মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ২৭
উনবিংশ অধ্যায়
ডক্টর বাগচীর দেওয়া দেওয়া সেই অনৈতিক প্রস্তাব আর তারপর তার সাথে বিদিশার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পরে একটা গোটা সপ্তাহ কেটে গেছে।
এই মুহূর্তে কলেজের দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ করিডোর দিয়ে বিদিশা প্রিন্সিপালের ঘরের দিকে এগোচ্ছেন, তাঁর পরনের কালো বর্ডারের ছাই-রঙা হ্যান্ডলুম শাড়িটা যেন তাঁর গুমোট মানসিক অবস্থার মূর্ত প্রতিচ্ছবি।
বাইরে নির্লিপ্ততার মুখোশ পড়ে থাকলে কী হবে, গত সপ্তাহের স্মৃতি এখনো তার মনের অন্দরে ভাঙা কাঁচের টুকরোর মতো গেঁথে আছে। চাইলেও তিনি সেটা উপেক্ষা করতে পারছেন না।
হাঁটতে হাঁটতেই তাঁর চোখের সামনে সিনেমার ফ্রেমের মতো গত সপ্তাহে প্রিন্সিপালের অফিসের সেই নাটকীয় মুহূর্তগুলো আবার ভেসে উঠল।
[ফ্ল্যাশব্যাক]
ডক্টর বাগচীর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক পরের দিনই প্রিন্সিপালের অফিস থেকে বিদিশার ডাক পড়েছিল। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তাকে প্রভাবশালী স্টুডেন্টদের ফেল করানোর ইস্যুতেই জবাবদিহি করতে হবে।
বিদিশা মানসিক ভাবে পুরোপুরি তৈরি হয়েই প্রিন্সিপালের অফিসে ঢুকেছিলেন। তার ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর একটা সাদা কাগজে লেখা ইস্তফাপত্র রেডি ছিল। আত্মসম্মানে সামান্যতম আঘাত লাগলে তিনি এক সেকেন্ডও ভাববেন না, সোজা প্রিন্সিপালের মুখের উপর ইস্তফার কাগজটা ছুড়ে দিয়ে এই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসবেন। এমনটা ভেবেই তিনি প্রিন্সিপালের অফিসে পা রেখেছিলেন।
কিন্তু প্রিন্সিপাল সান্যালের ঘরে ঢোকার পর যা ঘটল, তার জন্য তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না।
"মিস গাঙ্গুলি, প্লিজ হ্যাভ আ সিট", প্রিন্সিপাল সান্যাল অত্যন্ত উষ্ণ হাসির সাথে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন।
বিদিশা একটু সতর্ক হয়ে চেয়ারে বসলেন।
প্রিন্সিপাল হাসছেন ? ডক্টর বাগচী কি তবে কালকের ঘটনাটা ওনাকে জানাননি?
প্রিন্সিপাল ডক্টর বাগচীর প্রসঙ্গে ধারকাছ দিয়েও গেলেন না। বরং একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, "ম্যানেজমেন্ট, আপনার কালচারাল ফেস্টের বাজেটিং আর যে ডেডিকেশন নিয়ে আপনি কাজটা করেছেন, তাতে অত্যন্ত ইমপ্রেসড। কোনো এক্সট্রা খরচ হয়নি এবং স্পনসরশিপের টাকাও এত নিখুঁতভাবে ইউটিলাইজ করা হয়েছে যে অডিটররা আপনার প্রশংসা করেছেন। আপনি সত্যিই খুব দক্ষভাবে কাজটা সামলেছেন। এত কম বয়সে এমন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দক্ষতা সত্যিই বিরল।"
বিদিশা নিজের বিস্ময়টা আপ্রাণ চেষ্টায় গিলে ফেললেন। একটা প্রফেশনাল হাসি ধরে রেখে বললেন, "থ্যাংক ইউ, স্যার। আই ওয়াজ জাস্ট ডুইং মাই জব।"
কথাটা শেষ হওয়ার পর গোটা ঘরে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। বিদিশা অনুভব করলেন, তার ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর রাখা ইস্তফাপত্রটা এক নিমেষেই গুরুত্বহীন একটা সাধারণ কাগজে পরিণত হয়েছে। যে সম্ভাব্য শাস্তির খাঁড়া বা অপমানের মুখোমুখি হবার প্রস্তুতি নিয়ে তিনি অফিসে ঢুকেছিলেন, তার বদলে প্রশংসার এই বর্ষণ তাঁকে এক অদ্ভুত স্বস্তি দিল। তাঁর মেরুদণ্ডের সেই টানটান উত্তেজনাটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল।
