা সব যন্ত্রণা যেন এক নিমেষে বেরিয়ে এল।
"এতদিন কোথায় ছিলি রে বাবা? তোর মা তো পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল! মাসের পর মাস খোঁজ করেছে। পুলিশে গিয়েছে, চারদিকে খুঁজেছে। আমরা বলেছিলাম তুই ফিরে আসবি, কিন্তু তুই আসলি না।"
সৌম্যর গলা রুদ্ধ হয়ে এল। সে শুধু মাথা নাড়ল। দিদা তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। ড্রয়িংরুমের সোফায় দাদু শুয়ে আছেন। শরীরটা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে, সৌম্যর পা ফেলা কঠিন হয়ে পড়ল।
"দাদু..."
দাদু চোখ মেললেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত বাড়ালেন।
"তুই ফিরে এলি শেষ পর্যন্ত, সৌম্য।"
সৌম্য দাদুর পাশে বসে তার হাতটা শক্ত করে ধরল। তার গলার স্বর খসখসে হয়ে এসেছে।
"দাদু, আমি... আমি একটা দুর্ঘটনায় জড়িয়ে গিয়েছিলাম। পুলিশ আমাকে ধরে নিয়েছিল। আমি জেলে ছিলাম পাঁচ বছর।"
দিদা পাশ থেকে চিৎকার করে উঠলেন। "জেলে? তুই জেলে ছিলিস? পাঁচ বছর? কেন রে বাবা? তুই তো কোনোদিন কোনো খারাপ কাজ করিসনি!"
সৌম্য মাথা নিচু করল। "একটা পথচারী মারা গিয়েছিল। অনিচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল, তবুও আমাকে সাজা পেতে হয়েছিল।"
দাদু সৌম্যর কাঁধে হাত রাখলেন। তার চোখে জল। "জীবন অনেক কঠিন, দাদু। তুই এখন ফিরেছিস, সেটাই বড়।"
সৌম্যর মনে হঠাৎ এক তীব্র অস্থিরতা এল। সে চারদিকে তাকাল।
"মা কোথায়? মা কি এখানে নেই?"
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে এল। দিদা আর দাদু একে অপরের দিকে তাকালেন। দিদা তার শাড়ির আঁচলে মুখ মুছলেন।
"তোর মা... তোর মা এখানে নেই, সৌম্য।"
সৌম্যর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে সোজা হয়ে বসল। "কোথায়? কী হয়েছে? মা অসুস্থ? হাসপাতালে?"
দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় সোজা হয়ে বসলেন।
"সবকিছু বদলে গেছে, সৌম্য। তুই যখন চলে গেলি, প্রতিমা তোকে অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর নিরাশ হয়ে খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছিল। সে ভেবেছিল তুই আর ফিরবি না। তোর নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে ওর অনেক সময় লেগেছে।"
সৌম্যর মনে হলো তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। "নিখোঁজ? আমি নিখোঁজ হইনি দাদু! আমি এখানে তোমাদের সামনে আছি!"
"আমরা জানি," দিদা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "কিন্তু প্রতিমা জানত না। তারপর... তারপর অনেক কিছু হলো। প্রতিমা আবার মা হয়েছে, বাবা। ওর একটা ছেলে হয়েছে। অর্ণব।"
সৌম্যর কান যেন সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। শব্দগুলো তার মস্তিষ্কে ধাক্কা মারছে।
"ছেলে?" সৌম্যর কণ্ঠস্বর ফিসফিসানির মতো শোনা গেল। "মানে... মায়ের ছেলে? দাদু, আপনি কী বলছেন?"
দিদা কথা চালিয়ে গেলেন, "তুই মুম্বাই যাওয়ার পর জানা যায় যে প্রতিমা গর্ভবতী। আমরা সবাই ভেবেছিলাম এটা তোর বাবার শেষ চিহ্ন। তোর বাবা সুবীর মারা যাওয়ার পর প্রতিমা ওকে একা বড় করার সিদ্ধান্ত নিল। অর্ণব এখন বড় হচ্ছে।"
সৌম্যর মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল শূন্যের দিকে। তার ভেতরে একটা ঝড় শুরু হলো। দাদু-দিদা ভাবছেন এটা তার বাবা সুবীরের সন্তান। কিন্তু সৌম্য জানে সত্যটা। তার বাবা সুবীর মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর আগে। এটা অসম্ভব।
তার মনে পড়ল সেই শেষ রাতগুলো। প্রতিমার শরীর, সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা, আর তাদের নিষিদ্ধ মিলন। সে বুঝতে পারল, অর্ণব তার বাবার নয়, অর্ণব তার নিজের সন্তান। তার এবং তার মায়ের মিলনের ফল।
সৌম্যর বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। ভালোবাসা, অপরাধবোধ আর এক অদ্ভুত অহংকার—সব মিশে এক বিষাক্ত ককটেল তৈরি হলো তার ভেতরে। সে অনুভব করল তার রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে।
"তুই চুপ করে আছিস কেন রে সৌম্য? তুই কি খুব অবাক হয়েছিস?" দিদা জিজ্ঞেস করলেন।
সৌম্যর কথা বেরোচ্ছিল না। সে ভাবল, যদি সে এখন চিৎকার করে বলে যে অর্ণব তার ছেলে, তবে কী হবে? প্রতিমার বর্তমান জীবন? তার সম্মান? সমাজের সামনে এই চরম অপমান সে কীভাবে মেনে নেবে?
