প্রতিমার জীবন সংগ্রামের ইতিকথা - অধ্যায় ২৮
সপ্তবিংশ পর্ব:-
শিলিগুড়ি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নামতেই ভিড়ের ধাক্কাটা সৌম্যর শরীর কাঁপিয়ে দিল। কলকাতার সেই দমবন্ধ করা ভিড় এখানে নেই, কিন্তু এক অদ্ভুত অস্থিরতা আছে। ভাপ ওঠা চায়ের দোকানের গন্ধ আর ট্রেনের হুইসেলের শব্দ মিলেমিশে একাকার। সৌম্যর কাঁধে ঝোলানো পুরনো ব্যাগটা যেন তার অতীতের সব বোঝা বহন করছে।
সে প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে একটা রিকশার সামনে দাঁড়াল।
"দাদা, নিউ টাউনের দিকে যাবেন?" সৌম্যর গলাটা খসখসে।
রিকশাওয়ালা একবার সৌম্যের দিকে তাকাল। তার মুখে ঘন দাড়ি, চোখ দুটো বসা।
"নিউ টাউন? শিলিগুড়িতে নিউ টাউন নেই বাবু। আপনি কি ওই নতুন কলোনীর দিকে যাবেন নাকি শহরের ভেতরে?"
সৌম্য মাথা চুলকাল।
"না, আমি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি। ঠিকানাটা দেখুন।"
রিকশাওয়ালা কাগজটা হাতে নিয়ে মাথা নাড়ল।
"আহা, ওই পুরনো কলোনীর গলির ভেতরে। বসুন, নিয়ে যাচ্ছি।"
রিকশা যখন শহরের সরু গলিগুলোর মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল, সৌম্য বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। শীতের হালকা আমেজ। দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার অস্পষ্ট রেখা। সে মনে মনে হাসল। এই শহরটাই এখন তার শেষ আশ্রয়।
ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে সৌম্য দরজায় কড়া নাড়ল। একজন মাঝবয়সী লোক দরজা খুললেন।
"আপনিই কি সৌম্য বাবু?"
"হ্যাঁ, আমিই। ফ্ল্যাটটা কি একবার দেখতে পারি?"
লোকটি তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। একটা ছোট ঘর, এক কোণে ছোট রান্নাঘর আর একটা বারান্দা।
"ঘরটা পুরনো, কিন্তু পরিষ্কার। আপনি দেখুন।"
সৌম্য বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সামনেই দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। সে জানলাটা খুলে দিল। হিমেল বাতাস তার মুখে এসে লাগল।
"ভাড়া কত বললেন আপনি?"
"মাসে তিন হাজার। তবে অগ্রিম তিন মাস দিতে হবে।"
সৌম্য তার পকেটের টাকাগুলো গুনল। জেলের ভেতরে কিছু ছোটখাটো কাজ করে জমানো ও তার পিতা সুবীরের রেখে যাওয়া টাকা।
"ঠিক আছে। আমি আজই টাকা দিয়ে দিচ্ছি।"
"ঠিক আছে দাদা। আপনার পরিচয়পত্রটার জেরক্স জমা দেবেন।"
সৌম্য যখন তার পরিচয়পত্রটা দিল, লোকটির চোখে এক মুহূর্তের সন্দেহ দেখা দিল।
"পুরুলিয়া থেকে এসেছেন?"
"হ্যাঁ।"
"কি করতে চান এখানে?"