তবে তিনি অসতর্ক হলেন না। বরং নিজের মুখে গাম্ভীর্যের মুখোশটা আরো মজবুতভাবে এঁটে নিলেন। অয়নকে নিয়ে যে প্রশ্নটা ছুটি কাটিয়ে কলেজে ফেরার পর থেকে তাঁর মনের অন্দরে কাঁটার মতো বিঁধছিল, সেটাকে অত্যন্ত সুকৌশলে বাইরের আবহে মুক্তি দিলেন তিনি।
নিজের কভার পুরোপুরি অটুট রেখে বিদিশা অত্যন্ত ক্যাজুয়াল, প্রায় গুরুত্বহীন গলায় একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন:
"বাই দ্য ওয়ে স্যার, ফার্স্ট ইয়ারের অয়ন চ্যাটার্জী... ও গত কয়েকদিন ধরে আমার ক্লাসে অ্যাটেন্ড করছে না। ওর সাসপেনশন তো উঠে গেছে তাই না?"
সেদিন ব্যাকস্টেজে অয়নকে তিনি নিজের জীবন থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু, তার অবচেতন মন কোনদিন কল্পনা করেনি যে সেজন্য ছেলেটা তার ক্লাসে আসা ছেড়ে দেবে! অয়ন তো পড়াশোনায় কোনোদিন খারাপ ছিল না। জেদের বশে ছেলেটা কী এবার নিজের ভবিষ্যতটা জলাঞ্জলি দেবে ?
কঠোর শিক্ষিকা আর মমতাময়ী মা, ফেস্টের আগে থেকে বিদিশার ভেতরে এই দুই সত্তার মধ্যে যে অদৃশ্য টানাপোড়েনটা শুরু হয়েছিল, সেই দ্বন্দ্বে মাতৃসত্তা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিল।
একজন কড়া শিক্ষিকা হিসেবে ফেস্টের রাতের মারপিটের পরে অয়নের অনুপস্থিতিটা তার কাছে একান্তই কাঙ্ক্ষিত হবার কথা। যে ছাত্র তাঁর সামাজিক সম্মানকে এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, ক্লাসে তার শূন্য স্থান বিদিশার জন্য এক ধরনের স্বস্তি বয়ে আনার কথা।
কিন্তু, সে যখন তার নিজের ছেলে, তখন একজন মায়ের মন কী কখনো পেশাদারিত্বের নিয়ম মেনে শান্ত হতে পারে ? তার মাতৃসত্ত্বা ক্লাসে অয়নের এই অনুপস্থিতি মেনে নিতে পারছিল না।
তিনি ঠিক করেছিলেন যে সুযোগ এলে ব্যাপারটা নিয়ে প্রিন্সিপাল সান্যালের সাথে প্রফেশনাল গ্রাউন্ডে কথা বলবেন। আজ সুযোগ পেয়ে তিনি তার সদ্ব্যবহার করতে ছাড়লেন না।
প্রিন্সিপাল সান্যাল চশমাটা খুলে একটু কেশে নিয়েছিলেন।
"ওহ, অয়ন? হ্যাঁ, ওর সাসপেনশন তো উইথড্র করা হয়েছে।
"তাহলে ও ক্লাসে আসছে না কেন স্যার?" বিদিশা ভ্রু কুঁচকে বললেন।
"আমি ফার্স্ট ইয়ারের অ্যাটেনডেন্স দেখছিলাম। অয়ন চ্যাটার্জী ফেস্টের পর থেকে আমার প্রতিটি ক্লাসে অ্যাবসেন্ট। ও এমনিতেই একটা ক্রিমিনাল অফেন্স করেছে, তার ওপর ক্লাসে না এলে তো ও ফেল করবে। আমি ওকে কোনো স্পেশাল ফেভার করতে রাজি নই।"
প্রিন্সিপাল সান্যাল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর একটু অপ্রস্তুত হেসে বললেন,
"ওহ, মিস গাঙ্গুলি। আমি আসলে আপনাকে ব্যাপারটা ইনফর্ম করতে ভুলে গিয়েছিলাম। অয়ন চ্যাটার্জী আপনার ক্লাসে অ্যাবসেন্ট নয়। ওকে আসলে আপনার ক্লাস থেকে রিমুভ করে অন্য সেকশনে, মিস্টার দাসের ক্লাসে ট্রান্সফার করা হয়েছে।"
বিদিশার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। এক ঝটকায় যেন তার চারপাশের বাতাসটা ভারী হয়ে এল।
"ট্রান্সফার করা হয়েছে? মানে? আমার কনসেন্ট ছাড়া?"
