প্রতিমার জীবন সংগ্রামের ইতিকথা - অধ্যায় ২৩

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73447-post-6265845.html#pid6265845

🕰️ Posted on Thu Jul 16 2026 by ✍️ sghosh2100sg1900 (Profile)

🏷️ Tags:
📖 1394 words / 6 min read

Parent
দ্বাবিংশ:- সকালবেলার রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকেছে। প্রতিমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়িটা শরীরে জড়িয়েছে সে, সোনালি পাড়গুলো আলোর প্রতিফলনে ঝিলিক দিচ্ছে। গলার ভারী সোনার হার আর কানের দুলগুলো যেন তার ঘাড়ের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। চোখে কোনো আনন্দ নেই, নেই কোনো নতুন শুরুর উত্তেজনা। কেবল এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন কোনো দীর্ঘ যুদ্ধের পর এক টুকরো ক্লান্ত শান্তি। দরজায় টোকা পড়ল। মা ঘরে ঢুকলেন। প্রতিমার কাঁধে হাত রেখে মৃদু স্বরে বললেন, “তৈরি হয়ে গেছিস? সবাই নিচে অপেক্ষা করছে।” প্রতিমা মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠস্বর খুব নিচু, “অর্ণব কি জেগেছে?” মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এখনো ঘুমোচ্ছে। ওর দাদু কোলে নিয়েছি। তুই নিচে যা, এখন আর দেরি করা ঠিক হবে না।” প্রতিমা শেষবারের মতো আয়নার দিকে তাকাল। প্রথম বিয়েটা ছিল পালিয়ে যাওয়া, মন্দিরের এক কোণে গোপন প্রতিশ্রুতি। আর আজ, পরিবারের সামনে সে নতুন করে জীবন শুরু করছে। সে ধীর পায়ে নিচে নেমে এল। মণ্ডপটা ছোট, খুব অল্প কিছু আত্মীয়। আগুনের ধোঁয়া আর ধূপের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। সাদা পাঞ্জাবিতে ডাঃ অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে এক ধরনের স্থিরতা, মুখে মৃদু হাসি। প্রতিমা যখন মণ্ডপে এসে দাঁড়াল, অনিরুদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলেন। সেই হাসিটা ছিল উষ্ণ, কোনো দাবি নেই তাতে, কেবল এক অদ্ভুত ভরসা। অনিরুদ্ধ নিচু স্বরে বললেন, “আপনি কি ঠিক আছেন, প্রতিমা?” প্রতিমা মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ।” সাত পাকের সময় অনিরুদ্ধর হাতের স্পর্শ প্রতিমার শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। তবে তা কামনার নয়, বরং এক ধরণের নিরাপত্তা। যখন অনিরুদ্ধ তার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিলেন, প্রতিমা চোখ বন্ধ করল। আগুনের শিখাটা তার চোখের সামনে নাচছিল। সে অনুভব করল, এক অন্ধকার অধ্যায়ের পর্দা নামছে, আর এক অজানার দিকে সে পা বাড়াচ্ছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। আত্মীয়দের বিদায় জানিয়ে প্রতিমা রওনা হলো তার নতুন ঠিকানার দিকে—উত্তর কলকাতার এক বিশাল ফ্ল্যাট। গাড়ির জানালার বাইরে শহরের ব্যস্ততা বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিমার ভেতরে এক গভীর নীরবতা। বাড়ি ঢুকে প্রতিমা দেখল ঘরগুলো খুব পরিষ্কার। আসবাবপত্রগুলো পরিপাটি, জানালার