"একটা ছোট দোকান খোলার কথা ভাবছি।"
লোকটি হাসলেন।
"বেশ। এই শহরটা শান্ত। আপনি এখানে শান্তিতে থাকতে পারবেন।"
সৌম্য যখন ঘরে একা হলো, সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রতিমার মুখ। সেই শেষ রাতটা। দাদুর বাড়ি তাকে রেখে যাওয়ার মুহূর্ত।
দিদার কথাগুলো তার কানে বাজতে লাগল— "তোর মা আরেকটা সন্তানের জন্ম দিয়েছে, বাবা। এই সন্তানটি তোর বাবার শেষ চিহ্ন।"
সৌম্যর বুকটা ধক করে উঠল। সে জানত, অর্ণব তার বাবার সন্তান হতে পারে না। তার বাবা সুবীর অনেক আগে মারা গেছেন। অর্ণব তারই রক্ত। তার আর তার মায়ের সেই নিষিদ্ধ মিলনের ফল।
সে চোখ বন্ধ করল। শিলিগুড়ির বাতাসে এখন আর কোনো পুরনো স্মৃতি নেই, শুধু এক নতুন শুরুর গন্ধ।
কয়েকদিন পর শহরের এক ব্যস্ত মোড়ে সৌম্যর স্টেশনারি দোকানটা খুলে গেল। পেন, খাতা, রঙিন পেন্সিল আর কলেজ ব্যাগে ঠাসা ছোট দোকান। দোকানের পাশে একটা চায়ের দোকান। দোকানদার কথা বলায় খুব পটু।
"কি খবর সৌম্য বাবু? আজ দোকানের ভিড় কম মনে হচ্ছে।"
সৌম্য হেসে তাকাল।
"হ্যাঁ কাকু, কলেজগুলো বন্ধ তো, তাই ছাত্ররা কম আসছে।"
"কলকাতার মতো ব্যস্ততা এখানে পাবেন না। তবে এখানকার মানুষগুলো খুব সহজ।"
"ভালোই তো। আমি শান্তিই খুঁজছি।"
"শান্তি? আপনার চোখে তো দেখি অন্য কিছু। কোন রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন আপনি?"
সৌম্যর হাসিটা ম্লান হয়ে গেল।
"কোনো রহস্য নেই কাকু। শুধু জীবনটা একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।"
"এলোমেলো তো সবারই হয়। তবে মানুষ নতুন করে গুছিয়ে নিতে জানে।"
সৌম্য চুপ করে থাকল। সে কাউন্টারে বসে তার ফোনের দিকে তাকাল। প্রতিমার পুরনো নম্বরটা তার মনে গেঁথে আছে। সে একবার ডায়াল করল, তারপর নিজেই কেটে দিল।
"শোনেন সৌম্য বাবু, আপনার ওই দোকানটা আরও একটু বড় করতে পারেন। পাশের ওই খালি জায়গাটা ভাড়া নিতে পারেন।"
"এখন আর টাকা নেই কাকু। আগে যা আছে তা দিয়ে চলতে হবে।"
"ঠিক আছে। তবে মন খারাপ করবেন না। এই পাহাড়ের হাওয়া সব কষ্ট ধুয়ে দেয়।"
একদিন বিকেলে দোকান একদম ফাঁকা। সৌম্য আলমারির একদম নিচে থেকে একটা পুরনো ছবি বের করল। গোলাপি শাড়িতে প্রতিমা। এই ছবিটি তার মায়ের যৌবনকালের ছবি। জেলের অন্ধকার ঘরে এই ছবিটাই ছিল তার একমাত্র আলো।
সে ছবিটার ওপর আঙুল বুলিয়ে নিল।
"মা... তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে?" সে ফিসফিস করে বলল।
ঠিক সেই মুহূর্তে এক কলেজ শিক্ষক দোকানে ঢুকলেন।
"সৌম্য, আমার জন্য দুটো নীল কালি পেন আর একটা ডায়েরি দাও।"
সৌম্য দ্রুত ছবিটা লুকিয়ে ফেলল।
"এই নিন স্যার।"
"কি ব্যাপার সৌম্য, তোমার মন কি আজ অন্য কোথাও?"
"না স্যার, তেমন কিছু নয়।"
রাত হলে সৌম্য যখন তার ফ্ল্যাটে ফিরে আসত, সে বারান্দায় বসে আকাশের তারা দেখত।
"শিলিগুড়ি... তুমি কি আমাকে সত্যিই আশ্রয় দেবে?" সে নিজেকেই জিজ্ঞেস করল।
সময় গড়িয়ে চলল। সৌম্যর দোকান এখন এলাকার পরিচিত। সে ধীরে ধীরে কিছু টাকা সঞ্চয় করল। কিন্তু তার ভেতরে এক গভীর শূন্যতা। মাঝে মাঝে সে জানলার বাইরে তাকিয়ে ভাবত, তার মা প্রতিমা এখন কেমন আছে? অনিরুদ্ধর সাথে তার জীবন কি সত্যিই সুখের?