বিদিশার গলার স্বরে চরম বিস্ময় এবং প্রচ্ছন্ন অপমানের সুর।
প্রিন্সিপাল একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। গলার স্বর মোলায়েম করে বললেন, "মিস গাঙ্গুলি, প্লিজ ডোন্ট টেক ইট পার্সোনালি। এটা ম্যানেজমেন্টের একটা 'ক্লিন-আপ' ডিসিশন। প্রথমত, সেদিন ফেস্টের পর আপনার এবং বিক্রমের সাথে অয়নের যা ইনসিডেন্ট হলো, তারপর ওকে আপনার ক্লাসে রাখলে একটা বিশ্রী পরিবেশ তৈরি হতো। স্টুডেন্টদের মধ্যে নানা গসিপ চলত। আমরা চাইনি আপনার মতো একজন রেসপেক্টেড টিচার কোনো অস্বস্তিতে পড়ুন।"
বিদিশার হাত দুটো কোলের ওপর শক্ত হয়ে মুঠি পাকিয়ে গেল।
"আর দ্বিতীয়ত" প্রিন্সিপাল বলতে লাগলেন,
"অয়ন আমাদের কলেজের ফুটবল টিমের প্লেয়ার। স্পোর্টস ডিপার্টমেন্ট থেকে কোচ সেনগুপ্ত ওর জন্য স্পেশাল প্র্যাকটিসের রিকোয়েস্ট করেছেন। আপনার অ্যাডভান্সড ম্যাথমেটিক্সের ক্লাসগুলো বেশ টাফ আর আপনার অ্যাটেনডেন্সের নিয়মও খুব কড়া। স্পোর্টসের জন্য ওকে অনেক ক্লাস কামাই করতে হবে, যেটা আপনি অ্যালাও করবেন না। তাই সবদিক ভেবেই ওকে মিস্টার দাসের সেকশনে দেওয়া হয়েছে। ওখানে পড়াশোনার প্রেশারটা একটু কম।"
বিদিশার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। প্রিন্সিপালের কথাগুলো তাঁর মাথায় ঠিকমতো ঢুকছিল না।
তার মাথায় কেবল একটা কথাই ঘুরছিল, অয়নকে তার ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আর সে এতে কোনো আপত্তি জানায়নি ! যে ছেলেটা তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখত, সে এত সহজে মিস্টার দাসের ক্লাসে চলে যেতে রাজি হয়ে গেল?
তার মানে, ও আর সত্যিই তার কাছে থাকতে চাইছে না।
এই চিন্তাটা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিদিশার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল।
প্রিন্সিপাল একটু হাসলেন।
"এনিওয়ে, আপনি এবার নিশ্চিন্তে আপনার ক্লাসে ফোকাস করুন আর শুনলাম বিক্রম নাকি আপনার বাজেটের কাজগুলো খুব চমৎকারভাবে সামলেছে?"