পর্দাগুলো থেকে হালকা চন্দনের গন্ধ আসছে। অনিরুদ্ধ তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এলেন। “এই বাড়িটা এখন আপনার। এখানে আপনার যা ইচ্ছে তা করতে পারেন,” অনিরুদ্ধ বললেন। প্রতিমা চারপাশে তাকিয়ে বলল, “খুব সুন্দর বাড়ি।” “আপনার পছন্দ হবে বলে আশা করি। ঋতুপর্ণা এখন প্রতিবেশীর কাছে আছে। ওর জন্য একজন মায়ের খুব দরকার ছিল। আমি জানি আপনি ওকে আপন করে নেবেন,” অনিরুদ্ধর কথাগুলো ছিল খুব বিনম্র। রাত নেমে এল। শোবার ঘরের পরিবেশটা আলাদা। বিছানায় সাদা চাদর, তার ওপর লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। ছোট একটি প্রদীপ জ্বলছে, যার আলোয় ঘরের কোণগুলো রহস্যময় হয়ে উঠেছে। প্রতিমা বেনারসি খুলে একটি সাধারণ তাঁতের শাড়ি পরল। তার হাত দুটো কাঁপছিল। সে বিছানার এক কোণে বসে রইল, মাথা নিচু করে। দরজা খোলার শব্দ হলো। অনিরুদ্ধ ভেতরে এলেন। তিনি দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করলেন। প্রতিমা আরও কুঁকড়ে গেল। তার চোখে ভয়, আর মনে ভেসে উঠল সেই অন্ধকার রাতগুলো, সেই নিষ্ঠুর স্পর্শ। অনিরুদ্ধ তার পাশে বসলেন। খুব সাবধানে প্রতিমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তার স্পর্শ ছিল নরম, প্রায় স্পর্শহীন। “প্রতিমা,” অনিরুদ্ধর গলা ছিল খুব শান্ত। প্রতিমা চমকে তাকাল। “আমি জানি এই বিয়েটা আপনার জন্য সহজ নয়। আমি জানি আপনার স্বামী কয়েক বছর আগেই গত হয়েছেন,” অনিরুদ্ধর চোখে ছিল গভীর সহমর্মিতা। প্রতিমার ঠোঁট কাঁপল। সে কোনো কথা বলতে পারল না। “আমি চাই না আপনি কোনো চাপে থেকে কিছু করুন। এই ঘর, এই বিছানা—সবকিছুই আপনার। আমি চাই না আপনি জোর করে আমার কাছে আসুন,” অনিরুদ্ধর কথাগুলো প্রতিমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি করল। প্রতিমা চোখ তুলে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর ভাঙল, “আমার... আমার কিছু সময় দরকার। আমি এই সবকিছু এখনই মেনে নিতে পারছি না। আমি চাই... ধীরে ধীরে...” অনিরুদ্ধ তার হাতটা একটু জোরে চেপে ধরলেন, তারপর ছেড়ে দিলেন। “আপনি যতদিন চান, আমি অপেক্ষা করব। আপনার সম্মতির বাইরে আমি কখনো আপনাকে স্পর্শ করবো না। আপনি শুধু শান্তিতে ও নিশ্চিন্তে থাকুন,” অনিরুদ্ধ মৃদু হাসলেন। সে রাতে তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক মিলন হলো না। অনিরুদ্ধ বিছানার এক প্রান্তে শুয়ে পড়লেন, আর প্রতিমা অন্য প্রান্তে। মাঝখানে এক বিশাল শূন্যতা, কিন্তু সেই শূন্যতাটি ছিল সম্মানের। প্রতিমা চোখ বন্ধ করল। তার কানে বাজতে লাগল সৌম্যের সেই কর্কশ কণ্ঠ, তার শরীরের ওপর সেই ভারী ভার। কিন্তু পাশের মানুষটির স্থির শ্বাস-প্রশ্বাস শুনে তার মন ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল। সে বুঝল, এই মানুষটি তাকে শরীর হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে চাইছে। পরের দিনগুলো কাটতে লাগল এক অদ্ভুত ছন্দে। অনিরুদ্ধ সকালে হাসপাতালে যেতেন, রাতে ফিরতেন। প্রতিমা