"মা, তুমি যেখানে থাকো, সুখী থেকো। আর আমিও এখানে সুখে আছি," সে ফিসফিস করে বলল।
এইভাবে এক বছর কেটে যায়। পুরুলিয়ার ছোট্ট সেই স্টেশনারি দোকানটা ধীরে ধীরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে। কলেজের ছেলেমেয়েদের ভিড়, টিফিনের বাক্সের জন্য রঙিন ব্যাগ, স্যার-ম্যাডামদের ডায়েরি—সব মিলিয়ে সৌম্যের একটা রোজনামচা তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে তাকে নিজস্ব কাজে কলকাতায় আসতে হয়। পুরনো হাওড়া ব্রিজ, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া, আর মনের ভেতরে চাপা এক অজানা আকুতি—এসব নিয়েই তার দিন কাটে।
সেদিনও তাই। সকালবেলা হাওড়া পৌঁছে দোকানের জন্য বলপেন, স্কেচপেন, ড্রয়িং খাতা, আর কিছু নতুন ডায়েরি কিনল। বেলা গড়িয়ে দুপুর। ফেরার ট্রেন এখনও তিন ঘণ্টা বাকি। তাই ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে কলেজ স্ট্রিটের পাশ দিয়ে হাঁটছিল। মুখে অপরিষ্কার দাড়ি, চোখে ক্লান্তির ছাপ, গায়ে পুরনো পাঞ্জাবি—একেবারে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া এক মানুষ।
ঠিক তখনই প্রতিমা।
কলকাতা। শহরের ভিড় আগের মতোই। প্রতিমা রোদচশমা পরে ফুটপাতে হাঁটছিল। হাতে শপিং ব্যাগ। আজ সে একটু বেরিয়েছে ছেলেমেয়েদের জন্য ও ঘরের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনতে।
অনিরুদ্ধ কাছে অনন্যাকে বাড়িতেই রেখে এসেছে। ঋতুপর্ণা আর অর্ণব কলেজের কাজে ব্যস্ত, আর ছোট্ট অনন্যা বাবার কোলে খেলা করছে।
হঠাৎ প্রতিমার পা থেমে গেল। তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
কিছু দূরে, ফুটপাতের ধারে এক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। ময়লা জিন্স, পুরনো চেক শার্ট। মুখে ঘন দাড়ি। চোখ দুটো ক্লান্ত, গাল বসে গেছে।
প্রতিমার মনে মনে কথাগুলো ঘুরতে লাগল— "এটা কি হতে পারে? সৌম্য? এত বছর পর?"
সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিন্তু ওই দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ওই চোখের চাহনি... সে নিশ্চিত।
সৌম্য কাউকে দেখছিল না। সে শুধু হাঁটছিল। প্রতিমা নিজেকে সামলে নিল। সে আর কিছু ভাবল না। দূর থেকে চুপচাপ অনুসরণ করল। ভিড়ের মধ্যে সৌম্য ফিরে তাকায়নি। কিছুক্ষণ পর সে একটা সরু গলিতে ঢুকল, যেখানে সারি সারি কমদামি হোটেল। একটা জীর্ণ-শীর্ণ হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে সে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল, তারপর ভেতরে ঢুকে গেল।
প্রতিমা দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন, হাজারটা অভিমান। কয়েক মুহূর্ত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। সিঁড়ির ধারে একটা ছোট্ট রিসেপশন।
প্রতিমার বুক কাঁপছে। সে হোটেলের রিসেপশনে গেল।
"excuse me, ওই যে লোকটা এখন ভেতরে ঢুকল, উনি কোন রুমে গিয়েছেন?"
রিসেপশনিস্ট এক বয়স্ক লোক। সে প্রতিমার দিকে তাকাল।
"আপনার পরিচয় কি?"
"আমি ওনার আত্মীয়। খুব জরুরি কথা আছে।"
লোকটি একবার প্রতিমাকে দেখল, তারপর রেজিস্টার খাতাটা উল্টে বলল, "৩২১ নম্বর রুম। দ্বিতীয় তলায়।"
প্রতিমা কোনো কিছুর দিকে ফিরে তাকাল না। প্রতিমা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। প্রতিটি ধাপ যেন আগুনের মতো গরম। সরু করিডোর, দেয়ালে খোসা ছাড়ানো রং, বাতি একটাও জ্বলছে না। ৩২১ নম্বর ঘরের সামনে গিয়ে সে থামল। কয়েক সেকেন্ড শুধু দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে সাড়া এল, "কে?"