বিদিশা যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ... এক্সকিউজ মি স্যার। আমার একটা ক্লাস আছে।"
প্রিন্সিপালের রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর পুরো করিডোরটা তার কাছে হঠাৎ করে ভীষণ ফাঁকা আর বড় বলে মনে হচ্ছিল। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল তার পা দুটো যেন সিসার মতো ভারী হয়ে উঠেছে।
অয়নকে তিনি তার থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু ছেলেটাকে আক্ষরিক অর্থেই তার চোখের সামনে থেকে, এভাবে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হবে, এটা বিদিশার মাতৃসত্তা মেনে নিতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন কাঁচি দিয়ে তার অস্তিত্বের একটা বড় অংশ কেটে বাদ দিয়ে দিল।
[বর্তমান সময়]
হাঁটতে হাঁটতে বিদিশা একটা ধীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গত সপ্তাহে সব কটি বিষয়ের ইন্টারনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে, কিন্তু অয়নের ফলাফল কেমন হয়েছে, সেটা তিনি জানতে পারেননি। ফেস্টের সেই রাতের পর প্রায় দুই সপ্তাহ কাটতে চলল, এই বারোদিনে অয়ন একবারের জন্যও তার সাথে কোন যোগাযোগ করেনি। তারপর থেকে তিনি ওকে মেইন বিল্ডিংয়ের আর কোথাও দেখতে পাননি।
ফেস্টের পরে ছেলেটা যেন স্বেচ্ছায় কোন এক অচেনা গ্রহের বাসিন্দা হয়ে গেছে।
মনের অগোছালো ভাবনাগুলো এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে বিদিশা প্রিন্সিপালের ঘরের দরজায় মৃদু নক করলেন।
"কাম ইন", ভেতর থেকে প্রিন্সিপাল সান্যালের গলা ভেসে এল।
প্রিন্সিপাল সান্যালের গলার স্বরটা বিদিশার রোজকার মতো স্বাভাবিক মনে হল না।
তিনি ভেতরে ঢুকলেন। ঘরের ভেতরের আবহাওয়াটা তাকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দিল।
প্রিন্সিপাল সান্যালের ঘরের পরিবেশটা আজ অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বিশাল ঘরটায় সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা হাওয়া সত্ত্বেও দমবন্ধ করা একটা আবহাওয়া। বাতাসে একটা লেমন-গ্রাস রুম ফ্রেশনারের গন্ধ থাকলেও বিদিশার আজকে ঘরের গুমোটভাবটা সেদিনের চেয়েও অনেক বেশি বলে মনে হল।
প্রিন্সিপাল সান্যাল তার বিশাল ডেস্কের ওপাশে আনমনা অবস্থায় বসে আছেন। তার ডেস্কের একপাশে ফাইলের স্তূপ, সামনে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা খোলা, তার পাশে একটা ফাইল আর একটা অর্ধেক খাওয়া কফির কাপ। মানুষটাকে আজ ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তার চোখের নিচে কালচে ছাপ, টাইয়ের নটটা সামান্য আলগা করা, যেন একটা বিশাল ঝড়ের মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন।
"গুড আফটারনুন, স্যার। আপনি ডেকেছিলেন?"