দাদু আবার কথা বললেন, "পরে আমরা প্রতিমাকে বোঝালাম বিয়ে করতে। সে প্রথমে রাজি হয়নি, কিন্তু পরিস্থিতি বিচার করে রাজি হলো। ডাঃ অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তার বিয়ে হলো।"
সৌম্যর চোখ ভিজে এল। "বিয়ে? মা... মা বিয়ে করেছে?"
"হ্যাঁ বাবা। অনিরুদ্ধ খুব ভালো মানুষ। সে প্রতিমাকে খুব ভালোবাসে। এখন সে তার স্বামী, ছেলে অর্ণব আর অনিরুদ্ধের মেয়ে নিয়ে সুখে আছে।"
সৌম্যর মনে হলো কেউ তার বুকের ওপর ভারী পাথর বসিয়ে দিয়েছে। সে মাথা নিচু করে রইল। তার ভেতরে একটা চিৎকার দানা বাঁধল—'ওই ছেলে আমার! আমি ওর বাবা!' কিন্তু সেই চিৎকার সে গলাতেই চেপে রাখল। সে জানত, এই সত্য বেরিয়ে এলে প্রতিমার সাজানো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। অর্ণবের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়বে।
"মা... খুশি তো দাদু? মা ভালো আছেন তো?"
সৌম্যর গলায় এখন আর ক্রোধ নেই, শুধু এক গভীর বেদনা।
"হ্যাঁ বাবা, খুব ভালো আছে। অনিরুদ্ধ ওকে খুব যত্ন করে। অর্ণবও তাকে বাবা বলেই জানে। আর অনিরুদ্ধের মেয়ে ঋতুপর্ণা প্রতিমাকে নিজের মা মনে করে। কয়েকমাস আগে তাদের আরও একটি সন্তান হয়েছে, নাম রেখেছে অনন্যা। প্রতিমা এখন তিনটি সন্তান আর স্বামী নিয়ে খুব সুখে আছে।"
সৌম্যর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার আর সেখানে ফেরার কোনো পথ নেই। সে এখন এই গল্পের বাইরের একজন। এক আগন্তুক।
"তবে কি তুই ওকে দেখতে যাবি না?" দাদু জিজ্ঞেস করলেন।
সৌম্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল, "ওনারা কোথায় থাকেন?"
দিদা বললেন, "ব্যারাকপুরে ওদের নিজেদের বাড়ি। বেশ বড় বাড়ি। তুই কি যাবি তাদের কাছে?"