ঠিক সেই মুহূর্তে ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। সৌম্য বেরিয়ে এলো।
দুজনের চোখাচোখি হলো। সৌম্যর চোখ বড় হয়ে গেল।
"মা...?"
প্রতিমা কোনো উত্তর দিল না। সে এক পা এগিয়ে রুমে ঢুকে পড়ল এবং সশব্দে দরজা বন্ধ করল। প্রতিমার হাত উঠে এসে পড়ল তার দু'গালে—ঝনঝন করে দুটো জোরালো থাপ্পড়। সৌম্য নড়লও না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল, যেন সেই মারটুকুই সে বহু দিন অপেক্ষা করে ছিল।
শব্দটা ঘরের নীরবতাকে চিরে দিল।
"তুই আমার জীবন কেন নষ্ট করলি? তুই চলে গেলি মুম্বাই, কোনো খবর দিলি না! তোর পেছনে আমি কী করে বেঁচেছিলাম, তুই কি জানিস?" প্রতিমার কণ্ঠস্বর ভেঙে পড়ল।
সৌম্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকাল।
"এই ছ'বছর আমি কীভাবে কাটিয়েছি, তুই জানিস? জানিস আমার কী অবস্থা ছিল?"
সৌম্যর ঠোঁট কাঁপছে। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কথা বেরোলো না।
"তুই মুম্বাই যাওয়ার পর আমি জানতে পারি যে আমি তোর বাচ্চার মা হতে চলেছি। হ্যাঁ, তোর! আমার নিজের ছেলের বাচ্চা!" প্রতিমা চিৎকার করে উঠল।
সৌম্যর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল।
"আমি কাউকে বলতে পারিনি, সৌম্য। নিজের বাবা-মাকেও না। আমার পেটের সন্তানের বাবা যে আমারই ছেলে—এই কথা আমি কাকে বলতাম, কিভাবে বলতাম সৌম্য? আমার নিজের গলায় এত বড় পাথর বাঁধা ছিল, তবু বেঁচে থেকেছি। তোর জন্যই বেঁচে থেকেছি, ঐ গর্ভের বাচ্চাটার জন্য বেঁচে থেকেছি, ভেবেছিলাম তুই ফিরে আসবি। কিন্তু তুই তো ফিরলি না। আমি নিজের পেটে তোর সন্তানের জন্মের সত্যকে লুকিয়ে রেখেছি। একা সেটা সামলেছি। লজ্জায় মুখ ঢেকেছি।"
সৌম্যর চোখে জল চলে এল।
"আর তুই? তুই এখানে দাড়ি রেখে, নোংরা কাপড়ে, কোনো খোঁজ না দিয়ে এইভাবে ঘুরছিস?"
সৌম্য এবার মাথা তুলল। তার চোখে জল উপচে পড়ল।
"মা, আমি জানতাম না... আমি জানতামই না যে তুমি গর্ভবতী ছিলে।"
"জানতিস না? তুই জানতিস না যে তুই আমাকে কী দিয়ে গেলি?"
সৌম্যর গলাটা ধরে এল।
"আমি তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় জানতাম না যে মুম্বাইয়ে আমার জন্য কী বিপদ অপেক্ষা করছে। প্রথম কয়েক মাস ভালোই চলছিল। ভালো কোম্পানিতে কাজ পেয়েছিলাম।"
"তারপর? তারপর কী হলো?"
"একদিন রাস্তায় একটা দুর্ঘটনা হলো, মা। হঠাৎ ঘটনাক্রমে একজন পথচারী আমার গাড়ির নিচে এসে গেল। আমি কিছু করতে পারিনি। পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করল।"
প্রতিমা অবাক হয়ে তাকাল।
"গ্রেফতার করল? তারপর?"
"পাঁচ বছর, মা। পাঁচটা বছর আমি জেলের ভেতরে কাটিয়েছি। সেই কংক্রিটের দেয়ালের ভেতর আমি শুধু তোমার কথা ভেবেছি। তুমি কি ঠিক আছ? আমি ফোন করে তোমাকে আরো বেশী চিন্তায় ফেলতে চাইনি।
প্রতিমা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিমার চোখ আবার ভিজে উঠল। এবার রাগ নয়, বুক ফেটে যাওয়ার মতো ব্যথা। সে কাছে গিয়ে ছেলের সামনে নত হয়ে বলল, "পাঁচ বছর? তুই এই পাঁচ বছর জেলে ছিলি? আর আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে ভুলে গেছিস, আমার জন্য কোনো ভাবনা নেই তোর..."