প্রিন্সিপাল সান্যাল চমকে মুখ তুললেন। বিদিশাকে দেখে তিনি জোর করে একটা হাসি মুখে আনার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বিদিশার চোখে সেই হাসিটা আজ বড় ম্লান ঠেকল।
"আসুন মিস গাঙ্গুলি। প্লিজ হ্যাভ এ সিট।"
বিদিশা একটু সতর্ক হয়ে ডেস্কের সামনের লেদার চেয়ারটায় বসলেন। প্রিন্সিপাল সান্যাল নিজের চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। দুই হাতের আঙুলগুলো দিয়ে নিজের কপালের দু-পাশটা ঈষৎ চেপে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"মিস গাঙ্গুলি, আজ আপনাকে কোনো রুটিন কাজের জন্য ডাকিনি। কলেজ একটা চূড়ান্ত ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমার এই মুহূর্তে এমন একজনকে দরকার যার নার্ভ খুব স্ট্রং এবং যার লিডারশিপ আর ম্যানেজমেন্ট স্কিলের উপর আমি চোখ বুজে ভরসা করতে পারি।"
প্রিন্সিপাল সান্যাল সরাসরি পয়েন্টে এলেন।
বিদিশার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
"ক্রাইসিস? আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, স্যার।"
প্রিন্সিপাল সান্যাল ফাইলটা খুলে সেটা থেকে একটা সরকারি লেটারহেড বের করে আনলেন।
"আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমাদের কলেজ গত কয়েক বছর ধরে 'ডিমড ইউনিভার্সিটি' স্ট্যাটাস পাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এই স্ট্যাটাসটা পেলে কলেজের রেপুটেশন, প্রেস্টিজ সবকিছু একধাক্কায় অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।"
বিদিশা মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ স্যার, আমি শুনেছি।"
"এই স্ট্যাটাসটা পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো NAAC-এর গ্রেডিং", প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বরে উদ্বেগের সুর স্পষ্ট।
তিনি কথা বলতে বলতে ফাইলটা বিদিশার দিকে এগিয়ে দিলেন।
"ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন এবং ন্যাক-এর 'পিয়ার টিম'-র আমাদের কলেজ পরিদর্শনে আসার কথা ছিল আগামী বছর মার্চ মাসে। আমাদের হাতে অনেকটা সময় ছিল। কিন্তু গতকাল বিকেলে ন্যাক-এর অফিস থেকে হঠাৎ একটা নোটিশ এসেছে। কোনো অজ্ঞাত কারণে তারা তাদের ভিজিটের শিডিউল প্রি-পোন করেছে। তারা মার্চে নয়, আগামী জানুয়ারি মাসের সেকেন্ড উইকেই কলেজ ভিজিটে আসছেন! জাস্ট আউট অফ নো হোয়্যার!"
বিদিশার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। যেকোন অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যাক ভিজিট একটা জীবন-মরণ সমস্যা। কিন্তু এর সাথে ডিমড ইউনিভার্সিটি স্ট্যাটাসের কী সম্পর্ক?
"ন্যাকের রুল অনুযায়ী, একটা 'এ প্লাস' (A+) গ্রেড আমাদের পেতেই হবে আর এই গ্রেডিংয়ের সবচেয়ে ভাইটাল পার্ট হলো 'ক্রাইটেরিয়ন থ্রি' - রিসার্চ, ইনোভেশনস অ্যান্ড এক্সটেনশন। অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল সমৃদ্ধ না হলে ওরা আমাদের ডিমড ইউনিভার্সিটি স্ট্যাটাসের অ্যাপ্লিকেশন শুরুতেই খারিজ করে দেবে।"
প্রিন্সিপাল সান্যালের গলাটা এবার আরও ভারী শোনাল।
"ক্রাইটেরিয়ন থ্রি' হল ন্যাক গ্রেডিংয়ের সবচেয়ে ভাইটাল পার্ট। এই স্কোরটা বাড়ানোর জন্যই আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে আমরা একটা 'ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম' হোস্ট করার প্ল্যান করেছিলাম। দেশের নামকরা সব ম্যাথমেটিশিয়ানদের আসার কথা। কিন্তু ন্যাক ভিজিট জানুয়ারিতে এগিয়ে আসায়, আমাদের বাধ্য হয়ে এই ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামটাও প্রি-পোন করতে হচ্ছে। ইভেন্টটা আমাদের ডিসেম্বরের সেকেন্ড উইকে অর্গানাইজ করতে হবে। অর্থাৎ, হাতে সময় আছে আঠারো দিন। নইলে আমাদের অ্যাকাডেমিক স্কোর আবার এক ধাক্কায় অনেকটা নিচে নেমে যাবে। ডিমড ইউনিভার্সিটির স্বপ্নটা এই বছরের মতো শেষ হয়ে যাবে।"
বিদিশা মনে মনে দ্রুত হিসেব কষতে শুরু করলেন। আঠারো দিন মানে ৪৩২ ঘন্টা। একটা ন্যাশনাল লেভেলের ইভেন্ট, যেখানে সারা দেশ থেকে ডেলিগেটরা আসবেন, সেটার ডেট দুমাস এগিয়ে এনে মাত্র আঠারো দিনের নোটিশে নামানো? এটা এক প্রকার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বললেও কিছুই বলা হয় না!