বাড়ি সামলাতে শুরু করল। ঋতুপর্ণার সাথে তার প্রথম দেখা হলো বিকেলের দিকে। পাঁচ বছরের মেয়েটি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রতিমাকে দেখছিল। প্রতিমা নিচু হয়ে তার সামনে বসল। “কী নাম তোমার, সোনা?” মেয়েটি লাজুক স্বরে বলল, “ঋতুপর্ণা।” “খুব সুন্দর নাম। তুমি কি আমার সাথে খেলবে?” প্রতিমা তার গালে আলতো করে চুমু খেল। ঋতুপর্ণা প্রথমে একটু ইতস্তত করল, তারপর প্রতিমার গলা জড়িয়ে ধরল। “তুমি কে?” প্রতিমার চোখের কোণ ভিজে এল। সে মেয়েটিকে বুকে টেনে নিল। “আমি তোমার মা।” অর্ণবও ধীরে ধীরে অনিরুদ্ধর সাথে মিশে গেল। একদিন বিকেলে অনিরুদ্ধ অর্ণবকে কোলে নিয়ে খেলছিলেন। অর্ণব খিলখিল করে হাসছিল। হঠাৎ সে অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “বাবা!” প্রতিমা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার বুকের ভেতর এক মিষ্টি ব্যথা অনুভূত হলো। সে জানত অর্ণবের আসল বাবা কে, কিন্তু অনিরুদ্ধর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে তার মনে হলো—হয়তো এই সন্তান এই মানুষটিরই। রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে অনিরুদ্ধ বললেন, “অর্ণব খুব মিষ্টি ছেলে। ওকে দেখতে দেখতে আমি ওকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি।” প্রতিমা হাসল, “ও খুব দুষ্টু।” “দুষ্টু হলে তো ভালোই। আমরা দুজনেই ওর খেয়াল রাখব,” অনিরুদ্ধর চোখে ছিল এক পিতার তৃপ্তি। দিনগুলো গড়াতে লাগল। প্রতিমা এখন আর একা নয়। সে ঋতুপর্ণাকে গল্প শোনায়, অর্ণবকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ায়। অনিরুদ্ধর সাথে তার সম্পর্কটা এখন আর কেবল আইনি বন্ধন নয়, তা হয়ে উঠেছে এক গভীর বন্ধুত্বের। এক মাস পর এক বৃষ্টিভেজা বিকেল। অনিরুদ্ধ অফিস থেকে ফিরে দেখলেন প্রতিমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছেন। তিনি পেছন থেকে এসে প্রতিমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার মাথা প্রতিমার চুলে রাখলেন। প্রতিমা চমকে উঠল, কিন্তু এবার সে পিছিয়ে গেল না। সে অনুভব করল অনিরুদ্ধর উষ্ণ নিঃশ্বাস। এই প্রথম কোনো পুরুষ তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছে—কামনা নয়, কেবল বিশুদ্ধ স্নেহ দিয়ে। “আপনি এখন এখানে?” প্রতিমা মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল। “তোমাকে খুব মনে পড়ছিল। এই বৃষ্টিতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে,” অনিরুদ্ধর কণ্ঠস্বরে ছিল গভীর ভালোবাসা। প্রতিমা তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। সে অনুভব করল, সে অনিরুদ্ধকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। এই ভালোবাসা তাকে মুক্তি দিচ্ছে, তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে। বছর ঘুরল। অর্ণব আর ঋতুপর্ণা এখন একই সাথে বড় হচ্ছে। প্রতিমা এখন অনিরুদ্ধর সংসারে এক পরিপূর্ণ স্ত্রী। সে এখন তাকে মন থেকে স্বামী বলে মেনে নিয়েছে। সকালে