"প্রতিদিন ভাবতাম। কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। জেল থেকে বেরিয়ে ফোন করলাম, নম্বর বন্ধ। মুম্বাইয়ে থেকে যখন কলকাতায় এলাম, দাদু-দিদার কাছ থেকে জানলাম তুমি আবার বিয়ে করেছ, তুমি সুখে আছো। তোমার নতুন জীবন শুরু হয়েছে। তখন ভেবেছিলাম—আর কোনো দরকার নেই। তুমি সুখে থাকো, প্রয়োজনে আমি দূরে থাকি। "
"তুই জানতিস আমি নতুন জীবন শুরু করেছি?"
"হ্যাঁ। দাদু-দিদার থেকে সব শুনলাম। তুমি ডঃ অনিরুদ্ধর সাথে সুখী। অর্ণব তোমাদের সাথে সুখে আছে।"
"তাহলে তুই কেন সামনে আসলি না?"
"আমি তোমার শান্তি নষ্ট করতে চাইনি, মা। আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে সবকিছু জানিয়ে তোমার সংসার ভেঙে দেওয়া ঠিক হবে না। তাই আমি চলে গেছি শিলিগুড়িতে। একটা ছোট দোকান খুলেছি। নিজের মতো করে বেঁচে আছি।"
সৌম্যর কথাগুলো প্রতিমার মনে তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ল।
"প্রতিটা দিন তোমার কথা মনে পড়ে, মা। প্রতিটা রাতে তোমার কথা ভেবে কাটে।"
প্রতিমার হাঁটু ভেঙে এল। সে বিছানার ধারে বসে পড়ল। কান্না চেপে রাখতে পারল না।
সৌম্য তার সামনে নত হয়ে বসল।
"মা, আমি জানি তুমি কী কষ্ট পেয়েছ। আমি জানি। কিন্তু আজ যে তুমি এখানে এসেছ... এটা আমার জন্য অনেক বড়। আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে আর কোনোদিন দেখতে চাইবে না।"
প্রতিমা হাত বাড়িয়ে সৌম্যের দাড়ি স্পর্শ করল। তার আঙুল কাঁপছে।
"তোর চেহারা... কতটা বদলে গেছে। তোর বয়স তো তিরিশও হয়নি, কিন্তু তুই এক বুড়োর মতো দেখাচ্ছিস।"
"জেলে শরীর আর মন দুটোই ভেঙে গিয়েছিল, মা।"
"সৌম্য—তোর জন্য আমার মন ভেঙে গেছে। এই ছ'বছর আমি ভেবেছি তুই আমাকে ভুলে গেছিস। কোনো দায়িত্ব নিতে চাসনি। কিন্তু এখন জানলাম তুই জেলে ছিলি।"
প্রতিমা মাথা নাড়ল। তার চোখে এখন আর ঘৃণা নেই, শুধু এক গভীর মায়া।
"তবে এখন থেকে আর লুকিয়ে থাকা নয়। তুই আমার ছেলে, সৌম্য। যাই হোক না কেন।"
"মা, তুমি কি সত্যিই আমাকে ক্ষমা করেছ?"
প্রতিমার শরীর কেঁপে উঠল। সে সৌম্যের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দু'হাতে তার মলিন মুখটা ধরে বলল, "তুই আমার ছেলে। তুই যত বড় ভুল করিস। আর আমিও—আমার অতীত নিয়ে এখন আর লজ্জিত নই। যেটা হয়েছে, হয়ে গেছে। এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে, একসঙ্গে।"
সৌম্যর চোখে প্রথমবারের মতো এক টুকরো আলো দেখা দিল।
প্রতিমা দাঁড়াল। তার মুখটা শান্ত।
"তুই এখন কলকাতায় আছিস কিছুক্ষন। পরে তুই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবি দাদুর বাড়িতে।"
"দাদু-দিদা কি মেনে নেবে যদি আমি আবার তোমার সঙ্গে দেখা করি?"