"এই ইভেন্টের কো-অর্ডিনেটর ছিলেন সিনিয়র প্রফেসর শুভেন্দু বোস।"
কথা বলতে বলতে প্রিন্সিপালের মুখে চিন্তার রেখাগুলো আরও গাঢ় হয়ে উঠলো।
"কিন্তু, শুভেন্দুবাবুর তিন দিন আগে একটা মাইল্ড হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে। উনি এখন হসপিটালাইজড। আগামী এক মাস ডাক্তার ওনাকে সম্পূর্ণ বেড-রেস্টে থাকতে বলেছেন। এই ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনে পুরো ইভেন্টটা এখন অথৈ জলে।"
প্রিন্সিপাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলের স্তূপ থেকে বেশ কয়েকটা মোটা, অগোছালো ফাইল বের করে আনলেন।
"ডক্টর বোস অসুস্থ হবার আগে ইভেন্টের একটা খসড়া বা একটা প্রাথমিক কাঠামো বানিয়ে গিয়েছিলেন। আপাতত আমাদের কাছে যেটা আছে সেটা হলো, দেশ-বিদেশের আমন্ত্রিত অতিথিদের একটা প্রাথমিক তালিকা এবং তাঁদের কয়েকজনকে পাঠানো মেইল। কিন্তু মুশকিল হলো, সেমিনারের ডেট দুমাস এগিয়ে আসায় সেই পুরো শিডিউলটা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।"
প্রিন্সিপাল একটা নীল রঙের ফাইল বিদিশার দিকে এগিয়ে দিলেন।
"কাজটা এখন অনেকটা পাহাড় সমান, মিস গাঙ্গুলি। প্রথমত, আমাদের প্রায় সত্তরজন ডেলিগেটকে ব্যক্তিগতভাবে মেইল এবং ফোন করে এই নতুন শিডিউলে তাঁদের সম্মতি নিতে হবে। তাঁদের ফ্লাইটের টিকিট রি-বুকিং আর ডিসেম্বরের পর্যটন মরসুমে কলকাতার কোনো ভালো ফাইভ-স্টার হোটেলে এই অল্প সময়ে ব্লকে অন্তত পঁচিশটা রুম কনফার্ম করা, এটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয়ত, আমাদের কাছে সারা দেশ থেকে প্রায় তিনশো রিসার্চ পেপার জমা পড়েছে। ডক্টর বোস সেগুলো স্ক্রিনিং করা শুরু করতে পারেননি। এই অল্প সময়ে আমাদের অ্যাকাডেমিক প্যানেলকে দিয়ে পেপারগুলো শর্টলিস্ট করে অ্যাবস্ট্রাক্ট বুক ছাপাতে হবে। এছাড়া ভেন্ডারদের সাথে নতুন করে রেট নেগোশিয়েশন, অডিটোরিয়ামের টেকনিক্যাল সেটআপ আর লজিস্টিকস... সবকিছুই এখন একটা 'লুজ এন্ড'-এ ঝুলে আছে।"
প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু থেমে সরাসরি বিদিশার চোখের দিকে তাকালেন। তার সেই দৃষ্টিতে একজন প্রশাসকের আদেশের চেয়ে একজন মরিয়া মানুষের অনুরোধ বেশি স্পষ্ট ছিল।
"মিস গাঙ্গুলি, কালচারাল ফেস্টে আমি আপনার ম্যানেজমেন্ট স্কিল, আপনার ক্রাইসিস হ্যান্ডলিং এবং আপনার নিখুঁত ডেডিকেশন দেখেছি। আপনি যেভাবে কোনো এক্সট্রা খরচ না করে, স্পনসরশিপের টাকা ইউটিলাইজ করে ফেস্ট উতরে দিয়েছেন, তাতে আমরা আপনার কাজে অত্যন্ত ইমপ্রেসড।
আমি জানি কাজটা এই আঠারো দিনে করা হিউম্যানলি অলমোস্ট ইম্পসিবল। কিন্তু ডক্টর বোস ফাইলগুলো যেভাবে ক্যাটাগরাইজ করে রেখে গেছেন, তাতে আপনি যদি আজ থেকে কো-অর্ডিনেশন শুরু করেন, তবে জটগুলো একে একে খোলা সম্ভব। আপনার শুধু প্রয়োজন একটা শক্ত টিম আর নিখুঁত টাইম ম্যানেজমেন্ট। আমি জানি আপনি এটা পারবেন।