সৌম্য মাথা নাড়ল। "না, দিদা। আমি তাদের বিরক্ত করব না। মা এখন সুখী। আমি চাই না আমার জন্য তার জীবনে আবার অন্ধকার নেমে আসুক। আমি যাব, কিন্তু শুধু একবার। দূর থেকে। নিশ্চিত হতে যে মা ঠিক আছে। তারপর আমি চলে যাব। কোথাও দূরে।"
"দূরে? কোথায় যাবি রে তুই?" দিদা আর্তনাদ করে উঠলেন।
"যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না, দিদা। যেখানে আমি শুধু আমার সাথে থাকব।"
দিদা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সৌম্য আর কিছু বলল না। সে শুধু প্রতিমার ঠিকানাটা জেনে নিল।
পরের দিন সকালে সৌম্য নিউটাউনের সেই ঠিকানায় পৌঁছাল। সে কোনো গেটের ভেতরে ঢুকল না। রাস্তার উল্টো দিকে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। সামনেই একটি সুন্দর ফ্ল্যাট, সামনে ছোট একটা বাগান আর শিশুদের খেলার সরঞ্জাম।
সৌম্যর চোখ গেল সেই ছোট ছেলেটির দিকে। অর্ণব। ছেলেটি সকালের রোদে খেলছে। তার গায়ের রঙ, তার হাসির ধরন—সৌম্যর মনে হলো সে যেন নিজের ছোটবেলার প্রতিচ্ছবি দেখছে। ছেলেটির চোখে সেই একই চঞ্চলতা, যা একসময় সৌম্যর চোখে ছিল।
ঠিক তখনই বারান্দায় এক মহিলা এসে দাঁড়ালেন। প্রতিমা।
সৌম্যর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। মা। পাঁচ বছরে প্রতিমা বদলে গেছেন। মা আগের থেকে অনেক সুন্দরী হয়েছে। তার মুখে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, চোখে এক গভীর আলো। তিনি অর্ণবকে কাছে ডেকে নিলেন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে হাসলেন। সেই হাসিটা সৌম্যর মনে দাগ কেটে গেল। এই হাসির জন্য সে হয়তো সব ত্যাগ করতে পারে।
পাশে এসে দাঁড়ালেন এক ভদ্রলোক। ডাঃ অনিরুদ্ধ। তার এক হাতে তার মেয়ে ঋতুপর্ণা, আর অন্য হাতে প্রতিমার কোমর জড়িয়ে ধরে আছেন। প্রতিমার কোলে একটি সদ্যজাত কন্যা—অনন্যা।
সৌম্য অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর যুদ্ধের দামামা বাজছে। একদিকে তীব্র আকাঙ্ক্ষা—দৌড়ে গিয়ে অর্ণবকে কোলে নিতে ইচ্ছে করছে, মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করছে যে সে ফিরে এসেছে। অন্যদিকে এক চরম দায়িত্ববোধ।
সে জানত, সে যদি আজ সামনে যায়, তবে এই সুন্দর ছবিটা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। প্রতিমা তাকে দেখলেই সব মনে করবেন। সেই অন্ধকার রাত, সেই পাপ, সেই যন্ত্রণা। তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য মা কি তাকে ক্ষমা করবেন? নাকি ঘৃণা করে তাকে তাড়িয়ে দেবেন?
সৌম্যর মনে হলো, ক্ষমা পাওয়াটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো শান্তি। প্রতিমার শান্তি।
সে ধীরে ধীরে পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল। তার পা দুটো যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দূরে। কলকাতার রাস্তা ধরে সে হাঁটছিল, কিন্তু তার মনটা ওই বাগানটার মধ্যেই আটকে ছিল।
"তুই আমার ছেলে, অর্ণব," সে মনে মনে বলল, "কিন্তু তুই আমার নাম জানবি না। তুই শুধু জানবি তোর বাবা তোকে খুব ভালোবাসে, যদিও সে তোর সামনে কোনোদিন দাঁড়াতে পারবে না।"
আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করল। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। সৌম্য মাথা তুলে তাকাল। বৃষ্টির এক ফোঁটা জল তার গাল বেয়ে পড়ল, আর তার সঙ্গে মিশে গেল তার চোখের জল।
সে স্টেশনের দিকে রওনা দিল। তার হাতে এখন কোনো ঠিকানা নেই, কোনো আপন মানুষ নেই। কিন্তু তার মনে এক অদ্ভুত শান্তি। সে জানে তার মা সুখী। তার সন্তান নিরাপদ।
ট্রেনের জানালার পাশে বসে সে বৃষ্টির শব্দ শুনছিল। তার ভবিষ্যৎ এখন তার নিজের হাতে। সে জানে পথটা কঠিন, কিন্তু সে প্রস্তুত। সে আর কোনো মিথ্যে দুর্ঘটনার শিকার হবে না, আর কোনো নিষিদ্ধ ভালোবাসার পেছনে ছুটবে না।
সৌম্য চোখ বন্ধ করল। তার মনে পড়ল তার মা প্রতিমার সেই শেষ হাসিটা। সে মনে মনে বলল, "ভালো থেকো মা। ভালো থেকো আমার ছেলে।"
সৌম্য শিলিগুড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলো। ট্রেনটি যখন শহর ছাড়িয়ে দূরে চলে যাচ্ছিল, সৌম্যর মনে হলো সে তার জীবনের সব বোঝা ওই শহরের বৃষ্টিতে ধুয়ে ফেলে এসেছে। সে এখন মুক্ত। এক নিঃসঙ্গ, কিন্তু মুক্ত মানুষ। ভবিষ্যতে তার মায়ের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাতের আশা নিয়ে চললো শিলিগুড়ির উদ্দেশ্য।