তার জন্য চা বানানো থেকে শুরু করে রাতে তার ডিনার তৈরী করা, অনিরুদ্ধের জামা কাপড় পরিস্কার করা ও গুছিয়ে রাখা—সবকিছুই এখন তার আনন্দের উৎস। একদিন বিকেলে অনিরুদ্ধ ক্লিনিক থেকে ফিরে দেখলেন বারান্দায় প্রতিমা বসে আছে। অর্ণব আর ঋতুপর্ণা তার দুই পাশে বসে গল্প শুনছে। অর্ণব হঠাৎ বলে উঠল, “মা, বাবা এসেছে!” অনিরুদ্ধ পেছন থেকে এসে প্রতিমার কাঁধে হাত রাখলেন। প্রতিমা ফিরে তাকাল। তার চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, কেবল এক স্বচ্ছ ভালোবাসা। “আজ এত তাড়াতাড়ি ফিরলেন কেন?” প্রতিমা মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করল। “তোমাদের খুব মনে পড়ছিল। ভাবলাম আজ তোমাদের নিয়ে একটু ঘুরতে যাব। কোথায় যেতে চাও তোমরা?” অনিরুদ্ধর চোখে ছিল দুষ্টুমি। “আমি আইসক্রিম খাব!” ঋতুপর্ণা চিৎকার করে উঠল। “আমিও খাব!” অর্ণব তার ছোট ছোট হাত নেড়ে বলল। প্রতিমা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। সে ভাবল, এই মুহূর্তটিই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। অতীতের সেই অন্ধকার রাত, সেই চিৎকার, সেই যন্ত্রণার স্মৃতি এখন কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে। সে এখন বিশ্বাস করে, অর্ণব অনিরুদ্ধরই সন্তান। কারণ রক্ত সম্পর্কের চেয়েও বড় হলো এই যত্ন, এই মমতা ও এই ভালোবাসা। রাতে যখন শিশুরা আলাদা ঘরে ঘুমিয়ে পড়ল, প্রতিমা আর অনিরুদ্ধ বারান্দায় দাঁড়ালেন। আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ উঠেছে, বাতাসে হিমেল পরশ। অনিরুদ্ধ প্রতিমার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের দিকে টানলেন। “তুমি কি সুখী, প্রতিমা?” অনিরুদ্ধর প্রশ্নটি ছিল খুব গভীর। প্রতিমা তার দিকে তাকাল। তার চোখ সজল, কিন্তু সেই জলে এখন সুখের আভাস। “হ্যাঁ, অনিরুদ্ধ। আমি আপনার সাথে খুব সুখী। আপনি আমাকে শুধু একটা বাড়ি নয়, একটা জীবন দিয়েছেন,” প্রতিমা তার মাথা অনিরুদ্ধর কাঁধে রাখল। অনিরুদ্ধ তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। প্রতিমা চোখ বন্ধ করল। তার মনে পড়ল সৌম্যের কথা। সেই কালো অধ্যায়, সেই নিষিদ্ধ প্রেম আর ঘৃণা। সে অনুভব করল, সেই স্মৃতিগুলো এখন অনেক দূরে, যেন অন্য কোনো জন্মের কথা। সে এখন বর্তমানের সুখ নিয়ে বাঁচতে চায়। “আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি,” প্রতিমা ফিসফিস করে বলল। অনিরুদ্ধ তার কপালে একটি উষ্ণ চুমু খেলেন। “আর আমি আপনাকে সারাজীবন আগলে রাখব, তোমার আশেপাশে কোনোদিন দুঃখ ও কষ্ট আসতে দেবো না।” জানালার বাইরে রাত আরও গভীর হলো। শহরের আলোগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। প্রতিমা অনুভব করল, সে অবশেষে তার আসল ঠিকানায় পৌঁছেছে। সৌম্য কেবল একটি ভুলে যাওয়া স্বপ্ন, একটি দুঃস্বপ্ন যা ভোরের আলোয় মিলিয়ে গেছে। এখন তার সত্যি এই মানুষ, এই সন্তানরা, আর এই শান্ত ঘর। সে তার চোখ বন্ধ করে এক গভীর প্রশান্তিতে ডুবে গেল।
Parent