আমি চাই, আপনি এই ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামের 'লিড কো-অর্ডিনেটর'-এর দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিন।"
প্রস্তাবটা শুনে বিদিশা একটা জোর ধাক্কা খেলেন।
তিনি একজন শিক্ষিকা, কোনো প্রফেশনাল ইভেন্ট ম্যানেজার নন। যেরকম অনুষ্ঠান আয়োজনের গুরুদায়িত্ব প্রিন্সিপাল তার ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন সেটা সামলানোর মতো অভিজ্ঞতা বা মানসিক প্রস্তুতি কোনটাই তাঁর নেই।
তার উপর এই সামান্য কটা দিনের নোটিশে এত বড় একটা ইভেন্ট নামানো অসম যুদ্ধের সমান।
তাছাড়া, একটা ন্যাশনাল লেভেলের সিম্পোজিয়াম আর কলেজের ফেস্ট এক জিনিস নয়। ফেস্ট কলেজের নিজস্ব ইভেন্ট, সেখানে সিম্পোজিয়াম জাতীয় স্তরের ইভেন্ট। সেখানে বাইরে থেকে গেস্টরা আসবেন। সামান্য একটা ফ্লাইট মিস বা অ্যাকোমোডেশন নিয়ে গেস্টরা একটু অসন্তোষ প্রকাশ করলে কলেজের রেপুটেশন মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যাবে। আর সেই বিপর্যয়ের সমস্ত দায়ভার এসে পড়বে বিদিশার ঘাড়ের ওপর।
তিনি সবেমাত্র এই কলেজে পা রেখেছেন। শুরুতেই যদি এমন কালির দাগ লাগে তবে তার কেরিয়ার শুরু হতে না হতেই ধুলোয় মিশে যাবে।
বিদিশার ফর্সা মুখে একটা সূক্ষ্ম দ্বিধার রেখা ফুটে উঠল। তিনি প্রিন্সিপালকে সরাসরি 'না' বলে চটাতে চান না, আবার বিনাবাক্যে এই আত্মঘাতী দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিতে চাইছেন না।
"স্যার... ইটস আ হিউজ রেসপন্সিবিলিটি", বিদিশা অত্যন্ত সতর্কভাবে মেপে মেপে কথাগুলো বললেন। তার গলার স্বরে বিনয় থাকলেও তাতে একটা প্রচ্ছন্ন সতর্কতার সুর ফুটে উঠল।
"আপনি আমার ওপর ভরসা রাখছেন, তার জন্য আমি গ্রেটফুল। কিন্তু, আমার এর আগে এত বড় অ্যাকাডেমিক ইভেন্ট কো-অর্ডিনেট করার কোন অভিজ্ঞতা নেই। তাও সব আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। আর হাতে মাত্র আঠারো দিন... আমার নিজের রেগুলার ক্লাস, ফার্স্ট ইয়ার, থার্ড ইয়ারের সিলেবাস, সব এক সাথে..."
কথাগুলো বলতে বলতে এই দ্বিধার মুহূর্তেই বিদিশার মনে সাম্প্রতিক অতীতের একটা স্মৃতি বিদ্যুতের ঝলকের মতো খেলে গেল।
ডক্টর বাগচীর সেই ঠান্ডা, হুমকিভরা গলাটা যেন তার কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
'সামনেই কলেজকে ডিমড ইউনিভার্সিটি করার জন্য একটা বড় ফান্ডিংয়ের দরকার। যার জন্য খুব শিগগিরই একটা বড় ফান্ডিংয়ের প্রয়োজন। এর একটা অংশ এদের থেকে আসার কথা। আপনি যদি এখন এই প্রভাবশালী ঘরের ছেলেদের ফেল করান, তবে ফান্ডিংটা আটকে যেতে পারে...'
Continued...