"তারা তোকে ভালোবাসে। তুই তাদের নাতি ও আমার ছেলে, তাঁরা কিছু বলবেন না, কারন আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার তোর পুরো অধিকার আছে।"
সৌম্য মাথা নিচু করে হালকা হাসল।
"ঠিক আছে, মা। এবার তোমায় আর কষ্ট দেব না।"
প্রতিমা তাকে জোরে জড়িয়ে ধরল। অনেকক্ষণ ধরে। ঘরের নীরবতা ভেঙে শুধু তাদের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সৌম্যর কাঁধে মুখ লুকিয়ে প্রতিমা নিঃশব্দে কাঁদল—ছেলের জন্য, নিজের জন্য, আর ওই হারানো বছরগুলোর জন্য।
বাইরে কলকাতার রাস্তার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। শহরটা যেন আজ তাদের দুজনের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অশ্রু ভাগ করে নিচ্ছিল।
সৌম্য প্রতিমার বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, "আমি তোমাকে খুব মিস করেছি, মা।"
প্রতিমা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
"আমিও তোকে মিস করেছি, পাগল। এখন আর কোথাও যাস না।"
"আমি শিলিগুড়িতে দোকান রেখে এসেছি, মা। তবে তোমার কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হতো।"
"দোকানটা কেমন চলে? ভালো চলে?"
"হ্যাঁ, মোটামুটি চলে। কিছু টাকা জমিয়েছি।"
সৌম্য মাথা নাড়ল। সে জানত, অর্ণবের সামনে তার পরিচয় দেওয়া সহজ হবে না, কিন্তু প্রতিমার সাথে এই মিলন তাকে এক নতুন জীবন দিল।
"মা, অর্ণব কি আমাকে চিনবে?"
"সে তো ছোট। সে তোকে তার বড় ভাই হিসেবে জানবে। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে, আমি অর্নবের কাছে তোকে কোনোদিন তার বাবা হিসেবে পরিচয় দিতে পারবোনা।"
সৌম্যর মুখে একটা চিন্তার ছাপ এলো। সে জানত, জীবনটা খুব জটিল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আজ সেই জটিলতার গিঁটটা একটু আলগা হলো।
প্রতিমা তাকে আরও একবার জড়িয়ে ধরল।
"চল, এখান থেকে বের হই। এই হোটেলের ঘরটা খুব দমবন্ধ লাগছে।"
সৌম্য হাসল।
"হ্যাঁ মা, চলো। আমি তোমার সাথে হাঁটতে চাই।"
তারা দুজন যখন হোটেল থেকে বের হলো, বাইরের আকাশটা পরিষ্কার হয়ে এসেছিল। কলকাতার ভিড় আর শব্দ এখন আর প্রতিমার কাছে অসহ্য মনে হচ্ছিল না। কারণ তার পাশে তার ছেলে ছিল।
সৌম্যর দিকে তাকিয়ে প্রতিমা ভাবল, অন্ধকার রাত শেষ হয়, আলো আসে। তাদের জীবনেও সেই আলোর ভোর এসেছে।
"সৌম্য," প্রতিমা ডাকল।
"বলো মা।"
"তুই আর কোনোদিন নিজেকে একা ভাববি না।"
সৌম্যর চোখে জল এল, কিন্তু এবার তা সুখের জল। সে প্রতিমার হাতটা শক্ত করে ধরল।
"আমি জানি, মা। আমি জানি।"
কিছুক্ষন পর সৌম্য বলল, "মা, তুমি এখন বাড়ি যাও। এই হোটেল, এই এলাকা—চেনা কেউ দেখে ফেললে তোমাকে নিয়ে বাজে কথা ছড়াবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, যত তাড়াতাড়ি পারি দাদুর বাড়িতে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করব।"
এই কথা শুনে প্রতিমা মনে একটা ব্যাথা অনুভব করলো। কিন্তু তবুও নিরুপায় হয়ে প্রতিমা সৌম্যকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো ও সৌম্য ষ্টেশনের উদ্দেশ্য রওনা দিলো। তারা দুজন ধীরে ধীরে ভিড়ের মাঝে মিশে গেল, কিন্তু এবার তারা আলাদা হয়ে গেল, নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।